চাঁপাইনবাবগঞ্জে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জে নতুন সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নে ৪৮ জনকে নতুন করে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়ার পর এ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকটি ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা বলছেন, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নে খুচরা সার বিক্রির লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও মেসার্স এম. বি ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী বশির আহমেদকে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা হিসেবে শ্রীরামপুর, বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়ন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতার মাধ্যমে তিনি এ নিয়োগ পেয়েছেন। এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মো. মজিবুর রহমান। তিনি আরাফাত রহমান কোকো ক্রীড়া সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তাঁর দাবি, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে বিএনপির কোনো নেতাকে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বরং ওই এলাকার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার দক্ষিণ চরাগ্রাম-বুড়িপাড়ার সিহাব ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. রফিকুল ইসলামকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে এ নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নাচোল উপজেলাতেও সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন নাচোল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. এনামুল হক। তাঁর দাবি, নেজামপুর ইউনিয়নে মেসার্স আতাউর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. আতাউর রহমান এবং নাচোল ইউনিয়নে মেসার্স জুনাইদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. জুয়েলকে নতুন করে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের নিয়োগের পেছনে অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও তোলেন এনামুল হক। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নথিপত্র বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর পৌরসভায় মেসার্স তাজ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. মুনিরুজ্জামানকেও নতুন করে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়ভাবে তাঁকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। রহনপুর পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক মোহা. এনায়েত করিম (তকি) বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তিনি দলটির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সার ডিলার নিয়োগে সুযোগ না পাওয়ায় হতাশ হয়েছেন। তিনি বিএনপির হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাইয়ের দাবি জানান।
এ ছাড়া শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট উপজেলাতেও রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের সার ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় একজন ব্যক্তির একাধিক ডিলারশিপের মালিক হওয়ার সুযোগ না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। একই পরিবারের একজনের সার ডিলারশিপের পরিচয়পত্র থাকলে পরিবারের অন্য সদস্য আবেদন করতে পারবেন কি না, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
পরিবারের সংজ্ঞায় পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনি, অবিবাহিত কন্যা এবং একই খানায় একসঙ্গে খাদ্য গ্রহণকারী ভাই-বোন অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট নীতিমালার মূল নথি যাচাই করে এসব শর্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং-সংক্রান্ত কার্যক্রমের আওতায় গত ৭ অক্টোবর কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তারের স্বাক্ষরে একটি আদেশ জারি হয়। ওই আদেশে সারাদেশে ইউনিয়নভিত্তিক নতুন সার ডিলার নিয়োগের বিষয়ে তথ্য জানানো হয়।
এ বিষয়ে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি এবং জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মো. মুসা জঙ্গির বক্তব্য জানতে তাঁর সরকারি মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কয়েকজন কৃষকের আশঙ্কা, সার ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে কৃষকদের সারপ্রাপ্তিতে সংকট, কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁদের দাবি, কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং সার বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হোক।