মসজিুদল আকসা বা আল-আকসা মসজিদ মুসলিমদের প্রাণকেন্দ্র। মুসলিম জাতির হৃদয়ের স্পন্দন। তাদের হৃদয়ের গভীরে আছে এ নাম। এটি ফিলিস্তিনের রাজধানী জেরুজালেমে অবস্থিত। ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর ইয়াকুব (আ.) এ মসজিদ নির্মাণ করেন। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় প্রাচীন মসজিদ। এটি মুসলমানদের প্রথম কিবলা। ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থান। এ মসজিদকে কেন্দ্র করে ইসলামের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। কিয়ামতের আগে অসংখ্য বিস্ময়কর ঘটনা ঘটবে এই মসজিদ ও এর আশপাশের অঞ্চল ঘিরে।
নানা কারণে মুসলমানদের কাছে এ মসজিদটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এখানে গুরুত্বপূর্ণ দশটি কারণ উল্লেখ করা হলো—
পৃথিবীর দ্বিতীয় মসজিদ
মসজিদুল হারাম বা কাবাঘর—পৃথিবীর প্রথম ঘর ও প্রথম মসজিদ। এটি আল্লাহর ঘর। এরপরই ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত হয়েছে মসজিদুল আকসা। আবু জর বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, প্রথম কোন মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, এরপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। আমি বললাম, এ দুয়ের নির্মাণের মাঝখানে কত পার্থক্য? তিনি বললেন, ৪০ বছরের।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪২৫)
মুসলিমদের প্রথম কিবলা
আল-আকসা মসজিদ মুসলিম জাতির একসময়ের প্রথম কিবলা। নামাজ ফরজ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিরা আল-আকসার দিকে ফিরে নামাজ পড়তেন। মদিনায় গিয়েও তিনি ১৬-১৭ মাস সেদিকে ফিরে নামাজ পড়েন। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল কাবাঘর হোক নামাজের কিবলা। একদিন মসজিদে বনু সালামায় সাহাবিদের নিয়ে জোহর নামাজ পড়ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। দুই রাকাত নামাজ আদায়ের পর কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ এলো। নামাজের ভেতরই তিনি বায়তুল্লাহর দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কায় পবিত্র কাবার সামনে থাকাবস্থায় বায়তুল মাকদিসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়েন। মদিনায় হিজরতের পর দীর্ঘ ১৬ মাস সেদিকে ফিরেই নামাজ পড়েন। অতপর মুসলিমদের কিবলা পরিবর্তন করে পবিত্র কাবা করা হয়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৮৩৬)
নবীজি (সা.)-এর ইসরা ও মিরাজ
রাসুলুল্লাহ (সা.) রাত্রিকালীন ভ্রমণে (মিরাজের সফর) জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে মক্কা থেকে মসজিদুল আকসায় যান। সব নবীকে নিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়েন সেখানে। তিনি নামাজ পড়ান। এরপর যাত্রা করেন ঊর্ধ্বাকাশে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত। যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাঁকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১)
তৃতীয় সম্মানিত শহর
ইসলামে তিনটি শহর সম্মানিত। ইবাদতের উদ্দেশ্যে এই তিন শহর ছাড়া অন্য কোথাও সফর করা নিষিদ্ধ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘(ইবাদতের উদ্দেশ্যে) তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করা যাবে না। মসজিদুল হারাম, আমার মসজিদ (মসজিদে নববি) ও মসজিদুল আকসা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮২৭)
বরকতময় ও কল্যাণকর জায়গা
বায়তুল মাকদিস ও এর আশপাশের অঞ্চলকে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে বরকতপূর্ণ করেছেন। পবিত্র কোরআনের কয়েক স্থানে এর বর্ণনা পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছেন, যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি তাঁকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১)
অন্য এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি তাকে (ইবরাহিম) ও লুতকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম সেই ভূখণ্ডে, যেখানে আমি বিশ্ববাসীর জন্য কল্যাণ রেখেছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৭১)
নামাজ আদায়ে বিশেষ ফজিলত
মসজিদুল আকসায় নামাজ আদায়ে বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মসজিদুল হারামে (কাবা শরিফে) এক রাকাত নামাজ এক লাখ রাকাত নামাজের সমান। আমার মসজিদে (মসজিদে নববি) এক রাকাত নামাজ এক হাজার রাকাত নামাজের সমান এবং বায়তুল মাকদিসে (মসজিদুল আকসা) এক নামাজ পাঁচশ রাকাত নামাজের সমান।’ (মাজমাউজ জাওয়াইদ, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ১১)
প্রশংসা করেছেন নবীজি (সা.)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বায়তুল মাকদিস এবং এর আশপাশে অবস্থানকারীদের বিজয়ী, সাহসী উপাধিতে ভূষিত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের একটি দল সত্যের ওপর বিজয়ী থাকবে, শত্রুর মনে পরাক্রমশালী থাকবে। দুর্ভিক্ষ ছাড়া কোনো বিরোধী পক্ষ তাদের কিছুই করতে পারবে না। আল্লাহর আদেশ তথা কিয়ামত পর্যন্ত তারা এমনই থাকবে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, তারা কোথায় থাকবেন? তিনি বললেন, তারা বায়তুল মাকদিস এবং তার আশপাশে থাকবেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২১২৮৬)
ভ্রমণে আছে সওয়াব
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো মসজিদে বিশেষ সওয়াবের উদ্দেশে ভ্রমণ করো না। তিনটি মসজিদ হলো, মসজিদুল হারাম (কাবা শরিফ), মসজিদে নববী ও মসজিদুল আকসা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১১৫)
বিশ্বাসী বিজয়ীদের ভূমি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের একটি দল সত্যের ওপর বিজয়ী থাকবে, শত্রুর মনে পরাক্রমশালী থাকবে। দুর্ভিক্ষ ছাড়া কোনো বিরোধী পক্ষ তাদের কিছুই করতে পারবে না।
আল্লাহর আদেশ তথা কিয়ামত পর্যন্ত তারা এমনই থাকবে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, তারা কোথায় থাকবেন? তিনি বললেন, তারা বায়তুল মাকদিস এবং তার আশপাশে থাকবেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২১২৮৬)
হাশরের ময়দান
হাশর ও কিয়ামত সংঘটিত হবে এখানে। মাইমুনা (রা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমাদেরকে বায়তুল মাকদিস সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন এটা হবে হাশরের ময়দান। এখান থেকে মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যের দিকে যাবে। তোমরা এখানে আসো এবং নামাজ আদায় করো।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস : ৭০৮৮)
মন্তব্য করুন








