অন্তর্বর্তী সরকার বারবার আশ্বস্ত করার পরও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর হুঁশিয়ারির পরও নির্বাচনি প্রচারকালীন সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও সংঘাতে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পরও পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল সেগুলো পুরোপুরি উদ্ধার করা যায়নি। এখনও হদিস না পাওয়া এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদ নিয়ে ভয় রয়েছে ভোটের মাঠে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
একই সঙ্গে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব বৈধ অস্ত্র জমা পড়েনি, দুশ্চিন্তা আছে সেসব নিয়েও।
এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেসব ঝুঁকি থাকে তার মধ্যে অন্যতম উদ্ধার না হওয়া লুণ্ঠিত এবং জমা না হওয়া লাইসেন্সধারী অস্ত্র। শঙ্কার বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির বাইরে থাকা এসব অস্ত্র যে নির্বাচনের আগে ও পরে সন্ত্রাসীরা বা অপরাধী চক্রের সদস্যরা সংঘাত বা সহিংসতায় ব্যবহার করবে না, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। এসব অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে ভোটকেন্দ্র দখল, আধিপত্য বিস্তার আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়।
হদিস নেই হাজারের বেশি অস্ত্র ও দুই লাখের বেশি গোলাবারুদের
জুলাই আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকার কারণে ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাড়ে চারশ’র বেশি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় গণভবন থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) অস্ত্রপাতিও লুট হয়।
পুলিশের সেই সময়কার হিসাব অনুযায়ী, এসব হামলার ঘটনায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাড়ে ছয় লাখের মতো গোলাবারুদ লুট হয়েছে। লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ছিল চায়নিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের বন্দুক, সাবমেশিনগান (এসএমজি), লাইট মেশিনগান (এলএমজি), পিস্তল, শটগান, গ্যাসগানসহ আরও নানা ধরনের অস্ত্র। এসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ অভিযান শুরু করে যৌথ বাহিনী। এ ছাড়া অস্ত্র উদ্ধারের জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করে সরকার।
অভিযানে বিপুল অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হলেও সব অস্ত্রের এখনও হদিস মেলেনি। মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি) পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য বলছে, সারা দেশ থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র ও ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদের মধ্যে এখনও উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩৩০টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪টি গোলাবারুদ। অর্থাৎ, লুট হওয়া অস্ত্রের সাড়ে ২৩ শতাংশ এবং গোলাবারুদের সাড়ে ৩৯ শতাংশ এখনও বেহাত।
এদিকে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলির একটি অংশ গত দেড় বছরে নানা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। খুলনায় পুলিশের অভিযানে গত বছরের এপ্রিল মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে পুলিশের ব্যবহৃত পিস্তল, শটগান ও গুলি উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রামে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের ধরতে গিয়ে বেশকিছু অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে একটি হত্যাকাণ্ডে থানা থেকে লুট হওয়া পিস্তল ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রমাণ পায় পুলিশ।
নির্বাচনের আগে যে কোনোভাবে ও যত দ্রুত সম্ভব এসব অস্ত্র উদ্ধার করার ওপর জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। গত ২০ জানুয়ারি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় তিনি বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র যেভাবেই হোক নির্বাচনের আগেই উদ্ধার করতে হবে।
কিন্তু স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লুট হওয়া যেসব অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি, সেগুলো আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। গত ৩ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এ নিয়ে মাথা না ঘামালেও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী থেকে সাধারণ মানুষের মনেও লুট হওয়া অস্ত্র নিয়ে আতঙ্ক রয়েছে।
বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মকর্তা রাহাত আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, নির্বাচনের সময় এই অস্ত্রগুলো যদি মানুষের হাতে চলে আসে, আর তারা যদি অপব্যবহার করে, তাহলে আমরা তো সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারব না। তবে আমরা এটাও আশা করি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনী পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসবে।
লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ভোটার রফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, দেড় বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সরকারি মালখানা থেকে লুটের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি। এ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।
বৈধ অস্ত্র নিয়েও ভয়
নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বৈধ (লাইসেন্সপ্রাপ্ত) আগ্নেয়াস্ত্র জমা ও বহনে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়টিও একটি নিয়মিত, গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সে অনুযায়ী গত ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে করার লক্ষ্যে বৈধ অস্ত্রের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর অংশ হিসেবে বৈধ অস্ত্র ৩১ জানুয়ারির মধ্যে কাছের থানায় জমা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নির্ধারিত এ সময়ের মধ্যে ২৭ হাজার ৯৯৫টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র থানায় জমা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে কী পরিমাণ অস্ত্র জমা পড়েনি, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি তারা।
এ তথ্য জানতে দেশে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা কত তা জানার চেষ্টা চালায় এশিয়া পোস্ট। কিন্তু জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।
নির্বাচনের আগে এর মধ্যে কতটি অস্ত্র জমা পড়েছে জানতে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-৪ শাখায় গেলে নির্বাচনি ব্যস্ততা দেখিয়ে কোনো তথ্য দেননি দায়িত্বরতরা।
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা পড়া বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা জানতে গেলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, সংশ্লিষ্ট থানায় বৈধ অস্ত্র জমা দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। থানাগুলো থেকে আমাদের কাছে এখনও কোনো তথ্য আসেনি।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরে আলম রিগ্যান বলেন, প্রত্যেক নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান দেখি। যারা বৈধ অস্ত্রধারী আছেন, তারাও অস্ত্র থানায় জমা দেয়। এবার দৃশ্যমান কিছু এখনও দেখিনি।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে ‘পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স মিডিয়া সেন্টারে’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, ২৭ হাজার ৯৯৫টি বৈধ অস্ত্র থানায় জমা নেওয়া হয়েছে। কতগুলো অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি, তার সংখ্যা বেশি নয়। অনেকে হয়তো দেশে নেই, কিন্তু অস্ত্র লকারে তালা মেরে রেখে বিদেশে আছেন। তাদের বৈধ অস্ত্রগুলো হয়তো জমা পড়েনি, তবে তার সংখ্যা খুবই কম।
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা যে কোনো অবৈধ অস্ত্রই হুমকি। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে নির্বাচনে এ নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই দাবি করে আইজিপি আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন








