বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার ইস্যুটি বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ভোটের রাজনীতিতেও এর বিশেষ তাপর্য রয়েছে। তাই নির্বাচনের মৌসুমে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি আরও ব্যাপকভাবে আলোচনায় উঠে আসে।
দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কাঠামোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়; বিশেষ করে হিন্দুদের নিরাপত্তাঝুঁকি নিরসনের নিশ্চয়তা কম। তবে এ ধারণার সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে খুলনা-১ আসনের (বটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলা) সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীর।
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হয়েও কৃষ্ণ নন্দী এবার নির্বাচন করছেন ইসলাম ধর্মভিত্তিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়ে। কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো অমুসলিমকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে জামায়াত। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনার শেষ নেই।
কৃষ্ণ নন্দী মনে করেন, জামায়াত বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে দেশের হিন্দু সম্প্রদায় নিরাপদে থাকবে। এ ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরায় নিজের এমন মনোভাব তুলে ধরে একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছেন কৃষ্ণ নন্দী। সেখানে উঠে এসেছে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং এ সংক্রান্ত নানা প্রসঙ্গ। একই সঙ্গে ওই প্রতিবেদনে জামায়াতের রাজনীতি নিয়েও একেবারেই ভিন্ন একটি বয়ান সামনে এনেছেন কৃষ্ণ, যা নতুন আলোচনার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছে।

আমি কৃষ্ণ নন্দী। আমি একজন হিন্দু। একজন ব্যবসায়ী। পাশাপাশি আমি এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন মনোনিত প্রার্থী।
অনেক পাঠকের জন্যই এ বিষয়টি বিস্ময়কর মনে হলেও আমার মতে, এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের একটি বড় অংশকে বহু বছর ধরে বলা হয়ে আসছে যে, ইসলামি রাজনীতি মানেই তাদের জন্য ভয় ও অনিরাপত্তা।
আমার মনোনয়ন ঘোষণার পর দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। সাধারণভাবে মনে করা হয়, ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। এ ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতেই রাজনীতিতে আমার এ প্রচেষ্টা।
আমি বারবার আমার মানুষদের বলে আসছি জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে কোনো হিন্দুকে দেশ ছাড়তে হবে না বা কাউকে ভারতে যেতে বাধ্য করা হবে না। আমি যখন হিন্দুদের কথা বলছি, আমি বোঝাতে চাচ্ছি হিন্দুরা এই দেশেই সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করবে।
আমি ২০০৩ সালে আদর্শগত বিশ্বাস থেকে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেই। আমার অভিজ্ঞতায়, দলটিতে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। জামায়াতে ইসলামী দলটি অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনা, ভয় দেখানো বা সহিংস রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।
এগুলো কোনো বাড়িয়ে বলা কথা না। এগুলো এমন নীতিমালা, যা দলীয়ভাবে ভেতরে ভেতরে বাস্তবায়ন করা হয়। এ কারণেই সাধারণ নাগরিকসহ অনেক সংখ্যালঘুরাও এখন জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবছেন।
মানুষ ধীরে ধীরে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারাচ্ছে। এর মধ্যে এমন দলও রয়েছে, যারা একসময় গণতন্ত্রের কথা বলত, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি, সহিংসতা ও দায়মুক্তিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। নাগরিকরা শুধু কোনো কিছুর বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছেন না। তারা এমন একটি বিকল্প খুঁজছেন, যারা ন্যায়বিচার, সুশাসন ও নৈতিক দায়িত্ববোধের বিষয়ে সত্যিকার অর্থে আন্তরিক।
আলজাজিরাকে তিনি আরও জানান, অনেকের চোখে জামায়াত এখন সেই বিকল্প। খুলনা-১ আসনে দীর্ঘদিন ধরে মানুষ চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ভয়ভীতির মধ্যে জীবনযাপন করেছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা হামলা, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। অনেকেই অন্যায়ভাবে চাকরি হারিয়েছেন। বহু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে ছিল।
আমি স্পষ্টভাবে বলেছি, এসব অবিচার উপেক্ষা করা হবে না। যারা অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাবেন। কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
আমি দালালভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমি অন্যদের মাধ্যমে কোনো যোগাযোগও করি না। আমার ফোন নম্বর সবার কাছেই আছে এবং থাকবে। নির্বাচনের সময় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ হবে সরাসরি, জবাবদিহিতা থাকবে নিয়মিত এবং ধারাবাহিকভাবে।
আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টাও হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্রের কিছু ব্যক্তিও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। এ বিষয়ে আমার অবস্থান স্পষ্ট ও দৃঢ়। আমাকে চুপ করানো যাবে না বা সরিয়েও দেওয়া যাবে না। আমাদের রাজনীতিতে ভয় অনেক দিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। যদি আমরা এই ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করি, তাহলে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
আরেকটি বিষয়ে সৎভাবে কথা বলা দরকার, তা হলো ইতিহাস। আমি অস্বীকার করি না যে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেই কষ্ট শুধু কথার মাধ্যমে মুছে ফেলা যায় না। আসল প্রশ্ন হলো, কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন এসব অন্যায়কে অস্বীকার করবে নাকি তা স্বীকার করে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেখাবে।
জামায়াতে ইসলামীতে আমার উপস্থিতি ইতিহাস নতুন করে লেখার চেষ্টা নয়, বরং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি প্রয়াসমাত্র। অনেকেই প্রশ্ন করেন, জামায়াত কি শুধু মুসলমানদের জন্য? আমার উত্তর খুবই সহজ। জামায়াত মূল্যবোধের দিক থেকে একটি ইসলামি দল, তবে দায়িত্বের দিক থেকে একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল। ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবিক মর্যাদা কোনো একক ধর্মের সম্পত্তি নয়।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে সে সময়ে জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনের সদস্যরাই আমাদের সুরক্ষা দিয়েছেন এবং মন্দির ও উপাসনালয়সহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন।
ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুরক্ষা দেয়, কেবল স্লোগান দিয়ে রাষ্ট্র চালায় না। যখন কোনো পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে, জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত জনসেবামূলক নেটওয়ার্কগুলো তাদের সাহায্য করে। কোনো ধর্ম বা রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয়ে প্রশ্ন করে না। এই সেবার সংস্কৃতি থেকেই বোঝায় কেন অনেক নাগরিক জামায়াতকে কেবল স্লোগানের দল নয়, বরং শৃঙ্খলা, কাঠামো এবং দায়বদ্ধতার দল হিসেবে দেখে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্যও আমি স্পষ্ট হতে চাই। এই নির্বাচন কোনো মতাদর্শ আমদানি বা ভীতি রপ্তানি নিয়ে নয়। এটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য।
বাংলাদেশে এমন একটি সমাজ বর্তমান, যেখানে বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় বৈচিত্র্য আছে। যদি যে কোনো রাজনৈতিক দল এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে তাহলে তারা টেকসইভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। আমার মনোনয়ন শুধু একটি আসন জয় করার জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন প্রেক্ষাপট শুরু করার জন্য। এমন প্রেক্ষাপট যা ভয়, সাম্প্রদায়িক সন্দেহ এবং পরিচয় নিয়ে বিভাজনের ধারণার বাইরে গড়ে উঠবে।
আমি একজন হিন্দু প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছি এই বিশ্বাস থেকে যে, জামায়াতে ইসলামী দলটির নীতিমালা সবার জন্য আরও নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক হতে পারে। এই দেশ কারও একার নয়, এই দেশ আমাদের সবার।
মন্তব্য করুন








