অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, কোমর ব্যথা, জয়েন্টে টান বা শরীর ব্যথার সমস্যায় ভোগেন। অনেক সময় আমরা এটিকে বয়স বা খারাপ ঘুমের দোষ দিই। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, প্রতিদিনের কিছু সাধারণ অভ্যাসই এই অস্বস্তির বড় কারণ হতে পারে।
কোশিস হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. Palleti Siva Karthik Reddy বলেন, সকালে শরীর ব্যথা বা শক্ত হয়ে থাকা শুধু বয়স বা অতিরিক্ত কাজের ফল নয়। অনেক সময় ভুল ভঙ্গি, রক্তসঞ্চালনের সমস্যা এবং পেশির সঠিক পুনরুদ্ধার না হওয়াই এর পেছনে কাজ করে।
নিচে এমন পাঁচটি সাধারণ অভ্যাস তুলে ধরা হলো, যেগুলো ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর ব্যথার জন্য দায়ী হতে পারে এবং কীভাবে সেগুলো ঠিক করা যায়।
ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানো
উপুড় হয়ে ঘুমানো বা ঠিকমতো বালিশ ব্যবহার না করলে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান নষ্ট হয়। এতে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠে চাপ পড়ে এবং সকালে শক্ত ভাব বা ব্যথা তৈরি হতে পারে।
জার্নাল অব ফিজিক্যাল থেরাপি সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভুল ঘুমের ভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদি মাংসপেশি ও অস্থিসন্ধির ব্যথার ঝুঁকি বাড়ায়।
সমাধান : চিত হয়ে বা কাত হয়ে ঘুমান। এমন বালিশ ও ম্যাট্রেস ব্যবহার করুন যা মেরুদণ্ড সোজা রাখতে সাহায্য করে।
ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ উঠে দাঁড়ানো
অনেকে অ্যালার্ম বাজতেই হঠাৎ লাফিয়ে উঠে পড়েন। এতে পেশি ও জয়েন্টে হঠাৎ চাপ পড়ে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের তথ্য অনুযায়ী, হঠাৎ নড়াচড়া শরীরে স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা পেশিতে টান ও শক্ত ভাব বাড়ায়।
সমাধান : ঘুম থেকে উঠে ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড সময় নিন। আগে ধীরে ধীরে উঠে বসুন। হাত, ঘাড় ও কোমর হালকা নড়াচড়া করুন, তারপর দাঁড়ান।
সকালে পানি না খাওয়া
রাতে দীর্ঘ সময় পানি না খাওয়ায় শরীর কিছুটা পানিশূন্য হয়ে পড়ে। পানিশূন্যতা পেশিতে খিঁচুনি ও জয়েন্ট শক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
আমেরিকান জার্নাল অব ফিজিওলজিতে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, হালকা পানিশূন্যতাও পেশির ব্যথা ও প্রদাহ বাড়াতে পারে।
সমাধান : ঘুম থেকে উঠেই এক গ্লাস পানি পান করুন। যাদের প্রায়ই পেশিতে টান ধরে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শে ইলেক্ট্রোলাইট গ্রহণ করতে পারেন।
সকালে শরীর না নড়ানো বা স্ট্রেচিং না করা
সকালে দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা কোনো ধরনের হালকা ব্যায়াম না করলে পেশি শক্ত হয়ে থাকতে পারে।
জার্নাল অব অ্যাপ্লায়েড ফিজিওলজির গবেষণা অনুযায়ী, সকালে হালকা ডায়নামিক স্ট্রেচিং রক্তসঞ্চালন বাড়ায়, পেশির শক্তভাব কমায় এবং চলাচলের সক্ষমতা উন্নত করে।
সমাধান : সহজ কিছু স্ট্রেচিং করতে পারেন, যেমন ক্যাট কাউ, বসে মেরুদণ্ড মোচড়ানো বা দাঁড়িয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে শরীর প্রসারিত করা।
খারাপ ঘুমের মান ও পর্যাপ্ত গভীর ঘুমের অভাব
ঘুমের সময় শরীর নিজেকে মেরামত করে। পর্যাপ্ত গভীর ঘুম না হলে প্রদাহ বাড়তে পারে এবং ব্যথা অনুভূতির মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
স্লিপ মেডিসিন রিভিউস জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, খারাপ ঘুমের সঙ্গে শরীরে প্রদাহজনিত উপাদান বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে, যা ব্যথা বাড়াতে পারে।
সমাধান : প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান ও উঠুন। ঘুমানোর আগে মোবাইল বা টিভির পর্দা এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ম্যাগনেশিয়াম বা মেলাটোনিন গ্রহণ করতে পারেন।
কখন সতর্ক হবেন
ডা. রেড্ডির মতে, মাঝেমধ্যে সকালে শক্তভাব থাকা স্বাভাবিক। তবে যদি ব্যথা এক ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয়, জয়েন্টে ফোলা, অবশ ভাব বা ঝিনঝিনি থাকে, কিংবা ধীরে ধীরে ব্যথা বাড়তে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এ ধরনের উপসর্গ রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, ফাইব্রোমায়ালজিয়া, অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো জটিল সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
সকালের শরীর ব্যথা অনেক সময় আমাদেরই তৈরি করা অভ্যাসের ফল। ঘুমের ভঙ্গি ঠিক রাখা, ধীরে উঠে দাঁড়ানো, পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা স্ট্রেচিং এবং ভালো ঘুম নিশ্চিত করা - এই ছোট পরিবর্তনগুলোই বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
তবে ব্যথা যদি নিয়মিত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেটিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ সুস্থ দিনের শুরুই নির্ভর করে সুস্থ সকালের ওপর।
সূত্র : দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস