সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অর্জন মোটেও কম নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই জোট-নির্ভর দল হিসেবে পরিচিত জামায়াত এবার নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছে। এককভাবে ৬৮ আসনে (জোটগতভাবে ৭৭) বিজয়ী হয়েছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা, এটি তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এখন অবধি সবচেয়ে বড় সাফল্য। এ অর্জনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রশিবির। বিভিন্ন সময়ে সংগঠনটির নেতৃত্ব দেওয়া সাতজন আছেন জামায়াতের বিজয়ী প্রার্থীর তালিকায়। ভোটের মাঠে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়া সাবেক এই ছাত্রনেতারা সংসদেও নিজেদের দক্ষতা দেখাবেন—এমনটাই প্রত্যাশা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
সাইফুল আলম খান মিলন
এবারের নির্বাচনে রাজধানীর ছয়টি আসনে বিজয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছে জামায়াত। ঢাকা-১৫ আসন (মিরপুর-কাফরুল) থেকে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিজয়ী হবেন তা অনেকটা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু ঢাকা-১২ আসনে (তেজগাঁও, হাতিরঝিল ও শেরেবাংলা নগর থানা) একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীকে ধরাশায়ী করে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন জামায়াত প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এই সদস্য জাতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে খুব একটা আলোচনায় না থাকলেও ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে তিনি অচেনা কেউ নন। আশির দশকে শিবিরকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মিলন। ১৯৮২ সালে তিনি প্রথমবার সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। পরের বছর পালন করেন সভাপতির দায়িত্ব।
ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের
ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি-সেক্রেটারির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিতদের মধ্যে একজন ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতেও পরিচিত মুখ তিনি। এবারের নির্বাচনে কুমিল্লা-১১ আসন (চৌদ্দগ্রাম) থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ডা. তাহের। ২০০১ সালে তিনি প্রথমবার এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এবার ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩০৮ ভোট পেয়েছেন তাহের। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির কামরুল হুদা পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৬৩৮ ভোট।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অধিকারী ডা. তাহের ১৯৮৫ সালে প্রথমবার শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পান। এর আগে তিনি ছাত্রশিবিরের ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা মাহনগর শাখার সভাপতি ছিলেন। ঢাকা মেডিকেলে পড়া অবস্থায় তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সফলতার সঙ্গে সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮৫-৮৭ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ডা. তাহের। তিনি জনপ্রিয় শিশু-কিশোর পত্রিকা কিশোরকণ্ঠের প্রতিষ্ঠাতা।
রফিকুল ইসলাম খান
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে (উল্লাপাড়া) এবার চমক দেখিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। ১৯৯৩ সেশনে তিনি শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৪-৯৫ সাল মেয়াদে টানা দুইবার সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। ভোটগ্রহণ শেষে স্থানীয় কেন্দ্রের ফলাফল অনুযায়ী রফিকুল ইসলাম খান পান ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৩ ভোট। তার নিকটতম প্রার্থী বিএনপির আকবর আলী পান ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৫৮ ভোট। শুরুতে ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী হচ্ছেন বলে ধারণা করা হলেও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে বাজিমাত করেন রফিকুল। গণনা করে দেখা যায়, ওই আসনের ৩ হাজার ২১ পোস্টাল ভোটের মধ্যে রফিকুল পেয়েছেন ২ হাজার ১৭৯। পোস্টার ভোট যুক্ত হওয়ার পর রফিকুলের মোট প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৭২। অন্যদিকে এগিয়ে থাকা বিএনপির এম আকবর আলী ৮২০ ভোট পেয়ে পিছিয়ে যান। শেষপর্যন্ত জয়ের মালা পড়েন রফিকুল ইসলাম খান।
নুরুল ইসলাম বুলবুল
বিএনপির প্রভাবশালী প্রার্থী হারুনুর রশিদের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন (সদর) থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৬ ভোট পেয়েছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক এই নেতা। তার নিকটতম প্রার্থী হারুন পেয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৯৭৮ ভোট।

২০০০ সালে প্রথমবার শিবিরের সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালনের পর ২০০১-০২ সাল পর্যন্ত টানা দুবার সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন বুলবুল। পরে জামায়াতে যোগ দিয়ে ঢাকা মহানগরকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০১৭ সালে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির হওয়ার আগে তিনি গুলশান থানা শাখার আমির, উত্তরা দাওয়াতি ইউনিয়নের সেক্রেটারি-সভাপতিসহ বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটেও সমন্বয়ক ছিলেন বুলবুল।
শফিকুল ইসলাম মাসুদ
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ তার জ্বালাময়ী বক্তব্য এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে জাতীয় রাজনীতিতেও পরিচিত মুখ। দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার এই তরুণ সদস্য এবার পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসন থেকে ৯৮ হাজার ৪৩৮ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

জামায়াতের রাজনীতিতে আসার আগে ছাত্রশিবিরকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাসুদ। ২০০৪-০৫ সাল পর্যন্ত টানা দুইবার তিনি শিবিরের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। সভাপতি নির্বাচিত হয়েও দায়িত্ব পালন করেন টানা দুই মেয়াদে (২০০৬-০৭)
সালাহউদ্দীন আইয়ুবী
গাজীপুর-৪ আসনে (কাপাসিয়া) ১ লাখ ১ হাজার ৭৭৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটিতে ধানের শীষের প্রার্থীকে প্রায় ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি বিজয়ী হয়েছেন।

তরুণ এই নেতা ২০২০ সালে শিবিরের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরের বছর সভাপতির দায়িত্ব পান।
হাফেজ রাশেদুল ইসলাম
এবারের নির্বাচনে বিজয়ী জামায়াতের তরুণ প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম হাফেজ রাশেদুল ইসলাম। সালাউদ্দীন আইয়ুবীর কমিটিতে (২০২১) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরের বছর (২০২২) সভাপতি নির্বাচিত হয়ে শিবিরকে নেতৃত্ব দেন। শেরপুর-১ আসনে (সদর) জামায়াতের প্রার্থী হয়ে বড় ব্যবধানে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন রাশেদুল।

তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৩০ হাজার ৯৮৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৫২১ ভোট।
মন্তব্য করুন








