
প্রায় দুই বছর আগে নিজের ঘরের দেয়ালে লিখেছিলেন একটি শব্দ ‘Dream’। সেই শব্দকে ঘিরেই ছিল তাঁর পথচলা। মনের ভেতর ছিল একটি আকাঙ্ক্ষা, একদিন বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে বলবেন, ‘আমি জজ হয়েছি।’ দীর্ঘ প্রস্তুতি, ব্যর্থতা, হতাশা ও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পর সেই স্বপ্নই এখন বাস্তব।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার ফলাফলে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সজীবুর রহমান সজীব।
ফল প্রকাশের পর প্রথমেই বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে নিজের সেই স্বপ্ন পূরণের কথা জানান সজীব। তিনি বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ। এটা ছিল আমার জীবনের সেরা অনুভূতি। প্রায় দুই বছর আগে আমি এই দেয়ালে ‘Dream’ লিখে রেখেছিলাম। সেই স্বপ্ন যখন সত্যি হলো, তখন প্রথমেই আব্বু-আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বলেছি, ‘আমি জজ হয়েছি।’ ওই মুহূর্তের অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
১৮তম বিজেএসের ফল প্রকাশের দিন সকাল থেকেই উৎকণ্ঠায় ছিলেন সজীব। কমিশনের বৈঠক ও ফল প্রকাশের সম্ভাবনার কথা জানতে পেরে বারবার ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে নজর রাখছিলেন তিনি। আসরের নামাজ শেষে ওয়াই-ফাই চালু করতেই একটি গ্রুপে ফলাফলের ছবি দেখতে পান। কাঁপা হাতে ফলাফলের তালিকা ডাউনলোড করে নিজের রোল নম্বর খুঁজতে শুরু করেন।
প্রথম ও দ্বিতীয়বার নিজের রোল খুঁজে না পেয়ে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন। পরে তৃতীয়বার তালিকায় চোখ রাখতেই হঠাৎ নিজের রোল নম্বর দেখতে পান। এরপর দ্রুত বাবা-মায়ের কাছে ছুটে যান।
সজীব বলেন, “সঙ্গে সঙ্গে আব্বু বলে চিৎকার করে আব্বুর রুমে যাই। আব্বুকে জড়িয়ে ধরে বলি, ‘আব্বু, আমি জজ হয়েছি।’ আব্বুকে জড়িয়ে ধরে দুজনেই কেঁদেছি। কিছুক্ষণ পর আম্মু রুমে এলে তাঁকেও জড়িয়ে ধরে বলেছি, ‘আম্মু, আমি জজ হয়েছি।’ দীর্ঘদিনের স্বপ্নটা সত্যিই পূরণ হলো।”
তবে এই সাফল্যের পথ সহজ ছিল না। অনার্স শেষ করার দুই-তিন মাসের মধ্যেই ১৬তম বিজেএসের সার্কুলার পান সজীব। ওই পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভাইভায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেও চূড়ান্ত ফলাফলে সফল হতে পারেননি।
এরপর ১৭তম বিজেএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ নম্বরের জন্য উত্তীর্ণ হতে না পারা তাঁর জন্য আরও কঠিন অভিজ্ঞতা হয়ে আসে। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে সজীব বলেন, “কয়েকদিন প্রচণ্ড কেঁদেছি। একা রুমে কেঁদেছি, টিউশনিতে যাওয়া-আসার সময় রাস্তায় কেঁদেছি। আবার অনেক সময় চোখের জল চোখেই শুকিয়ে ফেলেছি। সময়টা সত্যিই কঠিন ছিল।”
এই ব্যর্থতার পর আত্মবিশ্বাস কিছুটা কমে গেলেও বড় ভাই, সহধর্মিণী ও কাছের মানুষের উৎসাহ তাঁকে আবার লক্ষ্যে ফিরতে সাহায্য করে। নতুন করে প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি।
বিজেএসের প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিশাল সিলেবাসের কথা উল্লেখ করেন সজীব। তাঁর মতে, অল্প সময়ের মধ্যে বড় পরিসরের সিলেবাস প্রস্তুত করে ১০টি লিখিত পরীক্ষা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। এ জন্য দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।
প্রস্তুতির সময় একসঙ্গে অনেক আইন না পড়ে বিভিন্ন দিনে ভাগ করে ধারাবাহিকভাবে পড়তেন সজীব। পাশাপাশি প্রতিদিন সাধারণ বিষয়গুলো পড়ার চেষ্টা করতেন। তবে তাঁর প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ছিল রিভিশনে। নতুন পড়া শুরুর আগে আগের দিনের পড়া বিষয়গুলো একবার দেখে নিতেন তিনি।
সজীব মনে করেন, বিজেএসের মতো পরীক্ষায় শুধু নতুন বিষয় পড়লেই হয় না; পড়া বিষয়গুলো বারবার রিভিশন দিয়ে মনে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই সাফল্যের পেছনে বাবা-মা, বড় ভাই, সহধর্মিণী, শিক্ষক, বড় ভাইদের অনেকে, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের উৎসাহ, সহযোগিতা ও দোয়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁদের প্রত্যাশা একসময় তাঁর ওপর চাপ তৈরি করলেও সেই চাপই তাঁকে আরও পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানান সজীব।
বড় ভাইয়ের অবদানের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আজ আমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে পৌঁছানোর পেছনে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
দেয়ালে লেখা ‘Dream’ পূরণ হলেও এটিকে শেষ হিসেবে দেখছেন না সজীব। একজন বিচারক হিসেবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, “অবশ্যই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই আমার প্রধান লক্ষ্য। আমি আমার সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে দেশ ও মানুষের আইনি সেবা করতে চাই। আমার ওপর অর্পিত এই পবিত্র দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য নিজেকে সবসময় প্রস্তুত ও সচেষ্ট রাখতে চাই। একজন বিচারপ্রার্থী যেন আদালত থেকে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা নিয়ে ফিরতে পারেন—এটাই আমার অন্যতম প্রত্যাশা।”
বিজেএসের প্রস্তুতি নেওয়া জুনিয়রদের উদ্দেশে সজীবের পরামর্শ, মানসিকভাবে প্রস্তুত থেকে নিজের লক্ষ্যে দৃঢ় থাকতে হবে। পড়াশোনার পরিমাণের চেয়ে পড়ার মানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং কী পড়তে হবে, কী পড়তে হবে না—সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখার পরামর্শ দেন তিনি। মূল আইন বুঝে বারবার পড়া এবং রিভিশনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সজীব বলেন, “চূড়ান্তভাবে সফল না হওয়া পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং সৃষ্টিকর্তাকে নিয়মিত স্মরণ করতে হবে। ইনশাআল্লাহ, একদিন আপনিও নিজের সফলতার গল্প লিখবেন। আপনিও বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারবেন, ‘আমি জজ হয়েছি।’”
একসময় ঘরের দেয়ালে নিজের হাতে লেখা ‘Dream’ ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্নের ঘোষণা। প্রায় দুই বছর পর সেই দেয়ালই হয়ে উঠেছে স্বপ্নপূরণের সাক্ষী। সজীবের কাছে ‘Dream’ এখন আর শুধু একটি শব্দ নয়; এটি তাঁর অপেক্ষা, পরিশ্রম, ব্যর্থতা পেরিয়ে সাফল্যে পৌঁছানোর গল্প।




