জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এই বাহিনীগুলোর ওপর জাতির প্রত্যাশা এবার অনেক বেশি। দৈনিক বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—‘সেনাবাহিনীর পেশাদারত্বের ওপরই গণতন্ত্রের উত্তরণ’ (৮ ফেব্রুয়ারি)। এটি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি অ্যাসিড টেস্ট বলা যেতে পারে। পরম আস্থায় সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের জনগণ। এটি সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের অসামান্য সুযোগ বটে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জন্মলগ্ন থেকেই নিজস্ব পেশাগত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় নিয়োজিত হয়ে আসছে। এ সহায়তার একটি অন্যতম ক্ষেত্র হলো স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান। স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় ইন-এইড টু সিভিল পাওয়ার-এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়ে থাকে।
সাংবিধানিক অনুমোদন
বাংলাদেশের সংবিধান মোতাবেক যে কোনো নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন মূলত নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত। তবে সেনাবাহিনী সর্বদা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির সচিবালয় বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ) থেকে লিখিত নির্দেশনা পাপ্তির পর প্রয়োজনীয়সংখ্যক সেনা মোতায়েন করে থাকে। স্বাধীনতা লাভের পর বিগত ৫৪ বছরে ১২টি জাতীয় ও আনুমানিক ১০টি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন হয়েছিল। নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনী মোতায়েন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্বে সেনাবাহিনী-পাকিস্তান পর্ব
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক (পাকিস্তানের) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই অঞ্চলে নিয়োজিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটসহ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট নির্বাচনের সময় দায়িত্বপালন করেছিল। এ প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক লিখেছেন, ‘১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা সহায়তা প্রদানমূলক কর্তব্য পালনের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। আমার দায়িত্বপূর্ণ (২য় ইস্ট বেঙ্গল) এলাকা ছিল বর্তমান শেরপুর জেলার যেটা তৎকালীন জামালপুর মহকুমার অংশ ছিল’ (সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ ও অন্যান্য, ২০১৫)। ২৯ ক্যাভালরি ইউনিটের (রংপুর সেনানিবাস) অফিসার হিসেবে মেজর নাসির উদ্দিন তৎকালীন বৃহত্তর রংপুরের কুড়িগ্রাম মহকুমায় নির্বাচনকালীন দায়িত্বপালন করেছিলেন (যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা, ১৯৯২)।
নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব-বাংলাদেশ পর্ব
বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বচান অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ। একটি নতুন স্বাধীন দেশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক অবকাঠামো তখনও মজবুত হয়ে উঠতে পারেনি। এমতাবস্থায় তৎকালীন সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনী নিয়োগ করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেনাবাহিনীর নির্বাচনবিষয়ক দায়িত্বপালন-নামিবিয়া থেকে সাউথ সুদান
১৯৮৯ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৯০ সালের মার্চ পর্যন্ত আফ্রিকার নামিবিয়াতে শান্তি মিশন (আনট্যাগ) পরিচালিত হয়। এটি ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় মিশন এবং বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম মিশন। এখানে ১৯৮৯ এর নভেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা অর্থাৎ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেন। পুলিশ কর্মকর্তা এন কে এন ইসলাম তার গ্রন্থ ‘আমার দেখা নামিবিয়া’তে (১৯৯১)’ নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্বপালনের অভিজ্ঞতার কথা চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।
কম্বোডিয়ায় ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশের শান্তিসেনা
১৯৯২-১৯৯৩ সালে কম্বোডিয়ার শান্তি মিশনে, (আনটাক) একপর্যায়ে দেশটির পরিস্থিতি মারাত্মক সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব কি না সেটা নিয়ে জাতিসংঘও দ্বিধায় পড়েছিল। এই সংকটকালে লে. কর্নেল খোন্দকার কামালুজ্জামানের (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ান (৩য় ইস্ট বেঙ্গল) দায়িত্বপূর্ণ প্রদেশে অত্যন্ত সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এমন উদাহরণ অন্যান্য দেশের শান্তিরক্ষীদের অনুপ্রাণিত করে। পাল্টে যায় সমগ্র দৃশ্যপট। খেমাররুজ দলের ব্যাপক সহিংসতার মুখেও সিয়ামরিপ প্রদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গৃহযুদ্ধ থেকে শান্তির পথে এগিয়ে যায় কম্বোডিয়া।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের এই সাহসী ভূমিকা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল। কম্বোডিয়ায় নির্বাচনের দিনে (মে, ১৯৯৩) দুর্ধর্ষ খেমাররুজ বাহিনী বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার একটি নির্বাচন কেন্দ্রে আক্রমণ করে। তবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা সেই আক্রমণ প্রতিহত করে। তবে একপর্যায়ে কমিউনিস্ট খেমাররুজ বাহিনীর রকেট লঞ্চারের আঘাতে চৌকস বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তা মেজর তামিম আহম্মেদ চৌধুরী (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) মারাত্মকভাবে আহত হন।
একজন শান্তিরক্ষী হিসেবে (সামরিক পর্যবেক্ষক) এই নিবন্ধকার কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেসব ঘটনার কিছু বিবরণ লেখার (কম্বোডিয়া: শান্তিসেনার জার্নাল) তার সুযোগ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সিয়েরালিওন, লাইবেরিয়া, আইভরি কোস্ট, দক্ষিণ সুদানসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে নিরাপত্তা সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশের শান্তিরক্ষিরা অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচন পরিচালনা
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও বিশেষত শান্তি বাহিনী/সন্ত্রাসী প্রভাবিত এলাকায় নির্বাচনে নিরাপত্তা প্রদান করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বিষয়। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত শান্তি বাহিনীর আক্রমণ ও হুমকির মুখেও সেনাবাহিনীসহ পাহাড়ে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ সহায়তায় সরকার সেখানে নির্বাচন পরিচালনা করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচনকালে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ১৯৭৭ সালের মে মাসে গণভোটের দিন রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী এলাকায় (বাঙালহালিয়া) একটি সেনা টহলের ওপর শান্তি বাহিনী একটি ভয়ংকর এমবুস পরিচালনা করে। এতে ১৭ জন সৈনিক নিহত হন।
১৯৮৬ সালের ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের সময় আমাদের ইউনিট (২৫ ইস্ট বেঙ্গল) রাঙামাটি জেলার দক্ষিণে বিলাইছড়ি-ফারুয়া অঞ্চলে নিয়োজিত ছিল। তখন পাহাড়ে শান্তি বাহিনীর বিদ্রোহ বা ইন্সারজেন্সির বসন্ত। সেই অশান্ত পরিবেশে আমাদের নির্বাচনকালীন দায়িত্বপালন করতে হয়েছিল। সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বি কে দেওয়ান (পরবর্তী সময়ে প্রতিমন্ত্রী) এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৮৯ সালের ২৫ জুন প্রথমবারের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলাতেই একযোগে স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পাহাড়ের এই আলোচিত নির্বাচনে সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক নিরাপত্তা-সহায়তা প্রদান করে। শান্তিচুক্তির (১৯৯৭) পরও পাহাড়ে শান্তি ফেরেনি। শান্তি বাহিনীর মতো শক্তিশালী না হলেও বর্তমানে প্রায় ৫টি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী কমবেশি সক্রিয় রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ উপজেলা নির্বাচনকালে, রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ৭ জন নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যক্তি নিহত হয়।
নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রথাগত ভূমিকা
বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনী সাধারণত ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্বপালন করে। তাদের মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, সংঘর্ষ, নাশকতা কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। এসব পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী দ্রুত মোতায়েন হয়ে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সক্ষম।
দ্বিতীয়ত, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ভোটারদের আস্থা ও সাহস জোগায়, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ বা স্পর্শকাতর এলাকায়।
তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা প্রদান। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় সেনাবাহিনী চলাফেরা করে এবং প্রয়োজনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে সহায়তা করে।
চতুর্থত, অস্ত্র ও সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমে সহায়তা। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী তৎপরতা দমন এবং বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা অনস্বীকার্য।
অন্যান্য বাহিনীর ভূমিকা
সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও র্যাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ রোধে সক্রিয় থাকে। উপকূলীয় ও নদীঘেঁষা এলাকায় কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। প্রয়োজনে বিমানবাহিনী লজিস্টিক ও জরুরি সহায়তা প্রদান করে।
সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর সামনে চ্যালেঞ্জসমূহ
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
প্রথমত, নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত পরিবেশে সেনাবাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পেশাদার অবস্থান ধরে রাখা। যে কোনো পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও উত্তেজনা। তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন মাঠপর্যায়ে সেনাসদস্যদের জন্য কাজ কঠিন করে তুলতে পারে।
তৃতীয়ত, গুজব ও অপপ্রচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ঘিরে ভুয়া তথ্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
চতুর্থত, আইনি সীমাবদ্ধতা ও মানবাধিকার প্রশ্ন। দায়িত্বপালনের সময় বলপ্রয়োগ যেন আইনসম্মত ও মানবাধিকারসম্মত হয়—এ বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সতর্কতার দাবি রাখে।
এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতি
এরই মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে সশস্ত্র বাহিনী আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা নিতে প্রস্তুত হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও বারবার বলা হচ্ছে সংঘাত এড়িয়ে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনে তারা বদ্ধপরিকর। এরই মধ্যে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অনেক দিন পর সেনাবাহিনীকে পুনরায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেসির ক্ষমতা থাকায় সেনাবাহিনীর কার্যক্রম অধিকতর কার্যকর হবে।
এবার বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ড ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩, চৌকিদার-দফাদারের ৪৫ হাজার ৮২০ জন সদস্য মোতায়েন করা হবে।
নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করতে হবে-সেনাপ্রধান
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা জোরদারের নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেছেন, দায়িত্বপালনকালে পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত সেনাবাহিনী দায়িত্বপালন করবে
‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে গুলিস্তানের রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সেনাসদর। সেখানে সেনাসদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয়, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে সশস্ত্র বাহিনী। অতীতের নির্বাচনগুলোতে এ দায়িত্ব ছিল না। এ কারণে এবারের নির্বাচনে এক লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪২ হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন থাকতেন।
মনজুর হোসেন বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাচন-সংক্রান্ত পরিপত্রে সশস্ত্র বাহিনীকে ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা আগে ছিল না। অতীতে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দূরে অবস্থান করা হলেও এবার প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি দায়িত্বপালন করা হবে।
সেনাপ্রধান নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ে দুটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এক, অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস। দুই, সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচনের প্রতি আস্থা তৈরি।
দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে নির্বাচনি সরঞ্জাম ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের পরিবহনে সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত থাকবে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন বলেন, দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে আগেই হেলিকপ্টার মোতায়েন থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যকে বড় হুমকি উল্লেখ করে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান এই সেনা কর্মকর্তা।
আলজাজিরা পত্রিকা—বাংলাদেশের নির্বাচনে এখনও নেপথ্যের শক্তি কি সেনাবাহিনী?
২৯ জানুয়ারি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রভাব ও ভূমিকা নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ‘সেনাবাহিনী বর্তমানে জনশৃঙ্খলার সবচেয়ে দৃশ্যমান গ্যারান্টার হিসাবে ভোটের পরিবেশ কেন্দ্রে চলে এসেছে।’
রাওয়া সেমিনারে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা
গত ৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে রাওয়া’র থিংক ট্যাঙ্ক ‘রাওয়া রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডি ফোরাম’ (আরআরএসএফ) ‘নির্বাচন ২০২৬’: জাতীয় ঐক্য ও প্রত্যাশা শীর্ষক এক সেমিনার আয়োজন করে। নির্বাচন ঘিরে অস্থিরতা তৈরিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করে মেজর নিয়াজ আহমেদ জাবের (অব.) বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ব্যর্থ হওয়া মানে জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জনকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করা।’
লে. কর্নেল আবু ইউসুফ জোবায়ের উল্লাহ (অব.) আগামীর বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, ‘আমাদের জন্য আজ প্রয়োজন একদল সৎ ও সাহসী মানুষের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের।’ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গণি (অব.) ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের বদলে জনস্বার্থ রক্ষায় যোগ্য, সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘এখন ভোট রক্ষা করার অর্থ কেবল নির্বাচনে জয়ী হওয়া নয়, বরং রাষ্ট্রকে রক্ষা করা।’
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘একটি প্রতিবেশী দেশ আমাদের নির্বাচন ভন্ডুল করতে এবং এখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। অস্থিরতা তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। তাই সামনে চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ কর্নেল হারুন-অর-রশীদ খানের (অব.) সভাপতিত্বে সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন লে. কর্নেল মোদাসসের হোসেন, বীর প্রতীক (অব.) ও লে. জেনারেল আমিনুল করিম (অব.) প্রমুখ।
বিগত ৩টি নির্বাচন ও সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ৩টি নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ আছে যে, আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা মোতায়েন থাকলেও সেসব নির্বাচনে কোথাও কোথাও অনিয়মের দৃশ্যমান অভিযোগ উঠলেও সেই সময় তাদের ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয়। এবারের নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক বাহিনীটির জন্য একধরনের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচনের মাঠে যদি সেনাবাহিনী সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ থেকে ভোটার, প্রার্থী ও এজেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, কেন্দ্রভিত্তিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি অনিয়ম-সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়, তাহলে নির্বাচনে অতীতের বিতর্ককে ছাপিয়ে পেশাদারত্বের একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী আমলের গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তাতে এবারের নির্বাচন সেনাবাহিনীর জন্য কেবল দায়িত্বপালন নয় বরং পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা দৃশ্যমানভাবে প্রমাণ করার বড় সুযোগ। যার মধ্যে দিয়ে গত কয়েক বছরের বিতর্ক ও আস্থার ঘাটতি কাটিয়ে সেনাবাহিনী নিজেদের ভূমিকা ও ভাবমূর্তি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারবেন।
সশস্ত্র বাহিনীকে যেসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে
বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পেশাদারত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে আসছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাদের ভূমিকা হবে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। একই সঙ্গে নিরপেক্ষতা, সংযম ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখাই হবে এই বাহিনীগুলোর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আসন্ন নির্বাচন এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর, পারস্পরিক অবিশ্বাস প্রবল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচারের বিস্তার উদ্বেগজনক। এই বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, সংযম ও নিরপেক্ষ আচরণই হতে পারে উত্তেজনা প্রশমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়—তাদের আচরণ যদি দায়িত্বশীল না হয়, তবে কোনো বাহিনীর পক্ষেই নির্বাচনকে পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ রাখা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক মহলও এই নির্বাচন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করবে। সে ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে যে, বাংলাদেশ গণতন্ত্র রক্ষায় প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম।
শেষের কথা
সবশেষে বলা যায়, আসন্ন নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা হবে আস্থা ও দায়িত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই হবে সশস্ত্র বাহিনীর সবচেয়ে বড় সাফল্য। সেই সাফল্যের মধ্য দিয়েই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আরও দৃঢ় হতে পারে। এই দায়িত্বে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক
মন্তব্য করুন








