জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে। সরকারি সরবরাহ না থাকায় সাধারণ রোগীরা ছুটছে ফার্মেসিতে। ফার্মেসিগুলোতেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত এই ভ্যাকসিন। আতঙ্ক বিরাজ করছে জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ সদর ও উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ সব স্থানেই এক চিত্র। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কুকুর ও বিড়াল কামড়ানো রোগীরা এসে শুনছেন ভ্যাকসিন নেই। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বাহির থেকে কিনে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু জেলার ৯টি উপজেলার কোনো ফার্মেসিতে তুলনামূলক ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না।
সদর হাসপাতালে ভ্যাকসিন নিতে আসা একাধিক জলাতঙ্ক রোগী জানান, চিকিৎসকরা আক্রমণের তারিখ জানার পরে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির ভ্যাকসিনের নাম লিখে বাইরে থেকে কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন। রোগী ও তাদের স্বজনরা জীবন রক্ষায় ভ্যাকসিনের জন্য ছোটাছুটি করছেন। ৫০০ টাকার টিকা এক হাজার টাকা দিয়েও ফার্মেসিতে পাচ্ছে না। ফার্মেসিগুলোতেও ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। নির্দিষ্ট সময়ে টিকা না দিলে জলাতঙ্ক হয়ে যাবে, এই চিন্তায় ঘুম নেই রোগী ও আত্মীয়স্বজনের।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি জেলায় কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকারের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জেলায় প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ কুকুর-বিড়াল ও সাপের ভ্যাকসিন প্রয়োজন। এ কারণে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনের চাহিদাও অনেক বেড়েছে।
সদর উপজেলার খোকসাবাড়ি থেকে আসা রোগীর স্বজন কাদের মিঞা জানান, হাসপাতালে এসে শুনতে পারি ভ্যাকসিন নেই। পরে ঢাকা থেকে ভ্যাকসিন এনে দেওয়া হয়েছে।
কাজিপুর উপজেলা থেকে আসা রোগীর বাবা জুরান আলী বলেন, আমার ছেলেকে কুকুর আঁচড় দিয়েছে। পরে কাজিপুর উপজেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, সেখানে ভ্যাকসিন নেই। সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সদর হাসপাতালে এসে দেখি ভ্যাকসিন নেই। টাকা দিয়ে বাহির থেকে ভ্যাকসিন কিনব তাও ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে না। ছেলেকে নিয়ে চিন্তায় আছি।
শহরের পৌর এলাকা মাহমুদপুর থেকে আসা আমেনা খাতুন জানান, মেয়েকে বিড়াল আঁচড় দিয়েছে। বাহির থেকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে দ্বিগুণ দামে ভ্যাকসিন নিয়ে এসেছি। পরে সেই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। সরকারের কাছে দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালগুলোতে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
সদর হাসপাতালে জলাতঙ্ক টিকা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা নার্স আয়শা জানান, গত ১৪ ডিসেম্বর ভ্যাকসিন শেষ হয়ে গেছে। ঢাকায় চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন শত শত রোগী এসে ভিড় করছেন ভ্যাকসিনের জন্য। এতদিন রোগীরা বাহির থেকে ভ্যাকসিন এনে দিলেও, এখন বাহিরেও ভ্যাকসিন মিলছে না।
মামুন মেডিকেলের স্বত্বাধিকারী মো. মামুন হোসেন বলেন, ফার্মেসিগুলো থেকে ভ্যাকসিনের ব্যাপক অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে। কয়েকটি কোম্পানিতে ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্য অর্ডার করেছি। ওষুধ কোম্পানি থেকে সাপ্লাই না থাকায় আমরা পারছি না। তিনি আরও বলেন, শুনেছি কাঁচামালের সংকটের কারণে ভ্যাকসিনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা ভ্যাকসিন স্টোর কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনের জন্য বিভিন্ন টেলিভিশন ও পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর আমরা এক মাস আগে ৫০০ ভ্যাকসিন পাই। এই ভ্যাকসিন থেকে ৫০টি করে ভ্যাকসিন উপজেলাগুলোতে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। শুনেছি সদর হাসপাতালে কয়েক মাস পর পর চার থেকে ৫০০ ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, যা দুই তিন দিনেই শেষ হয়ে যায়।
সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আকিকুন নাহার বলেন, এক মাস আগে ভ্যাকসিন শেষ হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি কোনো পর্যায়েই জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। ১৫ ডিসেম্বরের পর জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। যতদিন ছিল, ততদিন দেওয়া হয়েছে। গ্রামের মানুষরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিদিন হাসপাতালে শত শত রোগী ভিড় করছে। ভ্যাকসিনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র দেওয়া হলেও পাওয়া যাচ্ছে না ভ্যাকসিন।
এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমীন বলেন, সরবরাহ না থাকায় হাসপাতালে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনের মজুত নেই। এ কারণে কিছুটা সংকট রয়েছে। তবে প্রতিটি উপজেলার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আলাদা আলাদা চাহিদাপত্র দিয়ে রাখা হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই ভ্যাকসিন সংকটের সমাধান হবে।
মন্তব্য করুন








