তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একশ্রেণির ব্যবসায়ী জনগণকে জিম্মি করছে। রান্নার জন্য অপরিহার্য এই পণ্যের দাম সরকার নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। সংকটের অজুহাতে দ্বিগুণ দামে এলপিজি বিক্রি করে ভোক্তাদের পকেট কাটা হচ্ছে, অথচ কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রশ্ন হলো, দাবি কি শুধু ব্যবসায়ীদেরই থাকতে পারে? ভোক্তা বা দেশের সাধারণ নাগরিকদের কি কোনো দাবি নেই? জনগণকে জিম্মি করে এভাবে দাবি আদায়ের আন্দোলন যারা করেন, তারা কি প্রকৃত অর্থে ব্যবসায়ী, নাকি সুযোগসন্ধানী লুটেরা?
গত কয়েক দিনে রান্নার জন্য অপরিহার্য এই পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে যে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। দেশের লাখ লাখ পরিবার প্রতিদিনের রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের পরিবারগুলোর কাছে বিকল্প জ্বালানির সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে এই সংকট সরাসরি তাদের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
বাজারে এমনভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে যে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও অনেক জায়গায় এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। সারা দেশে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভোক্তা পর্যায়ে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। এই সুযোগে একদল অসাধু ব্যবসায়ী ভোক্তাদের জিম্মি করে দ্বিগুণ দামে এলপিজি বিক্রি করছে। এতে বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁসহ সব শ্রেণির ব্যবহারকারী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ফোনে ১২ কেজি এলপিজির দাম ২২০০-২৫০০ টাকা বলা হলেও সাংবাদিক বা টিভি ক্যামেরা দেখলেই সেই দাম নেমে আসে ১৫০০ টাকায়- এই দ্বিমুখী আচরণই প্রশ্ন তোলে, আসলে সংকট বাস্তব, নাকি পরিকল্পিত?
বড় কোম্পানিগুলো সাপ্লাই দিতে পারছে না। উৎপাদন খরচ বেড়েছে। একটা গাড়ি একদিন গেলে চার-পাঁচ দিন পরপর লোড হয়। সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো দাবি করেছে, শীতে চাহিদা বেশি থাকলেও ভূরাজনৈতিক সমস্যা ও জাহাজ সংকটের কারণে তৈরি হয়েছে এ সংকট। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন উৎস থেকে এলপিজি সংগ্রহ করে। তবে ভূরাজনৈতিক কারণে একটি বড় নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে এলপিজি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এটা অন্যতম কারণ। মনে হচ্ছে, এ সমস্যা সমাধানে এক মাসের বেশি সময় লাগতে পারে, যা উদ্বেগজনক। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পুরো এলপিজি বাজারকে অস্থিতিশীল করে জনগণের পকেট লুট করছে অসৎ ব্যবসায়ীরা।
প্রতি মাসের প্রথম দিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সরকার-নির্ধারিত সেই মূল্যে এলপিজি বিক্রি হয় না কখনোই। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এলপিজির চাহিদা ৯০ লাখের বেশি। সেই হিসাবে প্রতিটি সিলিন্ডার থেকে যদি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি নেওয়া হয়, তাহলে গড়ে মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়া হচ্ছে গ্রাহকের পকেট থেকে। তারপরও কেন এই অরাজকতা সৃষ্টি করে জনগণের পকেট কাটছে তারা?
এলপিজির এই পরিস্থিতির জন্য একে অপরকে দোষারোপ করে থাকে সংশ্লিষ্টরা। খুচরা বিক্রেতারা দোষারোপ করছেন ডিলারদের, ডিলাররা দোষারোপ করছেন বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। আর বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দুষছে বিইআরসিকে। কিন্তু এই ফাঁকে লুটপাটের শিকার হচ্ছে ভোক্তারা। ২৮টি কোম্পানি বর্তমানে এলপি গ্যাসকে সিলিন্ডারে ভরার ব্যবসা করছে। এসব কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের দাবি— বিইআরসির দাম নির্ধারণ ফর্মুলা বাস্তবসম্মত নয়। পরিবহনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খরচ সমন্বয় করা হয় না এতে। তারা আরও দাবি করেন, বাজার অস্থিতিশীল কোনোভাবেই হতো না যদি বিইআরসি এবং অপারেটরদের সমন্বয়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের সত্যিকারের মার্জিনটা তুলে ধরা হতো। প্রাইসিং ফর্মুলা অ্যাকিউরেট করতে হবে, না হলে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলাররা সারভাইভ করতে গিয়ে দাম বাড়াবেই।
বাজারে কিছু সংকট দেখা দেয় বৈশ্বিক বাজারের কারণে, আর কিছু সংকট তৈরি হয় মানুষের সচেতন কারসাজিতে। বাংলাদেশের চলমান এলপিজি সংকট তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার উধাও করে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। এটিকে বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা বলা যায় না। এটি দিনের আলোয় ডাকাতি, যার পেছনে রয়েছে সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
এলপিজি সিন্ডিকেট আকস্মিক ও অযৌক্তিকভাবে এলপিজির মূল্য সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করে জনগণের পকেট কেটে নিচ্ছে। অথচ সরকার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এলপিজির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সিন্ডিকেট লুটছে জনগণকে অথচ ভোক্তাদের দুর্ভোগ নিয়ে নীরব সরকার ও প্রশাসন। মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেট দমনের কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। সরকারের এমন নজিরবিহীন ব্যর্থতা ক্ষমার অযোগ্য।
চলমান এই সংকট দেশকে একটি বড় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাজার ব্যর্থ হয় শুধু বেসরকারি শক্তি প্রয়োগ করে নয়, বাজার ব্যর্থ হয় যখন আইন প্রয়োগ হয় না, আর নিয়ন্ত্রণ হয় নির্বাচিতভাবে। প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে দুর্বল রাষ্ট্র মানেই শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আমাদের সামনে এখন পরিষ্কার একটি পথ। হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার জনস্বার্থে পরিচালিত হবে, নয়তো তা সিন্ডিকেটের হাতে বন্দিই থাকবে। সরকারকে জরুরিভাবে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং যারা এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মন্তব্য করুন








