
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশতিয়াক শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে ফোনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময়ের কাছাকাছি অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যার কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অপ্রতিমের মরদেহের ময়নাতদন্তও সম্পন্ন হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। এরপর আর বাসায় ফেরেনি সে। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে ওইদিন সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটির সর্বশেষ অবস্থান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকার কাছাকাছি শনাক্ত হয়। এরপর ফোনটির আর কোনো অবস্থান পাওয়া যায়নি। পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাতভর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অপ্রতিমের গতিবিধি শনাক্তের চেষ্টা করে।
পরদিন শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন স্থান থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে এক তরুণকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় দেখা যায়। পরে ওই তরুণকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুজনকে আটক করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা হলেন তুহিন, আনাস ও ফাহিম। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায় নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে আইফোনই একমাত্র কারণ ছিল কি না, নাকি অন্য কোনো বিষয় রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এর আগে অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পুলিশ বিভিন্ন স্থানে তার সন্ধানে তল্লাশি চালায়। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার পাশাপাশি তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। প্রায় ২১ ঘণ্টা পর তার মরদেহের সন্ধান মেলে।
অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান।
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক দিনের শোক ঘোষণা করেছে এবং ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
অপ্রতিমের মৃত্যু কীভাবে, কার হাতে এবং কী কারণে ঘটেছে, এখন তদন্তের মূল প্রশ্নগুলো সেদিকেই। উদ্ধার হওয়া আইফোন, সিসিটিভি ফুটেজ ও আটক তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
প্রাথমিক ভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে যে তারা সবাই আগে থেকেই পরিচিত ছিলো। তারা ফ্রী ফায়ার গেমস খেলতো আর তুহিনের নামে আগেও একটি চুরির অভিযোগ ছিলো তার এলাকায়। তুহিনের বাসা থেকে সেই আইফোনটি উদ্ধার করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ও লোকাল পুলিশ।
এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইসমাত শাহরিয়ার অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ডে শোক নেমে এসেছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। এ ঘটনায় গভীর শোক ও প্রতিবাদ জানিয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদারের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ডে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার গভীরভাবে শোকাহত ও স্তম্ভিত। একই সঙ্গে নিহত অপ্রতীমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এদিকে অপ্রতীমের মৃত্যুর ঘটনায় আগামীকাল রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সাধারণ শোক’ ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলোর নতুন সময়সূচি পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর নোটিশের মাধ্যমে জানানো হবে।




