
কুতুবদিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবন অপসারণের কাজের ওয়ার্কঅর্ডার থাকা সত্ত্বেও কৌশলে ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলা প্রেসক্লাব কুতুবদিয়ার হলরুমে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ছাত্রদল নেতা হামিদুল ইসলাম সোহেল তাঁদের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, কুতুবদিয়ায় সক্রিয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদার তুষার সিন্ডিকেট নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে উপজেলা ছাত্রদল নেতাদের নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, পারসেন্টেজের বিনিময়ে দুর্নীতিবাজ আমলাদের যোগসাজশে কাজ নিয়ে একটি কাজ বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করে বাণিজ্য করা হচ্ছে। নিজে কাজ করতে আগ্রহী না হওয়ায় ভবনটির নির্মাণকাজও করা যাচ্ছে না। একেক সময় একেকজন ওই কাজের মালিক বনে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, কয়েক মাস আগেও ওই কাজটি কক্সবাজার সদর উপজেলায় কর্মরত পিয়ন জুবায়ের রাসেল, প্রকাশ ভটকা রাসেলের বলে দাবি করা হয়। তাঁকে উপযুক্ত প্রমাণ দেখাতে বলা হলে তিনি অপারগ হয়ে বলেন, ‘কাজটা আমার ভাগিনা তুষারের। কাজটা করার দায়িত্ব আমার, আমি তার কাছ থেকে কিনে নিয়েছি।’
পরবর্তীতে রড, সিমেন্ট ও পাথরের দাম বৃদ্ধি পেলে তিনিও কাজ না করে নতুন পার্টনারের সন্ধান করেন বলে দাবি করেন হামিদুল ইসলাম সোহেল। তাঁর ভাষ্য, ওয়ার্কঅর্ডার থাকা সত্ত্বেও কাজ শুরু না করলে তুষার পরবর্তীতে ভাঙার কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের ওপর দোষ চাপান।
তিনি আরও বলেন, মাসখানেক পর তুষার কাজটি আবারও ‘মেসার্স ইঐফ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। এ সংক্রান্ত বায়নানামার স্ট্যাম্পের ছবি রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। অথচ এখন ছাত্রদল নেতারা তাঁকে কাজ করতে দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
হামিদুল ইসলাম সোহেল প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘যে ব্যক্তি কাজ করতে ইচ্ছুক নন এবং অন্যজনের কাছে কাজ বিক্রি করে দেন, তিনি কীভাবে অন্যজনের নামে অপপ্রচার করতে পারেন?’
বক্তব্যে কক্সবাজার জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মৃদুময় চাকমার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানানো হয়। হামিদুল ইসলাম সোহেল দাবি করেন, নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে যে কাউকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কোনো প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকলে তা সরকারি বিধিমালা ও স্বার্থের সংঘাতের নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘ওদের সিন্ডিকেটে’ নতুন করে যুক্ত হয়েছেন গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা জিগারুন নাহার। তাঁর বাবা নুরুচ্ছফা বি.কম. দীর্ঘদিন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে দাবি করা হয়, জিগারুন নাহার কৌশলে অর্থের বিনিময়ে সরকারি কোষাগারে অল্প টাকা জমা দিয়ে ভবন অপসারণের কাজটি পছন্দের ঠিকাদার তুষারকে দিতে চেয়েছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি দিতে বাধ্য হওয়ায় ‘শাহ আব্দুল মালেক কুতুবী এন্টারপ্রাইজ’ কাজটি পায় বলে দাবি করা হয়।
বক্তব্যে আরও বলা হয়, নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে ভ্যাট-ট্যাক্সের বিষয়টি উল্লেখ না করে পরে আলাদা চিঠির মাধ্যমে তা আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়। ভ্যাট-ট্যাক্সসহ সরকারি কোষাগারে নির্দিষ্ট অর্থ জমা দেওয়ার পর বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা জিগারুন নাহার নিলামকৃত ভবন থেকে ফ্যান, ওয়্যারিং তার ও পুরোনো স্টিলের আলমারিসহ লক্ষাধিক টাকার মালামাল সরিয়ে নিয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনার ভিডিও প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
পরবর্তীতে পুরাতন ভবন ভাঙার মালামাল অপসারণের কাজ শুরু করা হয় জানিয়ে হামিদুল ইসলাম সোহেল বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিগারুন্নেছার পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেননি। এরই মধ্যে বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় প্রতিকূল আবহাওয়া ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে ভাঙা ভবনের সব মালামাল সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। এই বাস্তব পরিস্থিতিকেই এখন চাঁদাবাজির অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
একইভাবে জিগারুন্নেছা ও তুষারের সঙ্গে মৃদুময় চাকমার কথিত ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং বসুন্ধরা বিল্ডার্সের মাধ্যমে নতুন ভবনের কাজ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁদের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয়, কিছুদিন আগে জুবায়ের রাসেল, প্রকাশ ভটকা রাসেলের সরাসরি ইন্ধনে বিদ্যালয়ের দেয়াল ভেঙে কিছু গাজাটি ও টুকাই মালামাল লুট করা হয়েছে। ভিডিও দেখে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
হামিদুল ইসলাম সোহেল বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী অর্থ দিয়ে ভবন অপসারণের কাজ পাওয়া হয়েছে। কাজে কোনো হেরফের বা বিলম্ব হলে সরকারি কর্মকর্তা বা প্রশাসন তার জবাবদিহি করবে। তবে কোনো তৃতীয় পক্ষের ওই কাজে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তাঁদের দাবিগুলো হলো—
১. তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ করতে হবে।
২. কুতুবদিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের টেন্ডার ও কার্যাদেশের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে।
৩. বসুন্ধরা বিল্ডার্সের মালিকানা, অংশীদারিত্ব ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক যাচাই করতে হবে।
৪. নির্বাহী প্রকৌশলী মৃদুময় চাকমা, তুষার ও প্রধান শিক্ষক জিগারুন্নেছার মধ্যে কোনো ব্যবসায়িক বা আর্থিক অংশীদারত্ব আছে কি না, তা তদন্ত করতে হবে।
৫. পুরাতন ভবন ভাঙার কাজে বাধা, অসহযোগিতা কিংবা বিদ্যালয়ের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগেরও তদন্ত করতে হবে।
৬. বর্ষাকালীন পরিস্থিতির কারণে মালামাল অপসারণে বিলম্বের বিষয়টি কারিগরি ও বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই করতে হবে।
সবশেষে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মৃদুময় চাকমা, তুষার ও জিগারুন্নেছাকে ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো পাশ কাটিয়ে শুধু ছাত্রদল নেতাদের অভিযুক্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে না। তাই সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা, টেন্ডার প্রক্রিয়া, আর্থিক লেনদেন ও প্রকল্পের নথিপত্র নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
প্রকৃত অপরাধী যে-ই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন—এ দাবিও জানানো হয়।




