যুক্তরাজ্যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশজুড়ে অন্তত শতাধিক বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসের কথাও জানিয়েছে স্থানীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর। বছরের শুরুতেই নিয়মিত ও ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা দেখছেন দুর্বিষহ ও খারাপ আবহাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবেই।
বিজ্ঞানীদের মতে, ব্রিটেনের এই অবিরাম বৃষ্টির পেছনে যে বায়ুমণ্ডলীয় শক্তি কাজ করছে, সেটিই স্পেন ও পর্তুগালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার কারণ।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের (মেট অফিস) বরাতে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর আয়ারল্যান্ডে গত ১৪৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল মাস ছিল গত জানুয়ারি। একই সময়ে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে ১৮৩৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এটি ছিল ষষ্ঠ বৃষ্টিবহুল মাস। জানুয়ারিতে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গড়ের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি এবং দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য দক্ষিণ ইংল্যান্ডে গড়ের তুলনায় ৮৮ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ ছাড়া ডেভনের নর্থ ওয়াইক, কর্নওয়ালের কার্ডিনহ্যাম ও উরচেস্টারশায়ারের অ্যাস্টউড ব্যাংকে বছর শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
রিডিং ইউনিভার্সিটির হাইড্রোলজিস্ট জেস নিউম্যান বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের মানুষের জন্য বছরের শুরুটা ছিল দুর্বিষহ। লন্ডনের কাছের শহরগুলোতে ১০০ বছরেরও বেশি রেকর্ডে সবচেয়ে দীর্ঘ বৃষ্টিপাত দেখা গেছে। মাত্র কয়েক মাস আগেও যুক্তরাজ্যের বড় অংশে খরা ছিল এবং এ কারণে হোসপাইপ ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা জারি জারি ছিল।’
কিন্তু দীর্ঘদিন খরার পর বছরের শুরুতেই এবার কেন এত বৃষ্টিপাত হচ্ছে দেশটিতে? সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, এই অবিরাম বৃষ্টির পেছনে রয়েছে দ্রুত আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব। ‘জেট স্ট্রিমের’ ক্রমাগত দক্ষিণমুখী স্থানান্তরে ফলেই দেশটিতে এত বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। দ্রুতগতির এই বায়ুপ্রবাহ একের পর এক নিম্নচাপকে যুক্তরাজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মেট অফিসের প্রধান পূর্বাভাসকারী নিল আর্মস্ট্রং বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহে আটলান্টিক থেকে বারবার বৃষ্টির বলয় ঢুকে পড়েছে, ফলে যুক্তরাজ্যের বড় অংশে মাটি ক্রমেই আরও ভিজে গেছে।’ মূলত টানা বর্ষণের ফলে দেশের অনেক অংশের মাটি সম্পূর্ণভাবে স্যাচুরেটেড— অর্থাৎ পানি শোষণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
আর্মস্ট্রং আরও বলেন, ‘উত্তর আমেরিকার ওপর ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ উত্তর-পশ্চিম আটলান্টিকে তাপমাত্রার পার্থক্য বাড়িয়ে দিয়েছে, যা জেট স্ট্রিমকে আরও শক্তিশালী করেছে। একই সময়ে উত্তর ইউরোপে একটি শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় আবহাওয়া ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। যার ফলে সেগুলো যুক্তরাজ্যের ওপর আটকা পড়ছে।’
জেট স্ট্রিমের এই পরিবর্তন স্পেন ও পর্তুগালেও ভয়াবহ বন্যা ডেকে এনেছে। সেখানে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন এবং হাজারো মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন।
যুক্তরাজ্যে নিম্নচাপগুলো তুলনামূলকভাবে কম তীব্র হলেও, অনেক এলাকায়ই দৈনিক বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ভেঙেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে মাটি আর পানি শোষণ করতে পারে না। তখন সামান্য বৃষ্টিও বন্যার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতাও বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বাড়াচ্ছে। প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বাতাস প্রায় ৭ শতাংশ বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে। এর ফলে যুক্তরাজ্যে ভেজা শীতকাল আঞ্চলিক জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় দুই দশক আগেই শুরু হয়েছে। তবে চলতি জানুয়ারিতে আর্কটিক বাতাসের কারণে তাপমাত্রা কিছুটা কম ছিল।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাজ্যে শীতকাল আরও ভেজা ও গ্রীষ্মকাল আরও শুষ্ক হবে।
তবে জেস নিউম্যানের মতে, ‘সাম্প্রতিক বৃষ্টির একটি ইতিবাচক দিক হলো, যুক্তরাজ্যের পানিসম্পদ পুনরুদ্ধারের পথে ফিরছে। মে মাসের পর এই প্রথম ইংল্যান্ড পুরোপুরি খরামুক্ত হয়েছে। জলাধার ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে।’
মন্তব্য করুন
