একসময়ের জাতীয় পার্টির (জাপা) অভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটে দলটির চরম রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে। জেলার তিনটি সংসদীয় আসনেই জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে, যেখানে লাঙলের হেভিওয়েট তিন প্রার্থীই তাদের জামানত হারিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোট না পাওয়ায় এই লজ্জাজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। শুধু পরাজিত হওয়াই নয়, জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাসহ তিন হেভিওয়েট প্রার্থীই তাদের জামানত খুইয়েছেন। অন্যদিকে, দীর্ঘ ৪৭ বছর পর জেলার সবকটি আসনে নিরঙ্কুশ জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
গত এক দশকে এই অঞ্চলে জাতীয় পার্টির যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তা এখন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। জেলার তিনটি আসনে জাপা প্রার্থীদের প্রাপ্ত মোট ভোটের যোগফল মাত্র ৮ হাজার ১১১টি, যা দলটির অস্তিত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। যেখানে ১ লাখ ভোট ছিল, সেখানে এখন শূন্যের কোটা। লালমনিরহাটের নির্বাচনি ইতিহাসে জাতীয় পার্টির এমন শোচনীয় পরাজয় আগে কখনো দেখা যায়নি।
লালমনিরহাট-৩ (সদর): এই আসনটি জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের নিজস্ব আসন হিসেবে পরিচিত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জি এম কাদের এই আসনে ১ লাখ ১২ হাজার ৬৩২ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু এবার এই আসনে জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জাহিদ হাসান লিমন লাঙল প্রতীকে নির্বাচন করে পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ১৫০ ভোট। যেখানে মোট প্রদত্ত ভোট ছিল ২ লাখ ৬ হাজার ৫৬২টি। একাদশ নির্বাচনের তুলনায় এই ধসকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘অবিশ্বাস্য’ বলে অভিহিত করেছেন।
লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী ও কালীগঞ্জ): এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এলাহান উদ্দিনের ফল ছিল সবচাইতে করুণ। ২ লাখ ৭৯ হাজার ৩৯৩টি প্রদত্ত ভোটের বিপরীতে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৮১০ ভোট। এক সময়কার শক্তিশালী এই ঘাটিতে জাপার এমন ভোটপ্রাপ্তি দলের তৃণমূল কর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম): এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা প্রার্থী হয়েছিলেন। অভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদ ২ লাখ ৯১ হাজার ২২২টি ভোটের মধ্যে পেয়েছেন মাত্র ৫ হাজার ১৫৮ ভোট। হেভিওয়েট প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও তিনি জামানত রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
লালমনিরহাটের তিনটি আসনে এবার ভোটার উপস্থিতি এবং সচেতনতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনটি আসনে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৭৭ হাজার ১৭৭টি। কিন্তু এই বিশালসংখ্যক ভোটারের মধ্যে লাঙল প্রতীক পেয়েছে মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি ভোট। সাধারণ ভোটাররা বলছেন, দলের নীতিহীন অবস্থান এবং বড় দলের লেজুড়বৃত্তি করার কারণেই তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাধারণ ভোটার এবং ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে পতনের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ তকমা। সাধারণ মানুষের মতে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সখ্যতা এবং তাদের ওপর ভর করে নির্বাচনি বৈতরণি পার হওয়ার অপচেষ্টা ভোটাররা মেনে নেয়নি। অনেকেই মনে করছেন, জাপার নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক মেরুদণ্ড না থাকায় মানুষ বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকেছে। এ ছাড়াও দলটির শীর্ষ নেতাদের হটকারী সিদ্ধান্ত এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের অবমূল্যায়ন জাপাকে ‘কাগুজে বাঘে’ পরিণত করেছে। নির্বাচনের আগে জাপা প্রার্থীরা বরাবরই এই অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের কাছে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন, মোগলহাট স্থলবন্দর সচল করা এবং চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বারবার সুযোগ পেয়েও সেসব বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো ভূমিকা না রাখায় সাধারণ মানুষ এবার ব্যালটের মাধ্যমে তার জবাব দিয়েছে।
১৯৭৯ সালের পর লালমনিরহাটের সবকটি আসনে বিএনপির এই জয় এবং জাতীয় পার্টির এমন শোচনীয় পরাজয় এই জনপদের রাজনীতিতে নতুন এক মেরূকরণ সৃষ্টি করেছে। জাতীয় পার্টি যদি তৃণমূলের আস্থা এবং নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে এই ‘দুর্গ’ উদ্ধার করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় পার্টির জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, দল এখন হাইব্রিড নেতাদের দখলে। যারা ত্যাগী কর্মী তাদের মূল্যায়ন নেই। আগে মানুষ লাঙল বলতে পাগল ছিল, আর এখন মানুষ আমাদের হাসির পাত্র বানায়। রাজনৈতিক ভুলের কারণেই আজ এই ভরাডুবি।
একসময়ের ‘লাঙলের ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটে এখন জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই বিপর্যয় কাটিয়ে দলটি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নিয়ে খোদ সমর্থকদের মধ্যেই সংশয় দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট-৩ আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাস্তবায়ন না করা নিয়ে জাতীয় পার্টি যে নাটক করেছে, তার উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন ভোটাররা। তারা ক্ষমতায় থেকেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা কিংবা মোগলহাট স্থলবন্দর সচল করার মতো মৌলিক দাবিগুলো পূরণ করেনি। বরং পতিত ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে তারা মানুষের ভোটাধিকার হরণ করতে সহায়তা করেছে। লালমনিরহাটের মানুষ আর কোনো ধোঁকাবাজিতে বিশ্বাস করে না, যার প্রমাণ এই নির্বাচনের ফলাফল।
মন্তব্য করুন








