
যুদ্ধ শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; এর পাশাপাশি তথ্য ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও লড়াই চলে বলে মন্তব্য করেছেন সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রেগরি জে. সিমনস। তাঁর মতে, প্রতিপক্ষের বয়ান বা ‘ন্যারেটিভ’ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সংঘাতের ব্যাখ্যা ও জনমতকেও প্রভাবিত করা সম্ভব।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও বিশ্ব গণমাধ্যম: নৈতিক জবাবদিহি ও আত্মসমালোচনা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
পশ্চিমা গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে অধ্যাপক সিমনস বলেন, গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে বিবেচনা করার প্রচলিত ধারণা এখন কার্যকর নেই। তাঁর ভাষায়, উন্নত বিশ্বের গণমাধ্যমে চতুর্থ স্তম্ভের ধারণাটি কার্যত মৃত।
গণমাধ্যমের কাজ শুধু তথ্য সরবরাহ করা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, পশ্চিমা গণমাধ্যম জনমতকে নির্দিষ্ট দিকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে জনসমর্থন তৈরিতে তথ্যকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা হয়।
ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে সিমনস বলেন, এসব মাধ্যমে এমন বিকল্প পরিসর তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রচলিত গণমাধ্যমের বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি টাকার কার্লসন ও জাজ নাপোলিটানোর মতো ব্যক্তিদের উদাহরণ দেন।
যুদ্ধের ক্ষেত্রে তথ্যের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তথ্য ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মাধ্যমে মানুষকে নির্দিষ্টভাবে চিন্তা করতে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে প্রভাবিত করা যায়। তাঁর মতে, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বক্তব্য, তথ্যপ্রবাহ ও সংঘাতের ব্যাখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতাও চলে।
এ প্রসঙ্গে সিমনস বলেন, “আপনি যদি পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে পারেন, তবে আপনি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারবেন। আর যদি প্রতিপক্ষ আপনাকে সংজ্ঞায়িত করে ফেলে, তবে আপনি তাদের বর্ণনার কবলে বন্দী হয়ে পড়বেন।”
পশ্চিমা রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো সাম্রাজ্য বা সভ্যতার পতনের অন্যতম লক্ষণ হলো রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাওয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্ব সম্পর্কেও তিনি একই ধরনের সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন।
পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রসঙ্গে অধ্যাপক সিমনস বলেন, ১৯৯০-এর দশকে পশ্চিমা দেশগুলো শিল্প উৎপাদনের বড় অংশ বিদেশে স্থানান্তর করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে চীন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরেশিয়া অঞ্চলে গ্লোবাল সাউথের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে রাশিয়া, চীন ও ইরানের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমের সমালোচনা করে সিমনস বলেন, এসব গণমাধ্যম নিজেদের কর্মকাণ্ডের বৈধতা প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা অর্জনে তথ্য ব্যবহার করে। জনগণকে নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করার প্রবণতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের তুলনা করেন তিনি।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন অধ্যাপক সিমনস। এসব বিষয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, কৌশলগত লড়াইয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ইতিমধ্যে পিছিয়ে পড়েছে। বিকল্প গণমাধ্যম ও গ্লোবাল সাউথের গণমাধ্যম এ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাতের প্রসঙ্গে সিমনস যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমানবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর মতে, ইরানের মতো বিস্তৃত ভূখণ্ডের একটি দেশের বিরুদ্ধে এসব সামরিক সক্ষমতার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বর্তমান সংঘাতকে দুটি পর্যায়ে ব্যাখ্যা করেন—একটি বাস্তব সামরিক লড়াই, অন্যটি তথ্য ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই।
বিকল্প গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব মাধ্যমের কারণে ইরানের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের বিভিন্ন দিক আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাবে বাজার ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সেমিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত রুশ ফেডারেশনের রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গ্রিগোরিয়েভিচ খোজিন, ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমী জাহানাবাদী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন।
এ ছাড়া আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক এবং আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমদ ইহসানুল কবীর। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শাহ মো. নিসতার জাহান কবীর।




