‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৫’ গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। নীতিমালায় দেশের মসজিদগুলোর খতিব ছাড়া ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য জনবলের গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালায় খতিবের বেতন চুক্তিপত্রের শর্তানুসারে নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। তবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল মসজিদের জনবলের বেতন কাঠামো নির্ধারণের দায়িত্ব মসজিদের কমিটিকে দেওয়া হয়েছে।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ মানতে তারা বাধ্য কি না? কীভাবে তারা এটি বাস্তবায়ন করবেন? সরকার কি ভর্তুকি দেবে? এই নীতিমালা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশের ইমাম-মুয়াজ্জিনরাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও দেখা গেছে নানাধর্মী আলাপ-আলোচনা।
এর আগে দেশের মসজিদগুলোর জন্য সরকার কর্তৃক কোনো বেতন স্কেলের নীতিমালা ছিল না। ছিল না ছুটি উদযাপন কিংবা চাকরি অব্যাহতির নিয়ম-কানুন।
নীতিমালায় কোন গ্রেডে বেতন কত
নীতিমালায় সিনিয়র পেশ ইমামকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী পঞ্চম (বেসিক ৪৩ হাজার টাকা), পেশ ইমামকে ষষ্ঠ (বেসিক ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা) ও ইমামকে নবম গ্রেড (বেসিক ২২ হাজার টাকা), প্রধান মুয়াজ্জিনকে দশম (১৬ হাজার টাকা), মুয়াজ্জিনকে ১১তম (১২ হাজার ৫০০ টাকা), প্রধান খাদিমকে ১৫তম (বেসিক ৯ হাজার ৭০০ টাকা) ও খাদিমকে ১৬তম গ্রেডে (বেসিক ৯ হাজার ৩০০ টাকা) বেতন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দেশের মসজিদগুলো কীভাবে পরিচালিত হয়
১৭১৯ সালে নরসিংদীর পলাশে পারুলিয়ায় নির্মাণ করা হয় পারুয়িলা শাহি মসজিদ বা দেওয়ান শরিফ মসজিদ। এটি নির্মাণ করেন ঈশা খাঁর পঞ্চম অধস্তন বংশধর দেওয়ান শরিফ খাঁর স্ত্রী—জয়নব বিবি। তিনি বাংলার সুবেদার মুর্শিদকুলি খাঁর মেয়ে। প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছর জয়নব বিবির অর্থায়নে মসজিদটি পরিচালিত হয়। এরপর দায়িত্ব আসে স্থানীয়দের ওপর। এখন পর্যন্ত স্থানীয়দের সহায়তায় মসজিদটি চলছে।
দেশের প্রায় সব মসজিদেরই ইমাম-মুয়াজ্জিন, কর্মচারী ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক খরচ বহন করেন স্থানীয়রা। মসজিদকেন্দ্রিক মুসল্লি ও মহল্লাবাসীর মাসিক ‘চাঁদা’র টাকায় চলে মসজিদ। তবে কিছু মসজিদের খরচ চলে নিজস্ব আয়ে।
রাজধানীর বসিলা বড় মসজিদের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুর রশিদ তালুকদার বলেন, ‘বেসরকারি মসজিদগুলো চলে স্থানীয়দের সহায়তায়। সরকারি স্কেল অনুযায়ী তো সব মসজিদ বেতন দিতে পারবে না। শহরের অনেক মসজিদে স্কেলের চেয়ে বেশি সম্মানী দেওয়া হয় ইমাম-মুয়াজ্জিনকে। গ্রামের কিছু মসজিদে হয়তো তিন মাসে একবার বেতন দেওয়া হয় ইমামকে। মুয়াজ্জিন হয়তো এলাকার কেউ। যিনি বিনা বেতনে আজান দিচ্ছেন ১০ বছর ধরে।’
ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন কি সরকার দেবে
সরকার কর্তৃক পরিচালিত মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা সরকারি তহবিল বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই স্কেলে বেতন পাবেন। যেমন বায়তুল মোকাররম, আন্দরকিল্লা শাহি মসজিদ ও নবনির্মিত ৫৬০টি মডেল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা পাচ্ছেন। বেসরকারি মসজিদ তথা পাড়া-মহল্লা বা গ্রামের স্থানীয় কমিটি দ্বারা পরিচালিত মসজিদগুলো সরকারি তহবিল থেকে বেতন পায় না। এই স্কেলে তারা সরকার থেকে বেতন পাবে, এ কথার উল্লেখ নীতিমালায় নেই। এসব মসজিদে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন দেওয়ার মূল দায়িত্ব এখনো স্থানীয় কমিটির হাতেই থাকছে। সরকার এখানে উৎসাহদাতা হিসেবে কাজ করেছে। তবে কমিটি এই স্কেলে বেতন দিতে বাধ্য নয়। তাহলে এই বেতনকাঠামো নির্ধারণে লাভ আছে কি না, এ নিয়ে সন্দেহ দেখা গেছে সংশ্লিষ্টদের মাঝে।
ঢাকার টঙ্গীর আন-নূর জামে মসজিদের খতিব আলী হাসান তৈয়ব বলেন, ‘অনেকে চিন্তা করছেন, এটা দিয়ে কী হবে? সরকার তো বেতন দেবে না। সরকার বেতন না দিলেও এটি ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য অধিকারের স্বীকৃতি। এ বেতন স্কেল ঘোষণার ফলে ইমাম-মুয়াজ্জিন ও কর্মচারীরা জোর গলায় বলতে পারবেন, এ রকম বেতন তাদের হক। মসজিদের স্টাফরা কর্তৃপক্ষকে চাপ দিতে পারবেন।’
গ্রেডভিত্তিক বেতন কতটা বাস্তবায়ন করবে সরকার
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয়রা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন দেন। শহরের কোনো মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা স্কেলের চেয়ে বেশি বেতন পান। গ্রামের কোনো ইমাম পান পাঁচ হাজার। অনেক মসজিদে মুয়াজ্জিনরা আজান দেন বিনা বেতনে। স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। গ্রেডভিত্তিক বেতন সরকার বাস্তবায়ন করবে কি না, এ বিষয়ে নীতিমালায় কোনো নির্দেশনা নেই।
মসজিদ-উত-তাকওয়া সোসাইটি ধানমন্ডির খতিব মাওলানা সাইফুল ইসলাম বললেন, ‘নীতিমালায় বড় চ্যালেঞ্জ হলো, স্কেল অনুযায়ী ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন নির্ধারণ করা। মসজিদ চলে স্থানীয়দের অনুদান ও ভালোবাসায়। তাই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা, এ বিষয়ে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। দেশের মসজিদগুলো যদি সরকারের আওতায় আনা যায়, স্কেল অনুযায়ী বেতনদানে যদি সরকার প্রণোদনা দেয়, তাহলে ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের অর্থনৈতিক জীবন সচ্ছল হতো। বেতন স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের প্রণোদনা প্রয়োজন।’
কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তা, ঝুঁকি কতটা
দেশের বেসরকারি মসজিদগুলো পরিচালিত হয় স্থানীয় কমিটির নিয়মানুযায়ী। চাকরি দেওয়া, বেতন নির্ধারণ, ছুটি বা চাকরিচ্যুত করাও তাদের ইচ্ছাধীন। এ ক্ষেত্রে লিখিত বা নির্ধারিত নিয়ম মানা হয় না তেমন। তবে নীতিমালা বাস্তবায়ন ও আইনের প্রয়োগ হলে যখন-তখন ইমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকরিচ্যুত করা যাবে না বলে মনে করছেন মাওলানা সাইফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘মসজিদের কমিটির পদ-পদবিতে ভালো সরকারি কর্মকর্তা যদি থাকেন, এ নীতিমালা যদি বাস্তবায়ন করা যায় এবং আইনের প্রয়োগ যদি থাকে, তাহলে কমিটি ইমাম-মুয়াজ্জিনদের যখন-তখন চাকরিচ্যুত করতে পারবে না।’
মন্তব্য করুন








