অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য অস্বাভাবিক গতিতে বেড়েছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ডিএসসিসির আয়-ব্যয় সমন্বয়ের পর ৮২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পরের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) আয়ের চেয়ে ১০২ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের তুলনায় আয় বাড়লেও ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে ২০৪ কোটি টাকা হয়েছে।
ডিএসসিসির অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকে রাখা ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) ভেঙে সে টাকা দিয়ে বর্ধিত ব্যয়ের চাপ সামাল দিচ্ছে করপোরেশন। অর্থনৈতিক টানাপড়েনের কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম ও ঠিকাদারি বিল পরিশোধেও সংকট দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যে ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা।
ডিএসসিসির অর্থবিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৩০ কোটি ৮২ লাখ টাকা আয় হয়েছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়কালে আয় ছিল ৪০৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ বছর আয় বেড়েছে ১২৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে গেল অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব, পরিচালন ও উন্নয়নসহ ডিএসসির ব্যয় হয়েছে ৩৩৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এ বছর তা দ্বিগুণ বেড়ে ৭৩৪ কোটি ৮২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
যদিও ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেছেন, করপোরশনের আয়-ব্যয় ওঠানামার বিষয়টি স্বাভাবিক। বছরের শুরুতে আয় কম থাকে, কিন্তু বছরের শেষে আদায় বেড়ে যায়।
এফডিআর ভেঙে ব্যয় সামাল দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বছরের শুরুতে আদায় কম হওয়ায় এফডিআরের সাধারণ তহবিল থেকে খরচ করতে হচ্ছে। আমরা এখন রাজস্ব আদায়ে জোর দিচ্ছি। আশা করি, অর্থবছরের শেষে এটি ঠিক হয়ে যাবে।
তবে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, করপোরেশনের প্রতি বছরের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য থাকতে হবে। এখানে আয়-ব্যয়ের তারতাম্য নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন ওঠে।
বিশিষ্ট এই নগর পরিকল্পনাবিদ এশিয়া পোস্টকে আরও বলেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দুর্বল ছিল, প্রশাসকেরও জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের সময়কার বিতর্কিত উন্নয়ন কাজের বিল পরিশোধ করার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অডিট করা উচিত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। কিন্তু তারা সেটি করেনি।
কোথা থেকে কত আয়
ডিএসসিসির সব বিভাগের আয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব বিভাগ থেকে আয় হয়েছে ৩৪৯ কোটি ৯০ লাখ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৩৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সম্পত্তি বিভাগের আয় গত বছরের ৬ কোটি ১৩ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। প্রকৌশল বিভাগের এবারের আয় ২০ কোটি ১২ লাখ, আগের অর্থবছরে ছিল ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। দুটি বিভাগে আয় গত বছরের তুলনায় কমেছে। সমাজকল্যাণ বিভাগে আয় হয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ, আগের বছর ছিল ২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য বিভাগে আগের বছর আয় হয়েছে ৩১ লাখ টাকা, এবার আয় নেমে এসেছে ২১ লাখে।
এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে এবারের আয় ৩৯ কোটি ৮ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। পরিবহন বিভাগের আয় হয়েছে ৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যা গত বছরের ৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকার চেয়ে বেশি। এ ছাড়া অন্যান্য বিভাগ থেকে আয় হয়েছে ৯৪ কোটি ৯৮ লাখ, আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
পরিচালন ব্যয়ের চাপ বাড়ছে
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ডিএসসিসির পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩১৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের যা ছিল ২০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। বেতন-ভাতার পেছনে গেল বছর ব্যয় হয়েছে ১৫৪ কোটি ১০ লাখ, এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮২ কোটি ৬৭ লাখ টাকায়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি ও গ্যাস খাতে ব্যয় হয়েছে ৪২ কোটি ৫৯ লাখ, আগের বছর ছিল ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
ব্যয় বেড়েছে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণেও। গেল বছর যে ব্যয় ছিল ৭ কোটি ৭৯ লাখ, এবার তা হয়েছে ৩২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সরবরাহ খাতে এ বছরের ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। এবার ব্যয় ২৭ কোটি ৮৬ লাখ, আগে ছিল ১৩ কোটি ৫৮ লাখ।
স্বাস্থ্য বিভাগে ব্যয় এবার ১৮ কোটি ৩৩ লাখ, আগেরবার ১১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। কল্যাণমূলক খাতেও ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। গেল বছর এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৯৫ লাখ, এবার পরিমাণ ৮ কোটি ৫৯ লাখ।
উন্নয়ন ব্যয়ে বড় উল্লম্ফন
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে নিজস্ব অর্থায়নে ডিএসসিসির উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে ৪১৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ১২৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
করপোরেশনের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএসসিসির আয় ৭৯২ কোটি ৩০ লাখ, ব্যয় হয়েছে ৮৯৮ কোটি ২ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৯৭৯ কোটি ২১ লাখ, আয় ছিল ১ হাজার ৬১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ সালে ১ হাজার ১৫ কোটি ৯২ লাখ আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৯৭০ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ছিল ৮৭৯ কোটি ৭০ লাখ, ব্যয় হয়েছে ৮০২ কোটি ৮ লাখ টাকা। এ পরিসংখ্যান বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের ব্যবধান বেড়েই চলেছে।
করপোরেশনের একাধিক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, তহবিলে অর্থ সংকট থাকায় ঠিকাদারদের বিল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। উন্নয়ন কাজের গতি অনেক কমে এসেছে। অন্যদিকে চলতি মাসে ৭৫টি ওয়ার্ডের উন্নয়নের জন্য ১৫০ কোটি টাকার দরপত্র চলছে। পুরনো কাজই চলছে না, নতুন কাজ শুরু হলে সংকট বাড়বে।
বেতন-ভাতা নিয়েও শঙ্কা
ডিএসসিসির অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, সাবেক মেয়র তাপস তার সময়কার তিন বছরের কিছু ঠিকাদারি বিল আটকে রেখেছিলেন। এর আগে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের সময়কার অনেক ঠিকাদারের জামানতের টাকাও জমা ছিল। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এসব বিল ও জামানত একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত ছয় মাসে আয় হয়েছে ৫৩০ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় বাবদ খরচ করতে হয়েছে ৩১৫ কোটি টাকা এবং নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন ব্যয় গেছে ৪১৯ কোটি টাকা। এভাবে প্রতি মাসে আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়ছে। এতে করপোরেশনের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে না করার শর্তে এই কর্মকর্তা আরও জানান, আয়-ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে করপোরেশনের ফিক্সড ডিপোজিট থেকে ২০০ কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে এখন করপোরেশনের ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ তহবিলের টাকা ৪৬ কোটি। আপাতত উন্নয়ন খাতে টাকা ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত আয়-ব্যয়ের তারতাম্য না কমলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার সঙ্গতিও থাকবে না ডিএসসিসির।
মন্তব্য করুন








