
সৌদি আরবে নজরুল ইসলাম নামে এক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। নিহত নজরুলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আবদুল বাছির ও রেহেনা বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্বজনদের না জানিয়ে গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) সৌদি আরবের মক্কায় অনৈতিক কাজের অভিযোগে নজরুল ইসলামসহ দুইজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে গণমাধ্যমের খবর দেখে পরিবারের সদস্যরা তার মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন। দেশে ছেলের মৃত্যুর খবর পৌঁছালে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শুরু হয় শোকের মাতম।
হৃদয়বিদারক এই খবরে শোক সইতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। স্বজন হারানোর এই করুণ পরিণতিতে পুরো গ্রাম জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জানা যায়, এসএসসি পাস করার পর পরিবারের দারিদ্র্য দূর করতে ২০২২ সালে প্রায় ৭ লাখ টাকা ঋণ করে নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে মক্কা নগরীর হারাম শরীফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ পান তিনি। তবে কাজের প্রায় সাত-আট মাস পর থেকে তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দেড় মাস পর কারাগার থেকে নজরুল তার বাবাকে ফোন করে বন্দি থাকার কথা জানান, যদিও সে সময় আটক হওয়ার কারণ সম্পর্কে কিছু জানাননি। দীর্ঘ তিন বছর তিন মাস কারাগারে বন্দি থাকার পর, মৃত্যুর ঠিক আগের রোববার পরিবারের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয় তার। তখন তিনি জানান যে তিনি সমস্যার মধ্যে রয়েছেন।
নজরুলের পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে আটক রাখা হলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোনো আইনি সহায়তা কিংবা বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কনস্যুলেট বা পরিবারকে আগাম কোনো তথ্য না দিয়ে এভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের বাবা-মা ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
নিহত নজরুলের বাবা আবদুল বাছির ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ২০২২ সালে ৭ লাখ টাকা ঋণ করে নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার একমাস পর মক্কার হেরাম শরীফে সে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ পায়। তবে সাত থেকে আট মাস পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আটকের প্রায় দেড়মাস পর নজরুল সেদেশের জেল থেকে আমাকে ফোন দিয়ে জানায় সে সেখানে কারাবন্দি। তবে কি কারণে তাকে আটক করা হয়েছে সে এই বিষয়ে কিছু জানায়নি কিংবা আমরাও জানি না।
তিনি আরও বলেন, প্রায় তিন বছর তিনমাস ধরে সে কারাগারে ছিল। গত রোববার সে আমাকে ফোন দেয়। সে জানায় সে সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এটাই তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। গত বুধবার শুনলাম নজরুলকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। আমি এই বিষয়ে আর কিছু বলতে পারি না। বাড়িতে এখন কান্নার রোল। আমার বোন আবেদা বেগম বাড়িতে এসে নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। আমার ছেলেও গেলো, বোনও গেলো সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। আমি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
তিনি বলেন, নজরুল কারাগারে থাকার সময় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার কাছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে কেউ যোগাযোগ করেছে কিনা কিন্তু কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিটি দেশের কনস্যুলেট জেলে থাকা তাদের নাগরিকদের খোঁজ-খবর নেয়। অথচ আমাদের দেশের কনস্যুলেট থেকে তার কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি। আমরা কি দেশে বাস করছি। আমার ছেলেকে যেই অভিযোগে নেয়া হয়েছে সে বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য কোনো আইনজীবী পেয়েছিলেন কিনা অথবা কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হয়েছে কিনা তাও এখন বড় প্রশ্ন। আমার ছেলের মত আর কেউ যেন এভাবে মরতে না হয়। সেদেশে যারা আছেন তাদের যেন আমাদের দেশের সরকারের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নেয়া হয়।




