২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সারাদেশ টালমাটাল। এমন অবস্থায় বগুড়ার সদর থানায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। থানায় থাকা বিভিন্ন অস্ত্র ও গুলি লুট হয়। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বেশ কিছু অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করলেও অধিকাংশই হাতের নাগালের বাইরে আছে। দেড় বছরে শেষ হয়নি উদ্ধার কার্যক্রম।
আসন্ন নির্বাচনে এসব অরক্ষিত অস্ত্রের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা নির্বাচনি মাঠে এসব অস্ত্রের অপব্যবহার হতে পারে। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দাবি, এমন আশঙ্কার কোনো কারণ নেই।
বগুড়া জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বগুড়া সদর থানা থেকে ৫টি পিস্তল, ১২টি রাইফেল, ৫টি এসএমজি ও এলএমজি এবং ১৭টি শটগান লুট হয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৭টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। দুর্বৃত্তের হাতে রয়ে গেছে ৬টি রাইফেল ও ৪টি পিস্তলসহ মোট ২২টি আগ্নেয়াস্ত্র। ম্যাগাজিন লুট হয় ৫৬টি। উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৩টি। বাকিগুলোর এখনও কোনো সন্ধান মেলেনি।
এ ছাড়া লুট হওয়া ৮ হাজার ৪২৯ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে মাত্র ১৯৪ রাউন্ড। অবশিষ্ট ৮ হাজার ২৩৫ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
জেলা পুলিশের তথ্যে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বগুড়ায় ১০টি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করে পুলিশ। এর মধ্যে ৬টি বিদেশি পিস্তল। এর বাইরে ৬টি ম্যাগাজিন, ১৮১ রাউন্ড গুলি ও ৬৭২ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়৷
আরও পড়ুন : গুলশানের দিকে লাইন দিলে তরুণরা ছাড়বে না, প্রশাসনকে হাসনাত
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও বগুড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল। জেলাজুড়ে প্রায়ই খুন ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।
এমনকি পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। গত বছরে পুলিশের ওপর হামলার অন্তত ৩টি ঘটনা আছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলায় ৫৭টি হত্যাকাণ্ড হয়। এর মধ্যে রয়েছে বগুড়া সদর এলাকায় অপরাধের হার সবচেয়ে বেশি। এ উপজেলায় মোট ১৪টি খুনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। শাজাহানপুর থানায় ৭টি, শিবগঞ্জ থানায় ৪টি, সোনাতলায় ২টি, গাবতলীতে ৪টি, সারিয়াকান্দিতে ৩টি, আদমদীঘিতে ২টি, দুপচাঁচিয়ায় ৪টি, নন্দীগ্রামে ৪টি, কাহালুতে ৩টি, শেরপুরে ৭টি এবং ধুনটে ৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়াও ১৪টি ডাকাতি ও ৩৫টি দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত ২১ জানুয়ারি গাবতলীর নেপালতলী ইউনিয়নে একটি বাড়িতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ডাকাতি হয়।
এসব সংঘটিত অপরাধের কারণে স্থানীয়দের অনেকে মনে করেন, এবারের নির্বাচনে সংঘাতের ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে। আর এই সংঘাতে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করবে দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে বিদেশ থেকে পাচার হয়ে আসা অস্ত্র যেমন রয়েছে। তেমনি লুট হওয়া সরকারি অস্ত্রও আছে এই শঙ্কার তালিকায়।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মকর্তা রাহাত আহমেদ জানান, আমাদের সদর থানায় অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র লুটের ঘটনা আমরা সবাই জানি। সামনে নির্বাচন, এটাকে কেন্দ্র করে এসব অস্ত্রের অপব্যবহার হতেই পারে। এই নির্বাচনের সময় এই অস্ত্রগুলো যদি মানুষের হাতে চলে আসে, আর তারা যদি অপব্যবহার করে, তাহলে আমরা তো সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারবো না। তবে আমরা এটাও আশা করি, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, সেনাবাহিনী পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসবে।
নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কম দেখছেন বলে মন্তব্য করেন বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরে আলম রিগ্যান। তিনি বলেন, প্রত্যেক নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান দেখি। যারা বৈধ অস্ত্রধারী আছেন, তারাও অস্ত্র থানায় জমা দেয়। এবার দৃশ্যমান কিছু এখনও দেখিনি। এ ছাড়া প্রতি বছর অবৈধ অস্ত্রের বড় একটি অংশ প্রশাসন উদ্ধার করে। সেটারও তেমন কিছু দেখছি না। আবার আমাদের জন্য একটি আশঙ্কার বিষয়, সদর থানার অস্ত্র লুট হওয়া ঘটনা। আমরা আশা করব, সরকার অতি দ্রুত অবৈধ ও থানায় লুট অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেবে।
বগুড়ার সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন আহমেদ তুহিন বলেন, অবৈধ অস্ত্র মানুষের হাতে থাকলে সেটা তো অবশ্যই নির্বাচনে সমস্যা হতে পারে। অতীতেও আমরা এসব নিয়ে কাজ করেছি। দেখেছি অস্ত্রের ঝনঝনানি। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি রাজনীতিবিদদেরও দায় রয়েছে। যেহেতু একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়েছে। তারা কোনো আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে পারে। এ বিষয়ে আমি মনে করি সরকারকে আরও তৎপর হতে হবে।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুসেইন মুহাম্মদ রায়হান এশিয়া পোস্টকে জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে কেউ যেন নাশকতা, হত্যাকাণ্ড না করতে পারে এ জন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছি। যাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র আছে আমরা নামের তালিকাও করেছি। এ ছাড়া ৫ আগস্টে আমাদের থানায় যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে, সেগুলোও উদ্ধারের চেষ্টা করছি। এ লক্ষ্যে আমরা পুরস্কারের ঘোষণাও করেছি। আশা করছি, আমাদের তৎপরতায় আসন্ন নির্বাচনে কোনো প্রকার নাশকতা ঘটবে না।
সার্বিক বিষয়ে বগুড়ার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। রাজনৈতিক দলগুলোও আমাদের আশ্বাস দিয়েছে যে— তারাও সহযোগিতা করবে। এ লক্ষ্যে নিয়মিত মোবাইল কোর্টসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও সব ডেপ্লয়েড বাহিনী সব ধরনের অভিযান পরিচালনা করছে। তারা অস্ত্র উদ্ধার থেকে শুরু করে বিভিন্ন মামলার আসামি, ফেরারি আসামিদের গ্রেপ্তার করছেন।
মন্তব্য করুন








