ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে ভোটের আগে ভোটারদের সিদ্ধান্ত ভয়াবহ মাত্রার বিভ্রান্তির মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত থেকে ছড়িয়ে পড়া সমন্বিত ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার নির্বাচনের পরিবেশকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে সতর্ক করছেন তারা। এএফপির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মুসলিম-অধ্যুষিত বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। ২০২৪ সালের ছাত্রদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চব্বিশের আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে যান। সেখানে তিনি হিন্দু-জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকারের আশ্রয়ে রয়েছেন।
নির্বাচন সামনে রেখে অনলাইনে ভুয়া তথ্যের প্রবাহ বেড়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, তা ঠেকাতে আলাদা একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করতে হয়েছে সরকারকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্কের কাছে সহায়তা চেয়ে বলেন, নির্বাচন ঘিরে ‘ভুল তথ্যের বন্যা’ বইছে। তার ভাষায়, এই অপপ্রচার বিদেশি ও স্থানীয়—দুই দিক থেকেই আসছে।
এই ভুয়া প্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের দাবি। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অমুসলিম, যাদের বড় অংশ হিন্দু।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হিন্দু গণহত্যা’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে দাবি করা হচ্ছে, দেশে হিন্দুদের ওপর ‘পরিকল্পিত’ হামলা চলছে। কিন্তু জানুয়ারিতে প্রকাশিত পুলিশের আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ঘিরে সংঘটিত ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশকে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সমন্বিত ভারতীয় অপপ্রচার
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেইট জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে ‘হিন্দু গণহত্যা’ দাবি করে ৭ লাখের বেশি পোস্ট ছড়ানো হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার অ্যাকাউন্ট থেকে এসব পোস্ট করা হয়েছে।
সংস্থাটির প্রধান রাকিব নায়েক বলেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতার মিথ্যা অভিযোগ তুলে পরিকল্পিতভাবে ভারত থেকে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এসব কনটেন্টের ৯০ শতাংশের বেশি ভারতের উৎস থেকে এসেছে। বাকিগুলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাভিত্তিক হিন্দু-জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
এএফপি ফ্যাক্ট চেক টিমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া শত শত এআইয়ের তৈরি ভিডিওর খুব কম সংখ্যকই এআই কনটেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব ভিডিওর মধ্যে রয়েছে—এক হাত হারানো এক নারীকে দিয়ে বিএনপিকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানানো কিংবা হিন্দুদের জামায়াতে ইসলামিকে ভোট দিতে বাধ্য করার মতো সম্পূর্ণ সাজানো ও ভিত্তিহীন বার্তা।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনীতি দমন ও ভিন্নমত স্তব্ধ করে রাখার ফলে সমাজে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এই ভুয়া তথ্যের ঢেউ সেটিকে আরও তীব্র করেছে।
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডিজিটালি রাইটের প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন ভুয়া তথ্যের পরিমাণ অনেক বেশি। সহজলভ্য এআই টুলের কারণে উন্নত মানের ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করা এখন খুবই সহজ।
এমনকি কিছু এআই তৈরি ভিডিওতে বাংলাদেশের মানুষকে শেখ হাসিনার প্রশংসা করতেও দেখা যাচ্ছে, যিনি বর্তমানে পলাতক ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। এর প্রভাব শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভারতীয় হিন্দু উগ্রপন্থিদের ক্ষোভের জেরে দেশটির ঘরোয়া ক্রিকেট লিগ আইপিএল থেকে একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটারের চুক্তি বাতিল করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল চলতি মাসে ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকেও নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, অপপ্রচারের বড় অংশ ভারত থেকে এলেও, এর সঙ্গে সরাসরি ভারত সরকারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য দাবি করেছে, তারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর ‘হামলার উদ্বেগজনক ধারা’ লক্ষ করছে। পাশাপাশি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে নিজেদের অবস্থানও জানিয়েছে।
বড় হুমকি
এদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা মেটার সঙ্গে সমন্বয় করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করেছে।
নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র মো. রুহুল আমিন মল্লিক এএফপিকে বলেন, ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটার সঙ্গে সমন্বয় করা কাজ চলছে। ক্ষতিকর বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত হলেই তা ভুয়া তথ্য হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। তবে অনলাইনে কনটেন্টের বিপুল চাপ সামাল দেওয়া যে অত্যন্ত কঠিন, সেটিও তিনি স্বীকার করেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক ইসি কর্মকর্তা জেসমিন তুলির মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করছে। এটি বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য একটি বড় হুমকি। কারণ তথ্য যাচাই করার জন্য মানুষের তেমন সচেতনতা নেই। এআই-জেনারেটেড ভুয়া তথ্যের কারণে ভোটাররা তাদের সিদ্ধান্ত নিতে ভুল পথে যেতে পারেন।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শহরের ৮০ শতাংশের বেশি এবং গ্রামের প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবারে স্মার্টফোন রয়েছে, কিন্তু তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা এখনও অনেকের নেই। তার ভাষায়, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া দৃশ্য ভোটারদের সিদ্ধান্তকে মারাত্মকভাবে বিভ্রান্ত করতে পারে—যা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি।
মন্তব্য করুন








