ঢাকা, বাংলাদেশ ||
সোমবার
০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ||

অস্বাভাবিক গতিতে আবেদন নিষ্পত্তি

মির্জা ফখরুলের ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানকে ২২ কোটি টাকা মওকুফ জনতা ব্যাংকের

অনলাইন ডেস্ক
  ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:২৭
বামে জনতা ব্যাংকের লোগো ও ডানে মির্জা ফয়সাল আমিন। ছবি : সংগৃহীত

প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের ধকল নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে জনতা ব্যাংক। মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশ খেলাপি হওয়ায় অস্তিত্বের সংকটে আছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ প্রতিষ্ঠান। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ৪৪ কোটি টাকার এক ঋণখেলাপিকে প্রায় সাড়ে ২২ কোটি টাকা সুদ মাফ (মওকুফ) করে দিয়েছে জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা। সুদ মওকুফের আবেদনের এক সপ্তাহের মধ্যে অস্বাভাবিক গতিতে ফাইল নিষ্পত্তি করেছে ব্যাংকটি। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে তড়িঘড়ি করে এমন সুবিধা পাওয়া ব্যক্তি মির্জা ফয়সাল আমিন। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি এবং দলের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আপন ছোট ভাই। আওয়ামী লীগের সময়ে ব্যবসা বঞ্চিত হওয়ার দাবি করে এই সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে আওয়ামী লীগের সময়েই ঋণ সুবিধা নিয়েছেন প্রায় ১১ কোটি টাকা।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মির্জা ফয়সালের মালিকানাধীন নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ২০ বছর আগে প্রথমবার ঋণ দেয় জনতা ব্যাংক। সেই ঋণ শোধ করতে না পারলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রতিষ্ঠানটিকে আবারও ঋণ দেওয়া হয়। এরপর ১৭ বছর পুরোপুরি বন্ধ ছিল নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নতুন করে আলোচনায় আসে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো। অল্পদিনের মধ্যেই বিপুল অঙ্কের সুদ মওকুফের সুবিধাও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

জনতা ব্যাংকের নথি
জনতা ব্যাংকের নথি
জনতা ব্যাংকের নথি

এদিকে সুদ মওকুফ করানোর প্রেক্ষাপট সৃষ্টির জন্য নিশ্চিতপুর অ্যাগ্রো গত বছরের নভেম্বর মাসে কয়েক দফায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যাংকে জমা দিয়েছে। ১৭ বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে হঠাৎ কীভাবে এত নগদ টাকা এলো তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রোর একাল-সেকাল

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শুরুতে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই সময়কালে কৃষিভিত্তিক নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড গড়ে তোলেন তার ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন। ফয়সাল ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

জনতা ব্যাংকের নথি
জনতা ব্যাংকের নথি
জনতা ব্যাংকের নথি

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র এক মাস আগে ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিশ্চিন্তপুরকে ১০ কোটি ৯৭ লাখ টাকার প্রকল্প ঋণ অনুমোদন করে জনতা ব্যাংক। এ ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। ওই ঋণ অনুমোদনের সময় জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের (২০০১-০৬) পরিচালক ছিলেন মুহ. ফজলুর রহমান। এখন ২২ কোটি টাকা ঋণ মওকুফের সময় তিনিই জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।

বিএনপির সময়ে শুরু হলেও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিশ্চিন্তে জনতা ব্যাংক থেকে নানা সুবিধা পেয়েছে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিস্তি পরিশোধে অতিরিক্ত সুবিধো দিয়েছে জনতা ব্যাংক। এমনকি ব্যবসা শুরুর জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ওই সময় আরও প্রায় ১১ কোটি ঋণ দেওয়া হয় মির্জা ফয়সালের প্রতিষ্ঠানটিকে। নতুন করে এই টাকা পাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু বিগত ১৭ বছরে সেই ঋণ পরিশোধের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি।

জনতা ব্যাংকের নথি
জনতা ব্যাংকের নথি
জনতা ব্যাংকের নথি

পটপরিবর্তনের পর সুর বদল

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ঋণ পুনঃতফসিল এবং নতুন ঋণ বাগিয়ে নেওয়ার পরও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নতুন দাবি করে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০০৭ সাল থেকে তারা রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে ব্যবসা করতে পারেনি।

জনতা ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ১৭ বছর খবর না থাকলেও ৫ আগস্টের পর থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠেন মির্জা ফয়সাল। ২০২৫ সালের ৯ ও ২৭ নভেম্বর দুটি আবেদন করে সুদের টাকা মওকুফের আবদার জানান তিনি। আবেদনপত্রে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির এই শীর্ষ নেতা দাবি করেছেন, ২০০৭ সালের পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি ও তার প্রতিষ্ঠান ফ্যাসিস্ট সরকারের রোষানলে পড়ে। এর ফলে ব্যবসায়িকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাংকের সঙ্গে স্বাভাবিক লেনদেন করতে পারেননি। এ ছাড়া তার প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় এবং সারের দাম কমে যাওয়ার কারণেও লোকসানে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে জনতা ব্যাংকের নিজস্ব পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিশ্চিন্তপুরের কারখানা ১৭ বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে (ডেড প্রজেক্ট)।

জনতা ব্যাংকের নথি
জনতা ব্যাংকের নথি

এশিয়া পোস্টের ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে ব্যাংকের প্রতিবেদনের সত্যতা পেয়েছেন। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুরের ডোডাপাড়া এলাকায় গিয়ে জানা যায়, ২০১১ সাল থেকে এই কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। মিশ্র সার উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া কারখানাটিতে একসময় ২০-৩০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু সার বিক্রি না হওয়ায় কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সেই থেকে এই স্থাপনা অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

কারখানার আশপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে তারা রাজি হননি। কাঁটাতারে ঘেরা কারাখানার ভেতরে ঢোকার অনুমতি মেলেনি নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে থেকে। এমনকি ছবি তুলতে গেলেও তারা নিষেধ করেন।

নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো কারখানা
নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো কারখানা

সুদ মওকুফের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করা হয় যেভাবে

১৭ বছর কারখানা বন্ধ থাকার সুবাদে এই দীর্ঘ সময় জনতা ব্যাংকের সঙ্গে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রোর কোনো লেনদেন হয়নি। কিন্তু গত বছরের ৯ নভেম্বর সুদ মওকুফের প্রথম আবেদন জমা দেন মির্জা ফয়সাল আমিন। সেদিন থেকেই কয়েক দফায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

নথিপত্র থেকে জানা যায়, ৯ নভেম্বর প্রথম আবেদন জমার দিনে দুটি আলাদা কিস্তিতে ৫৬ লাখ ও ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধ করে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো। পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে পরিশোধ করা হয় আরও ৫০ লাখ টাকা। এরপর ২৭ নভেম্বর ঋণ মওকুফের জন্য দ্বিতীয় আবেদন করেন মির্জা ফয়সাল।

সুদ মওকুফের আবেদনের নথিপত্র
সুদ মওকুফের আবেদনের নথিপত্র

হিসাবের মারপ্যাঁচ ও অস্বাভাবিক গতিতে অনুমোদন

মির্জা ফয়সাল আমিনের আবেদনটি জমা দেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয় জনতা ব্যাংক। তাদের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রোর মোট দায়ের পরিমাণ ৪৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে মাত্র ২২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে অবশিষ্ট ২২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বা মোট দায়ের প্রায় ৫০ শতাংশই মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে মওকুফযোগ্য সুদের পরিমাণ ৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা, অনারোপিত সাধারণ সুদ ১ কোটি টাকা এবং অনারোপিত দণ্ড সুদ ২ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে মোট ২২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মওকুফের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে খেলাপি নিশ্চিন্তপুরকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদনে ‘এসএমএ’ (আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি নয়, তবে ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে প্রদর্শনের প্রস্তাব করা হয়। ব্যাংকারদের মতে, এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাস প্রচলিত ব্যাংকিং নীতিমালার পরিপন্থি এবং এতে আর্থিক ঝুঁকি গোপনের প্রবণতা দেখা দেয়। কিন্তু ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৮৬৬তম সভায় এসব প্রস্তাব পেশ করা হলে তা অনুমোদন দেওয়া হয়।

সংকটে ধুঁকছে জনতা ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, প্রভাবশালী গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে আগে থেকেই জিম্মি হয়ে আছে জনতা ব্যাংক। এ্যাননটেক্স, বিসমিল্লাহ, বেক্সিমকো, এস আলমসহ শীর্ষ ৯ ব্যবসায়িক গ্রুপের কাছেই আটকে আছে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বের পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। মোট ঋণ ৯৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ জনতার ব্যাংকের খেলাপির হার ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে আমানতের বিপিরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি ৪৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র ব্যাংকার এ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এশিয়া পোস্টকে বলেন, জনতা ব্যাংকের মতো সংকটাপন্ন ব্যাংক তারল্য সংকটে থাকা অবস্থায় এমন ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে ঋণের মানদণ্ড শিথিল করা এবং সিআইবিতে ভুল তথ্য দেওয়া বড় ধরনের গুরুতর অপরাধ। এটি নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের ভুল বার্তা দিচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের মূলধনের ভিত্তিকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করেছে। দীর্ঘ সময় ব্যাংককে কোনো টাকা না দিয়ে এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিকে আইনি অপকৌশল বলেও অভিহিত করেন এই ব্যাংকার।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, মওকুফের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে না। যে কোনো ব্যাংক চাইলে কোনো গ্রাহকের ঋণ মওকুফ করতে পারে। কোন প্রেক্ষাপটে এই মওকুফ করেছে, সেটা ওই ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা ভালো বলতে পারবেন। নীতিমালা মেনে করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু বলার নেই।

এর চেয়েও অনেক বেশি ছাড় দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে মন্তব্য করে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুজিবুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ’খেলাপি ঋণগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করেছে। এই সার্কুলার ও সব নীতিমালা মেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়েই কাজটি করা হয়েছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় আনা হয়নি। এর চেয়ে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে হলেও ঋণ আদায়ের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’

এ বিষয়ে কথা বলতে এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে মির্জা ফয়সাল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, বিগত বিএনপির সময়ে বা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি কোনো ঋণ পাননি। যে ঋণ পেয়েছিলেন তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। আওয়ামী লীগের সময় ব্যবসা করতে না পারায় সম্প্রতি সুদ মওকুফের আবেদন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক তা আমলে নিয়ে সুদ মওকুফের অনুমতি দেয় এবং জনতা ব্যাংক সেটা চূড়ান্ত করে।

মন্তব্য করুন

হাতিয়ায় ধর্ষণ: সিডিআর, হাসপাতালের নথি-ফুটেজ ও স্থানীয়দের বর্ণনায় সত্যতা মিলছে না
নোয়াখালীর হাতিয়ায় শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ায় তিন সন্তানের জননীকে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে তথ্যপ্রমাণে সত্যতা মিলছে না। যে সময় ও স্থানে ধর্ষণের দাবি করা হয়েছে তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই এলাকায় ছিলেন না বলে এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ঘটনায় অভিযোগকারী বা তার পক্ষে কেউ এখনও আইনি পদক্ষেপ নেননি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি করার পর মেডিকেল বোর্ড গঠন ও ওই নারীর আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।  এমন প্রেক্ষাপটে এশিয়া পোস্ট ওই নারীর অভিযোগ নিয়ে নানাভাবে অনুসন্ধান চালিয়েছে। এর অংশ হিসেবে অভিযোগকারী নারী এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির মোবাইল লোকেশন ও কল ডিটেল রেকর্ড (সিডিআর), হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং প্রাথমিক তথ্য, ওই নারীর অন্তত আটজন প্রতিবেশী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে এশিয়া পোস্ট। সেসব বিশ্লেষণের পর অভিযোগকারীর বর্ণনার সঙ্গে অনেক ঘটনা ও সময়কালের সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীর দাবি  ধর্ষণের অভিযোগ তোলা নারী হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোটগ্রহণের  পরদিন শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। অবশ্য বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তিনি নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর।  সেই সাক্ষাৎকারের ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারী বলছেন, শাপলা কলি মার্কায় ভোট দেওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার থেকেই তিনি হুমকি পাচ্ছিলেন। সে জন্য শুক্রবার রাতে তিনি চাচাতো বোনের বাড়িতে চলে যান। প্রথমে সেখানে হামলা ও ভাঙচুর হয়। এরপর তার স্বামী তাকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। রাত ১১টার দিকে তিন ব্যক্তি সেখানে আসেন এবং তাদের মধ্যে একজন ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে দাবি করেন ওই নারী। সাংবাদিকদের এ তথ্য জানানোর সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপর অভিযোগকারী নারী জানান, শুক্রবার রাতে ধর্ষণের পর শনিবার ভোর ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে ১০-১২ লোক আবার তাদের বাড়িতে আসেন। ওই ব্যক্তিরা তার স্বামীকে মারধর করে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যান।   হাসপাতালে যা বলেছেন অভিযোগকারী শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান ওই নারী। হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে হাসপাতালে জরুরি বিভাগে যান তিনি। ওই সময় জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত ছিলেন চিকিৎসক মোস্তাফিজুর রহমান। ওই নারী প্রথমে জানান, শনিবার সকাল ৬টার দিকে মারধর করা হয়েছে। রোগীর দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী চিকিৎসক ইনজুরি নোটে এসব তথ্য লিপিবদ্ধ করেন।    কিন্তু হাসপাতালে যাওয়ার ঘণ্টা তিনেক পর রাত ৮টার দিকে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে নতুন দাবি জানান। ততক্ষণে জরুরি বিভাগে নতুন শিফটের চিকিৎসক চলে এসেছেন। তার কাছে গিয়ে ওই নারী জানান, তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এবার ঘটনার সময় হিসেবে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার কথা বলেন ওই নারী। দায়িত্বরত চিকিৎসক নতুন করে ইনজুরি নোট লিখে অভিযোগকারীকে হাসপাতালের গাইনি বিভাগে স্থানান্তর করেন।  প্রধান অভিযুক্ত দিলেন ভিন্ন তথ্য  অভিযোগকারী নারীর বর্ণনা অনুযায়ী যিনি ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছেন অর্থাৎ প্রধান অভিযুক্ত- তাকে খুঁজে বের করে তার সঙ্গেও কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত একই আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। অভিযুক্ত ব্যক্তি জানান, ভোটের পরদিন (১৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে তার ওপর হামলা চালায় শাপলা কলির সমর্থকরা। এ সময় মারধরে তিনি মাথায় আঘাত পান। আহত অবস্থায় তিনি তিমির রঞ্জন দাস নামে এক ব্যক্তির দোকানে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। এরপর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসাপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসা শেষে রাত দেড়টা থেকে ২টার দিকে তিনি বাড়ি ফিরে যান। হাসপাতালের নথিতে দেখা গেছে, সেখানে লেখা হয়েছে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে এই ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।  অন্যদিকে একই সময়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় মারধরের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া আরেক নারীর চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য থেকে। ওই নথি অনুযায়ী, ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তি যে এলাকা থেকে হাসপাতালে এসেছিলেন সেই একই এলাকা থেকে একই সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন একজন নারী। তাকেও ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার দিকে আঘাত করা হয়েছে বলে হাসপাতালের ইনজুরি নোটে উল্লেখ রয়েছে।  জানা যায়, ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর যখন হামলা চালানো হয় তখন ওই নারী বাধা দেন। ফলে তার ওপরও হামলা চালানো হয় এবং তার হাতে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে দুজন একসঙ্গে হাসপাতালে যান এবং নারীর হাতে প্লাস্টার করা হয়। অভিযোগকারী নারীর সিডিআর কী বলছে দুপক্ষের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের থেকে মোবাইল ফোনের লোকেশন ও সিডিআর সংগ্রহ করেছে এশিয়া পোস্ট। অভিযোগকারী নারীর সিডিআর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনি ধর্ষণের যে সময় ও স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন ওই সময়ে তিনি সেই স্থানেই ছিলেন। পরদিন ভোরে মারধরের ঘটনার যে স্থান ও সময়ের কথা বলেছেন সিডিআরের সঙ্গে তার মিল পাওয়া গেছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টা ২৮ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। এরপর একটি নম্বরে কল করেন এবং ওই এলাকা থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা দেন।  সিডিআরের তথ্য থেকে জানা যায়, ১১টায় ৩৩ মিনিটে ওই নারী পশ্চিমচর বাটা এলাকা থেকে আরেকজনকে কল করেন। এরপর আরও পাঁচটি নম্বরে কল দেন তিনি। ১১টা ৫৮ মিনিটে খাশেরহাট এলাকায় পৌঁছান ওই নারী। ১টা ২৬ মিনিটে পৌঁছান নোয়াখালী সদরের মাইজদীতে।  হাসপাতালে যেতে অস্বাভাবিক বিলম্ব  মাইজদী থেকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের দূরত্বে। কিন্তু অভিযোগকারী নারী ১টা ২৬ মিনিটে মাইজদী পৌঁছালেও হাসপাতালে গিয়ে তিনি প্রথম রিপোর্ট করেছেন বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টার পর।  অভিযুক্তর সিডিআরে পাওয়া তথ্য  প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির মোবাইল ফোনের লোকেশন অনুযায়ী, তিনি শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৩৪ মিনিট পর্যন্ত আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকাতেই ছিলেন। সিডিআর বলছে, এই ১২ ঘণ্টায় তার মোবাইল ফোন থেকে বিভিন্ন জনের কাছে অন্তত ৯৫টি বার কল করা হয়েছে। এরপর রাত ৯টা ১৩ মিনিটে তিনি ছিলেন চরবাটা এলাকায়। সেখান থেকে ৯টা ২২ মিনিটে খাশেরহাট, ১০টা ১ মিনিটে মান্নাননগর, ১০টা ১৪ মিনিটে সোনপুর ও ১০টা ১৯ মিনিটে মাইজদী এবং ১০টা ৩০ মিনিটে তার অবস্থান দেখা যায় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল এলাকায়। রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে হাসপাতাল এলাকা ত্যাগ করেন তিনি।  এরপরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাত ১১টা ৪৮ মিনিটে মাইজদী, ১১টা ৫৮ মিনিটে হরিনারায়ণ এলাকা এবং রাত ১টা ৬ মিনিটে আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে একটি নম্বরে কল করেন তিনি। রাত ১২টার কয়েক মিনিট আগে তিনি বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন এবং ১টা নাগাদ সেখানে পৌঁছান।  হাসপাতালের সিসি ক্যামেরায় যা দেখা গেল  প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির দাবি এবং তার সিডিআর রেকর্ড মোতাবেক শুক্রবার রাতে তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের ওই সময়ের সিসি ক্যামেরার ফুটেজও সংগ্রহ করেছে এশিয়া পোস্ট। তাতে দেখা যাচ্ছে, শুক্রবার রাত ১০টা ২২ মিনিটে অভিযুক্ত ব্যক্তি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশ করছেন। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ওই ব্যক্তিকে মাথায় ব্যন্ডেজসহ দেখা যাচ্ছে। এ থেকে হাসপাতালে আসার আগে তার প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার দাবিরও প্রমাণ পাওয়া যায়। হাসপাতালের ১২ মিনিটের ফুটেজে শেষ পর্যন্ত তাকে জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।   হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজের এই তথ্যের সঙ্গে অভিযোগকারী নারীর বক্তব্যের মিল পাওয়া যায় না। রাত ১১টায় যে ব্যক্তি ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তিনি মূলত ঘটনার আধা ঘণ্টা আগে থেকে হাসপাতালে ছিলেন; যা ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৪০ কি.মি. দূরে এবং যাতায়াতে সময় লাগে অন্তত এক ঘণ্টা। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যান আকবর  ধর্ষণের অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যান আকবর নামের এক ব্যক্তি। এশিয়া পোস্টকে তিনি জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় শুক্রবার রাতে মারধরের শিকার ব্যক্তি ও এক নারীকে তিনি কোস্ট গার্ডের সহায়তায় রাত ৮টার দিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত সাড়ে ১০টার তাকে হাসপাতালে পৌঁছান। সেখানে চিকিৎসা শেষে দুজনকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। আকবর জেলা শহরে তার ছেলের ছাত্রাবাসে থেকে যান। অভিযোগকারীর দাবি ও সিডিআর তথ্যে গরমিল ধর্ষণের শিকার নারীর দাবি, তাকে রাত ১১টার দিকে ধর্ষণ করেছেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। কিন্তু সিডিআর ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি রাত ৯টার আগেই নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন এবং সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতাল এলাকায় পৌঁছান। রাত ১১টার সময় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার মানে অভিযোগকারী নারীর উল্লিখিত সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই এলাকাতেই ছিলেন না।  অভিযোগকারী নারীর প্রতিবেশীরা কিছুই জানেন না  অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তি একই আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করেন। তাদের একজনের ঘর থেকে অন্যজনের ঘরের দূরত্বও ২০০ মিটারেরও কম। এশিয়া পোস্টের প্রতিনিধি সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিন ওই এলাকায় যান। তিনি অভিযোগকারী নারীর অন্তত ছয়জন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলেন, যাদের ঘরও ওই নারীর ঘরের ২০০ মিটারের মধ্যে। নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে তাদের বক্তব্যের ভিডিও এশিয়া পোস্টের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।  অভিযোগকারীর ঘরের পশ্চিম দিকের একটি ঘরের একজন বাসিন্দা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ওই রাতে কোনো ঘটনা ঘটেনি। সবাই যার যার ঘরে ছিলাম। এখন শুনি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।  একই সারির আরেক বাসিন্দা বলেন, আমাদের সঙ্গের একজন নারীর ইজ্জত চলে গেলে আমরা কি চেয়ে থাকব? আমরা তাদের (হামলাকারীদের) রক্ত নিয়ে নিতাম। আমাদের ইজ্জত আর ওই নারীর ইজ্জত কি বেশ-কম আছে? নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।  অভিযোগকারীর পাশের ঘরের আরেক বাসিন্দা ধর্ষণের অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে বলেন, ওই রাতে কোনো ঘটনা ঘটেনি।  এনসিপির এজেন্টের বক্তব্য অভিযোগকারী নারী বলছেন, তিনি নোয়াখালী-৬ আসনে (হাতিয়া) জামায়াত জোট মনোনীত প্রার্থী এনসিপি নেতা আব্দুল হান্নান মাসউদকে ভোট দেওয়ায় তাকে নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু হাতিয়ার চানন্দীর ৯ নম্বর ওয়ার্ডে এনসিপির নির্বাচনি এজেন্ট নিজাম উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভোটের পরদিন বিএনপির লোকজন এসে আমাদের ঘর-দরজা ভেঙেছে। তবে আমাদের মারেনি। ধর্ষণের কোনো আলামতও পাওয়া যায়নি। আমি যেটা দেখিনি সেটা আমি কেমনে বলব?  ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতির দাবি, নেপথ্যে পুরোনো দ্বন্দ্ব নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, তার বাড়িতে হামলাকারীদের মধ্যে একজন ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইমরান। অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, আগে তিনি কেয়ারিং চরে থাকতেন। নদীতে বাড়ি ভেঙে যাওয়ার পর এই এলাকায় এসেছেন। এখনও ঠিকভাবে এখানকার কাউকে চেনেন না। ভোটের রেজাল্ট শুনে তিনি বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন নেতাকর্মীদের কাছে নির্যাতনের খবর শুনেছেন। হামলার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে।  বিএনপি নেতা ইমরান আরও জানান, ওই নারী রুবেল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছেন। অথচ রুবেল কোনো দল করে নাক। ব্রিক ফিল্ডের টাকা নিয়ে তার সঙ্গে পুরোনো দ্বন্দ্ব থাকায় তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।  ঘটনার সত্যতা মেলেনি পুলিশের তদন্তেও হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। তিনি বলেন, স্থানীয় প্রকল্প বাজার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে এখনো কোনো সত্যতা পাননি।  নোয়াখালী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদেরকে কেউ লিখিত কোনো অভিযোগ করেনি বা ফোনেও জানায়নি। সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে জেনে একজন অ্যাডিশনাল এসপি ও একজন ইন্সপেক্টরকে সেখানে পাঠানো হয়। স্থানীয় লোকজন ধর্ষণের বিষয়ে জানেন না, তবে মারামারির ঘটনা ঘটেছে বলে জানান। ওই নারী যে ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করছেন হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী সেই ব্যক্তি একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, হাসপাতাল থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব দেড় থেকে দুই ঘণ্টার পথ।  তাহলে কেন ওই নারী এমন অভিযোগ তুললেন? জানতে চাইলে নোয়াখালী সহকারী পুলিশ সুপার (হাতিয়া সার্কেল) মো. নুরুল আনোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, আগে থেকে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল। সেটা থেকে টুকটাক ঝামেলা হয়েছে। তবে আপনাদের যেভাবে জানানো হয়েছে ঘটনাটি তেমন না।  তিনি আরও বলেন, শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ার জন্য এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এটি জাস্ট একসাজারেশন প্রোপাগান্ডা। দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য, ইস্যু করার জন্য করা হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সত্য উদ্ঘাটনে মাঠে রয়েছেন বলেও জানান নুরুল আনোয়ার।  পুরোনো দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক বিরোধ স্খানীয় সূত্র জানায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেকে ইটের ভাটায় কাজ করেন। নুরুন্নবী মাঝির (সরদার) মাধ্যমে তারা ইটভাটায় কাজ করেন। প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে ১৫ হাজার টাকা পাওনা নুরুন্নবীর। অন্যদিকে অভিযোগকারী নারী নুরুন্নবীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। সেই সূত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে একাধিকবার ধারের টাকা ফেরত চাইতে যান ওই নারী। এ নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে ওই নারীর বিরোধ চলছিল।  অন্যদিকে এনসিপির সঙ্গে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে বলেও স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি মূলত আওয়ামী লীগের সমর্থক। আওয়ামী লীগের পতনের পর তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় বিএনপিকে সংগঠিত করার জন্য কাজ করেন।  বিএনপির বক্তব্য চানন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আকবর হোসেন বলেন, সে (প্রধান অভিযুক্ত) আমাদের কর্মী এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি প্রার্থী। নোয়াখালী-৬ আসনে ধানের শীষের পরাজিত প্রার্থী  এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম এশিয়া পোস্টকে বলেন, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে সে আমাদের কর্মী এটা সঠিক। সে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেছে।   স্থানীয় সূত্র জানায়, এর আগে ওই ব্যক্তিকে এনসিপিতে যোগ দেওয়ার জন্য একাধিকবার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এনসিপিতে যোগ দিলে তাকে এই এলাকার সভাপতি করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে তাতে রাজি না হয়ে বিএনপিতে যুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে তার ওপর এনসিপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের ক্ষোভ থাকতে পারে।  এ বিষয়ে এনসিপির চানন্দী ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আকবরের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। জিডি ও মেডিকেল বোর্ড ঘটনার তিন দিন পার হলেও অভিযোগকারীর পক্ষে কোনো কোনো মামলা দায়ের বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত ও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ায় পুলিশের পক্ষ থেকে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) হাতিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। সাধারণ ডায়েরির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেডিকেল বোর্ড গঠন ও ঘটনার আলামত সংগ্রহ করেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মেডিকেল বোর্ড রিপোর্ট দেবে বলে এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছেন হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম।
হাতিয়ায় ধর্ষণ: সিডিআর, হাসপাতালের নথি-ফুটেজ ও স্থানীয়দের বর্ণনায় সত্যতা মিলছে না
লুট হওয়া ১৩৩০ অস্ত্র নিয়ে ভয় এখনও 
অন্তর্বর্তী সরকার বারবার আশ্বস্ত করার পরও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর হুঁশিয়ারির পরও নির্বাচনি প্রচারকালীন সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও সংঘাতে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।  এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পরও পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল সেগুলো পুরোপুরি উদ্ধার করা যায়নি। এখনও হদিস না পাওয়া এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদ নিয়ে ভয় রয়েছে ভোটের মাঠে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে।  একই সঙ্গে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব বৈধ অস্ত্র জমা পড়েনি, দুশ্চিন্তা আছে সেসব নিয়েও।  এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেসব ঝুঁকি থাকে তার মধ্যে অন্যতম উদ্ধার না হওয়া লুণ্ঠিত এবং জমা না হওয়া লাইসেন্সধারী অস্ত্র। শঙ্কার বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির বাইরে থাকা এসব অস্ত্র যে নির্বাচনের আগে ও পরে সন্ত্রাসীরা বা অপরাধী চক্রের সদস্যরা সংঘাত বা সহিংসতায় ব্যবহার করবে না, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। এসব অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে ভোটকেন্দ্র দখল, আধিপত্য বিস্তার আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। হদিস নেই হাজারের বেশি অস্ত্র ও দুই লাখের বেশি গোলাবারুদের জুলাই আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকার কারণে ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাড়ে চারশ’র বেশি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় গণভবন থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) অস্ত্রপাতিও লুট হয়। পুলিশের সেই সময়কার হিসাব অনুযায়ী, এসব হামলার ঘটনায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাড়ে ছয় লাখের মতো গোলাবারুদ লুট হয়েছে। লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ছিল চায়নিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের বন্দুক, সাবমেশিনগান (এসএমজি), লাইট মেশিনগান (এলএমজি), পিস্তল, শটগান, গ্যাসগানসহ আরও নানা ধরনের অস্ত্র। এসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ অভিযান শুরু করে যৌথ বাহিনী। এ ছাড়া অস্ত্র উদ্ধারের জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করে সরকার। অভিযানে বিপুল অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হলেও সব অস্ত্রের এখনও হদিস মেলেনি। মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি) পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য বলছে, সারা দেশ থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র ও ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদের মধ্যে এখনও উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩৩০টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪টি গোলাবারুদ। অর্থাৎ, লুট হওয়া অস্ত্রের সাড়ে ২৩ শতাংশ এবং গোলাবারুদের সাড়ে ৩৯ শতাংশ এখনও বেহাত।   এদিকে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলির একটি অংশ গত দেড় বছরে নানা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। খুলনায় পুলিশের অভিযানে গত বছরের এপ্রিল মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে পুলিশের ব্যবহৃত পিস্তল, শটগান ও গুলি উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রামে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের ধরতে গিয়ে বেশকিছু অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে একটি হত্যাকাণ্ডে থানা থেকে লুট হওয়া পিস্তল ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রমাণ পায় পুলিশ।  নির্বাচনের আগে যে কোনোভাবে ও যত দ্রুত সম্ভব এসব অস্ত্র উদ্ধার করার ওপর জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। গত ২০ জানুয়ারি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় তিনি বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র যেভাবেই হোক নির্বাচনের আগেই উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লুট হওয়া যেসব অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি, সেগুলো আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। গত ৩ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে তিনি এমন মন্তব্য করেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এ নিয়ে মাথা না ঘামালেও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী থেকে সাধারণ মানুষের মনেও লুট হওয়া অস্ত্র নিয়ে আতঙ্ক রয়েছে। বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মকর্তা রাহাত আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, নির্বাচনের সময় এই অস্ত্রগুলো যদি মানুষের হাতে চলে আসে, আর তারা যদি অপব্যবহার করে, তাহলে আমরা তো সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারব না। তবে আমরা এটাও আশা করি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনী পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসবে। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ভোটার রফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, দেড় বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সরকারি মালখানা থেকে লুটের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি। এ নিয়ে আমরা শঙ্কিত। বৈধ অস্ত্র নিয়েও ভয় নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বৈধ (লাইসেন্সপ্রাপ্ত) আগ্নেয়াস্ত্র জমা ও বহনে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়টিও একটি নিয়মিত, গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সে অনুযায়ী গত ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে করার লক্ষ্যে বৈধ অস্ত্রের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর অংশ হিসেবে বৈধ অস্ত্র ৩১ জানুয়ারির মধ্যে কাছের থানায় জমা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্ধারিত এ সময়ের মধ্যে ২৭ হাজার ৯৯৫টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র থানায় জমা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে কী পরিমাণ অস্ত্র জমা পড়েনি, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি তারা। এ তথ্য জানতে দেশে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা কত তা জানার চেষ্টা চালায় এশিয়া পোস্ট। কিন্তু জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। নির্বাচনের আগে এর মধ্যে কতটি অস্ত্র জমা পড়েছে জানতে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-৪ শাখায় গেলে নির্বাচনি ব্যস্ততা দেখিয়ে কোনো তথ্য দেননি দায়িত্বরতরা।  ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা পড়া বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা জানতে গেলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, সংশ্লিষ্ট থানায় বৈধ অস্ত্র জমা দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। থানাগুলো থেকে আমাদের কাছে এখনও কোনো তথ্য আসেনি।  এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরে আলম রিগ্যান বলেন, প্রত্যেক নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান দেখি। যারা বৈধ অস্ত্রধারী আছেন, তারাও অস্ত্র থানায় জমা দেয়। এবার দৃশ্যমান কিছু এখনও দেখিনি।   এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে ‘পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স মিডিয়া সেন্টারে’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, ২৭ হাজার ৯৯৫টি বৈধ অস্ত্র থানায় জমা নেওয়া হয়েছে। কতগুলো অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি, তার সংখ্যা বেশি নয়। অনেকে হয়তো দেশে নেই, কিন্তু অস্ত্র লকারে তালা মেরে রেখে বিদেশে আছেন। তাদের বৈধ অস্ত্রগুলো হয়তো জমা পড়েনি, তবে তার সংখ্যা খুবই কম। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা যে কোনো অবৈধ অস্ত্রই হুমকি। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে নির্বাচনে এ নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই দাবি করে আইজিপি আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
লুট হওয়া ১৩৩০ অস্ত্র নিয়ে ভয় এখনও 
আয়-ব্যয়ে বেসামাল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন / ছয় মাসে এফডিআর ভেঙে ব্যয় ২০৪ কোটি টাকা, বেতন-ভাতা নিয়ে শঙ্কা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য অস্বাভাবিক গতিতে বেড়েছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ডিএসসিসির আয়-ব্যয় সমন্বয়ের পর ৮২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পরের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) আয়ের চেয়ে ১০২ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের তুলনায় আয় বাড়লেও ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে ২০৪ কোটি টাকা হয়েছে। ডিএসসিসির অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকে রাখা ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) ভেঙে সে টাকা দিয়ে বর্ধিত ব্যয়ের চাপ সামাল দিচ্ছে করপোরেশন। অর্থনৈতিক টানাপড়েনের কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম ও ঠিকাদারি বিল পরিশোধেও সংকট দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যে ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা। ডিএসসিসির অর্থবিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৩০ কোটি ৮২ লাখ টাকা আয় হয়েছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়কালে আয় ছিল ৪০৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ বছর আয় বেড়েছে ১২৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে গেল অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব, পরিচালন ও উন্নয়নসহ ডিএসসির ব্যয় হয়েছে ৩৩৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এ বছর তা দ্বিগুণ বেড়ে ৭৩৪ কোটি ৮২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। যদিও ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেছেন, করপোরশনের আয়-ব্যয় ওঠানামার বিষয়টি স্বাভাবিক। বছরের শুরুতে আয় কম থাকে, কিন্তু বছরের শেষে আদায় বেড়ে যায়। এফডিআর ভেঙে ব্যয় সামাল দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বছরের শুরুতে আদায় কম হওয়ায় এফডিআরের সাধারণ তহবিল থেকে খরচ করতে হচ্ছে। আমরা এখন রাজস্ব আদায়ে জোর দিচ্ছি। আশা করি, অর্থবছরের শেষে এটি ঠিক হয়ে যাবে। তবে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, করপোরেশনের প্রতি বছরের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য থাকতে হবে। এখানে আয়-ব্যয়ের তারতাম্য নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন ওঠে। বিশিষ্ট এই নগর পরিকল্পনাবিদ এশিয়া পোস্টকে আরও বলেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দুর্বল ছিল, প্রশাসকেরও জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের সময়কার বিতর্কিত উন্নয়ন কাজের বিল পরিশোধ করার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অডিট করা উচিত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। কিন্তু তারা সেটি করেনি।  কোথা থেকে কত আয় ডিএসসিসির সব বিভাগের আয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব বিভাগ থেকে আয় হয়েছে ৩৪৯ কোটি ৯০ লাখ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৩৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সম্পত্তি বিভাগের আয় গত বছরের ৬ কোটি ১৩ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। প্রকৌশল বিভাগের এবারের আয় ২০ কোটি ১২ লাখ, আগের অর্থবছরে ছিল ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। দুটি বিভাগে আয় গত বছরের তুলনায় কমেছে। সমাজকল্যাণ বিভাগে আয় হয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ, আগের বছর ছিল ২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য বিভাগে আগের বছর আয় হয়েছে ৩১ লাখ টাকা, এবার আয় নেমে এসেছে ২১ লাখে। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে এবারের আয় ৩৯ কোটি ৮ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। পরিবহন বিভাগের আয় হয়েছে ৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যা গত বছরের ৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকার চেয়ে বেশি। এ ছাড়া অন্যান্য বিভাগ থেকে আয় হয়েছে ৯৪ কোটি ৯৮ লাখ, আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। পরিচালন ব্যয়ের চাপ বাড়ছে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ডিএসসিসির পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩১৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের যা ছিল ২০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। বেতন-ভাতার পেছনে গেল বছর ব্যয় হয়েছে ১৫৪ কোটি ১০ লাখ, এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮২ কোটি ৬৭ লাখ টাকায়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি ও গ্যাস খাতে ব্যয় হয়েছে ৪২ কোটি ৫৯ লাখ, আগের বছর ছিল ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ব্যয় বেড়েছে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণেও। গেল বছর যে ব্যয় ছিল ৭ কোটি ৭৯ লাখ, এবার তা হয়েছে ৩২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সরবরাহ খাতে এ বছরের ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। এবার ব্যয় ২৭ কোটি ৮৬ লাখ, আগে ছিল ১৩ কোটি ৫৮ লাখ।  স্বাস্থ্য বিভাগে ব্যয় এবার ১৮ কোটি ৩৩ লাখ, আগেরবার ১১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। কল্যাণমূলক খাতেও ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। গেল বছর এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৯৫ লাখ, এবার পরিমাণ ৮ কোটি ৫৯ লাখ।  উন্নয়ন ব্যয়ে বড় উল্লম্ফন চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে নিজস্ব অর্থায়নে ডিএসসিসির উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে ৪১৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ১২৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা। করপোরেশনের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএসসিসির আয় ৭৯২ কোটি ৩০ লাখ, ব্যয় হয়েছে ৮৯৮ কোটি ২ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৯৭৯ কোটি ২১ লাখ, আয় ছিল ১ হাজার ৬১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ সালে ১ হাজার ১৫ কোটি ৯২ লাখ আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৯৭০ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ছিল ৮৭৯  কোটি ৭০ লাখ, ব্যয় হয়েছে ৮০২ কোটি ৮ লাখ টাকা। এ পরিসংখ্যান বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের ব্যবধান বেড়েই চলেছে। করপোরেশনের একাধিক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, তহবিলে অর্থ সংকট থাকায় ঠিকাদারদের বিল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। উন্নয়ন কাজের গতি অনেক কমে এসেছে। অন্যদিকে চলতি মাসে ৭৫টি ওয়ার্ডের উন্নয়নের জন্য ১৫০ কোটি টাকার দরপত্র চলছে। পুরনো কাজই চলছে না, নতুন কাজ শুরু হলে সংকট বাড়বে। বেতন-ভাতা নিয়েও শঙ্কা ডিএসসিসির অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, সাবেক মেয়র তাপস তার সময়কার তিন বছরের কিছু ঠিকাদারি বিল আটকে রেখেছিলেন। এর আগে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের সময়কার অনেক ঠিকাদারের জামানতের টাকাও জমা ছিল। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এসব বিল ও জামানত একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত ছয় মাসে আয় হয়েছে ৫৩০ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় বাবদ খরচ করতে হয়েছে ৩১৫ কোটি টাকা এবং নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন ব্যয় গেছে ৪১৯ কোটি টাকা। এভাবে প্রতি মাসে আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়ছে। এতে করপোরেশনের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে না। নাম প্রকাশে না করার শর্তে এই কর্মকর্তা আরও জানান, আয়-ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে করপোরেশনের ফিক্সড ডিপোজিট থেকে ২০০ কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে এখন করপোরেশনের ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ তহবিলের টাকা ৪৬ কোটি। আপাতত উন্নয়ন খাতে টাকা ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত আয়-ব্যয়ের তারতাম্য না কমলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার সঙ্গতিও থাকবে না ডিএসসিসির।
ছয় মাসে এফডিআর ভেঙে ব্যয় ২০৪ কোটি টাকা, বেতন-ভাতা নিয়ে শঙ্কা
খুলনায় ভারতীয় ‘পেনগান’ কেড়েছে ব্যবসায়ীর প্রাণ, জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
দেখে মনে হবে পিতলের তৈরি সৌখিন একটি কলম। অধিকাংশ সাধারণ কলমের মতোই সাড়ে ৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য। বহন করা যায় খুব সহজে। শার্ট-প্যান্ট কিংবা পাঞ্জাবির পকেটে রাখা যাবে অনায়াসে। বহন করা যাবে ডায়েরি-প্যাডের ভাঁজেও। কেউ কিছু সন্দেহও করতে পারবে না। কিন্তু কলমসদৃশ বস্তুটির ভেতরে কালি নেই, রয়েছে সাক্ষাৎ মৃত্যু পরোয়ানা! কারণ কলমের মতো দেখতে হলেও এটি কলম নয়, ভয়ংকর এক মারণাস্ত্র।  পিতলের ক্যাপ আর স্টিলের বডির বস্তুটি মূলত সক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র। কলমের খোলসের ভেতরে রয়েছে বিশেষভাবে তৈরি বডি (ব্যারেল) ও ফায়ারিং পিন। স্প্রিং মেকানিজমের মাধ্যমে পিস্তলের মতো কাজ করে এটি। ব্যবহার করা হয় ৭ দশমিক ৬৫ কেএফ ব্র্যান্ডের বু‌লেট। একবারে একটি বুলেট ব্যবহার করা যায়। সেটি নিক্ষেপের সময় কোনো শব্দ হয় না। কলমের পিন চাপলেই নিঃশব্দে নীরব ঘাতকের মতো ছুটে আসে বুলেট, যা হতে পারে প্রাণঘাতী।  কলমের মতো হওয়ায় এ অস্ত্রের নাম হয়েছে ‘পেনগান‘! অস্ত্রটি ব্যবহার করাও খুবই সহজ। কলমের মতো খোলা যায় মাঝখান থেকে। এরপর ওপরের অংশে লোড করা হয় বুলেট। তারপর স্প্রিংযুক্ত লিভার টেনে ছেড়ে দিলেই ফায়ারিং পিন গিয়ে সজোরে আঘাত করে বুলেটের পেছনে। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসে গুলি।  নাটক-সিনেমায় এমন কলমের দেখা হয়তো পেয়েছেন অনেকে- কিন্তু বাস্তবেই এ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে খুলনায়। গেল বছর জেলার ফুলতলা উপজেলায় খুন হন সুমন মোল্লা নামে এক ঘের ব্যবসায়ী। সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়েই ভয়ংকর পেনগানের তথ্য বেরিয়ে আসে। পরবর্তীতে ঘাতকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় একটি ধানক্ষেত থেকে পেনগানটি জব্দ করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, অস্ত্রটি ভারতে তৈরি করা।  যেভাবে মিলল পেনগানের সন্ধান  পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২২ এপ্রিল ফুলতলার জামিরা বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন সুমন মোল্লা। পিপরাইল দাসপাড়া কালভার্টের কাছে তার গতি রোধ করে সন্ত্রাসীরা। তদন্তে উঠে আসে, সন্ত্রাসীরা ধ্বস্তাস্তি করতে করতেই সুমনের মুখের মধ্যে পেনগান ঢুকিয়ে লিভারে টান দিতেই বেরিয়ে আসে গুলি। মুহূর্তেই সুমনের মুখ ও গলার অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় সুমনের।  ঘটনার পরদিন (২৩ এপ্রিল) মোমিদ গাজী নামে  চিহ্নিত এক সন্ত্রাসীকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন সুমন মোল্লার বাবা রকিবুদ্দিন গাজী (মামলা নং-১৪, তারিখ ২৩ এপ্রিল ২০২৫)। মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৫-৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। এর ১০ দিন পর যশোর থেকে মোমিদ গাজীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। রিমান্ডে পেনগানের তথ্য দেয় মোমিন।  সুমন মোল্লা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফুলতলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো শরিফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মামলাটি আগে অন্য কর্মকর্তার কাছে ছিল। আমি গত মাসেই দায়িত্ব পেয়েছি। মামলার এক ও চার নম্বর আসামি কারাগারে। আগামী ১৭ ফেব্রুয়া‌রি নতুন করে তাদের রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য আছে। তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে অভিনব এই অস্ত্রের ব্যাপারে আরও তথ্য বের করা যাবে।‘ মামলা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া যায়, এ ধরনের অস্ত্র বাংলাদেশে কোথাও তৈরি হয় না। তবে ভারতে এমন অস্ত্র ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। সুমন হত্যা মামলায় জব্দ হওয়া অস্ত্রটি ভারত থেকে এসেছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা।  এ বিষয়ে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল হক এশিয়া পোস্টকে ব‌লেন, মামলা‌টির গুরুত্ব‌ বি‌বেচনায় ইন্স‌পেক্টর পদমর্যাদার একজন‌কে তদ‌ন্তের ভার দেওয়া হ‌য়ে‌ছে। এজাহারভুক্ত আসামিদের প্রায় সবাইকে গ্রেপ্তার ক‌রে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হ‌য়ে‌ছে। পেনগান‌টি নিয়ে কাজ চলমান র‌য়ে‌ছে। খুব শিগগিরই অস্ত্রটির ব‌্যা‌লি‌স্টিক রি‌পোর্ট হা‌তে পৌঁছাবে। তখন এই অস্ত্রের বিষ‌য়ে আরও বিস্তা‌রিত জান‌া‌নো যা‌বে। জননিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ   এদিকে পেনগানের মতো অচেনা এবং গোপন প্রাণঘাতী অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে আসার বিষয়টি জননিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।  এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, কলমসদৃশ অস্ত্র ভয়াবহতা বাড়াবে। বাংলাদেশে এ ধরনের অস্ত্র তৈরি কিংবা ব্যবহার হওয়ার কথা নয়। এ ধরনের অস্ত্রগুলো টার্গেট কিলিং ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয়। কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ের জন্য এ ধরনের অস্ত্র অনেক সময় ভাড়া দেওয়া হয় বলে শুনেছি। এগুলো ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়াবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর  উচিত তদন্তের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা। 
খুলনায় ভারতীয় ‘পেনগান’ কেড়েছে ব্যবসায়ীর প্রাণ, জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
২২ কোটি টাকা ঋণ মওকুফ / এক দিনে তিন ব্যবসায়ী থেকে মির্জা ফয়সালের অ্যাকাউন্টে দেড় কোটি টাকা
সম্প্রতি জনতা ব্যাংক থেকে ২২ কোটি টাকা ঋণ মওকুফ সুবিধা পেয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সহোদর ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন। এ বিষয়ে গত শনিবার ‘অস্বাভাবিক গতিতে আবেদন নিষ্পত্তি/মির্জা ফখরুলের ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানকে ২২ কোটি টাকা মওকুফ জনতা ব্যাংকের’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে এশিয়া পোস্ট। বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে জানা যায়, মির্জা ফয়সল আমিন ঋণ মওকুফের এই সুবিধা পাওয়ার জন্য মূল ঋণ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। এই টাকা পরিশোধের আগে এক দিনে তিন জেলার তিন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা এসেছে মির্জা ফয়সালের অ্যাকাউন্টে। জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে তিনি এসব টাকা নেন নিজ মালিকানাধীন নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে। আর এ টাকা থেকে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ নবায়ন ও সুদ মওকুফ সুবিধা নিতে এককালীন জমা করা হয়েছে। তিন জেলায় অবস্থিত টাকা পাঠানো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো— ঠাকুরগাঁওয়ের সামিহা অটো রাইস মিল, নারায়ণগঞ্জের ডিআর পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও রংপুরের এরিস্ট্রোকেট অ্যাগ্রো লিমিটেড। এ ছাড়া মেহেদি ও সবুজ নামে অজ্ঞাত দুজন অ্যাকাউন্টটিতে ২০ লাখ ও ১৮ লাখ টাকা জমা করেন।  এসব লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা জমা হয়েছে, তাদের সঙ্গে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।  এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এক দিনে (৯ নভেম্বর) তিন ব্যবসায়ী গ্রুপ নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চলতি অ্যাকাউন্টে এক কোটি ৫২ লাখ টাকা জমা করে। এর মধ্যে সামিহা অটো রাইস মিল জমা করে ৩০ লাখ টাকা। এর মালিক ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার আ. সামাদ। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিএনপির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন তিনি। একই দিন নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে ৭২ লাখ টাকা জমা করে ডিআর পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এটি নারায়ণগঞ্জের ডিআর গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। এখন শীর্ষস্থানীয় মেঘনা গ্রুপ এটি পরিচালনা করে। এ ছাড়াও এদিন রংপুরের এরিস্ট্রোকেট অ্যাগ্রো লিমিটেড জমা করে ৫০ লাখ টাকা। এটি দ্য এরিস্ট্রোকেট গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান, অগ্রণী ব্যাংকের শীর্ষ ঋণখেলাপিদের একটি।   পরদিন ১০ নভেম্বর নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে জনৈক মেহেদি ২০ লাখ টাকা জমা করেন। ব্যাংকটির গুলশান শাখার মাধ্যমে তিনি এ টাকা জমা দেন। পরে ১২ নভেম্বর আরেক জনৈক ব্যক্তি সবুজ ঠাকুরগাঁও শাখার মাধ্যমে জমা দেন ১৮ লাখ টাকা। একই দিন অ্যাকাউন্টটিতে ডিআর পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ জমা দেয় আরও ১২ লাখ টাকা। বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কারখানা বন্ধ থাকায় এ দীর্ঘ সময় জনতা ব্যাংকের সঙ্গে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রোর কোনো লেনদেন হয়নি। কিন্তু গত বছরের ৯ নভেম্বর সুদ মওকুফের প্রথম আবেদন জমা দেন মির্জা ফয়সাল আমিন। সেদিন থেকেই কয়েক দফায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।  নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত ৯ নভেম্বরে প্রথম আবেদন জমার দিনে দুটি আলাদা কিস্তিতে ৫৬ লাখ ও ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধ করে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো। পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে পরিশোধ করা হয় আরও ৫০ লাখ টাকা। এরপর ২৭ নভেম্বর ঋণ মওকুফের জন্য দ্বিতীয় আবেদন করেন মির্জা ফয়সাল। নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে কোনো প্রতিষ্ঠান চেনেন না জানিয়ে সামিহা অটো রাইস মিলের মালিক আ. সামাদ বলেন, কীসের এগ্রো, কী এটা, কোথায় সেটা? আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তিনি বলেন, মির্জা ফয়সাল আমিন কিংবা তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই, তাকে কোনো টাকা পাঠাইনি।  কথার এক পর্যায়ে এশিয়া পোস্টের কাছে আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ আছে জানালে টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার করেন তিনি । এ বিষয়ে জানতে মির্জা ফয়সাল আমিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা রিসিভ হয়নি।  পরে তার পিএস মো. সবুজের মোবাইল ফোনে কল করা হলে এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। স্যার (মির্জা ফয়সাল আমিন) সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত। এখন কথা বলা সম্ভব না।
এক দিনে তিন ব্যবসায়ী থেকে মির্জা ফয়সালের অ্যাকাউন্টে দেড় কোটি টাকা
জাতীয় সংসদ নির্বাচন / ১০ হাজার বডি ক্যামেরা এসেছে বিএনপি নেতার প্রতিষ্ঠান থেকে
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশের জন্য কমপক্ষে ৪০ হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরা (বডিক্যাম) সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। প্রতিটি নির্বাচনি কেন্দ্রে ভোট সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নজরদারির জন্য এ ক্যামেরা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, বডি ক্যামেরা দ্রুত কেনার জন্য জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউএনডিপির মাধ্যমে কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হয়নি। পরে স্থানীয় কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে ৪০ হাজারের জায়গায় ২৫ হাজার ৭০০ বডিক্যাম কেনা হয়েছে। এই সংখ্যক ক্যামেরা দিয়ে সর্বোচ্চ ১৮ হাজারের মতো কেন্দ্রে নজরদারি করা যাবে।  বডি ক্যামেরা সরবরাহকারীদের মধ্যে রয়েছে ‘স্মার্ট টেকনোলজিস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক আওয়ামী লীগের মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের মেয়ে নাফিসা কামাল। বিতর্কিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদও আছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায়। স্মার্ট টেকনোলজিস ছাড়াও আরও চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বডিক্যাম সরবরাহকারীর তালিকায়। তারা হলো- দাহুয়া, টিডিটেক, কেডাকম ও অকজন। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ক্যামেরা নেওয়ার বিষয়ে ইতিপূর্বে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। জানা গেছে, ২৫ হাজার ৭০০ বডিক্যামের মধ্যে ১০ হাজার ক্যামেরা সরবরাহ করেছে ‘সিল্কওয়েস কার্ড অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে এরই মধ্যে পাঁচ মহানগর (মেট্রোপলিটন) ও ৩৮ জেলা ও ৬০৪ থানা পুলিশের কাছে নির্বাচনি বডিক্যাম সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক এবং চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি। এবারের নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে চাঁদপুর-৩ আসন (সদর ও হাইমচর) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শেখ ফরিদ। সিল্কওয়েস কার্ড অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেডের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিএনপি নেতা শেখ ফরিদ এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার স্ত্রী মুনিরা আহমেদ আছেন চেয়ারম্যান পদে।  শেখ ফরিদ আহমেদের নির্বাচনি হলফনামায় স্ত্রী হিসেবে মুনিরা আহমেদের নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে হলফনামায় সম্পদের বিরণে বন্ড, ঋণপত্র, স্টক একচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির শেয়ার রয়েছে বলে উল্লেখ থাকলেও সিল্কওয়েস কার্ড অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেডের নাম উল্লেখ করে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।  এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথিপত্র থেকে জানা গেছে, সিল্কওয়েসের মাধ্যমে এরই মধ্যে পাঁচ মহানগরে পুলিশের জন্য ৫১১টি বডিক্যাম সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১০৪, রাজশাহীতে ১১৬, বরিশালে ৮৩, সিলেটে ১৩৪ ও রংপুরে ৭৪টি ক্যামেরা পাঠানো হয়েছে।    এ ছাড়া ৩৮ জেলা ও ৬০৪টি থানার জন্য সিল্কওয়েস কার্ড অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড সরবরাহ করেছে আরও ৯ হাজার ৪৮৯ বডি ক্যামেরা। এর মধ্যে রয়েছে, রাজশাহী রেঞ্জের জয়পুরহাটে ২৮, বগুড়ায় ৩১০, চাপাইনবাবগঞ্জে ২৬৪, নওগাঁয় ২৫৫, রাজশাহীতে ৪৩, নাটোরে ৫০, সিরাজগঞ্জে ১১৭ ও পাবনায় ১৯১টি বডিক্যাম সরবরাহ করেছে সিল্কওয়েস। প্রতিষ্ঠানটি খুলনা রেঞ্জে পুলিশের জন্য ক্যামেরা পাঠিয়েছে মেহেরপুরে ৭৬, কুষ্টিয়ায় ২৮৭, চুয়াডাঙ্গায় ৬৯, যশোরে ২২৬, মাগুরায় ১৪৯, নড়াইলে ১৪৪, বাগেরহাটে ২২৩ ও সাতক্ষীরায় ১২০টি। বরিশাল রেঞ্জে সিল্কওয়েস বডি ওর্ন ক্যামেরা সরবরাহ করেছে বরগুনায় ১১৩, পটুয়াখালীতে ২৪৯, ভোলায় ২১৭, বরিশালে ১৪৩, ঝালকাঠিতে ৩৬ ও পিরোজপুরে ১৩২টি। ময়মনসিংহ রেঞ্জের জামালপুরে ১৯৬, শেরপুরে ৯১ ও নেত্রকোনায় ২৬৬টি ক্যামেরা গেছে সিল্কওয়েসের মাধ্যমে। সিলেট রেঞ্জের সুনামগঞ্জে ২০৯ ও হবিগঞ্জে ২৩২টি ক্যামেরা পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া চট্টগ্রাম রেঞ্জের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪৮২, কুমিল্লায় ৮৫১, চাঁদপুরে ২২৯, ফেনীতে ২৪৭,নোয়াখালীতে ৭৫, লক্ষ্মীপুরে ১৯৮, চট্টগ্রামে ৫৩০, কক্সবাজারে ২৯৬, খাগড়াছড়িতে ১৩৮, রাঙামাটিতে ১৬৯ ও বান্দরবানে ১৪৬টি। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বডি ওর্ন ক্যামেরা অনলাইন ও অফলাইন; দুই ধরনের হয়। অনলাইনের জন্য ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড থাকে। এই আইডি-পাসওয়ার্ড ক্যামেরা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি করে দেওয়া হলে সেসব তথ্য তাদের ডাটাবেজেও থাকতে পারে, যা কাজে লাগিয়ে ওইসব প্রতিষ্ঠান চাইলে ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে। সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুলিশের কাছে থাকলেও সার্ভিস দেওয়ার জন্য সরবরাহকারীদের কাছে আংশিক নিয়ন্ত্রণ থাকা স্বাভাবিক। এ নিয়ে কথা হয় তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরার ফুটেজের সঙ্গে  কোনো ক্লাউড সার্ভারের সংযোগ নেই। ফুটেজ ক্যামেরা থেকে পুলিশের একটা সার্ভারে যাবে। তবে সেই সার্ভারে ক্যামেরা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রিত এক্সেস থাকতে পারে। এটা করা হয় অপারেশনকে নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য। অপারেশনের কোনো পর্যায়ে কারিগরি ত্রুটি বা অন্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে এর সমাধান করা লাগতে পারে। এ জন্যই নিয়ন্ত্রিত এক্সেস দেওয়া হতে পারে। তবে ক্যামেরার সার্ভারে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের এক্সেস নিয়ে খুব বেশি আশঙ্কার কিছু নেই বলে মনে করেন তানভীর হাসান জোহা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধরুন, আমাদের বাসা-বাড়িতে যারা সহায়ক হিসেবে কাজ করেন, তাদেরকে তো আমাদের বাসার এক্সেস দেই, মানে বাসায় প্রবেশ করতে দেই। বিষয়টা সে রকম। তবে আমার আশঙ্কা এটা যে, নেতিবাচক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কেউ এই সার্ভারে ডিডস অ্যাটাক করে সার্ভার ডাউন করে ফেলতে পারে। জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ পুলিশের কাছেই থাকবে। সার্ভার ডাটাবেজ আমাদের নিজস্ব। তবে জরুরি সার্ভিস দরকার হলে যেন দিতে পারে সে জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের টেকনিক্যাল লোকেরা আমাদের সঙ্গে থাকবেন। এর আগে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাব্বির সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুলিশদের শরীরে লাগানো থাকে বডি ক্যামেরা। পুলিশ কাউকে নিপীড়ন করছে কি না, অনেক সময় তারা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে কি না দেখতে, সেক্ষেত্রে তাদের বাঁচানোর জন্যও এটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বডি ক্যামেরায় যেসব ভিডিও ও অডিও যুক্ত থাকে সেটি তাৎক্ষণিকভাবে কন্ট্রোল সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়। কন্ট্রোল সেন্টার থেকে তারা দেখতে পারে এই ক্যামেরা যার কাছে থাকে সেই জায়গার পরিস্থিতি কেমন।  
১০ হাজার বডি ক্যামেরা এসেছে বিএনপি নেতার প্রতিষ্ঠান থেকে
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময় / স্বাস্থ্য খাতে সমস্যা চিহ্নিত করতেই মেয়াদ পার
সেবার মান ও গতি বাড়বে, কমবে সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি—অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন স্বপ্নই দেখিয়েছিল দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে। কিন্তু সরকারের বিদায়বেলায় বিগত দেড় বছরের পরিসংখ্যান মেলাতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, স্বপ্নের ছিটেফোঁটাও বাস্তবায়ন হয়নি। নতুন চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ এবং পদোন্নতি ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম নেই অন্তর্বর্তী সরকারের। এমনকি স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের দেওয়া সুপারিশও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন স্বাস্থ্য বিভাগ। উল্টো অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকটি সিদ্ধান্তের কারণে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, স্বাস্থ্যের ১৪টি খাতে অর্থ বরাদ্দ হয় অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে। কিন্তু হাসিনা সরকারের পতনের বছর ২০২৪ সালেই ওপি থেকে বেরিয়ে আসে সরকার। এতে স্বাস্থ্যের সব উন্নয়নমূলক কাজে স্থবিরতা নেমে আসে। স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর সমালোচনা করে স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব এশিয়া পোস্টকে বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা জুলাই বিপ্লবের আগে যেখানে ছিল, এখনো সেখানেই রয়েছে। মাঝখানে কিছু চিকিৎসকের পদোন্নতি হয়েছে। এর বাইরে আর কিছু দেখা যায়নি। দায়িত্বরত যে অজুহাতই দেন না কেন, রাষ্ট্রের নিযুক্ত কর্মকর্তারা যদি ঠিকভাবে তদারকি করেন, বাজেট দেন এবং জনগণকে প্রাধান্য দিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন, কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসার কথা। তবে বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমান বলছেন ভিন্ন কথা। অস্থায়ী সরকারের গত দেড় বছরে যত চিকিৎসকের পদোন্নতি, সিস্টেমের উন্নতি হয়েছে, তা অতীতে কখনো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। সমস্যা চিহ্নিতে গুরুত্ব, সমাধানে ভাটা অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য খাতের নানা সমস্যা চিহ্নিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। গত বছরের ৮ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডের শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন হলে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য খাতের ১০টি বড় সংকট বা ‘রোগ’ শনাক্তের কথা জানান সায়েদুর রহমান। সংকট নিরসনে কী উদ্যোগ নেবেন, সে পরিকল্পনার কথাও ওই সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন তিনি। সেদিন সায়েদুর রহমান বলেন, ‘মেধা, জ্ঞান ও যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা। পাশাপাশি অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষজ্ঞনির্ভর চিকিৎসা, প্রাথমিক চিকিৎসা উপেক্ষা করে বিশেষজ্ঞের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, স্বচ্ছতার অভাব ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবলহীনতা, চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধ ও চিন্তায় বিদেশনির্ভরতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পনায় দুর্বলতা, চিকিৎসা শিক্ষায় মানহীনতা, নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনায় অকার্যকারিতা এবং স্বাস্থ্য বাজেট বরাদ্দ ও ব্যবহারজনিত সমস্যা।’ তিনি আরও বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের মেডিকেল কলেজ মূল্যায়নের আওতায় আনা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন নয়, সেগুলো বন্ধ কিংবা একীভূত করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘নিম্নমানের কলেজ চালু রাখলে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছর দেশের স্বাস্থ্য খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ১৫ হাজার শয্যা ঘাটতি, বাড়েনি একটিও ওই সংবাদ সম্মেলনে সায়েদুর রহমান জানান, সারা দেশে রোগী অনুযায়ী ১৫ হাজারের বেশি শয্যার ঘাটতি রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানান তিনি। শয্যা সংকটে অধিকাংশ রোগীকে ছুটতে হয় বিভাগীয় ও রাজধানীয় ঢাকায়। ভোগান্তি লাঘবে শুধু জনবলের অভাবে অচল ৮১টি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে অন্তত এক হাজার শয্যা চালুর উদ্যোগের কথা জানানও সায়েদুর রহমান। কিন্তু সরকারের মেয়াদ শেষ হতে চললেও বাড়েনি একটি শয্যাও। দেড় বছরেও সবল হয়নি তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কাগজে-কলমে ৫০ শয্যার হাসপাতাল লেখা থাকলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন। ১১ বছর আগে ২০১৩ সালে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও হাসপাতালটিতে ৩১ শয্যার লোকবলও নেই। পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে খুঁড়িয়ে চলছে প্রান্তিক মানুষের এই ভরসাস্থল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতীয় সীমান্তর্বর্তী এ উপজেলায় তিন লাখের বেশি মানুষের বসবাস। দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন হাসপাতালটিতে। উপজেলার রাজিবপুর, রৌমারী ও পার্শ্ববর্তী দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষও আসেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে। কিন্তু হাসপাতালটিতে চিকিৎসক বলতে একজন মেডিকেল অফিসার রয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী এ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. রেজাউল ইসলাম জানান, তিনি এবং একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ছাড়া হাসপাতালে কোনো চিকিৎসক নেই। এ ছাড়া সাত ইউনিয়নের সাবসেন্টারে সাত মেডিকেল অফিসারের মধ্যে একজনও নেই। ফলে চিকিৎসক না থাকায় বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এই চিত্র শুধু জামালপুরের এক উপজেলা হাসপাতালের নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশের হাসপাতালে ১২ হাজার ৯৮০ চিকিৎসকের পদ শূন্য। এর মধ্যে ৪৯২ উপজেলা হাসপাতালে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার চিকিৎসকের ৫৩ শতাংশই খালি। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেবায়। সংকট কাটাতে সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের ২৯ মে ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর ১১ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। চার মাস পর সরকারের শেষ পর্যায়ে এসে সম্প্রতি গেজেট প্রকাশ হয়েছে। জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক ডা. জয়নাল আবেদীন টিটো এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের মূল সমস্যা এখনো নির্ণয় করা হয়নি। সংস্কার কমিশন যে সুপারিশ করেছে, তা দীর্ঘমেয়াদি। যে কোনো মানুষ অল্প সময়ে সেবা চান। উপজেলায় শুধু ডাক্তার নয়, নিম্নপদস্থ কর্মচারীরও তীব্র অভাব রয়েছে৷ দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু জনবল রয়েছে ৪০ বছরের আগের সিস্টেমে। দুই বছর আগের করা জনবলের স্ট্যান্ডার্ড সেটাপ বাস্তবায়ন হলেও সমাধান হতো, কিন্তু এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় সেটি পাস করেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সিস্টেম অনুযায়ী ওপির দরকার রয়েছে। বর্তমানে স্বাভাবিক রাজস্ব বাজেটে চলছে, অর্থাভাবে বহু সেবা আটকে আছে।’ প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবার চিত্র বদলাতে হলে জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে পুনর্বিন্যাস করতে হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা। জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো পরিবর্তন করে স্বাস্থ্য কাঠামো অনুযায়ী গড়তে হবে। অবকাঠামো স্বাস্থ্য, নারী, শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নবান্ধব হতে হবে। যেখানে সেবা মিলবে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মতো দ্রুত। এ জন্য দরকার পর্যাপ্ত জনবল। একই সঙ্গে দরকার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ। এগুলো না হলে যত পরিকল্পনাই করা হোক না কেন, স্বাস্থ্য খাত পরিবর্তন হবে না।’ আলোর মুখ দেখেনি শহরাঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রায় সাত কোটি মানুষের বসবাস। গ্রামাঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও শহরাঞ্চলের মানুষের সামান্য জ্বর হলেই ছুটতে হয় সেকেন্ডারি হাসপাতাল তথা জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা টারশিয়ারি হাসপাতালে। এতে ২০ টাকার চিকিৎসা নিতে গিয়ে চলে যায় হাজার টাকা। পাশাপাশি রোগীদের চাপ বেশি থাকায় মেলে না কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবাও। এ সমস্যা সমাধানে গত বছরের শুরুর দিকে বিভিন্ন শহরে ‘জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) ক্লিনিক’ চালুর উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। শুরুতে ঢাকা শহরে চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান। সে অনুযায়ী গত বছরের অক্টোবরের দিকে বিভাগীয় আটটি শহরে চালুর কথা ছিল। তবে এখন পর্যন্ত একটি ক্লিনিকও দৃশ্যমান হয়নি। আটকে গেছে সরকারি হাসপাতালে মডেল ফার্মেসি চালুর উদ্যোগ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সহজে ওষুধ প্রাপ্তির লক্ষ্যে সারা দেশে ‘ফার্মেসি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তেলার উদ্যোগ নেয় সরকার। প্রাথমিকভাবে সরকারি ৭০০ হাসপাতালে এই ফার্মেসি করা হবে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান। মূলত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৪২৯টি উপজেলা হাসপাতাল, ৫৯টি জেলা সদর হাসপাতাল, ৩৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২১টির মতো বিশেষায়িত হাসপাতালে এসব ফার্মেসি হবে। এসব ফার্মেসি সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, একাধিক সভা হলেও এখনো কোনো হাসপাতালেই চালু করা সম্ভব হয়নি।  ফাইলবন্দি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ গত বছরের ৫ মে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নিরসনে সংস্কার প্রস্তাব জমা দেয় স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন। ওই সময় যেসব সুপারিশ এখনই বাস্তবায়নযোগ্য তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে এলেও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা ছাড়া বাস্তবায়ন হয়নি আর কোনো সুপারিশ। সম্প্রতি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় নতুন করে ১৩৫টি ওষুধ যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ২৯৫টি। এসব ওষুধের দাম বেঁধে দেবে সরকার। যদিও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ঔষধ শিল্প সমিতি বলছে, ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর মতামত না নিয়েই তালিকা প্রস্তুত ও দাম বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য খাত-সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায়িত্ব নিয়ে কাগজে-কলমে কিছু অগ্রগতি হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও জনবল সংকট, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাব এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আগের মতোই রয়ে গেছে। বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, ‘লোক বাড়ালেই স্বাস্থ্যসেবার মান বেড়ে যাবে, এমনটা নয়। এখানে প্রতিষ্ঠানের মেশিনারিজ, সুযোগ-সুবিধা না বাড়িয়ে অর্থ বাড়লে লাভ নেই। স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের উদ্যোগ এর আগেও ১৯৯০, ২০০০ ও ২০১১ সালে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারও নিল। নিয়েছে। কিন্তু ফল দেখা যায়নি।’ যা বলছে মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক সায়েদুর রহমান। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘আইন বিষয়ক কিছু পরিবর্তন ছাড়া গত দেড় বছরে অন্য কোনো বিভাগে ৩০০-এর বেশি নিয়োগ, পদোন্নতি হয়নি। আমরা এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প থেকে বেরিয়ে এসেছি। হাজার হাজার রিক্রুটমেন্ট হয়েছে। সাড়ে তিন হাজার নার্স ও ১০ হাজার চিকিৎসকের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনো অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি। এক বছরে এত চিকিৎসকের পদোন্নতি অতীতে কখনো হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে পদায়নে ঘুষ গ্রহণসহ নানা অনিয়ম হতো। আমরা সেই পথও বন্ধ করে দিয়েছি। অটোমেশনের মাধ্যমে সব ধরনের পদায়ন ও বদলি হচ্ছে। আগামীতেও এমনভাবে হবে। ফলে যোগ্যতা দিয়ে পদায়ন, পদোন্নতি হবে, দলীয় প্রভাবে নয়। তবে আমাদের সময়ে যন্ত্রপাতি কেনা, ভবন বানানো সম্ভব নয়।’ শয্যা বাড়ানো প্রসঙ্গে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ‘শয্যা বাড়াতে গেলে লাগবে ২০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের বড় ধরনের চিন্তা ছাড়া এগুলো রাতারাতি করা সম্ভব নয়। একটা ৫০০ শয্যার হাসপাতাল করতেও ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা লাগে। আর সব শয্যা শুধু ঢাকায় করলে হবে না। এটা আমাদের পক্ষে করা এই মুহূর্তে অসম্ভব।’ জিপি সেন্টার চালু করতে না পারার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশেষ সহকারী বলেন, ‘এটার জন্য যথাসময়ে ফান্ড পাওয়া যায়নি। পরে পাওয়ায় ডিজাইনসহ সবকিছু প্রস্তুত করা হয়েছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে ছয় থেকে এক বছরের মধ্যে করতে পারবে।’
স্বাস্থ্য খাতে সমস্যা চিহ্নিত করতেই মেয়াদ পার
যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার / ২৩৯২ দিন টোলের এক টাকাও সরকারকে দেয়নি ওরিয়ন
৯ মাস ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি) রাজধানীর যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার (মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার) থেকে আদায় করা টোলের টাকার ভাগ দিচ্ছে না ওরিয়ন গ্রুপ। কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে যানবাহন না চলার অজুহাত দেখিয়ে গেল বছরের মে মাস থেকে প্রায় ২৮০ দিন ধরে (চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) সিটি করপোরেশনকে কোনো টাকা দেয়নি তারা। এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়, এর আগে একই কারণ দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ বছরেরও বেশি সময় সরকারকে রাজস্ব দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এবার কম যানবাহন চলাচলের কথা বলে টোলের ভাগ বন্ধ রাখার পাশাপাশি আরও দুই হাজার ৩৪ দিনের জন্য (৫ বছর ৬ মাস ২৮ দিন) চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনও জানিয়েছে ওরিয়ন।  বকেয়া শোধ না করে মেয়াদ বাড়ানোর তোড়জোড় দেশের প্রথম টোলভিত্তিক পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প হিসেবে নির্মাণ করা হয় যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার। ২০১৩ সালের ১৩ অক্টোবর দেশের দীর্ঘতম এই ফ্লাইওভারে যান চলাচল শুরু হয়। সেদিন থেকেই চলছে টোল আদায়। শুরু থেকেই ফ্লাইওভারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করছে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ফ্লাইওভার চালুর পর গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ হাজার ১৫৭ দিনের (১১ বছর ৪ মাস ১৯ দিন) মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৭৬৫ দিনের (৪ বছর ১০ মাস চার দিন) টোলের ভাগ সিটি করপোরেশনকে দিয়েছে ওরিয়ন। ইক্যুয়িটি বেনিফিট শেয়ার হিসেবে এ টাকা পরিশোধ করলেও বাকি ২ হাজার ৩৯২ দিনের (৬ বছর ৬ মাস ২০ দিন) টোলের টাকার কোনো ভাগ সিটি করপোরেশনকে দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। করপোরেশনের পক্ষ থেকে পাওনা টাকার জন্য লিখিত ও মৌখিকভাবে যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।  ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তাদের (ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড) লিখিত ও মৌখিকভাবে করপোরেশনের বকেয়া টাকা পরিশোধের জন্য বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কোনো সাড়া নেই।’ বকেয়া পরিশোধ না করলেও গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ডিএসসিসির প্রশাসকের কাছে ২ হাজার ৩৪ দিনের (পাঁচ বছর ৬ মাস ২৮ দিন) জন্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবাইদুল করিম। চুক্তি অনুযায়ী দৈনিক ৪৩ হাজার ২৮৩টির চেয়েও কম গাড়ি চলাচল করে উল্লেখ করে ওই আবেদনে তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দুই হাজার ৩৪ দিন চুক্তির চেয়েও কম গাড়ি চলাচল করেছে। এতে ওরিয়নের রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে।   যানবাহন চলাচল কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে ওই আবেদনে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিখেছেন,  চুক্তিলঙ্ঘন করে ডিএসসিসি দয়াগঞ্জ-পোস্তগোলা লিংক রোড ও ঢাকা সিটি বাইপাস নির্মাণ করেছে এবং এই দুটি সড়কে ফ্লাইওভারের সমান্তরাল সুবিধা থাকার কারণে ফ্লাইওভারে যানচলাচল কম হয়েছে।  এছাড়াও গুলিস্তানে অননুমোদিত জুতার বাজার, অনিয়ন্ত্রিত বাস পার্কিং এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ ও প্রস্থান পয়েন্টে অ-মোটরচালিত যানবাহনের (রিকশা) অব্যাহত উপস্থিতির কারণেও ফ্লাইওভারে যানবাহন কম ওঠে। এছাড়াও ফ্লাইওভারে নিম্ন-শ্রেণির যানবাহন (দুই চাকার) টোল রাজস্বে ন্যূনতম অবদান রাখে, কিন্তু উচ্চ টোল যানবাহনগুলো (বাস, ট্রাক, ট্রেলার) সে তুলনায় কম যাতায়াত করে।  চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে কিছু সুপারিশ দিয়েছে- এসব কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা হবে।   বারবার একই অজুহাত : ১১ বছরে ডিএসসিসির আয় মাত্র ৪০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা চুক্তির দোহাই দিয়ে ওরিয়ন বারবার রাজস্ব পরিশোধ বন্ধ করলেও ডিএসসিসির কর্মকর্তারা বলছেন, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করপোরেশনের চুক্তির মধ্যেই শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। সে সুযোগই বারবার কাজে লাগাচ্ছে ওরিয়ন।  এ ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ফ্লাইওভার দিয়ে কতটি বাস, ট্রাক ও অন্যান্য বাস গেলে করপোরেশন রাজস্ব পাবে এটি সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তির সময় সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। এ কারণে বছর শেষে দেখা যায় ফ্লাইওভারে যানবাহন চলাচল কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে হচ্ছে না। আমি মনে করি, সে সময়ের চুক্তিটিই ভালোভাবে হয়নি, এটি ছিল অসম চুক্তি। আবার চুক্তি অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর মূল্যস্ফীতি অনুযায়ী টোলের টাকা সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছিল কিন্তু সেটি নিয়মিত করা হয়নি। ২০২০ সালের একটি জরিপে ৯৪ হাজার গাড়ি চলাচলের কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি একটি জরিপে চলাচলকৃত গাড়ির সংখ্যা সন্তোষজনক ছিল। সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানান, ২০১৩ সালে ফ্লাইওভার চালুর পর ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত কোনো টাকা দেয়নি ওরিয়ন। ২০২০ সালের জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস নিজেই বিষয়টি নিয়ে ওরিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের ফ্লাইওভার দিয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক গাড়ি চলে না। তাই চুক্তি মোতাবেক সেই পরিমাণ গাড়ির বেশি না চললে তারা লভ্যাংশ দেবে না।  পরে সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় ফ্লাইওভারের প্রতিটি সংযোগে টোলপ্লাজা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন মেয়র তাপস। এর অংশ হিসেবে ফ্লাইওভারের সাতটি টোলপ্লাজায় করোনাকালীন সময়ে ওই বছরের গাড়ি চলাচল নিয়ে একটি জরিপ করেন। জরিপে ফ্লাইওভার দিয়ে প্রতিদিন ৯৪ হাজার ৩৫৩টি গাড়ি চলাচলের রিপোর্ট প্রদান করা হয়। জরিপের রিপোর্টে করোনাকালীন সেই সময়ে ফ্লাইওভার দিয়ে তুলনামূলক কম গাড়ি চলছে উল্লেখ করা বলা হয়, করোনার পর গাড়ি চলাচলের সংখ্যা আরও বাড়বে ।   এদিকে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের হিসাব বলছে, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারে প্রতি ঘণ্টায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলে ৮ থেকে ১০ হাজার। এক দিনে গাড়ি চলে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার। বছরে গাড়ি চলে ৭০ কোটি ৮০ হাজার। সে হিসেবে টোল আদায় হওয়ার কথা বছরে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। আর ওরিয়ন হিসাব দিচ্ছে বছরে ১৪০ কোটি থেকে ১৭৮ কোটি টাকার। এ ছাড়া ফ্লাইওভারের নির্মাণ নকশা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নিচের রাস্তা বন্ধ করে পায়ার ও ডিভাইডার করা হয়েছে যাতে গাড়ি কম চলতে পারে। মেয়র তাপসের সমীক্ষার পর প্রতি মাসে লভ্যাংশ দিতে রাজি হলেও শেষ পর্যন্ত কথা রাখেনি ওরিয়ন। ডিএসসির রাজস্ব বিভাগের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ইক্যুইটি শেয়ার বেনিফিট হিসেবে সিটি করপোরেশনকে সবমিলিয়ে ৪০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে ওরিয়ন। এরপর থেকে ফের লভ্যাংশ দেওয়া বন্ধ রেখেছে তারা।   অসম চুক্তির সুযোগ নেয় ওরিয়ন, পদে পদে অনিয়ম চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন পাওয়ার পর গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারে গাড়ি চলাচলের প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। গত ১১ নভেম্বর কমিটির পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন করপোরেশনে জমা দেওয়া হয়। ১২ নভেম্বর সেটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পাঠানো হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে।  ওই প্রতিবেদনের একটি কপি পেয়েছে এশিয়া পোস্ট। তাতে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০০৫ সালের ২১ জুন বেলহাসা–একম জেভি ও এসোসিয়েটস লিমিটেডের সঙ্গে ডিএসসিসির যাত্রাবাড়ী–গুলিস্তান ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রথম চুক্তি হয়। ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি বেলহাসা–একম জেভি ও এসোসিয়েটস লিমিটেডের পরিবর্তে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে করপোরেশনে লিপিবদ্ধ হয়। চুক্তির সিডিউল–সি অনুযায়ী টোল আদায়ের শুরুর দিন থেকে ২০৩৭ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দৈনিক ৪৩ হাজার ২৮৩টি গাড়ি চলাচল করলে ২৪ বছর সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান মালিকানা ভোগ করবে। সে অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১ মে থেকে আরও ৪১৮৩ দিন চুক্তির মেয়াদ আছে।  প্রতিবেদন দাখিলের পূর্ববর্তী ৪১৫৭ দিনে ফ্লাইওভারে চলাচলকৃত গাড়ি ও রাজস্ব জমাদানের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের যানবাহন চলাচলের ঘাটতি দেখানোর কারণে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ডিএসসিসিকে ২৩৯২ দিনের কোনো ইক্যুইটি বেনিফিট শেয়ার প্রদান করেনি। পরবর্তীতে ১৭৬৫ দিনের শেয়ার প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে তথ্য ভিত্তিক জবাবদিহিতায় আনার সুপারিশ করে কমিটি।  এছাড়া টোল আদায়ের স্লিপ প্রস্তুত এবং বিকাশে টোল পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে ওরিয়ন সিটি করপোরেশনের মতামত নেয়নি বলে জানতে পেরেছে কমিটি। তাই ওই দুই পদ্ধতিতে আদায়কৃত টোলের লভ্যাংশ ডিএসসিসি পেয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হতে পারেনি কমিটি।   প্রতিবেদনে বলা হয়, টোল প্লাজার স্লিপের মাধ্যমে মাসিক রিপোর্টে টোলপ্লাজার নাম, কাউন্টার নাম্বারের বিপরীতে সিরিয়াল নম্বর ও গাড়ির ধরন উল্লেখ না থাকায় গাড়ির সংখ্যা টোল আদায়ের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এক্ষেত্রে বিকাশ পেমেন্টের টাকার শেয়ার নিশ্চিতকরণ, আদায়কৃত টোল দৈনিক ব্যাংকে বিবরণী ও অনলাইন পেমেন্ট হিসেব নেওয়া এবং টোল আদায়ে কম্পিউটার সিস্টেম ক্রস চেকিংয়ের জন্য আইটি বিশেষজ্ঞের দ্বারা পরীক্ষার সুপারিশ করে কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনে এমন আরও বহু অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে করপোরেশনে লভ্যাংশের টাকা না দিলে পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফার হার অনুযায়ী দুই শতাংশ হারে অপরিশোধিত টাকার ওপর মুনাফা পরিশোধ করতে হবে। তবে ওরিয়ন ২০১৩ সাল থেকে এই অপরিশোধিত টাকার ওপর মুনাফা পরিশোধ করেনি।  কমিটির পক্ষ থেকে দ্রুত এই বকেয়া মুনাফা আদায়ের তাগিদ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী ফ্লাইওভারে ৬৫ হাজার ৫৮১টির ওপর যানবাহন চলাচল করলে নিট আয়ের ৪০ শতাংশ করপোরেশন প্রাপ্য হবে। তবে চুক্তির সিডিউল–সি মতে ৫ শতাংশ শেয়ারের অর্থ থেকে ৪০ শতাংশ নিট মুনাফাপ্রাপ্তি হবে বহুগুণ বেশি। সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, ইক্যুইটি শেয়ার ৪০ শতাংশ নিট মুনাফার বিষয়টি অনুপস্থিত। কমিটি চুক্তির এই অংশটি স্পষ্টকরণের মতামত দিয়েছে করপোরেশনকে।  তদন্ত কমিটি আরও উল্লেখ করে, ২০০৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী যানবাহনের শ্রেণি ১১টি এবং চুক্তির সিডিউল–সি অনুযায়ী যানবাহনের শ্রেণি ৮টি ধরা হয়েছিল। তবে ২০১৩ সালে কোন শর্তবলে যানবাহনের শ্রেণি বৃদ্ধি করা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। সিডিউল–সি অনুযায়ী জিপ, মাইক্রোবাস ও পিকআপ এক শ্রেণির হলেও টোলের হার করা হয়েছে ৩০, ৩৫ ও ৫৫ টাকা। ট্রাক ও ট্রেইলার একই শ্রেণির হলেও পরবর্তীতে পৃথক শ্রেণি করে টোলের হার ৭৩, ১১০ ও ১১৫ টাকা করা হয়েছে। চুক্তিতে যানবাহনের শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। বিষয়টি স্পষ্টীকরণের সুপারিশ করেছে কমিটি।  এছাড়া টোল আদায়ের স্লিপের স্বচ্ছতা, টোল আদায় লেনে কম্পিউটার সিস্টেম ও বুথের লেনের জন্য এআই ক্যামেরা সংযুক্ত করা, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও সিস্টেম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সিস্টেম সিকিউরিটি সংরক্ষণের প্রতিষ্ঠান পৃথক করতে সুপারিশ করে।  এর সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানসম্মত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট ফার্ম দ্বারা যানবাহন সংখ্যা, ধরন ও সমগ্র রাজস্ব আদায়ের অডিট করতে করপোরেশনকে সুপারিশ করা হয়েছে।  চূড়ান্ত সুপারিশে ডিএসসিসিকে ফ্লাইওভারে চলাচলরত যানবাহনের ধরন ও সংখ্যা নির্ণয়ে ডিজিটাল আইটি সিস্টেম স্থাপন করা ও সময়ে সময়ে ম্যানুয়ালি যানবাহন গণনা করতে বলেছে কমিটি।  কমিটির আহ্বায়ক ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মোবাশ্বের হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, সে সময় যারা করপোরেশনের দায়িত্বে ছিলেন তারা জেনে বা না বুঝেই একটি অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। ফ্লাইওভারের টোল আদায়ের মনিটরিং সিটি করপোরেশনের আয়ত্তে রাখার কথা থাকলেও সেটি সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়েছে। তারাই মনিটরিং করে করপোরেশনকে রিপোর্ট করবেন, কিন্তু এটি কখনোই হয়নি। তারা তথ্যই দেয়নি ডিএসসিসিকে। আবার যেটি দিয়েছে সেটি চলাচলকৃত গাড়ির চেয়েও কম। তিন বছর পর পর টোল আদায়ের মূল্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে সমন্বয় করার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশে ৫ নির্দেশনা মন্ত্রণালয়ের ওরিয়নের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন বিবেচনার স্বার্থে কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ডিএসসিকে পাঁচটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে-   চুক্তির অনুচ্ছেদ ৯ অনুযায়ী ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সঠিক সংখ্যা ও ধরন পরীক্ষা-নিরীক্ষার লক্ষ্যে নিরপেক্ষ অডিটর (দেশের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের স্বনামধন্য ফার্ম) নিয়োগ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। চুক্তির ১৮.২ ধারা অনুযায়ী ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড কর্তৃক যানবাহন চলাচলের ধরন ও সংখ্যা নির্ধারণে ব্যবহৃত হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের ডেটাবেস, ড্যাশবোর্ড এবং রিপোর্টিং অ্যাক্সেস করপোরেশনকে প্রদানসহ দৈনিক/মাসিক যানবাহন চলাচল গণনা শিটে উভয়পক্ষের স্বাক্ষর গ্রহণ। সব ধরনের যানবাহনের লাইভ ডাটা ডিএসসিসি কর্তৃক এক্সেস থাকা অটোমেশন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। চুক্তির ধারা ১৮.২ অনুযায়ী ২০২৬ সাল থেকে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে প্রতিদিন/প্রতি সপ্তাহ/প্রতি মাসে ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ও ধরন মনিটরিং নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১টি মনিটরিং সেল গঠন করা এবং ওই মনিটরিং সেল কর্তৃক করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দৈনিক/সাপ্তাহিক/মাসিক প্রতিবেদন দাখিলের ব্যবস্থা গ্রহণ। ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলকারী যানবাহন গণনাকল্পে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য ব্যবস্থার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং যানবাহন চলাচলের সংখ্যা ও ধরন নির্ণয়ে করপোরেশন কর্তৃক সময়ে সময়ে ম্যানুয়ালি জরিপ কার্য পরিচালনা করা এবং চুক্তি অনুযায়ী ফ্লাইওভার পরিচালনা ও রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি যথাযথ তদন্তপূর্বক সুষ্ঠু সমাধান নিশ্চিত করা। বক্তব্য মেলেনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড গ্রুপের বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবাইদুল করিমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। যাত্রাবাড়ী–গুলিস্তান ফ্লাইওভারে ওরিয়নের   হটলাইন নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়ার পরও কেউ রিসিভ করেননি।  ওরিয়নের পক্ষে ডিএসসির সঙ্গে যোগাযোগ সমন্বয়কারী কর্মকর্তা জাকারিয়া ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে খালেদ মাসুদ নামে ওরিয়ন গ্রুপের এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে ফোন করে, অফিসে গিয়ে তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পরামর্শ দেন। তবে যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের লভ্যাংশ নিয়ে ডিনএসসির সঙ্গে জটিলতার ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।
২৩৯২ দিন টোলের এক টাকাও সরকারকে দেয়নি ওরিয়ন
তারেক রহমানের নামে কয়ছরের প্রতারণা / ৩ কোটিতে বিএনপির মনোনয়ন চুক্তি, ৬৫ লাখ অগ্রিম
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রবাসীর কাছ থেকে ৬৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সুনামগঞ্জ-৩ আসনে (শান্তিগঞ্জ ও জগন্নাথপুর) ধানের শীষের প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ; যিনি কয়ছর এম আহমেদ নামেই পরিচিত। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম ব্যবহার করে তিনি এ মনোনয়ন বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিএনপি কর্মী আমিনুল ইসলাম মিঠুকে তিন কোটি টাকার বিনিময়ে রাজশাহী-৬ আসনে (চারঘাট ও বাঘা) মনোনয়ন নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অগ্রিম হিসেবে ৬৫ লাখ টাকা নেন কয়ছর। তবে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পাইয়ে দিতে না পারলেও কয়ছর আহমেদ টাকা ফেরত দিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন মিঠু। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিস্তারিত অনুসন্ধান করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হয়েছে এশিয়া পোস্ট। জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিএনপি কর্মী আমিনুল ইসলাম মিঠুর বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চন্ডিপুর বাজার এলাকায়। তিনি বর্তমানে নিউইয়র্কের ব্রঞ্চ শহরের স্টারলাইন এলাকায় বসবাস করেন। নিউইয়র্কের স্টারলাইন, জ্যাকসন হাইটস, চায়না টাউন ও ম্যানহাটনে তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় এবার তিনি নিজ এলাকা থেকে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করেন। তাকে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (তৎকালীন) তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দেওয়া যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কয়ছর আহমেদ। তিন কোটি টাকার বিনিময়ে মিঠুকে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার বিষয়ে কয়ছরের সঙ্গে আলোচনা, চুক্তি ও লেনদেনের বিষয়টি মধ্যস্থতা করেন রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি (মিঠুর পূর্ব পরিচিত) তোফাজ্জল হোসেন তপু। চুক্তি মোতাবেক টাকা লেনদেনের জন্য আমিনুল ইসলাম মিঠুকে হোয়াটসঅ্যাপে দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠান কয়ছর আহমেদ। এছাড়া দলের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত হয়েছে মর্মে কিছু নথিপত্রও মিঠুকে পাঠান তিনি। সেসব নথিতে মিঠুর মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছে বলে দেখানো হয়। পরে গত বছরের অক্টোবর মাসে কয়ছরের দেওয়া অ্যাকাউন্টে মিঠুর পক্ষ থেকে কয়েক দফায় মোট ৬৫ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। টাকা জমা দেন মিঠুর  ছোট ভাই আবুল হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন তপু, মিঠুর প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারীর ভাই সাখাওয়াত (বাংলাদেশে অবস্থানরত) এবং নিউইয়র্কে মিঠুর ভাড়া বাসার মালিকের ভাই বিমল চন্দ্র পোদ্দার (বাংলাদেশে অবস্থানরত)।  টাকা পাওয়ার পর কয়ছর জানান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে কোনো সময় মিঠুকে ফোন করবেন। যদিও তারেক রহমান মিঠুকে কখনো ফোন করেননি কিংবা কোনো মাধ্যমে তার সঙ্গে কথাও বলেননি। দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। কয়ছরের কথায় মিঠু তার বৃদ্ধ বাবাকে গুলশানে পাঠান। কিন্তু মিঠুর বাবাকে কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশের ব্যবস্থাও করতে পারেননি কয়ছর। শেষ পর্যন্ত মিঠু মনোনয়নও পাননি।  মনোনয়নবঞ্ছিত হওয়ার পর আমিনুল ইসলাম মিঠু কয়ছর আহমেদ ও তোফাজ্জল হোসেন তপুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের একটি গ্রুপ কলে আলোচনার অডিও এসেছে এশিয়া পোস্টের হাতে। ওই কথোপকথনে মনোনয়নের টোপ দিয়ে মিঠুর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চূড়ান্ত তালিকায় নাম না থাকার পরও মিঠুকে আশ্বস্ত করে ওই রেকর্ডিংয়ে তপুকে বলতে শোনা যায়, তিনি প্রয়োজনে নিজেই তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলবেন। তারপরও মনোনয়ন নিশ্চিত না হলে তারেক রহমানকে কৈফিয়ত দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তপু। এ সময় বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। মনোনয়ন তালিকা ও তারেক রহমানের নাম ব্যবহার দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করেই আমিনুল ইসলাম মিঠুর মনোনয়ন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন কয়ছর আহমেদ। এজন্য প্রথমে তিনি দলীয় মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের একটি তালিকা মিঠুর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। সেখানে দেখা যায়, এক পাতায় রাজশাহী-৪, রাজশাহী-৫ ও রাজশাহী-৬ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা ও দুটি মন্তব্যের ঘর রয়েছে। ওই তালিকায় রাজশাহী-৬ এর ঘরে ক্রমান্বয়ে আবু সাঈদ চাঁদ, আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল, নুরুজ্জামান খান মানিক ও শেষে আমিনুল ইসলাম মিঠুর নাম রয়েছে। মন্তব্যের ঘরে ইংরেজিতে লেখা, আমিনুল ইসলাম মিঠুর সঙ্গে কথা বলুন এবং তার নৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সামর্থ্য আছে কিনা আমাকে দ্রুত জানান। পরবর্তী মন্তব্যের ঘরে লেখা রয়েছে- থ্রিসি অর অ্যাবোভ, ডিপেন্ডিং অন পলিটিক্যাল ইনভলভমেন্ট {তিন সি (কোটি) বা বেশি, নির্ভর করছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ওপর}। দুটি মন্তব্যের নিচেই লেখা, কমেন্টেড বাই তারেক রহমান অর্থাৎ মন্তব্য দুটি তারেক রহমানের। সেখানে তারিখ লেখা রয়েছে-৯ আগস্ট ২০২৫। এর কয়েক দিন পর মিঠুর কাছে আরও একটি তালিকা পাঠান কয়ছর আহমেদ। যেখানে তিনটি আসনের মধ্যে রাজশাহী-৬ আসনে শুধু আমিনুল ইসলাম মিঠুর নাম। মন্তব্যের ঘরে লেখা-অ্যাপ্রুভড বাই চেয়ারপার্সন অর্থাৎ চেয়ারপারসনের মাধ্যমে অনুমোদিত। এর পরের লাইনে আগের মতো লেখা, থ্রিসি অর অ্যাবোভ, ডিপেন্ডিং অন পলিটিক্যাল ইনভলভমেন্ট [তিন সি (কোটি) বা বেশি, নির্ভর করছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ওপর]। এই নথিতেও মন্তব্যের নিচে লেখা রয়েছে, কমেন্টেড বাই তারেক রহমান। তারিখ দেওয়া ২ অক্টোবর ২০২৫। মিঠুর দাবি, ৯ আগস্ট ও ২ অক্টোবরের এসব নথি ও তালিকা দেখে তিনি আশ্বস্ত হন এবং কয়ছরকে টাকা দেন।  আমিনুল ইসলাম মিঠু বলেন, টাকা দেওয়ার পর কয়ছর একাধিকবার আমাকে বলেছেন, চেয়ারম্যান সাহেব (তারেক রহমান) যে কোনো সময় তোমার সঙ্গে কথা বলবেন। সুখবরটি তিনিই তোমাকে দেবেন। এজন্য সবসময় কোন নম্বর চালু থাকে সেটি জিজ্ঞেস করেন কয়ছর। তবে তারেক রহমান কখনোই মিঠুর সঙ্গে কথা বলেননি।  যেভাবে টাকা লেনদেন অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, কয়ছর আহমেদ যে দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর মিঠুকে দিয়েছেন তার একটি সিটি ব্যাংকের সাতক্ষীরা শাখার। যার শেষ চার অংক ৩০০১। এই অ্যাকাউন্টের মালিক শাওন আহমেদ সোহেল নামে এক ব্যক্তি। তবে সাতক্ষীরায় সোহেল নামের এই ব্যক্তির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। পরে এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, অ্যাকাউন্ট সাতক্ষীরায় হলেও শাওন সোহেলের বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার নন্দীকুজা গ্রামে। বর্তমানে তিনি লন্ডনের হ্যাম্পশায়ারের গোল্ডস্মিথ অ্যাভিনিউয়ে বসবাস করেন। তার বিরুদ্ধে যশোরে একটি প্রতারণার মামলাও রয়েছে। ৬-৭ বছর আগে সোহেল লন্ডনে যান এবং কয়ছর আহমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তার বিভিন্ন বিষয় তদারকি করেন। সোহেলের বাবার নাম শাহজাহান আলী। তিনি সম্প্রতি একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে অবসরে গেছেন।  সোহেলের সিটি ব্যাংকের ওই অ্যাকাউন্টের লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আমিনুল ইসলাম মিঠুর দেওয়া ৬৫ লাখ টাকার মধ্যে ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা আসমা আক্তার নামের এক নারীর অ্যাকাউন্ট ঘুরে শেষ পর্যন্ত সোহেলের অ্যাকাউন্টেই জমা হয়েছে। বাকি টাকা সরাসরি সোহেলের অ্যাকাউন্টেই জমা হয়েছে। পরে বিভিন্ন সময়ে আরটিজিএস ও এনপিএসবির (ব্যাংক থেকে দ্রুত বড় ও মাঝারি অঙ্কের টাকা ট্রান্সফারের পদ্ধতি) মাধ্যমে সে টাকা অন্যত্র পাঠানো হয়।  কয়ছর আহমেদের দেওয়া অপর অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেটি অগ্রণী ব্যাংকের নেত্রকোনা শাখার। ওই অ্যাকাউন্টের শেষ চার অঙ্ক ০০০২। এটির মালিক আসমা আক্তার নামে এক নারী। তার বাড়ি নেত্রোকোনা সদরের দেওপুর গ্রামে।  আমিনুল ইসলাম মিঠুর দেওয়া তথ্য এবং শাওন আহমেদ সোহেল ও আসমা আক্তারের ব্যাংক তথ্য বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ৬৫ লাখ টাকার মধ্যে আসমা আক্তারের অ্যাকাউন্টে জমা হয় ১৭ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে গত বছরের ৫ অক্টোবর অগ্রণী ব্যাংকের ঢাকা বিজয়নগর শাখা থেকে আসমার অ্যাকাউন্টে ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা দেন তোফাজ্জল হোসেন তপু। একই দিন ওই অ্যাকাউন্টে পল্লবী শাখা থেকে আরও ৫ লাখ টাকা জমা দেন মিঠুর ভাই আবুল হাসান। এই ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা থেকে ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা গত ৮ অক্টোবর আরটিজিএস করে শাওনের সিটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। বাকি টাকার মধ্যে ৫ লাখ লেনদেন হয় কুয়েতে।   এদিকে ৫ অক্টোবর মিঠুর ছোট ভাই আবুল সিটি ব্যাংকের পল্লবী শাখা থেকে শাওন আহমেদ সোহেলের সাতক্ষীরার অ্যাকাউন্টে ৬ লাখ ৫০ হাজার ও ৬ লাখ টাকা জমা দেন। একই দিনে ডাচ-বাংলা ব্যাংক থেকে মিঠুর কর্মচারীর ভাই সাখাওয়াত এনপিএসবি করে ৩ লাখ, ২ লাখ ৫০ হাজার জমা দেন। ৬ অক্টোবর রুপালি ব্যাংকের বরিশাল শাখা থেকে সোহেলের সাতক্ষীরার সিটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ টাকা আরটিজিএস করে পাঠান বিমল চন্দ্র পোদ্দার। এছাড়া তোফাজ্জল হোসেন তপু ১৪ অক্টোবর সাওন আহমেদ সোহেলের অ্যাকাউন্টে আরটিজিএস করে আরও ১০ লাখ টাকা জমা দেন। আসমা আক্তারের অ্যাকাউন্টে ১২ লাখ ৮০ হাজার ও সোহেলের অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা জমা হয় তপুর মাধ্যমে। এই ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা মিঠুর ছোট ভাই আবুল হোসেন থেকে হাতে হাতে নিয়েছিলেন তপু। পরে সে টাকা কয়ছরকে পৌঁছে দিতে ওই দুই অ্যাকাউন্টে পাঠান তিনি।  কয়ছর-সোহেল-আসমার সম্পর্ক কী লেনদেনের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে নেত্রকোনার দেওপুর গ্রামে আসমার বাড়িতে যান এশিয়া পোস্টের জেলা প্রতিনিধি। যুক্তরাজ্য বিএনপি নেতার অবৈধ টাকা কীভাবে আসমার অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে তা জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। অবশ্য তিনি দাবি করেছেন, অ্যাকাউন্টটি তার স্বামী দেখভাল করেন।  আসমার স্বামী আব্দুস সালামের সঙ্গেও যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। সালাম একটি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে চাকরি করেন। বর্তমানে কুয়েতে ওই বাহিনীর হয়ে একটি মিশনের কাজ করছেন। তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানা যায়, সোহেলের বাবা শাহজাহানও ওই একই মিশনে কর্মরত ছিলেন। অর্থাৎ আসমার স্বামী ও সোহেলের বাবা সহকর্মী ছিলেন।  ঘটনা স্বীকার করেছেন আসমার স্বামী কুয়েত থেকে আসমার স্বামী আব্দুস সালাম মোবাইল ফোনে এশিয়া পোস্টকে বলেন, কুয়েতে অবস্থানকালে সহকর্মী শাহজাহান আলী আসমার অ্যাকাউন্টে ওই টাকা পাঠিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে নিজের ছেলে শাওন সোহেলের অ্যাকাউন্টে  ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ট্রান্সফার করেন শাহজাহান। বাকি ৫ লাখ ক্যাশ নিয়েছেন। আব্দুল সালাম টাকা গুণে শাহজাহানকে দিচ্ছেন এমন ভিডিও ফুটেজও পেয়েছে এশিয়া পোস্ট। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক থেকে তোলা টাকা গুনে নিচ্ছেন শাহজাহান।  কিন্তু এই টাকা কেন আসমার অ্যাকাউন্টে লেনদন করা হয়েছে তা জানতে চাইলে সদুত্তর দিতে পারেননি সালাম। শাহজাহান মিয়ার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।  সোহেলের বক্তব্য এসব বিষয়ে কথা বলতে লন্ডনে অবস্থানরত শাওন আহমেদ সোহেলের ভ্যারিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সোহেল বলেন, তিনি কয়ছর আহমেদ কিংবা আমিনুল ইসলাম মিঠু নামে কাউকে চেনেন না।  তাহলে কয়ছর আহমেদ সংশ্লিষ্ট লেনদেনে তার অ্যাকাউন্ট কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন প্রশ্ন করলে সোহেল দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে পরিচিত একজন তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। এ কারণে লেনদেন সংক্রান্ত কোনো তথ্য তার কাছে নেই। এ লেনদেনের সঙ্গে তার বাবার সম্পৃক্ততার বিষয়টি উবল্লেখ করলে সোহেল বলেন, বাবা ও পরিবারের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। বাড়ি নাটোরে অ্যাকাউন্ট কেন সাতক্ষীরায় সাওন আহমেদ সোহেলের বাড়ি নাটোরে হলেও সাতক্ষীরায় কীভাবে ও কেন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করেছেন তা জানতে চাইলে সিটি ব্যাংকের সাতক্ষীরা শাখার ম্যানেজার রবিউল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, সিটি ব্যাংকে এক সময় অনলাইনে অ্যাকাউন্ট করা যেত। তখন করে থাকতে পারে। অনেকে এই সুযোগটা নিয়েছে জানতে পেরে সিটি ব্যাংক অনলাইনে অ্যাকাউন্ট করার পদ্ধতি বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানান তিনি।  কথা বলতে চেয়েও বলেননি কয়ছর এ বিষয়ে কথা বলতে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কয়ছর এম আহমেদের সঙ্গে বৃহস্পতিআর (৫ ফেব্রুয়ারি) মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তাকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে মিঠুর সঙ্গে লেনদেনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এখন কথা বলতে পারবেন না বলে জানান। তবে পরবর্তীতে তাকে একাধিকবার কল দিলেও আর রিসিভ করেননি। পরে তার মোবাইলে ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলেও সাড়া দেননি। এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কেউই মন্তব্য করতে রাজি হননি। এমনকী তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে সেটিও প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। দায় এড়াতে পারে না দল : টিআইবি নির্বাচনের মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা দেখেছি জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ৫ আগস্ট থেকেই সারা দেশে বিভিন্নভাবে যারা ক্রিয়াশীলরা বড় রাজনৈতিক দলগুলো যে ধরনের দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ইত্যাদি শুরু করেছে, সেটারই একটা দৃষ্টান্ত। রাজনৈতিক অবস্থান বা নির্বাচনের অবস্থানটা বা জনপ্রতিনিধি অবস্থানটা দেখা হয় দুর্নীতি করার বা ক্ষমতা ব্যবহার করার লাইসেন্স হিসেবে। সেই কারণে এই লাইসেন্সটা পাওয়ার জন্য কেনাবেচা হয়। এটারই একটা দৃষ্টান্ত।  এ ঘটনায় জড়িতদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে মন্তব্য করে ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ঘটনা সঠিক হলে সংশ্লিষ্ট দলও দায় এড়াতে পারে না। এখানে একাধিক অপরাধ রয়েছে। প্রথমত, অবৈধ লেনদেন অপরাধ- যেটা কেউ করতে পারে না। দ্বিতীয়ত নির্বাচনে অংশগ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া, যেটা করতে পারেন না এবং সেটাকে এইভাবে মনোনয়নের অঙ্গীকার করে প্রতারণামূলকভাবে আশ্রয় নিতে পারেন না। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, এটা অবৈধ লেনদেন মোটামুটি পরিষ্কারভাবে। যেহেতু সংঘটিত হয়েছে, কাজেই এর সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত তাদের তো অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতায় আনতে হবে। অন্যদিক থেকে,  এর সাথে রাজনৈতিক দলে যারা জড়িত, তাদের ক্ষেত্রে এটা  একক মনে করার কোনো সুযোগ নেই। 
৩ কোটিতে বিএনপির মনোনয়ন চুক্তি, ৬৫ লাখ অগ্রিম