নানা আলোচনা, জল্পনা-কল্পনার পর সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় বেতন কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করেছে। প্রতিবেদনটিতে সরকারি কর্মচারীদের বেতনকাঠামোর ব্যাপক পুনর্বিন্যাসসহ নতুন বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন, পেনশন-ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন এবং সার্ভিস কমিশন গঠন অন্যতম প্রস্তাব।
নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ আগে বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই প্রতিবেদন তুলে দেন কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ সব গ্রেডেই বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা।
প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০তম গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে কমিশন। এদিকে সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
এতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত কমে দাঁড়াচ্ছে ১:৮, যা আগের ১:৯.৪৮ অনুপাতের তুলনায় কম।
গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির চিত্র
প্রথম গ্রেড: ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা; দ্বিতীয় গ্রেড: ৬৬,০০০-৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৩২,০০০-১,৬০,০০০ টাকা; তৃতীয় গ্রেড: ৫৬,৫০০-৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,১৩,০০০-১,৪৮,৮০০ টাকা; চতুর্থ গ্রেড : ৫০,০০০-৭১,২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০০,০০০-১,২৪,৮০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া পঞ্চম গ্রেড: ৪৩,০০০-৬৮,৫২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৬,০০০-১,০৩,৭০০ টাকা; ষষ্ঠ গ্রেড: ৩৫,৫০০-৬৭,০১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭১,০০০-১,০৪,০০০ টাকা; সপ্তম গ্রেড: ২৯,০০০-৬৩,৪১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৮,০০০-৯২,৮০০ টাকা; অষ্টম গ্রেড: ২৩,০০০-৫৫,৭৯০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৭,০০০-৮৩,৭০০ টাকা; নবম গ্রেড: ২২,০০০-৫৩,০৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫,০০০-৮০,৮০০ টাকা; ১০ম গ্রেড: ১৬,০০০-৩৮,৬৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩২,০০০-৭৯,০০০ টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নিম্ন গ্রেডগুলোতেও বড় অঙ্কের বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
১১তম গ্রেড : ১২,৫০০-৩০,২৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫,০০০-৬০,০০০ টাকা; ১২তম গ্রেড: ১১,০০০-২৬,৫৯০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২,০০০-৫৬,৭০০ টাকা; ১৩তম গ্রেড: ৯,৩০০-২২,৪৯০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮,০০০-৫৬,০০০ টাকা; ১৪তম গ্রেড: ১০,২০০-২৪,৬৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,৫০০-৫৬,০০০ টাকা; ১৫তম গ্রেড: ৯,৭০০-২৩,৪৯০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯,৮০০-৫৫,২০০ টাকা; ১৬তম গ্রেড: ৯,৩০০-২২,৪৯০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯,২০০-৫৩,৯০০ টাকা; ১৭তম গ্রেড: ৯,০০০-২১,৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮,৮০০-৫৩,২০০ টাকা; ১৮তম গ্রেড: ৮,৮০০-২১,৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮,৩০০-৫০,৯০০ টাকা; ১৯তম গ্রেড: ৮,৫০০-২০,৫৭০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮,০০০-৪৮,৬০০ টাকা; ২০তম গ্রেড: ৮,২৫০-২০,০১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০-৪৮,৮০০ টাকার সুপারিশ করা হয়েছে।
আশা করা হচ্ছে, প্রস্তাবিত এই বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হলে প্রায় সরকারি ১৫ লাখ চাকরিজীবী ও পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন।
কমিশনের মতে, নতুন বেতন কাঠামোতে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডে তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধি রেখে আয়বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বাড়িভাড়া, টিফিন, ঝুঁকিভাতা ও অন্যান্য ভাতায়ও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। তবে উচ্চ গ্রেডের গাড়ি ব্যবহার ও জ্বালানি ভাতার মতো সুবিধা সীমিত রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টাকে দেওয়া প্রতিবেদনে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনকাঠামোর ব্যাপক পুনর্বিন্যাসসহ নতুন প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন এবং সার্ভিস কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বেতন গ্রেড ও স্কেল যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করার সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারি দপ্তরগুলোর ভাতাসমূহ পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।
আরও প্রস্তাব করা হয়, কোনো সরকারি কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে, বেতন কমিশন সংশ্লিষ্ট মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা প্রদানের সুপারিশ করেছে, শর্ত থাকে যে, সকল ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ দু’জন সন্তান এই সুবিধা পাবে।
জানা গেছে, নতুন পে স্কেলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। যেসব পেনশনভোগী মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়বে ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনভোগীদের জন্য বাড়ানোর হার ধরা হয়েছে ৫৫ শতাংশ।
চিকিৎসা ভাতাও বাড়ছে পেনশনভোগীদের। ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনধারীদের জন্য মাসিক চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে বয়সভেদে এ ভাতা আট হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য চিকিৎসা ভাতা পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান জানান, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু সময়োপযোগী বেতনকাঠামো না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন








