
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঈশ্বরদী ইপিজেড, পাকশী রেলওয়ের বিভাগীয় কার্যালয়, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক ডাল গবেষণা কেন্দ্রসহ অনেকগুলো সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ঈশ্বরদীতে হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঈশ্বরদীতে এসে বসবাসকারী দেশি-বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর আদমশুমারি-২০২২-এর তথ্যানুযায়ী, ঈশ্বরদী উপজেলার মোট জনসংখ্যা ৩ লাখ ৯০ হাজার ৪০২ জন। ২৪৬ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ভূখণ্ডের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকেও প্রতিনিয়ত মানুষ চিকিৎসা নিতে এই উপজেলায় আসেন। এ ছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ঈশ্বরদী ইপিজেডে কর্মরত বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি। ইপিজেডে কর্মরত ২১ হাজার শ্রমিকের অর্ধেকের বেশি আসেন পার্শ্ববর্তী জেলা নাটোর ও কুষ্টিয়া থেকে।
কর্মের পরিধি ও পারস্পরিক যোগাযোগব্যবস্থার কারণে ঈশ্বরদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসার জায়গা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। যেখানে কর্মী সংকটে হাসপাতালটি নিজেই নানা জটিলতায় ভুগছে দীর্ঘদিন ধরে। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর জন্য ৫০ শয্যার এই একটি মাত্র হাসপাতালে যেন ভোগান্তির অভয়াশ্রম।
উপজেলা শহরের পূর্ব নূর-মহল্লার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর ইসলাম বলেন, ‘ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছিলাম ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু ডাক্তার তো দূরের কথা, এখানে কর্মরত সেবিকাদের সঙ্গে কথা বলাই দায়। পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার ও ময়লা-আবৃত বেডশিট—সব মিলিয়ে হাসপাতাল তো নয়, এ যেন ময়লার ভাগাড়। যেখানে কোনো সুস্থ মানুষও অসুস্থ হতে বাধ্য।’
বুকের ব্যথা নিয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন পৌরসভার রহিমপুর এলাকার বাসিন্দা মো. শিহাব উদ্দিন। টানা ২৪ ঘণ্টা অতিক্রম করেও ডাক্তারের সাক্ষাৎ না পেয়ে নিজেই হাসপাতালের দ্বিতীয় তলা থেকে নেমে আসেন ডাক্তারের খোঁজে। পরে ডাক্তারের সাক্ষাৎ পেলেও সঠিক চিকিৎসা পাননি। ফলে ডাক্তারি নানা পরীক্ষার জন্য তাঁকে ছুটতে হয়েছে পার্শ্ববর্তী ক্লিনিকে। যেখানে তৈরি করা রিপোর্টের মান নিয়েও নানা অজুহাত রয়েছে চিকিৎসকদের।
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা আসমা খাতুন বলেন, ‘হাসপাতালে কোনো শৃঙ্খলা নেই। প্রতিবাদ করলেই স্টাফদের রোষানলে পড়তে হয়। চিকিৎসা বলতে কেবল গ্যাস আর সর্দি-কাশির বড়ি ছাড়া তেমন ওষুধ নেই। রোগীর কথা শুনতে চায় না। কথা বলতে গেলেই বাইরের ক্লিনিক বা রাজশাহীতে যেতে বলে।’
সরকারি হাসপাতালের জঞ্জাল এড়াতে এবং স্বাস্থ্যসম্মত চিকিৎসার প্রত্যাশায় স্ত্রীকে নিয়ে ঈশ্বরদী শহরের নামকরা বহুতল ভবনের একটি ক্লিনিকে যান শিহাব উদ্দিন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও রিপোর্ট শেষে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর স্ত্রীর ওভারিতে সিস্টের বিভীষিকাময় অবস্থা। এমন অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে মা হতে না পারার বিষয়ে ওই দম্পতিকে ভয়ও দেখানো হয়। কিন্তু ঈশ্বরদীর বাইরের চিকিৎসকেরা বলেন, তাঁর স্ত্রীর এমন কিছুই হয়নি। উল্টো রয়েছে সুখবর।
বাসচালক উজ্জল হোসেন পিঠের ব্যথা নিয়ে আরেকটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন। ২০ হাজার টাকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর হার্টে ৬০ শতাংশ ব্লক রয়েছে। চিকিৎসকের কথায় অর্ধমৃত উজ্জল চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে রওনা হন। সেখানে অবস্থান করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানতে পারেন, তাঁর সমস্যা হার্টে নয়, বরং মাথার পেছনের আঘাতের কারণে।
অসুস্থতা থেকে বাঁচতে চিকিৎসা নিতে আসা এমন হাজারো ভুক্তভোগীর অজানা গল্প এখন নিত্যদিনের। যে ধাঁধায় আটকে আর্থিক ও শারীরিকভাবে ধ্বংস হচ্ছে বহু পরিবার। ভুল চিকিৎসায় হারাচ্ছে নিজের বসতভিটা ও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ঈশ্বরদীর গুরুত্ব ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে সরকারি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা অত্যন্ত সামান্য। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিদেশি নাগরিকদের চিকিৎসার জন্য প্রায়ই রাজশাহী ও ঢাকায় যেতে হয়। ঈশ্বরদীর সঙ্গে রাজশাহী বা ঢাকার দূরত্ব এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার কারণে প্রায়ই বিপদগ্রস্ত হন অনেকে। অনেকের মৃত্যুও হয় রাস্তায়।
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক আরএমও শফিকুল ইসলাম শামীম জানান, যতদিন ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছিলেন, ততদিন দায়িত্বের সঙ্গে সব কাজ করেছেন। পরিচিতদের কাছ থেকে জেনেছেন, বর্তমানে জনবল সংকটে সেখানকার চিকিৎসাব্যবস্থা বিপন্নপ্রায়। এ ছাড়া শহরজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ক্লিনিকগুলোর গুণগত মান নিয়েও সংশয় রয়েছে। কেননা এসব ক্লিনিকে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিগুলো প্রায় অচল। সে কারণে পরীক্ষার ফলাফলেও বড় ধরনের গরমিল আসে। সেগুলো একজন রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন পাল বলেন, ‘আমাদের সাধ্যমতো আমরা রোগীদের সেবা দিয়ে থাকি। এর মধ্যেও কেউ কোনো অভিযোগ করলে আসলে কিছুই বলার থাকে না। তবে গত তিন মাস ধরে আমাদের এখানে অ্যানেসথেশিয়া ও গাইনি বিশেষজ্ঞ নেই। তাই এ বিভাগের চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা ক্লিনিক ও তাদের চিকিৎসার মান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন উপজেলা প্রশাসন। এটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।’
জানতে চাইলে ঈশ্বরদী সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান সরকার বলেন, ‘সঠিক সেবা নাগরিকের অধিকার। এটা নিশ্চিত করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ সোয়াইবকে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।




