ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য ১ হাজার ৫১ কর্মকর্তাকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মকর্তার মধ্যে এমন দুই শতাধিক কর্মকর্তা রয়েছেন যারা শেখ হাসিনার আমলের ‘রাতের ভোট’ (২০১৮) ও ‘আমি-ডামি নির্বাচনে’ (২০২৪) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-সচিবদের পিএস-এপিএস হিসেবে দায়িত্বপালনকারী, ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এবং আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একাধিক কর্মকর্তাও রয়েছেন তালিকায়।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমন অন্তত ১৮ জনের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হয়েছে এশিয়া পোস্ট। প্রজ্ঞাপনে নাম থাকা অন্তত পাঁচ কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু চাকরিজনিত নিরাপত্তার জন্য তারা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি স্বীকার করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী। তার দাবি, লোকবলের অভাবে অভিযুক্তদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এশিয়া পোস্টকে এই যুগ্ম সচিব বলেন, ‘আমরা প্রায় ১ হাজার জনের মতো তালিকা দিয়েছি। সাধারণত সহকারী সচিব থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এই দায়িত্বপালন করেন। নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের বলা হয়েছে, প্রতি আসনে ১০ জন করে ম্যাজিস্ট্রেট দিতে। অর্থাৎ ৩০০ আসনে আমাদের তিন হাজার ম্যাজিস্ট্রেট লাগবে। কিন্তু এই পদমর্যাদার মোট অফিসারই আছেন আমাদের দুই থেকে আড়াই হাজারের মতো। এর মধ্যে ১ হাজার ১০০ জন ইতোমধ্যে মাঠে রয়েছেন। ফলে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা মেটাতে আমাদের আরও ২ হাজার অফিসার দরকার ছিল। কিন্তু আমরা সব খুঁজেও ১ হাজার ২০০ জনের বেশি অফিসার পাইনি। ফলে উপায় না পেয়ে নিয়োগ দিতে হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এমন ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারছেন না রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল নেতারা। হাসিনা আমলের ভোটের কারিগররা এবারও নির্বাচনি দায়িত্বে থাকলে বিষয়টি আশঙ্কাজনক বলে মনে করেন তারা। এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের যে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে নির্বাচনি কাজে সহায়তার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি কোনো পক্ষপাতদুষ্ট বা ফ্যাসিবাদী দলের দোসরদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সে নির্বাচন কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। যারা টানা ১৭ বছর ধরে জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে এবং পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে, তাদেরই যদি আসন্ন নির্বাচনে দায়িত্বপালনের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে জনগণ তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
গত ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগ আমলের তিন নির্বাচনে দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তাদের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্বে না রাখতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানায় বিএনপি।
এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবির মুখে আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত তিন নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে অনুযায়ী গত বছরের শুরুতে ৪৫ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। তারা ২০১৮ সালের নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ছিলেন। এ ছাড়া বিতর্কিত নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের মধ্যে চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর হওয়া ২২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় এবং ২৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় ২৫ জনকে করা হয় ওএসডি।
গত ১২ অক্টোবরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ঘোষণা দেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্বপালনকারীদের ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিরত রাখা হবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও জানিয়েছিলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিগত তিন নির্বাচনে ডিসি (জেলা প্রশাসক), এডিসি (অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক) ও ইউএনওসহ (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) যারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন তাদের মাঠপর্যায়ে পদায়ন করা হবে না।
প্রেস সচিব আরও বলেন, রিটার্নিং অফিসার, পোলিং বা অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার হোন, তিন নির্বাচনে তাদের যদি ন্যূনতম ভূমিকাও থাকে, তারা যাতে নতুন করে দায়িত্ব না পায় সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। তবে মঙ্গলবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে সরকারের এমন ঘোষণার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বিচারিক ক্ষমতা পেলেন যে বিতর্কিত কর্মকর্তারা
প্রাথমিকভাবে যাচাই করে এশিয়া পোস্ট বিতর্কিত যে ১৮ কর্মকর্তার বিস্তারিত তথ্য এবং আগের নির্বাচনের ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছে তাদের বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-
* প্রজ্ঞাপনের ৫১ নম্বরে রয়েছে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) উপপরিচালক ফয়সাল হকের নাম। তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব কেএম আলী আজমের সাবেক একান্ত সচিব (পিএস) এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে গাজীপুর সদরে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন।
* ২১৭ নম্বরে থাকা দিপন দেবনাথ সাবেক মুখ্যসচিব এবং শেখ হাসিনার উপদেষ্টা কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর একান্ত সচিব ছিলেন।
* সাবেক সচিব আবদুল মালেকের সাবেক পিএস ফেরদৌস ওয়াহিদের নাম আছে ৩০৯ নম্বরে। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে কোটালীপাড়ার সহকারী রিটার্নিং অফিসার ছিলেন। ছাত্রজীবনে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ করতেন ফেরদৌস।
* ৫ আগস্ট থেকে পলাতক সাবেক মুখ্যসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সাবেক একান্ত সচিব সায়েদুল আরেফিনের নাম আছে প্রজ্ঞাপনে ৪০১ নম্বরে।
* প্রজ্ঞাপনে ৪৯২ নম্বরে রয়েছেন পিন্টু বেপারী। তিনি নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত সচিব হেলাল উদ্দীন আহমেদের পিএস ছিলেন। পিন্টুকে এর আগে ভোলা জেলা পরিষদে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।

* ৪৯৮ নম্বরে থাকা বারিউল করিম খান হাসিনার আমলে জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর একান্ত সচিব ছিলেন।
* ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কামরুল হাসান সোহেল আছেন ৫১১ নম্বরে। ৩৪ বিসিএস ব্যাচের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোহেল আওয়ামী লীগ আমলে নিজের প্রভাব বাড়াতে সরকারি চাকরি করেও শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বই লিখেছিলেন।
* আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের একান্ত সচিব তৌহিদ এলাহীর নাম রয়েছে ৫৩১ নম্বরে।
* ৫৬৮ নম্বরে থাকা নাহিয়ান আহমেদ ছিলেন সালমান এফ রহমানের এপিএস।
* ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরীর (বর্তমানে ওএসডি) আপন ছোট ভাই জিয়াউল ইসলাম চৌধুরীর নাম রয়েছে ৫৮৪ নম্বরে।
* ৬০৬ নম্বরে থাকা পারভেজুর রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ৩০ বিসিএস ব্যাচের সাবেক সভাপতি। সাভার উপজেলার সাবেক এই ইউএনও ২০১৮ সালের নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন টাঙ্গাইল সদরে।

* আওয়ামী লীগের পলাতক মাহবুবুল আলম হানিফের আত্মীয় এবং কুষ্টিয়ার প্রভাবশালী আওয়ামী পরিবারের সদস্য রিফাত ফেরদৌস রয়েছেন প্রজ্ঞাপনের ৬০৯ নম্বরে।
* ৬১২ নম্বরে থাকা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষ নেতা। ৩৩ বিসিএস ব্যাচের সাবেক সভাপতি। ২০২৪ সালের নির্বাচনের গাজীপুরের কালিয়াকৈর আসনে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন।
* ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং ৩৫ বিসিএস ব্যাচের সাবেক সভাপতি ৭৮৮ নম্বরে থাকা মো. আদনান চৌধুরী।
* ১০১৫ নম্বরে আছেন মো. আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষ নেতা। ৩৪ বিসিএস ব্যাচের সাবেক সভাপতি এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় সহকারী রিটার্নিং অফিসার ছিলেন।

* সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের একান্ত সচিব ছিলেন প্রজ্ঞাপনের ১০৩৪ নম্বর সিরিয়ালে থাকা আবদুল কাদির মিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতাকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে নিজ জেলা মেহেরপুরে বদলি করেন ফরহাদ হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনে ভূমিকার জন্য পুরস্কার হিসেবে পরবর্তী সময়ে কাদিরকে একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন ফরহাদ।
* তালিকার ৭০৩ নম্বরে থাকা মো. মতিউর রহমান বুয়েট ছাত্রলীগ করতেন। চাকরি জীবনে তিনি সালমান এফ রহমানের এপিএস এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে নবাবগঞ্জ উপজেলার সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন।
মন্তব্য করুন








