প্রকৃতির স্বর্গে অবহেলার ছাপ— জরাজীর্ণ মধুটিলা, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটকরা
পাহাড়, টিলা আর সবুজ বনভূমির অপূর্ব মেলবন্ধনে প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা ইকোপার্ক। একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকলেও দীর্ঘদিনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে অনেকটাই জৌলুশ হারিয়েছে এই পর্যটনকেন্দ্র।
পার্কের বিভিন্ন স্থাপনা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও ভাঙাচোরা অবকাঠামো, কোথাও আবার বন্ধ পড়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এর মধ্যেই ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রবেশমূল্য করা হয়েছে ১০০ টাকা। এতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন দর্শনার্থীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা প্রায় ৩৮০ একর বনভূমি নিয়ে ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করে মধুটিলা ইকোপার্ক। প্রথম পর্যায়ের উন্নয়নকাজ শেষ হয় ২০০৪ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পার্কটিতে আর কোনো বড় ধরনের উন্নয়নকাজ হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন মধুটিলায়। তবে সময়ের সঙ্গে দর্শনার্থীদের প্রত্যাশা বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি পার্কের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা।
একসময় পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র ছিল পার্কের তথ্যকেন্দ্র ও প্রদর্শনীকেন্দ্র। বর্তমানে এসব স্থাপনার কোথাও তালা ঝুলছে, আবার কোথাও দেখা যাচ্ছে ভাঙাচোরা অবস্থা। পার্কজুড়ে থাকা হাতি, বাঘ, হরিণ, কুমিরসহ বিভিন্ন ভাস্কর্যের রং উঠে গেছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নানা স্থাপনাও।
পার্কে মিনি চিড়িয়াখানা থাকলেও এর বর্তমান অবস্থা নিয়ে হতাশ দর্শনার্থীরা। শিশুদের বিনোদনের জন্য থাকা শিশুপার্কেও নেই আগের সেই আকর্ষণ। প্রয়োজনীয় রাইড না থাকায় শিশুদের বিনোদনের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
মধুটিলা ইকোপার্কে রয়েছে লেক, পিকনিক স্পট, পাহাড়ে ওঠার সিঁড়ি, ওয়াচ টাওয়ার ও পার্কিং জোন। তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এসব স্থাপনার অনেকগুলোই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও রাস্তা ভাঙা, কোথাও দেখা যায় অপরিচ্ছন্নতা। পর্যাপ্ত শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থার ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে দর্শনার্থীদের।
এরই মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পার্কের প্রবেশমূল্য। একসময় যেখানে মাত্র ২০ টাকা দিয়ে প্রবেশ করা যেত, বর্তমানে সেখানে টিকিটের মূল্য বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০০ টাকা। দর্শনার্থীদের অভিযোগ, পার্কের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার দৃশ্যমান উন্নয়ন না হলেও বাড়ানো হয়েছে প্রবেশমূল্য। ফলে অনেকে ১০০ টাকা টিকিট না কেটে পার্কের গেট থেকেই ফিরে যাচ্ছেন।
ঢাকা-গাজীপুর থেকে ঘুরতে আসা শিল্পী আক্তার বলেন, শুধু প্রবেশমূল্য বাড়ালেই হবে না, এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়াতে হবে সেবার মানও। দ্রুত পুরোনো স্থাপনাগুলো সংস্কার, বিনোদনের সুযোগ বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং পর্যটকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
পার্কে বেড়াতে আসা রহিম মিয়া বলেন, পার্কে প্রবেশের মূল্য অনেক বেশি। সেই তুলনায় পার্কের ভেতরের অবকাঠামো ও সেবার মান অনেক নিম্নমানের। পুরোনো স্থাপনাগুলো সংস্কারের পাশাপাশি আধুনিক ও বিনোদনমূলক নতুন সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করা প্রয়োজন।
মধুটিলা ইকোপার্কের রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, “২০০৪ সালের পর থেকে কোনো উন্নয়নকাজ হয়নি। এ কারণে পার্কের বিভিন্ন স্থাপনা সংস্কার করা প্রয়োজন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এমপি মহোদয়কে জানানো হবে, যাতে পার্কটি সংস্কার ও উন্নয়ন করা যায় এবং পর্যটকদের আবার আকৃষ্ট করা সম্ভব হয়।”
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা মধুটিলা ইকোপার্ক এখনও সম্ভাবনাময় একটি পর্যটনকেন্দ্র। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে হারাচ্ছে এর আকর্ষণ। একদিকে জরাজীর্ণ অবকাঠামো, অন্যদিকে ২০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা প্রবেশমূল্য—সব মিলিয়ে হতাশ দর্শনার্থীরা।
পর্যটকদের প্রত্যাশা, দ্রুত পার্কের পুরোনো স্থাপনাগুলো সংস্কার করে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে মধুটিলা আবারও হয়ে উঠবে শেরপুরের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।