
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান আলোচনার অংশ হিসেবে ৬০ দিনের আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি এবং পর্যায়ক্রমে কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত আঞ্চলিক একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তেহরান ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে একটি কূটনৈতিক ‘রোডম্যাপ’ উপস্থাপন করেছে।
এতে ৬০ দিন পর্যন্ত অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, পর্যায়ক্রমে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা এবং চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে বিস্তৃত আলোচনার জন্য একটি সময়সূচির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও জানা গেছে, এই প্রস্তাবে আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা পুরোপুরি বন্ধ রাখার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন যে, ওয়াশিংটন যদি তেহরানের শর্তগুলো মেনে নেয়, তবে আগামী সাত দিনের মধ্যে সম্ভাব্যভাবে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া যেতে পারে। নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, কূটনীতির পথ এখনো খোলা রয়েছে। তবে তাদের জোর দাবি, যেকোনো চুক্তিতে অবশ্যই তাদের দাবিগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে-যার মধ্যে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্যতম।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন কূটনীতির ক্ষেত্রে উন্মুক্ত থাকলেও সামরিক ব্যবস্থার বিকল্প পথ এখনো বহাল রেখেছে। বর্তমানে উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে এমন অবস্থান ধরে রেখেছে যাতে ছাড় দেওয়ার মতো কোনো ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। ফলে এই কূটনৈতিক আলোচনা অত্যন্ত পরিবর্তনশীল এবং অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। এদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সহযোগী হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানবন্দর অচল করে দেওয়ার কঠোর হুমকি দিয়েছে ইরান।
ইরানি বিমানসংস্থাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আরোপিত নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা হলে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দেশটি। এতে করে গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের কারণে উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাই দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, “আমি আমাদের প্রতিবেশী সব দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অ্যাডভেঞ্চারে যুক্ত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। এই পাঁচতারা পরিকল্পনা খুব দ্রুতই ব্যর্থ হবে।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, কোনো দেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে সাহায্য করে, তবে তাদের বিমানবন্দর থেকে ইরানে বা ইরানের ওপর দিয়ে কোনো ফ্লাইট পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না এবং সেগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করা হবে। সম্প্রতি মার্কিন অর্থ দফতর (ট্রেজারি বিভাগ) ইরানের অন্যতম বড় বিমানসংস্থা ‘মাহান এয়ার’সহ দেশটির ২৭টি এয়ারলাইন্সের ওপর নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারিত করেছে।
একইসঙ্গে বলা হয়েছে, বিশ্বের যেকোনো বিমানবন্দর যদি ইরানি বিমানকে জ্বালানি, ল্যান্ডিং সুবিধা কিংবা টিকিট বিক্রির সুযোগ দেয়, তবে তারাও মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এই হুমকির পর ইতিমধ্যেই দুবাই, বাগদাদ, মাসকাট, আজারবাইজান ও জর্জিয়ায় ইরানের ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। তবে তুরস্ক, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে কিছু ফ্লাইট চালু থাকলেও সেখানেও বড় প্রভাব পড়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান অন্য স্বাধীন দেশের বিমানবন্দর সরাসরি বন্ধ করতে না পারলেও, অতীতে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের আকাশপথ অচল করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিমানখাত ২০২৬ সালে প্রায় ৪.৩০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো বড় কেন্দ্রগুলোতে চলতি বছরের প্রথমার্ধে যাত্রী পরিবহন প্রায় ৩১ শতাংশ কমে গেছে।
এই অচলাবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ইরানি নাগরিকরা, যারা আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে তুরস্ক ও আর্মেনিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে সড়কপথে যাতায়াত করছেন।




