নাটোর সদর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়া এখন দেশের একমাত্র স্বীকৃত ভেষজ গ্রাম হিসেবে পরিচিত। অ্যালোভেরা, অশ্বগন্ধা, শিমুল মূলসহ প্রায় দেড়শ প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদের চাষে বদলে গেছে এ এলাকার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা। ভেষজ চাষকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শত কোটি টাকার বাণিজ্য, কর্মসংস্থান হয়েছে অন্তত ১০ হাজার মানুষের।
তবে উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ না থাকায় সম্ভাবনা পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ কৃষকদের।
স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়ায় প্রায় ১৫৫ হেক্টর জমিতে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ৭০ হেক্টর জমিতে কেবল অ্যালোভেরার আবাদ। বছরে এ গ্রাম থেকে উঠছে প্রায় ১৫ হাজার টন অ্যালোভেরা পাতা। সরাসরি ভেষজ চাষ করছেন দুই হাজারের বেশি কৃষক। চারা উৎপাদন, শ্রমিকের কাজ, পরিবহন, বেচাকেনা-সব মিলিয়ে জীবিকা জুটছে অন্তত ১০ হাজার মানুষের।
জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে খোলাবাড়িয়ার আফাজ পাগলা নামের এক কবিরাজ তার চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন ভেষজ গাছ লাগাতে শুরু করেন। পরে ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বাড়ি ও জমিতে। সেই ধারাবাহিকতায় এখন পুরো গ্রামজুড়ে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ হচ্ছে।
গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, আবাদি জমির পাশাপাশি বাড়ির উঠোন, ঘরের পাশে ফাঁকা জায়গা, রাস্তার ধার-সবখানেই অ্যালোভেরাসহ বিভিন্ন ভেষজ গাছ। মাঠের চাষের পাশাপাশি অনেকে বাড়ির উঠোনে অল্প পরিসরেও গড়ে তুলেছেন ভেষজ বাগান। অ্যালোভেরা এ গ্রামের প্রধান অর্থকরী ফসল।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অ্যালোভেরার চারা রোপণের মৌসুম। এক বিঘা জমিতে গড়ে ১০ হাজার চারা রোপণ করা হয়। চারা লাগানোর তিন মাস পর থেকে পাতা সংগ্রহ শুরু হয়, যা টানা দুই বছর পর্যন্ত চালানো যায়। চাষে প্রাকৃতিক জৈব সার ছাড়াও প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার ব্যবহার করা হয়। পাতায় দাগ বা পচন ঠেকাতে দেওয়া হয় চুন। পোকামাকড় ও রোগবালাই কমাতে অনেকে এখন ছত্রাকনাশক, টাইকোডার্মা ও সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করছেন।
অ্যালোভেরার পাশাপাশি শিমুল মূল, অশ্বগন্ধা, বিটরুট, মিশ্রি দানাসহ অন্যান্য ভেষজ ফসলও চাষ হচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। এসব পণ্য স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। শুকনো ভেষজ বিক্রি হচ্ছে নতুন বাজার, আমিরগঞ্জ, হাজীগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরসহ স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ব্যবসাকেন্দ্রগুলোতে।
লক্ষ্মীপুর এলাকার ইব্রাহিম ভেষজ ভাণ্ডারের পরিচালক আতিকুর রহমান বলেন, আমার দোকান থেকেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ভেষজ পণ্য বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকাররা এসে এখানকার পণ্য কিনে নিয়ে যান। তার দাবি, যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা হলে এ বেচাকেনা আরও কয়েকগুণ বাড়তে পারে।
এই গ্রামে উৎপাদিত অ্যালোভেরার বড় অংশই সরবরাহ হয় বিভিন্ন ওষুধ ও পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে।
স্থানীয়রা জানান, হামদর্দসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানি নিয়মিতভাবে এখানকার অ্যালোভেরা কেনে। ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত এক বিদেশি মালিকানাধীন জুস কোম্পানি প্রতিদিন ট্রাকভর্তি অ্যালোভেরা পাতা সংগ্রহ করে। ঢাকার বিভিন্ন ওষুধ ও প্রসাধনী কারখানাতেও প্রতিদিনই যায় এখানকার ভেষজ পণ্য।
ভেষজ চাষকে কেন্দ্র করে এলাকার বহু দিনমজুর ও প্রান্তিক পরিবারও এখন নিয়মিত আয়ের সুযোগ পাচ্ছে। চারা রোপণ, সেচ, আগাছা পরিষ্কার, পাতা কাটা ও বাছাইয়ের কাজেই সারা বছর ব্যস্ত থাকেন স্থানীয় শ্রমিকরা। অনেক নারীও এখন মাঠের কাজে যুক্ত হয়েছেন।
তবে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয়নি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অবকাঠামো। কৃষকদের অভিযোগ, অ্যালোভেরা পাতা কাটার পর বেশি সময় রাখা যায় না, দ্রুত পচে যায়। অথচ এলাকায় কোনো হিমাগার বা প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র নেই। ফলে ট্রাকে করে দ্রুত ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠাতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, আবার কখনো কখনো কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা।
স্থানীয় কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, পাতা কাটার পর হাতে বেশি সময় থাকে না। গরমে তো আরও সমস্যা। যদি এখানে হিমাগার থাকত, আমরা নিজের সুবিধামতো পণ্য ছাড়তে পারতাম।
এ ছাড়া অতিবৃষ্টিও অ্যালোভেরা চাষের বড় ঝুঁকি। মাঠের নিচু জমিতে পানি জমে গেলে গাছের গোড়া পচে নষ্ট হয়ে যায়। গত মৌসুমে টানা বৃষ্টিতে লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়ার অনেক জমির অ্যালোভেরা গাছেরই ক্ষতি হয়েছে বলে জানান কৃষকরা। তবে একবার চাষ করলে দুই বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়ার সুযোগ থাকায় পরের মৌসুমে ভালো ফলনের আশায় রয়েছেন তারা।
ভেষজ চাষে সম্ভাবনা থাকলেও কাঠামোগত সহায়তার অভাবে পুরো সুফল মিলছে না বলে মনে করেন কৃষক ও সমবায় নেতারা। খোলাবাড়িয়া ভেষজ সমবায় সমিতির সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, এখানে অ্যালোভেরা ও অন্যান্য ভেষজ সংরক্ষণের জন্য একটা আধুনিক হিমাগার, আর সাবান-শ্যাম্পুসহ ভেষজ প্রসাধনী তৈরির কারখানা দরকার। সঙ্গে যদি একটা পূর্ণাঙ্গ ভেষজ গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা যায়, তাহলে গুণাগুণ পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ এখানেই করা যাবে। এতে বড় কোম্পানিগুলো আমাদের কাছে সরাসরি আসবে, কৃষকরাও ন্যায্য দাম পাবে।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারাও ভেষজ গ্রামটির সম্ভাবনা ও সংকটের কথা স্বীকার করেন। নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভেষজ চাষকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের অন্তত ১০ হাজার মানুষের জীবিকা তৈরি হয়েছে। প্রতিবছরই চাষের পরিধি বাড়ছে, নতুন নতুন উদ্যোক্তা যুক্ত হচ্ছেন। শুধু কৃষি নয়, ভবিষ্যতে এখানে পর্যটন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পেরও সম্ভাবনা আছে।
তিনি আরও বলেন, এখানে যদি একটি হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট আর ভেষজ গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা যায়, তাহলে লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়া সহজেই দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি দুই পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন








