ঢাকা, বাংলাদেশ ||
সোমবার
০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ||

এলপিজি কারসাজিতে জনগণ জিম্মি

এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া

  ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৩
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ‍্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার। ফাইল ছবি

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একশ্রেণির ব্যবসায়ী জনগণকে জিম্মি করছে। রান্নার জন্য অপরিহার্য এই পণ্যের দাম সরকার নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। সংকটের অজুহাতে দ্বিগুণ দামে এলপিজি বিক্রি করে ভোক্তাদের পকেট কাটা হচ্ছে, অথচ কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রশ্ন হলো, দাবি কি শুধু ব্যবসায়ীদেরই থাকতে পারে? ভোক্তা বা দেশের সাধারণ নাগরিকদের কি কোনো দাবি নেই? জনগণকে জিম্মি করে এভাবে দাবি আদায়ের আন্দোলন যারা করেন, তারা কি প্রকৃত অর্থে ব্যবসায়ী, নাকি সুযোগসন্ধানী লুটেরা?

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

গত কয়েক দিনে রান্নার জন্য অপরিহার্য এই পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে যে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। দেশের লাখ লাখ পরিবার প্রতিদিনের রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের পরিবারগুলোর কাছে বিকল্প জ্বালানির সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে এই সংকট সরাসরি তাদের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

বাজারে এমনভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে যে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও অনেক জায়গায় এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। সারা দেশে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভোক্তা পর্যায়ে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। এই সুযোগে একদল অসাধু ব্যবসায়ী ভোক্তাদের জিম্মি করে দ্বিগুণ দামে এলপিজি বিক্রি করছে। এতে বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁসহ সব শ্রেণির ব্যবহারকারী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ফোনে ১২ কেজি এলপিজির দাম ২২০০-২৫০০ টাকা বলা হলেও সাংবাদিক বা টিভি ক্যামেরা দেখলেই সেই দাম নেমে আসে ১৫০০ টাকায়- এই দ্বিমুখী আচরণই প্রশ্ন তোলে, আসলে সংকট বাস্তব, নাকি পরিকল্পিত?

বড় কোম্পানিগুলো সাপ্লাই দিতে পারছে না। উৎপাদন খরচ বেড়েছে। একটা গাড়ি একদিন গেলে চার-পাঁচ দিন পরপর লোড হয়। সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো দাবি করেছে, শীতে চাহিদা বেশি থাকলেও ভূরাজনৈতিক সমস্যা ও জাহাজ সংকটের কারণে তৈরি হয়েছে এ সংকট। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন উৎস থেকে এলপিজি সংগ্রহ করে। তবে ভূরাজনৈতিক কারণে একটি বড় নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে এলপিজি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এটা অন্যতম কারণ। মনে হচ্ছে, এ সমস্যা সমাধানে এক মাসের বেশি সময় লাগতে পারে, যা উদ্বেগজনক। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পুরো এলপিজি বাজারকে অস্থিতিশীল করে জনগণের পকেট লুট করছে অসৎ ব্যবসায়ীরা।

প্রতি মাসের প্রথম দিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সরকার-নির্ধারিত সেই মূল্যে এলপিজি বিক্রি হয় না কখনোই। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এলপিজির চাহিদা ৯০ লাখের বেশি। সেই হিসাবে প্রতিটি সিলিন্ডার থেকে যদি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি নেওয়া হয়, তাহলে গড়ে মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়া হচ্ছে গ্রাহকের পকেট থেকে। তারপরও কেন এই অরাজকতা সৃষ্টি করে জনগণের পকেট কাটছে তারা?

এলপিজির এই পরিস্থিতির জন্য একে অপরকে দোষারোপ করে থাকে সংশ্লিষ্টরা। খুচরা বিক্রেতারা দোষারোপ করছেন ডিলারদের, ডিলাররা দোষারোপ করছেন বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। আর বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দুষছে বিইআরসিকে। কিন্তু এই ফাঁকে লুটপাটের শিকার হচ্ছে ভোক্তারা। ২৮টি কোম্পানি বর্তমানে এলপি গ্যাসকে সিলিন্ডারে ভরার ব্যবসা করছে। এসব কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের দাবি— বিইআরসির দাম নির্ধারণ ফর্মুলা বাস্তবসম্মত নয়। পরিবহনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খরচ সমন্বয় করা হয় না এতে। তারা আরও দাবি করেন, বাজার অস্থিতিশীল কোনোভাবেই হতো না যদি বিইআরসি এবং অপারেটরদের সমন্বয়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের সত্যিকারের মার্জিনটা তুলে ধরা হতো। প্রাইসিং ফর্মুলা অ্যাকিউরেট করতে হবে, না হলে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলাররা সারভাইভ করতে গিয়ে দাম বাড়াবেই।

বাজারে কিছু সংকট দেখা দেয় বৈশ্বিক বাজারের কারণে, আর কিছু সংকট তৈরি হয় মানুষের সচেতন কারসাজিতে। বাংলাদেশের চলমান এলপিজি সংকট তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার উধাও করে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। এটিকে বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা বলা যায় না। এটি দিনের আলোয় ডাকাতি, যার পেছনে রয়েছে সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

এলপিজি সিন্ডিকেট আকস্মিক ও অযৌক্তিকভাবে এলপিজির মূল্য সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করে জনগণের পকেট কেটে নিচ্ছে। অথচ সরকার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এলপিজির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সিন্ডিকেট লুটছে জনগণকে অথচ ভোক্তাদের দুর্ভোগ নিয়ে নীরব সরকার ও প্রশাসন। মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেট দমনের কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। সরকারের এমন নজিরবিহীন ব্যর্থতা ক্ষমার অযোগ্য।

চলমান এই সংকট দেশকে একটি বড় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাজার ব্যর্থ হয় শুধু বেসরকারি শক্তি প্রয়োগ করে নয়, বাজার ব্যর্থ হয় যখন আইন প্রয়োগ হয় না, আর নিয়ন্ত্রণ হয় নির্বাচিতভাবে। প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে দুর্বল রাষ্ট্র মানেই শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আমাদের সামনে এখন পরিষ্কার একটি পথ। হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার জনস্বার্থে পরিচালিত হবে, নয়তো তা সিন্ডিকেটের হাতে বন্দিই থাকবে। সরকারকে জরুরিভাবে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং যারা এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

মন্তব্য করুন

মর্যাদাপূর্ণ অভিষেকের মতো মর্যাদাপূর্ণ বিদায়ের কথাও ভাবুন
আজ যারা মন্ত্রী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করছেন—তাদের প্রতি জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। একই সঙ্গে রাখতে চাই একটি বিনীত অনুরোধ। আজকের এই মর্যাদাপূর্ণ অভিষেক যেন পাঁচ বছর পর সমান মর্যাদার বিদায়ে পরিণত হয় - সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই আপনাদের যাত্রা শুরু হোক। অতীতের সরকারগুলোর ভুল ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র ও প্রশাসন পরিচালনা করুন এমনভাবে, যাতে বিদায়ের মুহূর্তে কোনো অমর্যাদা আপনাদের স্পর্শ না করে। মনে রাখবেন, ক্ষমতার শেষ প্রান্তে এসে সুবিধাভোগীদের অধিকাংশই আর পাশে থাকে না। দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনি অনেকের কাছে এক ধরনের ‘সম্পদে’ পরিণত হন। পরিবার, নিকট আত্মীয়, দলীয় নেতাকর্মী—অনেকে আপনাকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চাইবে। কেউ কেউ আপনাকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাও করবে। কিন্তু আপনি নিজেকে কতটা সুরক্ষিত রাখবেন, কতটা নীতিতে অটল থাকবেন—তা নির্ভর করবে আপনার প্রজ্ঞা, সততা ও নৈতিক দৃঢ়তার ওপর। বিচক্ষণতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারলে তবেই আপনি প্রকৃত অর্থে জননেতা হয়ে উঠবেন। আরেকটি কথা স্পষ্টভাবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, হিসাব একদিন আপনাকেই দিতে হবে। ব্যক্তিগত লোভে, নির্বাচনি ব্যয় উসুলের প্রয়াসে কিংবা চাটুকারদের প্ররোচনায় যদি রাষ্ট্রের একটি টাকাও অপচয় বা অপব্যবহার হয়, তার জবাবদিহি অনিবার্য। দুনিয়াতে হোক বা শেষ  বিচারের দিনে—দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। ১৮ কোটি মানুষের কাছে জীবদ্দশায় ক্ষমা পাওয়া সহজ নয়। এই বার্তা আপনাদের কাছে পৌঁছাক বা না পৌঁছাক—আমি আমার নাগরিক দায়িত্ব পালন করলাম। বাকিটা নির্ভর করবে জনগণের ওপর—তারা যেন এই আহ্বান আপনাদের কানে পৌঁছে দেয়। লেখক : অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহবায়ক, ওয়েল-বিয়িং-ফাস্ট ইনিশিয়েটিভ (ওয়েফি), বাংলাদেশ 
মর্যাদাপূর্ণ অভিষেকের মতো মর্যাদাপূর্ণ বিদায়ের কথাও ভাবুন
নির্বাচন শেষ: এখন দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পালা
বহুল প্রতীক্ষিত ও আকাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। দীর্ঘদিন পর ভোটকেন্দ্রে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দের দল ও প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার দৃশ্য— গণতন্ত্রের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা। এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করতে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সবার কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য। গণতন্ত্র কেবল ব্যালটের লড়াই নয়; এটি আস্থার প্রশ্ন। সে আস্থা ফিরিয়ে আনার পথে এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিজয় ও বিরোধিতার নতুন সমীকরণ এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তাদের জোটসঙ্গীরা নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। তাদের এই সাফল্যের জন্য জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা। একই সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলে নির্বাচনকে প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক করে তোলার জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও প্রশংসার দাবিদার। গণতন্ত্রে শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্বশীল ও কার্যকর বিরোধী দলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের এই পর্বকে একটি ‘নির্বাচনি ইকোসিস্টেম’ হিসেবে দেখলে দেখা যায়—জনগণই এখানে মূল নিয়ামক। তারা অতিথি নন, বরং প্রকৃত মালিক। তাদের ভোট হলো এক অমূল্য উপহার, যা তারা আস্থা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে বিজয়ী দলের হাতে তুলে দিয়েছেন। এখন সেই আস্থার প্রতিদান দেওয়ার পালা। ‘মেহমানদারি’র রাজনৈতিক দর্শন জনগণ যদি মালিক হন, তবে নির্বাচিত সরকার তাদের সেবক—এই বোধ থেকেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে হবে। বিজয়ী দল হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব হবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা। অন্যদিকে বিরোধী দল হিসেবে ১১ দলীয় জোটের ভূমিকা হবে গঠনমূলক সমালোচনা, নীতিগত পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি নিশ্চিত করা। এটাই ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’—ক্ষমতার ভারসাম্য। সরকার যেন স্বেচ্ছাচারী না হয়, আবার বিরোধী দল যেন কেবল বাধা দেওয়ার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, বিরোধিতাও রাষ্ট্রগঠনের অংশ। ১৯৯১-এর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জন্য এটি এক নতুন সুযোগ। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটে তুলনামূলকভাবে যে সংযত, মেধাভিত্তিক ও দায়িত্বশীল মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ব্যক্তিস্বার্থ, অতিরিক্ত ক্ষমতালিপ্সা কিংবা দলীয়করণ—এসব থেকে দূরে থেকে একটি দক্ষ, সৎ ও কম স্বার্থান্বেষী মন্ত্রিসভা গঠন সময়ের দাবি। রাষ্ট্র পরিচালনায় এখন প্রয়োজন—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনর্গঠন; প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি; দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান; বিচার ও প্রশাসনে নিরপেক্ষতা; তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন; এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো । জনগণ কেবল সরকার পরিবর্তন চায় না; তারা শাসনব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন চায়। বিরোধী দলের কৌশলগত দায়িত্ব বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের জন্যও এটি একটি পরীক্ষা। সংখ্যায় কম হলেও কার্যকর বিরোধী দল হওয়া সম্ভব—যদি তারা তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, সংসদে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নীতিগত বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারে। তাদের আগেভাগেই বিশ্লেষণ করতে হবে—সরকার কোথায় ভুল করতে পারে, কোন নীতিতে ঝুঁকি রয়েছে, কোন খাতে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। বিরোধিতা যেন প্রতিহিংসার না হয়ে নীতিনিষ্ঠ হয়। ভুল পথে গেলে সরকারকে সতর্ক করা হবে, কিন্তু উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে সমর্থনও দেওয়া হবে—এমন রাজনৈতিক পরিপক্বতা এখন জরুরি। নতুন রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমের সম্ভাবনা বিএনপি ক্ষমতায় এবং জামায়াত ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট বিরোধী দলে—এমন সমীকরণ অতীতে খুব কমই দেখা গেছে। এই বাস্তবতা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ এনে দিয়েছে। যদি সরকার দায়িত্বশীল হয় এবং বিরোধী দল গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে, তবে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ইকোসিস্টেম তৈরি হতে পারে—যেখানে ক্ষমতা ও জবাবদিহি পাশাপাশি চলবে। জনগণের চূড়ান্ত প্রত্যাশা সবচেয়ে বড় কথা—জনগণ আবারও ভোট দিয়েছে। তারা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আস্থা প্রকাশ করেছে। এখন সেই আস্থাকে মর্যাদা দেওয়া রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব। গণতন্ত্র কেবল পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতা লাভের সুযোগ নয়; এটি জনগণের সঙ্গে এক নৈতিক চুক্তি। সেই চুক্তি রক্ষা করতে হলে দরকার সংযম, প্রজ্ঞা, স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। আমরা আশাবাদী—এই নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও উন্নয়নমুখী শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে। নির্বাচন শেষ হয়েছে; এখন শুরু হোক দায়িত্ব পালনের প্রতিযোগিতা। দেশ এগিয়ে নেওয়ার পালা—এবার সত্যিকার অর্থেই। ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এবং আহবায়ক, ওয়েল-বিয়িং-ফাস্ট ইনিশিয়েটিভ (ওয়েফি), বাংলাদেশ।
নির্বাচন শেষ: এখন দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পালা
সব দলের কাছে দায়িত্বশীল আচরণের প্রত্যাশা
আগামীকাল শুরু হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। একটি নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হলো মাঠপর্যায়ের পরিবেশ। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত সংবাদ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কারণ দেখছি না। ভোটের মাঠের পরিবেশ এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ। আমার ধারণা, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দল ও জোট একটি বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন—যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা হঠকারিতা নির্বাচনি প্রক্রিয়াকেই ব্যাহত করতে পারে। প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলো যেহেতু জয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী, তাই এই আশার পরিবেশ বিনষ্ট হয় এমন কোনো আত্মঘাতী আচরণ তারা করবে না বলেই আমার বিশ্বাস। অতীতের কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনটি চরিত্রগতভাবেই ভিন্ন। এই ভিন্নতার অন্যতম বড় কারণ হলো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ। দেশের জনগণ পরপর তিনটি নির্বাচনে কার্যত ভোট দিতে পারেনি বা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সি বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা বিগত বছরগুলোতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত ছিল, তারা এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবে। এটি তাদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা ও শিহরণ জাগানিয়া মুহূর্ত। এছাড়া, এবারের নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দলের সরব উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। তারা তাদের নির্বাচনি প্রচারণার মাধ্যমে জানান দিচ্ছে যে, জাতীয় রাজনীতিতে তারা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। অতীতে তাদের এই রূপ দেখা যায়নি, যা এবারের নির্বাচনের অন্যতম একটি নতুন দিক। বাংলাদেশের রাজনীতির একটি চিরস্থায়ী সমস্যা হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও সেই আস্থার সংকট দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন পক্ষ থেকেই নির্বাচনে কারচুপি বা ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মী ও ভোটারদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিচ্ছে। এই আস্থার সংকট কেবল রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি নির্বাচন কমিশনকে ঘিরেও দানা বেঁধেছে। কমিশনের কিছু কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি এই সন্দেহের মাত্রাকে কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে।  তাত্ত্বিকভাবে আমরা জানি, সমাজে ‘বিশ্বাস’ বা ‘ট্রাস্ট’ একটি সামাজিক পুঁজি হিসেবে কাজ করে। একসময় আমাদের সমাজে মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করত, সমাজের মুরুব্বি বা নেতৃস্থানীয়দের কথার ওপর ভরসা রাখত। কিন্তু ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে আজ পর্যন্ত নানাবিধ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে সেই পুরোনো সামাজিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধগুলো ভেঙে গেছে। সমাজটা একটা ওলটপালট অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ‘বিশ্বাস’ তার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। সমাজ যখন আবার স্থিতিশীল হবে এবং উন্নয়ন ও উৎপাদনের পথে হাঁটবে, তখনই হয়তো নতুন করে আস্থার ভিত্তি তৈরি হবে। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও কিছু প্রশ্ন উঠেছে। মাঝেমধ্যে তারা এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলাফল তারা আগেই চিন্তা করে না। যেমন—ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি সমালোচনার মুখে তাদের প্রত্যাহার করতে হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো কমিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং উদ্বেগের কথা জানাচ্ছে। আশা করা যায়, নির্বাচন কমিশন একটি ‘সেলফ কারেক্টিং মেকানিজম’ বা নিজেদের শুধরে নেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ত্রুটিগুলো কাটিয়ে উঠবে। নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো মাঠ প্রশাসন। এখন পর্যন্ত মাঠ প্রশাসন বাধার মুখে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করার প্রবণতা। সংবাদমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, কতজন ডিসি জামায়াতপন্থি বা কতজন বিএনপিপন্থি—এভাবে কর্মকর্তাদের ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা সুস্থতার লক্ষণ নয়। এতে করে আস্থার সংকট আরও তীব্র হয়। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এখনো মনে হচ্ছে, আমরা একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করি, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবাই একে অপরের সহযোগিতা করবে এবং কোনো ধরনের উগ্রতা বা হঠকারিতা পরিহার করে সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখবে। জনগণ তাদের কাছে যে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে, তা তারা পূরণ করবে। পরিশেষে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমার পরামর্শ—আপনারা সহনশীল হোন। জয়ের নেশায় কেউ কোনো অনৈতিক পন্থার আশ্রয় নেবেন না। সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি করার আগে নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করুন। মনে রাখবেন, জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আজ হোক বা কাল, মানুষ আপনার ত্রুটি-বিচ্যুতির হিসাব চাইবে এবং আপনাকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। আওয়ামী লীগ একসময় মনে করেছিল তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সেই ভুলের জন্য আজ তাদের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীল আচরণ করতে হবে।   ড. মাহ্বুব উল্লাহ্ শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সব দলের কাছে দায়িত্বশীল আচরণের প্রত্যাশা
স্মৃতির ক্ষত থেকে আগামীর স্বপ্ন: ব্যালট কি পারবে বদলাতে ভাগ্য?
ফেব্রুয়ারির মৃদু হিমেল হাওয়ায় কান পাতলে এখন শীতের বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়। বাতাসে একইসঙ্গে বইছে ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তা। প্রকৃতির পালাবদলের এমন সন্ধিক্ষণে ১২ তারিখের ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। দিনটি ঘিরে মনের ভেতরে আশার প্রদীপের পাশাপাশি এক দীর্ঘশ্বাসের ছায়াও খেলা করছে। বাংলাদেশের বিগত ১২টি নির্বাচনের চড়াই-উতরাই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। হাতেগোনা তিন-চারটা জাতীয় নির্বাচন বাদ দিলে বাকিগুলোর ইতিহাস মূলত বিতর্ক আর অগ্রহণযোগ্যতার কালিতে লেখা। স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সেই দিনটি। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে কোনো ভোটই হয়নি—প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেকেই জানতে পেরেছিলাম, আমাদের ভোট আগের রাতেই অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে। একরাশ ঘৃণা ও অভিমান নিয়ে সেদিন ভোটকেন্দ্র থেকে ফিরে এসেছিলাম। তারপর থেকে আর ভোটকেন্দ্রমুখী হওয়া হয়নি। উন্নত বিশ্বে ভোট কেমন হয় তা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৩ মার্চের কথা। অস্ট্রেলিয়ায় তখন জাতীয় নির্বাচন। আমি সিডনিতে ছিলাম। নিউ সাউথ ওয়েলস (NSW) স্টেটের নির্বাচনের সেই স্মৃতি আজও অমলিন। নিউ সাউথ ওয়েলসের রাজধানী সিডনির দেয়ালে কাগজের পোস্টারের ঘিঞ্জি চোখে পড়েনি, নির্বাচনি শব্দদূষণ-বিকট মাইকিং, পথ অবরোধ করে নির্বাচনি প্রচার, বা চোখে পড়েনি ট্যাগিংয়ের রাজনীতি। লিবারেল ও লেবার পার্টির প্রার্থীদের প্রায়ই একসঙ্গে ভোট চাইতে দেখা যায়। একে অপরের দিকে কোনো কাদা ছোড়াছুড়ি নয় বরং উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে সবাইকে মুখিয়ে থাকতে দেখেছি। অস্ট্রেলিয়ায় ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক, না দিলে জরিমানা দিতে হয়। অথচ আমাদের দেশে ভোট দিতে যাওয়াটাই যেন এক ‘সাহসী যুদ্ধ’। উন্নত দেশে মানুষের কাছে নির্বাচন মানে সেবার সুযোগ খোঁজা, আর আমাদের অনেক প্রার্থীর কাছে নির্বাচন যেন এক ‘লাভজনক ব্যবসা’। শিক্ষার হার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মাথাপিছু আয়ে আমরা হয়তো এগোচ্ছি, কিন্তু সুস্থ রাজনৈতিক চর্চায়, মন-মানসিকতায় আমরা কতটা দরিদ্র, তা বিদেশের ওই ভোটকেন্দ্রগুলোতে না গেলে অনুধাবন করা কঠিন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের হৃদয়ে নতুন করে স্বপ্ন বোনার সাহস জুগিয়েছে। মানুষ এখন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন চায় না, বরং একটি ‘সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ ও ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। ২৪-এর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লব আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা দেখেছি, ক্ষমতার মোহ কীভাবে মানুষকে অন্ধ করে দেয়, দেশ কীভাবে রসাতলে চলে যায়। তাই ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের জন্য কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি পরীক্ষা, আমাদের জাতিগত বোধোদয়ের দিন। অস্ট্রেলিয়ার সেই সুশৃঙ্খল পরিবেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের শুরু হতে পারে এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই। আসুন অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো পেছনে ফেলে ১২ তারিখ আমরা একটি পরিবর্তনের লক্ষ্যে ভোটকেন্দ্রে যাই। আমাদের একটি ভোটই পারে একজন সত্যিকারের যোগ্য ও দেশপ্রেমিক প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে। আগামী পাঁচ বছর যেন কোনো আক্ষেপের নয়, বরং গৌরবের সঙ্গে মাথা উচু করে বাঁচার সময় হয়ে ওঠে। আমি বিশ্বাস করি, দেশের মানুষ এবার দলান্ধ হয়ে ভোট দেবে না। তারা ভোট দেবে যোগ্যতা, সততা ও দেশপ্রেম দেখে। সঠিক নেতৃত্বে আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশকে দুর্নীতির অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব। আসুন পরিবর্তনের জন্য হ্যাঁকে জয়যুক্ত করি। গড়ে তুলি বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতির নতুন বাংলাদেশ। লেখক: ভাইস চ্যান্সেলর ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
স্মৃতির ক্ষত থেকে আগামীর স্বপ্ন: ব্যালট কি পারবে বদলাতে ভাগ্য?
সশস্ত্র বাহিনীর আস্থা ও দায়িত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা আসন্ন নির্বাচন
জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এই বাহিনীগুলোর ওপর জাতির প্রত্যাশা এবার অনেক বেশি। দৈনিক বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—‘সেনাবাহিনীর পেশাদারত্বের ওপরই গণতন্ত্রের উত্তরণ’ (৮ ফেব্রুয়ারি)। এটি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি অ্যাসিড টেস্ট বলা যেতে পারে। পরম আস্থায় সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের জনগণ। এটি সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের অসামান্য সুযোগ বটে।   বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জন্মলগ্ন থেকেই নিজস্ব পেশাগত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় নিয়োজিত হয়ে আসছে। এ সহায়তার একটি অন্যতম ক্ষেত্র হলো স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান। স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় ইন-এইড টু সিভিল পাওয়ার-এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়ে থাকে।  সাংবিধানিক অনুমোদন     বাংলাদেশের সংবিধান মোতাবেক যে কোনো নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন মূলত নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত। তবে সেনাবাহিনী সর্বদা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির সচিবালয় বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ) থেকে লিখিত নির্দেশনা পাপ্তির পর প্রয়োজনীয়সংখ্যক সেনা মোতায়েন করে থাকে। স্বাধীনতা লাভের পর বিগত ৫৪ বছরে ১২টি জাতীয় ও আনুমানিক ১০টি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন হয়েছিল। নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনী মোতায়েন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।  নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্বে সেনাবাহিনী-পাকিস্তান পর্ব   ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক (পাকিস্তানের) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই অঞ্চলে নিয়োজিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটসহ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট নির্বাচনের সময় দায়িত্বপালন করেছিল। এ প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক লিখেছেন,  ‘১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা সহায়তা প্রদানমূলক কর্তব্য পালনের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। আমার দায়িত্বপূর্ণ (২য় ইস্ট বেঙ্গল) এলাকা ছিল বর্তমান শেরপুর জেলার যেটা তৎকালীন জামালপুর মহকুমার অংশ ছিল’ (সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ ও অন্যান্য, ২০১৫)। ২৯ ক্যাভালরি ইউনিটের (রংপুর সেনানিবাস) অফিসার হিসেবে মেজর নাসির উদ্দিন তৎকালীন বৃহত্তর রংপুরের কুড়িগ্রাম মহকুমায় নির্বাচনকালীন দায়িত্বপালন করেছিলেন (যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা, ১৯৯২)। নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব-বাংলাদেশ পর্ব  বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বচান অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ। একটি নতুন স্বাধীন দেশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক অবকাঠামো তখনও মজবুত হয়ে উঠতে পারেনি। এমতাবস্থায় তৎকালীন সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনী নিয়োগ করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেনাবাহিনীর নির্বাচনবিষয়ক দায়িত্বপালন-নামিবিয়া থেকে সাউথ সুদান ১৯৮৯ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৯০ সালের মার্চ পর্যন্ত আফ্রিকার নামিবিয়াতে শান্তি মিশন (আনট্যাগ) পরিচালিত হয়। এটি ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় মিশন এবং বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম মিশন। এখানে ১৯৮৯ এর নভেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা অর্থাৎ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেন। পুলিশ কর্মকর্তা এন কে এন ইসলাম তার গ্রন্থ ‘আমার দেখা নামিবিয়া’তে (১৯৯১)’ নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্বপালনের অভিজ্ঞতার কথা চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। কম্বোডিয়ায় ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশের শান্তিসেনা ১৯৯২-১৯৯৩ সালে কম্বোডিয়ার শান্তি মিশনে, (আনটাক) একপর্যায়ে দেশটির পরিস্থিতি মারাত্মক সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব কি না সেটা নিয়ে জাতিসংঘও দ্বিধায় পড়েছিল। এই সংকটকালে লে. কর্নেল খোন্দকার কামালুজ্জামানের (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ান (৩য় ইস্ট বেঙ্গল) দায়িত্বপূর্ণ প্রদেশে অত্যন্ত সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এমন উদাহরণ অন্যান্য দেশের শান্তিরক্ষীদের অনুপ্রাণিত করে। পাল্টে যায় সমগ্র দৃশ্যপট। খেমাররুজ দলের ব্যাপক সহিংসতার মুখেও সিয়ামরিপ প্রদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গৃহযুদ্ধ থেকে শান্তির পথে এগিয়ে যায় কম্বোডিয়া।  বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের এই সাহসী ভূমিকা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল। কম্বোডিয়ায় নির্বাচনের দিনে (মে, ১৯৯৩) দুর্ধর্ষ খেমাররুজ বাহিনী বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার একটি নির্বাচন কেন্দ্রে আক্রমণ করে। তবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা সেই আক্রমণ প্রতিহত করে। তবে একপর্যায়ে কমিউনিস্ট খেমাররুজ বাহিনীর রকেট লঞ্চারের আঘাতে চৌকস বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তা মেজর তামিম আহম্মেদ চৌধুরী (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) মারাত্মকভাবে আহত হন।  একজন শান্তিরক্ষী হিসেবে (সামরিক পর্যবেক্ষক) এই নিবন্ধকার কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেসব ঘটনার কিছু বিবরণ লেখার (কম্বোডিয়া: শান্তিসেনার জার্নাল) তার সুযোগ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সিয়েরালিওন, লাইবেরিয়া, আইভরি কোস্ট, দক্ষিণ সুদানসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে নিরাপত্তা সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশের শান্তিরক্ষিরা অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচন পরিচালনা পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও বিশেষত শান্তি বাহিনী/সন্ত্রাসী প্রভাবিত এলাকায় নির্বাচনে নিরাপত্তা প্রদান করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বিষয়। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত শান্তি বাহিনীর আক্রমণ ও হুমকির মুখেও সেনাবাহিনীসহ পাহাড়ে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ সহায়তায় সরকার সেখানে নির্বাচন পরিচালনা করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচনকালে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ১৯৭৭ সালের মে মাসে গণভোটের দিন রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী এলাকায় (বাঙালহালিয়া) একটি সেনা টহলের ওপর শান্তি বাহিনী একটি ভয়ংকর এমবুস পরিচালনা করে। এতে ১৭ জন সৈনিক নিহত হন। ১৯৮৬ সালের ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের সময় আমাদের ইউনিট (২৫ ইস্ট  বেঙ্গল) রাঙামাটি জেলার দক্ষিণে বিলাইছড়ি-ফারুয়া অঞ্চলে নিয়োজিত ছিল। তখন পাহাড়ে শান্তি বাহিনীর বিদ্রোহ বা ইন্সারজেন্সির বসন্ত। সেই অশান্ত পরিবেশে আমাদের নির্বাচনকালীন দায়িত্বপালন করতে হয়েছিল। সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বি কে দেওয়ান (পরবর্তী সময়ে প্রতিমন্ত্রী) এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালের ২৫ জুন প্রথমবারের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলাতেই একযোগে স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পাহাড়ের এই আলোচিত নির্বাচনে সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক নিরাপত্তা-সহায়তা প্রদান করে। শান্তিচুক্তির (১৯৯৭) পরও পাহাড়ে শান্তি ফেরেনি। শান্তি বাহিনীর মতো শক্তিশালী না হলেও বর্তমানে প্রায় ৫টি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী কমবেশি সক্রিয় রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ উপজেলা নির্বাচনকালে, রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ৭ জন নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যক্তি নিহত হয়।  নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রথাগত ভূমিকা বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনী সাধারণত ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্বপালন করে। তাদের মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, সংঘর্ষ, নাশকতা কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। এসব পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী দ্রুত মোতায়েন হয়ে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সক্ষম। দ্বিতীয়ত, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ভোটারদের আস্থা ও সাহস জোগায়, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ বা স্পর্শকাতর এলাকায়। তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা প্রদান। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় সেনাবাহিনী চলাফেরা করে এবং প্রয়োজনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে সহায়তা করে। চতুর্থত, অস্ত্র ও সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমে সহায়তা। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী তৎপরতা দমন এবং বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা অনস্বীকার্য। অন্যান্য বাহিনীর ভূমিকা সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও র‌্যাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ রোধে সক্রিয় থাকে। উপকূলীয় ও নদীঘেঁষা এলাকায় কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। প্রয়োজনে বিমানবাহিনী লজিস্টিক ও জরুরি সহায়তা প্রদান করে। সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর সামনে চ্যালেঞ্জসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত পরিবেশে সেনাবাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পেশাদার অবস্থান ধরে রাখা। যে কোনো পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও উত্তেজনা। তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন মাঠপর্যায়ে সেনাসদস্যদের জন্য কাজ কঠিন করে তুলতে পারে। তৃতীয়ত, গুজব ও অপপ্রচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ঘিরে ভুয়া তথ্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। চতুর্থত, আইনি সীমাবদ্ধতা ও মানবাধিকার প্রশ্ন। দায়িত্বপালনের সময় বলপ্রয়োগ যেন আইনসম্মত ও মানবাধিকারসম্মত হয়—এ বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সতর্কতার দাবি রাখে। এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতি এরই মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে সশস্ত্র বাহিনী আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা নিতে প্রস্তুত হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও বারবার বলা হচ্ছে সংঘাত এড়িয়ে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনে তারা বদ্ধপরিকর। এরই মধ্যে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অনেক দিন পর সেনাবাহিনীকে পুনরায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেসির ক্ষমতা থাকায় সেনাবাহিনীর কার্যক্রম অধিকতর কার্যকর হবে।   এবার বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ড ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩, চৌকিদার-দফাদারের ৪৫ হাজার ৮২০ জন সদস্য মোতায়েন করা হবে। নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করতে হবে-সেনাপ্রধান আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা জোরদারের নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেছেন, দায়িত্বপালনকালে পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত সেনাবাহিনী দায়িত্বপালন করবে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে গুলিস্তানের রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সেনাসদর। সেখানে সেনাসদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয়, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে সশস্ত্র বাহিনী। অতীতের নির্বাচনগুলোতে এ দায়িত্ব ছিল না। এ কারণে এবারের নির্বাচনে এক লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪২ হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন থাকতেন। মনজুর হোসেন বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাচন-সংক্রান্ত পরিপত্রে সশস্ত্র বাহিনীকে ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা আগে ছিল না। অতীতে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দূরে অবস্থান করা হলেও এবার প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি দায়িত্বপালন করা হবে। সেনাপ্রধান নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ে দুটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এক, অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস। দুই, সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচনের প্রতি আস্থা তৈরি। দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে নির্বাচনি সরঞ্জাম ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের পরিবহনে সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত থাকবে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন বলেন, দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে আগেই হেলিকপ্টার মোতায়েন থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যকে বড় হুমকি উল্লেখ করে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান এই সেনা কর্মকর্তা। আলজাজিরা পত্রিকা—বাংলাদেশের নির্বাচনে এখনও নেপথ্যের শক্তি কি সেনাবাহিনী? ২৯ জানুয়ারি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রভাব ও ভূমিকা নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ‘সেনাবাহিনী বর্তমানে জনশৃঙ্খলার সবচেয়ে দৃশ্যমান গ্যারান্টার হিসাবে ভোটের পরিবেশ কেন্দ্রে চলে এসেছে।’  রাওয়া সেমিনারে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা গত ৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে রাওয়া’র থিংক ট্যাঙ্ক ‘রাওয়া রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডি ফোরাম’ (আরআরএসএফ) ‘নির্বাচন ২০২৬’: জাতীয় ঐক্য ও প্রত্যাশা শীর্ষক এক সেমিনার আয়োজন করে। নির্বাচন ঘিরে অস্থিরতা তৈরিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করে মেজর নিয়াজ আহমেদ জাবের (অব.) বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ব্যর্থ হওয়া মানে জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জনকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করা।’  লে. কর্নেল আবু ইউসুফ জোবায়ের উল্লাহ (অব.) আগামীর বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, ‘আমাদের জন্য আজ প্রয়োজন একদল সৎ ও সাহসী মানুষের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের।’ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গণি (অব.) ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের বদলে জনস্বার্থ রক্ষায় যোগ্য, সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘এখন ভোট রক্ষা করার অর্থ কেবল নির্বাচনে জয়ী হওয়া নয়, বরং রাষ্ট্রকে রক্ষা করা।’ অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘একটি প্রতিবেশী দেশ আমাদের নির্বাচন ভন্ডুল করতে এবং এখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। অস্থিরতা তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। তাই সামনে চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ কর্নেল হারুন-অর-রশীদ খানের (অব.) সভাপতিত্বে সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন লে. কর্নেল মোদাসসের হোসেন, বীর প্রতীক (অব.) ও লে. জেনারেল আমিনুল করিম (অব.) প্রমুখ।  বিগত ৩টি নির্বাচন ও সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি  এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ৩টি নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ আছে যে, আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা মোতায়েন থাকলেও সেসব নির্বাচনে কোথাও কোথাও অনিয়মের দৃশ্যমান অভিযোগ উঠলেও সেই সময় তাদের ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয়। এবারের নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক বাহিনীটির জন্য একধরনের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।  নির্বাচনের মাঠে যদি সেনাবাহিনী সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ থেকে ভোটার, প্রার্থী ও এজেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, কেন্দ্রভিত্তিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি অনিয়ম-সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়, তাহলে নির্বাচনে অতীতের বিতর্ককে ছাপিয়ে পেশাদারত্বের একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী আমলের গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তাতে এবারের নির্বাচন সেনাবাহিনীর জন্য কেবল দায়িত্বপালন নয় বরং পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা দৃশ্যমানভাবে প্রমাণ করার বড় সুযোগ। যার মধ্যে দিয়ে গত কয়েক বছরের বিতর্ক ও আস্থার ঘাটতি কাটিয়ে সেনাবাহিনী নিজেদের ভূমিকা ও ভাবমূর্তি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারবেন।  সশস্ত্র বাহিনীকে যেসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পেশাদারত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে আসছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাদের ভূমিকা হবে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। একই সঙ্গে নিরপেক্ষতা, সংযম ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখাই হবে এই বাহিনীগুলোর সবচেয়ে বড় সাফল্য।  আসন্ন নির্বাচন এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর, পারস্পরিক অবিশ্বাস প্রবল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচারের বিস্তার উদ্বেগজনক। এই বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, সংযম ও নিরপেক্ষ আচরণই হতে পারে উত্তেজনা প্রশমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।  একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়—তাদের আচরণ যদি দায়িত্বশীল না হয়, তবে কোনো বাহিনীর পক্ষেই নির্বাচনকে পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ রাখা সম্ভব নয়।  আন্তর্জাতিক মহলও এই নির্বাচন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করবে। সে ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে যে, বাংলাদেশ গণতন্ত্র রক্ষায় প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম। শেষের কথা  সবশেষে বলা যায়, আসন্ন নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা হবে আস্থা ও দায়িত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই হবে সশস্ত্র বাহিনীর সবচেয়ে বড় সাফল্য। সেই সাফল্যের মধ্য দিয়েই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আরও দৃঢ় হতে পারে। এই দায়িত্বে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।  লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক
সশস্ত্র বাহিনীর আস্থা ও দায়িত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা আসন্ন নির্বাচন
আল জাজিরায় কৃষ্ণ নন্দী / ‘জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশি হিন্দুরা নিরাপদ থাকবে, আমিই তার প্রমাণ’
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার ইস্যুটি বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ভোটের রাজনীতিতেও এর বিশেষ তাপর্য রয়েছে। তাই নির্বাচনের মৌসুমে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি আরও ব্যাপকভাবে আলোচনায় উঠে আসে।  দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কাঠামোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়; বিশেষ করে হিন্দুদের নিরাপত্তাঝুঁকি নিরসনের নিশ্চয়তা কম। তবে এ ধারণার সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে খুলনা-১ আসনের (বটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলা) সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীর। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হয়েও কৃষ্ণ নন্দী এবার নির্বাচন করছেন ইসলাম ধর্মভিত্তিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়ে। কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো অমুসলিমকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে জামায়াত। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনার শেষ নেই।  কৃষ্ণ নন্দী মনে করেন, জামায়াত বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে দেশের হিন্দু সম্প্রদায় নিরাপদে থাকবে। এ ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরায় নিজের এমন মনোভাব তুলে ধরে একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছেন কৃষ্ণ নন্দী। সেখানে উঠে এসেছে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং  এ সংক্রান্ত নানা প্রসঙ্গ। একই সঙ্গে ওই প্রতিবেদনে জামায়াতের রাজনীতি নিয়েও একেবারেই ভিন্ন একটি বয়ান সামনে এনেছেন কৃষ্ণ, যা নতুন আলোচনার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছে।   কৃষ্ণ নন্দীর লেখাটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো আমি কৃষ্ণ নন্দী। আমি একজন হিন্দু। একজন ব্যবসায়ী। পাশাপাশি আমি এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন মনোনিত প্রার্থী। অনেক পাঠকের জন্যই এ বিষয়টি বিস্ময়কর মনে হলেও আমার মতে, এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের একটি বড় অংশকে বহু বছর ধরে বলা হয়ে আসছে যে, ইসলামি রাজনীতি মানেই তাদের জন্য ভয় ও অনিরাপত্তা। আমার মনোনয়ন ঘোষণার পর দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। সাধারণভাবে মনে করা হয়, ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। এ ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতেই রাজনীতিতে আমার এ প্রচেষ্টা। আমি বারবার আমার মানুষদের বলে আসছি জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে কোনো হিন্দুকে দেশ ছাড়তে হবে না বা কাউকে ভারতে যেতে বাধ্য করা হবে না। আমি যখন হিন্দুদের কথা বলছি, আমি বোঝাতে চাচ্ছি হিন্দুরা এই দেশেই সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করবে।  আমি ২০০৩ সালে আদর্শগত বিশ্বাস থেকে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেই। আমার অভিজ্ঞতায়, দলটিতে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। জামায়াতে ইসলামী দলটি  অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনা, ভয় দেখানো বা সহিংস রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।  এগুলো কোনো বাড়িয়ে বলা কথা না। এগুলো এমন নীতিমালা, যা দলীয়ভাবে ভেতরে ভেতরে বাস্তবায়ন করা হয়। এ কারণেই সাধারণ নাগরিকসহ অনেক সংখ্যালঘুরাও এখন জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। মানুষ ধীরে ধীরে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারাচ্ছে। এর মধ্যে এমন দলও রয়েছে, যারা একসময় গণতন্ত্রের কথা বলত, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি, সহিংসতা ও দায়মুক্তিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। নাগরিকরা শুধু কোনো কিছুর বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছেন না। তারা এমন একটি বিকল্প খুঁজছেন, যারা ন্যায়বিচার, সুশাসন ও নৈতিক দায়িত্ববোধের বিষয়ে সত্যিকার অর্থে আন্তরিক। আলজাজিরাকে তিনি আরও জানান, অনেকের চোখে জামায়াত এখন সেই বিকল্প। খুলনা-১ আসনে দীর্ঘদিন ধরে মানুষ চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ভয়ভীতির মধ্যে জীবনযাপন করেছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা হামলা, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। অনেকেই অন্যায়ভাবে চাকরি হারিয়েছেন। বহু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে ছিল। আমি স্পষ্টভাবে বলেছি, এসব অবিচার উপেক্ষা করা হবে না। যারা অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাবেন। কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। আমি দালালভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমি অন্যদের মাধ্যমে কোনো যোগাযোগও করি না। আমার ফোন নম্বর সবার কাছেই আছে এবং থাকবে। নির্বাচনের সময় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ হবে সরাসরি, জবাবদিহিতা থাকবে নিয়মিত এবং ধারাবাহিকভাবে। আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টাও হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্রের কিছু ব্যক্তিও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। এ বিষয়ে আমার অবস্থান স্পষ্ট ও দৃঢ়। আমাকে চুপ করানো যাবে না বা সরিয়েও দেওয়া যাবে না। আমাদের রাজনীতিতে ভয় অনেক দিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। যদি আমরা এই ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করি, তাহলে কোনো পরিবর্তন আসবে না। আরেকটি বিষয়ে সৎভাবে কথা বলা দরকার, তা হলো ইতিহাস। আমি অস্বীকার করি না যে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেই কষ্ট শুধু কথার মাধ্যমে মুছে ফেলা যায় না। আসল প্রশ্ন হলো, কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন এসব অন্যায়কে অস্বীকার করবে নাকি তা স্বীকার করে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেখাবে। জামায়াতে ইসলামীতে আমার উপস্থিতি ইতিহাস নতুন করে লেখার চেষ্টা নয়, বরং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি প্রয়াসমাত্র। অনেকেই প্রশ্ন করেন, জামায়াত কি শুধু মুসলমানদের জন্য? আমার উত্তর খুবই সহজ। জামায়াত মূল্যবোধের দিক থেকে একটি ইসলামি দল, তবে দায়িত্বের দিক থেকে একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল। ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবিক মর্যাদা কোনো একক ধর্মের সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে সে সময়ে জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনের সদস্যরাই আমাদের সুরক্ষা দিয়েছেন এবং মন্দির ও উপাসনালয়সহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুরক্ষা দেয়, কেবল স্লোগান দিয়ে রাষ্ট্র চালায় না। যখন কোনো পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে, জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত জনসেবামূলক নেটওয়ার্কগুলো তাদের সাহায্য করে। কোনো ধর্ম বা রাজনৈতিক আনুগত্যের  বিষয়ে প্রশ্ন করে না। এই সেবার সংস্কৃতি থেকেই বোঝায় কেন অনেক নাগরিক জামায়াতকে কেবল স্লোগানের দল নয়, বরং শৃঙ্খলা, কাঠামো এবং দায়বদ্ধতার দল হিসেবে দেখে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্যও আমি স্পষ্ট হতে চাই। এই নির্বাচন কোনো মতাদর্শ আমদানি বা ভীতি রপ্তানি নিয়ে নয়। এটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য। বাংলাদেশে এমন একটি সমাজ বর্তমান, যেখানে বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় বৈচিত্র্য আছে। যদি যে কোনো রাজনৈতিক দল এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে তাহলে তারা টেকসইভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। আমার মনোনয়ন শুধু একটি আসন জয় করার জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন প্রেক্ষাপট শুরু করার জন্য। এমন প্রেক্ষাপট যা ভয়, সাম্প্রদায়িক সন্দেহ এবং পরিচয় নিয়ে বিভাজনের ধারণার বাইরে গড়ে উঠবে। আমি একজন হিন্দু প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছি এই বিশ্বাস থেকে যে, জামায়াতে ইসলামী দলটির নীতিমালা সবার জন্য আরও নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক হতে পারে। এই দেশ কারও একার নয়, এই দেশ আমাদের সবার।
‘জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশি হিন্দুরা নিরাপদ থাকবে, আমিই তার প্রমাণ’
আলজাজিরার কলাম / বাংলাদেশের নির্বাচনে দৃশ্যমান হচ্ছে ‘হাদি ইফেক্ট’
শহীদরা মরে না, তাদের প্রস্থানে কিছু সময়ের জন্য শুধু শোক অনুভূত হয়। তবে মানুষের কর্মব্যস্ততায় সেই শোকও একসময় ম্লান হয়ে যায়। পরে শহীদরা হয়ে ওঠেন প্রতিবাদের প্রতীক, আন্দোলনের অনুপ্রেরণা। ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশের মানুষ এমনই এক অভিজ্ঞতার সন্ধ্যান পেয়েছে। গত ডিসেম্বরে রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হাদির জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি পুরো জাতির আবেগকে নাড়া দিয়েছিল ক্ষণিকের জন্য। তবে বাংলাদেশের জন্য হাদির ঘটনা প্রথম নয়, এর আগেও এ দেশের মানুষ এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী।  ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ, তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জোরালো ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন অনিবার্য হয়েছিল। আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের অস্ত্রের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা, পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত শ্রেষ্ট কর্মগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। তার সেই দৃশ্যটি দেয়ালচিত্রে, ম্যুরালে পুনরুত্থান,  শিল্পকলার শিল্পায়নে এবং বইপুস্তকে জায়গা করে নিয়েছে।  আবু সাঈদের ছবি অমর, স্মৃতিগুলোও অমর। তার মৃত্যুকে ঘিরে যে শোক তা এখন কেবল তার পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবের ছোট বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর বাকিদের জীবনে তার মৃত্যুর বিষয়টি এখন প্রতিদিনকার কর্মব্যস্ততা, দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, নিরাপত্তার ঝুঁকি ও নির্বাচনি আলাপের সঙ্গে হারিয়ে গেছে প্রায়। এটি মানুষের জীবনে চলমান একটি প্রক্রিয়ার মধ্যেই পড়ে।  এখানে আরেকটি কঠোর সত্য হলো- আবু সাঈদদের মৃত্যু শেষ পর্যন্ত একটি পরিণতি এনে দেয় জাতিকে। যেমনটি বাংলাদেশ দেখেছে আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার পর ছাত্র আন্দোলন জনতার আন্দোলনে পরিণত হয়, আর শেষ পর্যন্ত হাসিনার দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরশাসনের পতন হয়। জাতি একটি নতুন যুগের সূচনা করে, নতুন স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায়। আবু সাঈদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের একটি উপযোগী উদ্দেশ্য সাধন করেছে, ইতিহাসও নড়েচড়ে ওঠে। তার এই আত্মত্যাগ যতই কষ্টের হোক না কেন, তা পরিপূর্ণতা পেয়েছে। হাদির মৃত্যু হয়নি, তিনি শহীদ। শাহাদতের এক মাস পার হলেও তার হত্যাকাণ্ডের বিচার এখানো অমীমাংসিত। তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে আবেগ এবং গণমানুষের স্ফুলিঙ্গ দেখা গেছে তা প্রমাণ করে যে হাদির মৃত্যুর শোক এখানো মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে। মরণোত্তর মানুষের দেওয়া সম্মাননা আর বাঁধভাঙা কান্না প্রমাণ করে যে, একজন বীরের বিদায় নয়, বরং তা ‘হাদি ইফেক্ট’ বা হাদি প্রভাব হিসেবে সমাজে নতুন কোনো বিপ্লবের ইঙ্গিত দেয়।  যেমন ছিলেন হাদি হাদি মূলত দেশের মানুষের নজরে আসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশন টকশোর মাধ্যমে। বড় বড় রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিত্ব ও সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে জড়ানো তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সাদামাটা মনের মানুষ ছিলেন, উশকোখুশকো চুল-দাড়ি আর ছোটখাটো গড়নের। তার আসল শক্তি ছিল মুখের ভাষায়। কথা বলতেন একদম খাস বাংলায়, যেখানে দক্ষিণবঙ্গের গ্রামীণ টানও মিশেল ছিল। ঢাকার অভিযাত শ্রেণির মার্জিত ভাষার বিপরীতে তার এই ব্যবহার মাটির কাছাকাছি সুর কোটি মানুষের কাছে ছিল অত্যন্ত পরিচিত এবং আপন। মাদ্রাসার শিক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা এবং নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা হাদি ছিলেন এক অনন্য চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন তথাকথিত ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ, যার হাতে ছিল পৃতিষ্ঠিত উচ্চবর্গের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সাহস। তিনি পুরোপরি দেশীয় ব্যবস্থাপনার ভেতরে ছিলেন না, আবার বাইরেরও কেউ না। এ ছাড়া তার আপসহীন ইসলামি পরিচয় ৯০ ভাগ  মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে তাকে বিপুল জনপ্রিয় করে তুলেছিল। এমন এক দেশে যেখানে ধর্মই পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি, সেখানে হাদির ধর্মীয় অবস্থান তাকে গণমানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে।  ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর হাদি মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। যখন আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দোসররা পুনরায় জনপরিসরে ফেরার জন্য পা টিপে টিপে এগোচ্ছিল, তখন হাদি সেখানে ছিলেন পাহাড়ের মতো একটি বাধা। হাদির প্রতিবাদের ভাষা ছিল প্রতিপক্ষের জন্য আক্রমণাত্মক ও স্পষ্ট। তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, রাজনীতিতে ফেরার আগে দলটি যেন এই দেশের জনগণের সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সংযোগে অনুপ্রবেশ করতে না পারে। হাদির মৃত্যু এ দেশের তরুণদের জন্য এক আদর্শিক লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে ওঠেছে। তার লড়াই প্রচলিত কোনো রাজনৈতিক লড়াই ছিল না। তার লড়াই ছিল সরাসরি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। হাসিনার শাসনকালে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রায় আধিপত্য বিস্তার করেছিল। গণমাধ্যম, শিক্ষা এবং শিল্পকলায়- প্রায় সব ক্ষেত্রে তাদের পছন্দের পরিপূর্ণতা নিয়ে এসেছিল। নীতিগতভাবে এটি আশ্চর্য কোনো বিষয় ছিল না। ১৯৭১ সালের মুক্তযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মধ্য-বাম ঘরানার দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ভাষা, পরিচয়, সংস্কৃতি এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর তাদের কর্তৃত্বকে বৈধতা দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল।  শেখ হাসিনার চার মেয়াদের শাসন সেই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রেখেছিল। একটা সময় দেখা গেছে, তার মতবাদকে একটি প্রতিষ্ঠিত রূপ দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে অনন্য নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য জাতীয়তাবাদকে সংকুচিত করে, ইতিহাস বিকৃত করে এবং মুক্তিযুদ্ধকে ক্রমশ পুনর্বিন্যাস করার চেষ্টা করেছেন।  এই পরিবর্তনের পরিণতি ছিল গভীর। কারণ মূলধারার গণমাধ্যমগুলো এবং প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীরা হাসিনার চাপানো সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তা জনমানুষের ওপর প্রযোগ করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী- মূলত ধর্মপ্রাণ এবং মধ্যপন্থি মুসলিমদের মাঝে প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্রনির্ধারিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ জাতীয়তাবাদের মাঝে তারা নিজেদের খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা প্রদর্শন কেবল সম্মানের জায়গায় সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেনি; এটি বাধ্যতামূলক আচারে পরিণত হয়েছিল। এর বাইরে ভিন্নমত পোষণ করা মানেই ছিল সামাজিক বা পেশাগতভাবে চরম মূল্য চুকানো।  কিন্তু সেই মূল্য চুকোনোর জমাটবদ্ধ ক্ষোভ হারিয়ে যায়নি। তা কেবল সময়ের অপেক্ষায় ছিল। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও হাদি ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট হাসিনা পালিয়ে যায় ভারতে। আর তার চাপানো আধিপত্যের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শেখ মুজিবের ম্যুরালগুলো ভাঙার মধ্য দিয়ে। তা কেভল কেবল ‘ভাঙচুর’ হিসেবে দেখা হবে ভুল; বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া একপাক্ষিক আদর্শ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি বলিষ্ঠ চেষ্টা মাত্র। এর মূলে ছিল একটি দাবি- এমন এক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যা কৃত্রিম ধর্মনিরপেক্ষ প্রতীকের বদলে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও গণমানুষের সহজ স্বভাবের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। এই আমূল পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। হাদির উত্থান ছিল কোনো সুনির্ধারিত ছক ছাড়াই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে মূলধারার প্ল্যাটফর্মগুলোতে তিনি পদ্ধতিগতভাবে সেই বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন, যারা নৈতিকতার আবরণে শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছিল। হাদির সমালোচনা ছিল আপসহীন; তিনি কোনো তত্ত্বের আড়ালে না গিয়ে সরাসরি অপরাধীদের নাম ধরে চিহ্নিত করতেন। এটিই জনমানুষের ভেতরের চাপা ক্ষোভকে উসকে দিয়েছিল। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে হাদি হয়ে উঠেছিলেন তাদেরই না বলা কথার প্রতিধ্বনি। লোকে যা ফিসফিস করে বলত বা চেপে রাখত, হাদি তা-ই প্রকাশ্য মঞ্চে উচ্চস্বরে বলতেন। তার এই ‘বেপরোয়া সততা’ দ্বিমুখী রাজনীতিতে ক্লান্ত মানুষের কাছে চুম্বকের মতো কাজ করেছিল। হাদি কেবল সমালোচনাতেই থেমে থাকেননি। তিনি সরকারি অর্থায়নে গড়ে তোলেন ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। এটি ছিল তার বিকল্প সাংস্কৃতিক কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা। এই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট; এমন একটি বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি করা যা ইসলামী মূল্যবোধ এবং এ দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সামাজিক বোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। যারা এতদিন অভিজাত ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিকে নিজেদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা একপাক্ষিক মনে করতেন, তাদের কাছে এই কেন্দ্রটি ছিল একটি ‘ঐতিহাসিক সংশোধন’। তবে অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ কেবল সংস্কৃতির পরীক্ষাগার ছিল না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে মানুষ স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচনের দাবি তুলতে শুরু করে। হাদি দ্রুতই বুঝতে পারেন, রাজপথের সংগ্রামকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে তাকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তর করতে হবে। আর সেই ক্ষমতার চাবিকাঠি হলো জাতীয় সংসদ। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হাদিকে রাতারাতি নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়াই হাদি লড়াইয়ে নামেন এমন এক হেভিওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধে, যার পেছনে ছিল অঢেল অর্থ এবং জয়ের প্রবল সম্ভাবনা। এটি ছিল ‘দাউদ বনাম জালুত’ এর মতো এক অসম লড়াই। হাদির ভিন্নধর্মী প্রচার কৌশল প্রথাগত কোনো প্রচার কৌশল ছিল না হাদির; কৌশল না থাকাটাই ছিল তার কৌশল। তার প্রচার কৌশলে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ বিলবোর্ড বা মোটরবাইক মহড়া নয়, তার প্রচার চলত লিফলেট আর হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে। তিনি ভোটারদের সঙ্গে ফজরের নামাজ পড়তেন, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পাড়ায় পাড়ায় হাঁটতেন এবং সেই পরিচিত আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই স্বতঃস্ফূর্ত দৃশ্যগুলোকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, যা হাদিকে করে তোলে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও জনপ্রিয়।  হাদির জনপ্রিয়তার মূলে ছিল একটি দৃঢ় বিশ্বাস- তিনি দুর্নীতির ঊর্ধ্বে। দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনে যখন রাষ্ট্রযন্ত্র, আমলাতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল, তখন হাদি আবির্ভূত হয়েছিলেন তার ঠিক বিপরীত মেরু হিসেবে। তিনি কোনো বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেননি; বরং তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সাহসের। যেখানে যোগান ছিল ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাহস। ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতাদের ওপর মানুষের যে আস্থা তৈরি হয়েছিল, রাজনীতির পুরনো মারপ্যাঁচে তা কিছুটা ম্লান হতে শুরু করে। ঠিক ওই মুহূর্তেই সাধারণ মানুষের সেই হারানো বিশ্বাস আর সততার দায়ভার যেন অবলীলায় হাদির কাঁধে গিয়ে পড়ে। মজার ব্যাপার হলো, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল কারিগর বা সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়াদের কেউ ছিলেন না হাদি। কিন্তু আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন এর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। টকশোর বিতার্কিক হাদি মানুষের চিন্তার মস্তিষ্ক দখল করেছিলেন ঠিকই, একইসঙ্গে নির্বাচনি  প্রচারণার মাঠের হাদি পৌঁছে গিয়েছিলেন মানুষের হৃদয়ের গভীরে। ঠিক এ কারণেই তার মৃত্যু সংবাদে সারা দেশ এক গভীর শূন্যতা অনুভব করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, তাদের নিজস্ব বা জরুরি কিছু একটা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর পর হাদি ব্যক্তি হাদির চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছেন। তবে তিনি রাজনৈতিকভাবে কতটা শক্তিশালী হবেন, তা এখনো সময়ের হাতে। ইতিহাস সবসময় নিশ্চয়তা দেয় না। ইতোমধ্যে তার শাহাদাতকে পুঁজি করে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে। আত্মত্যাগকে রাজনৈতিক মুদ্রায় রূপান্তর করা এ দেশে নতুন কিছু নয়। তবে শোক কমে গেলেই হাদি প্রাসঙ্গিকতা হারাবেন- এমনটা ভাবলে ভুল হবে। জনগণের আবেগ জনআবেগ হয়তো অনিবার্যভাবে কমে যায়, কিন্তু যে সংগ্রামের সূচনা হাদি করেছিলেন, তা এখনো শেষ হয়নি। নিজের সাংস্কৃতিক অধিকার পুনরুদ্ধার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং অভিজাত শ্রেণির আধিপত্যকে প্রত্যাখ্যান করার যে ধারণা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার চূড়ান্ত মীমাংসা এখনো হয়নি। হাদির প্রকল্প আজও অসম্পূর্ণ। আর এই অসম্পূর্ণতাই তাকে জাতীয় মানসপটে অমর করে রাখবে। যারা মনে করছেন হাদি অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে, তারা সম্ভবত এই সময় এবং এই মানুষটি- উভয়কেই বুঝতে ভুল করছেন। লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক ও দিল্লি বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার আলজাজিরার মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত
বাংলাদেশের নির্বাচনে দৃশ্যমান হচ্ছে ‘হাদি ইফেক্ট’
বাংলাদেশে জাতীয় সরকার যে ঝুঁকি তৈরি করবে
আমরা একটি দীর্ঘ সময় পরে জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এ নিয়ে গণমানুষের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনার যেমন শেষ নেই, তেমনি নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ধরন কেমন হবে, সে বিষয়েও মানুষের মধ্যে নানা গুঞ্জন ও আলাপ দেখতে পাই। জাতীয় সরকার তেমনই একটি বিষয়। এখানে উল্লেখ্য যে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের পরে একটি জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে। আর বিএনপি তাদের মিত্র, যাদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তাদের নিয়েই সরকার গঠনের কথা বলছে। এই বিষয়গুলোর ফয়সালা বোধ করি নির্বাচনের পরেই হবে। তবে জাতীয় সরকারের বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটা যৌক্তিক, সে বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা জরুরি। কেননা এই ধারণার বিশদ বিশ্লেষণ না করে এই আলাপে যাওয়া আমাদের গণতন্ত্রের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। জাতীয় সরকার হলো ঐকমত্যভিত্তিক সরকার, যেখানে সাধারণত বিরোধী দলগুলো সরকারের অংশ হয়। ফলে সেখানে কোনো বিরোধী দল থাকে না এবং সবাই একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে। সেই জায়গা থেকে জাতীয় সরকারের ধারণা আকর্ষণীয় শোনালেও, নির্বাচনের পরে এর বাস্তবায়ন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল তার পলিআর্কি: পার্টিসিপেশন অ্যান্ড অপজিশন বইয়ে বলেন, আদর্শ গণতান্ত্রিক চর্চায় বহুদলীয় একটি ব্যবস্থা থাকা জরুরি, যেখানে নাগরিকেরা স্বাধীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিসরে অংশ নিতে পারে। কিন্তু জাতীয় সরকারের ধারণায় এ বিষয়টি ভিন্নভাবে কাজ করে, যেখানে কার্যত বহুদলীয় অংশগ্রহণ একটি একক সরকারব্যবস্থার মধ্যে আত্তীকরণ ঘটে, যা কোনোভাবেই আদর্শ একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়। আমরা যদি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় সরকারের অভিজ্ঞতাগুলো দেখি, তাহলে দেখতে পাই, গৃহযুদ্ধ, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো যখন ঝুঁকির মুখে থাকে এবং সহিংসতার পরিস্থিতিতে জাতীয় সরকার সাময়িক সময়ের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারে, কিন্তু স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে এটি জনমত ও বিরোধী রাজনীতিকে উপেক্ষা করে। এর সঙ্গে সমাজে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজন বৃদ্ধির মতো ঝুঁকিও দৃশ্যমান হয়। তাই জাতীয় সরকারকে একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেখা হয় না বরং একে দেখা হয় একটি ব্যতিক্রম হিসেবে। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় সরকার নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সবার আগে আমাদের বোঝা দরকার, জাতীয় সরকার ধারণা আদতে আমাদের জন্য কী ধরনের প্রভাব নিয়ে আসতে পারে। প্রথমেই যে বিষয়টা এখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সরকারের অংশ হলেও তাদের মধ্যে যখন নিজ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, অর্থাৎ দলীয় স্বার্থ নিয়ে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হবে, তখন জাতীয় স্বার্থসংবলিত অগ্রাধিকারগুলোর বাস্তবায়ন সমস্যাজনক হয়ে পড়বে এবং তা দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে যেতে পারে। ফলে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ ও সমস্যাজনক হয়ে পড়বে, যা কার্যত জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আবারও বিভাজনের রাজনীতি শুরু হতে পারে। তবে এখানে বড় ভয়ের বিষয় হলো যদি এই বিভাজন সমাজের মধ্যেও ছড়িয়ে যায়। তাহলে মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক দলকেন্দ্রিক বিভাজন আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের কায়েমি স্বার্থসংবলিত (ভেস্টেড ইন্টারেস্ট) বিষয়াবলি যেমন জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভাজিত করতে পারে, ঠিক তেমনই তার সমর্থকদেরও বিভাজিত করতে পারে। যে বিভাজনের চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে রাজনৈতিক সহিংসতা। এভাবে আমরা সামাজিকভাবেও আরও বিভাজিত হয়ে পড়ব। এর সঙ্গে আমাদের বিশেষভাবে ধর্মভিত্তিক বিভাজনের ঝুঁকির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, কেননা ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রচেষ্টা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে এতটাই বেড়েছে যে ভোট দেওয়াকেও কোনো কোনো গোষ্ঠী জান্নাত লাভের উপায় হিসেবে প্রচার করছে। তাই ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের প্রচেষ্টা আরও যে বৃদ্ধি পেতে পারে, সে বিষয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। এ ছাড়া জাতীয় সরকার যদি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগির কৌশল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তসম্পর্ক উন্নয়ন ও স্থিতিশীল করার একটি কৌশলী প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য যেমন মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, যা ছাড়া গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বেচ্ছাচার শাসনে রূপ নিতে পারে, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা, বিরোধী রাজনীতির অধিকার, নাগরিক অংশগ্রহণ, অবাধ নির্বাচন, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ও বিচারব্যবস্থা ইত্যাদি পরিসর আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতীয় সরকার যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠিত হয়, তাই সেখানে বিরোধী দলের কোনো ধারণা থাকে না। তাই এখানে সব রাজনৈতিক দল সরকারের অংশ হয়ে ওঠে। বিরোধী দল না থাকার ফলে একটি একপক্ষীয় সরকারের বিকাশ ঘটতে পারে, যেখানে জাতীয় সরকারের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বলয় তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়ে আধুনিক গণতন্ত্রের মৌলিক শর্তগুলোকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাই এ ধরনের বিরোধী দলহীন সরকার গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠে। বিরোধী দল যখন আর বিরোধী থাকে না, তখন রাজপথ, সংসদ ও জনপরিসরে কাউন্টার ন্যারেটিভ বা বিকল্প বয়ান দুর্বল হয় এবং ক্ষমতার বিকল্প পরিসর ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। ফলে কর্তৃত্ববাদী সরকার নামক একটি দানব তৈরি হওয়ার সুযোগ অনেক বেশি থাকে। বিরোধী দলহীন রাজনীতির কারণে জনগণের সামনেও আর কোনো বিকল্প রাজনৈতিক পাটাতন থাকে না। ফলে জনগণকে একটি রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে করে রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে তারা সরকার থেকে দূরে চলে যায়। এসব প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী ন্যায্যতা ক্ষুণ্ন হলে সরকার ও জনগণের মধ্যে তখন তৈরি হয় আস্থা, ভরসা ও বিশ্বাসের দূরত্ব। এভাবে রাষ্ট্রীয় পরিসরে জনগণের অংশগ্রহণও কমে যেতে থাকে। যে সময়ে আমরা মানুষের মধ্যে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের একটি স্পৃহা দেখতে পাই, যে গণতন্ত্রের নৈতিক পথের দিকে মানুষ তাকিয়ে আছে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে, এমন একটি সময় জাতীয় সরকারের ধারণা আমাদের যদি আরও বিভক্তির দিকে নিয়ে যায়, তা আমাদের জন্য একটি হতাশার বিষয়ই হবে। এতে করে নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে জনগণের উৎসাহ আবারও ক্ষোভে রূপান্তরিত হতে পারে। পরিশেষে তাই বলা যায়, বাংলাদেশের মতো দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার দেশে জাতীয় সরকার গঠন কোনো গণতান্ত্রিক সমাধান নয় বরং তা গণতন্ত্রকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। আমাদের জন্য এখন প্রয়োজন একটি কার্যকর সংসদ, যেখানে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের সাংগঠনিক রূপান্তর ঘটাবে। আমাদের জন্য প্রয়োজন গণতন্ত্রের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ও সংস্কারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো একটি সংসদীয় ব্যবস্থা। এতে করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে আর ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের রাজনীতি স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। এর মধ্য দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে কাম্য সংস্কারপ্রক্রিয়াকেও বেগবান করে একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক দেশ গঠনে এগিয়ে যাব। তাই বলা যায়, জাতীয় সরকার নয় বরং বাংলাদেশের জন্য অধিক প্রয়োজন অবাধ নির্বাচন, শক্তিশালী বিরোধী দল, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর সংস্কার। লেখক : অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র: প্রথম আলো
বাংলাদেশে জাতীয় সরকার যে ঝুঁকি তৈরি করবে
নগরায়ণের অন্ধকার দিক : বায়ুদূষণের ভয়াবহতা
প্রাণকেন্দ্র ঢাকা। আকাশজুড়ে ঘন ধোঁয়ার চাদর, যানবাহনের কালো বিষাক্ত ধোঁয়া, কলকারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া, নির্মাণ প্রকল্পের ধুলাবালু, যত্রতত্র বর্জ্য পোড়ানো আর অনিয়ন্ত্রিত ধূমপান— সব মিলিয়ে ঢাকাবাসীর জীবনে বায়ুদূষণ যেন নিয়মতান্ত্রিক বিষপান সমতুল্য হয়ে উঠেছে।  ঢাকায় বায়ুদূষণের প্রধান কারণ মানুষের কর্মকাণ্ড। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নিয়ন্ত্রণহীন শিল্পায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষাবিধি অমান্য করার প্রবণতা ঢাকাকে ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত করছে। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ, যা একে বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল শহরে পরিণত করেছে। এই বিপুল জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত যানবাহনব্যবস্থা ও শিল্পকারখানার বিস্তার শহরের বায়ুকে ক্রমেই বিষাক্ত করে তুলছে। ফলে বায়ুর গুণমান সূচক (একিউআই) অনুযায়ী, বিশেষ করে গত বছর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা প্রায়ই শীর্ষ তিনের মধ্যে অবস্থান করছে। তবে শীতকালে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিশেষ করে নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ঢাকার বাতাস ‘অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘বিপজ্জনক’ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। যেখানে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া মানে বিষকে নিজের অনিচ্ছাসত্ত্বেও গ্রহণ করা। অনেক সময় বায়ুদূষণের মাত্রার স্কোর এতই বেশি হয় যে, তা ২৭০-৩০০ ছুঁয়ে ফেলে, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বা ‘জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বিবেচিত হয়। শীতকালে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো ধুলাবালু, ইটভাটার ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং যানবাহনের কালো ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলে আটকে থাকা। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে দূষণ কিছুটা কমে এলেও শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। গবেষণায় দেখা যায়, এ সময়ে ঢাকার মোট বায়ুদূষণের প্রায় ৬৫ শতাংশ ঘটে থাকে। ফলে বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষের মতো ঢাকার মানুষও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি দূষিত বাতাস গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪.২ মিলিয়ন মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য বায়ুদূষণ দায়ী। বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায়ী হলো যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, কয়লা-তেল-গ্যাসসহ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধূলিকণা এবং বর্জ্য পোড়ানো। এসব উৎস থেকে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও সূক্ষ্ম ধূলিকণা বায়ুতে মিশে মানুষের ফুসফুস ও হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। এই দূষণের প্রভাব সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে। ঢাকায় শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যানসার দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, বয়স্করা হয়ে পড়ছেন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু স্বাস্থ্যই নয়, বায়ুদূষণের এই অতিমাত্রায় বৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতি ও পরিবেশকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই অবস্থায় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ অতীব জরুরি। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের হাঁটা ও সাইকেল ব্যবহার বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার কমানো, ধূমপান পরিহার, গাছ লাগানো ও বর্জ্য না পোড়ানোর মতো অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সামাজিকভাবে নাগরিক সমাজকে সোচ্চার হতে হবে। অবৈধ ইটভাটা ও কারখানার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে অংশগ্রহণ এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বিশাল। যানবাহন ও শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ, ইটভাটা আধুনিকীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, গণপরিবহন ও ইলেকট্রিক যানবাহনের প্রসার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং সবুজায়ন প্রকল্প জোরদার করা। গাছ কাটা নিরুৎসাহিত করে বন ও বনায়ন সংরক্ষণ, নিয়মিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও তার রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষিত হবে, অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়বে এবং পরিবেশ ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক ভারসাম্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোর টেকসই নীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশও পারে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সফল হতে। তবে এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রণয়ন, জরিমানা এবং কার্যকর তদারকি।  লেখক : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
নগরায়ণের অন্ধকার দিক : বায়ুদূষণের ভয়াবহতা