ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশের জন্য কমপক্ষে ৪০ হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরা (বডিক্যাম) সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। প্রতিটি নির্বাচনি কেন্দ্রে ভোট সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নজরদারির জন্য এ ক্যামেরা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, বডি ক্যামেরা দ্রুত কেনার জন্য জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউএনডিপির মাধ্যমে কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হয়নি। পরে স্থানীয় কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে ৪০ হাজারের জায়গায় ২৫ হাজার ৭০০ বডিক্যাম কেনা হয়েছে। এই সংখ্যক ক্যামেরা দিয়ে সর্বোচ্চ ১৮ হাজারের মতো কেন্দ্রে নজরদারি করা যাবে।
বডি ক্যামেরা সরবরাহকারীদের মধ্যে রয়েছে ‘স্মার্ট টেকনোলজিস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক আওয়ামী লীগের মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের মেয়ে নাফিসা কামাল। বিতর্কিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদও আছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায়। স্মার্ট টেকনোলজিস ছাড়াও আরও চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বডিক্যাম সরবরাহকারীর তালিকায়। তারা হলো- দাহুয়া, টিডিটেক, কেডাকম ও অকজন। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ক্যামেরা নেওয়ার বিষয়ে ইতিপূর্বে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। জানা গেছে, ২৫ হাজার ৭০০ বডিক্যামের মধ্যে ১০ হাজার ক্যামেরা সরবরাহ করেছে ‘সিল্কওয়েস কার্ড অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে এরই মধ্যে পাঁচ মহানগর (মেট্রোপলিটন) ও ৩৮ জেলা ও ৬০৪ থানা পুলিশের কাছে নির্বাচনি বডিক্যাম সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে।
এই প্রতিষ্ঠানের মালিক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক এবং চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি। এবারের নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে চাঁদপুর-৩ আসন (সদর ও হাইমচর) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শেখ ফরিদ।

সিল্কওয়েস কার্ড অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেডের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিএনপি নেতা শেখ ফরিদ এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার স্ত্রী মুনিরা আহমেদ আছেন চেয়ারম্যান পদে।

শেখ ফরিদ আহমেদের নির্বাচনি হলফনামায় স্ত্রী হিসেবে মুনিরা আহমেদের নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে হলফনামায় সম্পদের বিরণে বন্ড, ঋণপত্র, স্টক একচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির শেয়ার রয়েছে বলে উল্লেখ থাকলেও সিল্কওয়েস কার্ড অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেডের নাম উল্লেখ করে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথিপত্র থেকে জানা গেছে, সিল্কওয়েসের মাধ্যমে এরই মধ্যে পাঁচ মহানগরে পুলিশের জন্য ৫১১টি বডিক্যাম সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১০৪, রাজশাহীতে ১১৬, বরিশালে ৮৩, সিলেটে ১৩৪ ও রংপুরে ৭৪টি ক্যামেরা পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া ৩৮ জেলা ও ৬০৪টি থানার জন্য সিল্কওয়েস কার্ড অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড সরবরাহ করেছে আরও ৯ হাজার ৪৮৯ বডি ক্যামেরা। এর মধ্যে রয়েছে, রাজশাহী রেঞ্জের জয়পুরহাটে ২৮, বগুড়ায় ৩১০, চাপাইনবাবগঞ্জে ২৬৪, নওগাঁয় ২৫৫, রাজশাহীতে ৪৩, নাটোরে ৫০, সিরাজগঞ্জে ১১৭ ও পাবনায় ১৯১টি বডিক্যাম সরবরাহ করেছে সিল্কওয়েস। প্রতিষ্ঠানটি খুলনা রেঞ্জে পুলিশের জন্য ক্যামেরা পাঠিয়েছে মেহেরপুরে ৭৬, কুষ্টিয়ায় ২৮৭, চুয়াডাঙ্গায় ৬৯, যশোরে ২২৬, মাগুরায় ১৪৯, নড়াইলে ১৪৪, বাগেরহাটে ২২৩ ও সাতক্ষীরায় ১২০টি। বরিশাল রেঞ্জে সিল্কওয়েস বডি ওর্ন ক্যামেরা সরবরাহ করেছে বরগুনায় ১১৩, পটুয়াখালীতে ২৪৯, ভোলায় ২১৭, বরিশালে ১৪৩, ঝালকাঠিতে ৩৬ ও পিরোজপুরে ১৩২টি। ময়মনসিংহ রেঞ্জের জামালপুরে ১৯৬, শেরপুরে ৯১ ও নেত্রকোনায় ২৬৬টি ক্যামেরা গেছে সিল্কওয়েসের মাধ্যমে। সিলেট রেঞ্জের সুনামগঞ্জে ২০৯ ও হবিগঞ্জে ২৩২টি ক্যামেরা পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া চট্টগ্রাম রেঞ্জের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪৮২, কুমিল্লায় ৮৫১, চাঁদপুরে ২২৯, ফেনীতে ২৪৭,নোয়াখালীতে ৭৫, লক্ষ্মীপুরে ১৯৮, চট্টগ্রামে ৫৩০, কক্সবাজারে ২৯৬, খাগড়াছড়িতে ১৩৮, রাঙামাটিতে ১৬৯ ও বান্দরবানে ১৪৬টি।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বডি ওর্ন ক্যামেরা অনলাইন ও অফলাইন; দুই ধরনের হয়। অনলাইনের জন্য ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড থাকে। এই আইডি-পাসওয়ার্ড ক্যামেরা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি করে দেওয়া হলে সেসব তথ্য তাদের ডাটাবেজেও থাকতে পারে, যা কাজে লাগিয়ে ওইসব প্রতিষ্ঠান চাইলে ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে। সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুলিশের কাছে থাকলেও সার্ভিস দেওয়ার জন্য সরবরাহকারীদের কাছে আংশিক নিয়ন্ত্রণ থাকা স্বাভাবিক।
এ নিয়ে কথা হয় তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরার ফুটেজের সঙ্গে কোনো ক্লাউড সার্ভারের সংযোগ নেই। ফুটেজ ক্যামেরা থেকে পুলিশের একটা সার্ভারে যাবে। তবে সেই সার্ভারে ক্যামেরা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রিত এক্সেস থাকতে পারে। এটা করা হয় অপারেশনকে নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য। অপারেশনের কোনো পর্যায়ে কারিগরি ত্রুটি বা অন্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে এর সমাধান করা লাগতে পারে। এ জন্যই নিয়ন্ত্রিত এক্সেস দেওয়া হতে পারে।

তবে ক্যামেরার সার্ভারে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের এক্সেস নিয়ে খুব বেশি আশঙ্কার কিছু নেই বলে মনে করেন তানভীর হাসান জোহা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধরুন, আমাদের বাসা-বাড়িতে যারা সহায়ক হিসেবে কাজ করেন, তাদেরকে তো আমাদের বাসার এক্সেস দেই, মানে বাসায় প্রবেশ করতে দেই। বিষয়টা সে রকম। তবে আমার আশঙ্কা এটা যে, নেতিবাচক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কেউ এই সার্ভারে ডিডস অ্যাটাক করে সার্ভার ডাউন করে ফেলতে পারে।
জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ পুলিশের কাছেই থাকবে। সার্ভার ডাটাবেজ আমাদের নিজস্ব। তবে জরুরি সার্ভিস দরকার হলে যেন দিতে পারে সে জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের টেকনিক্যাল লোকেরা আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
এর আগে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাব্বির সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুলিশদের শরীরে লাগানো থাকে বডি ক্যামেরা। পুলিশ কাউকে নিপীড়ন করছে কি না, অনেক সময় তারা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে কি না দেখতে, সেক্ষেত্রে তাদের বাঁচানোর জন্যও এটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বডি ক্যামেরায় যেসব ভিডিও ও অডিও যুক্ত থাকে সেটি তাৎক্ষণিকভাবে কন্ট্রোল সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়। কন্ট্রোল সেন্টার থেকে তারা দেখতে পারে এই ক্যামেরা যার কাছে থাকে সেই জায়গার পরিস্থিতি কেমন।

মন্তব্য করুন








