পৃথিবীর প্রথম সূর্যোদয় থেকে মুসলমানদের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে আল্লাহর মনোনিত নবী-রাসুলরা। তারা আল্লাহর খলিফা। খলিফা আরবি শব্দ। অর্থ উত্তরাধিকারী, প্রতিনিধিত্বকারী। ইসলামি পরিভাষায় খলিফা হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি যাবতীয় বিষয়ে শরিয়ত অনুযায়ী জাতিকে পরিচালিত করেন। ইসলামি রাষ্ট্রে খলিফা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে।
শান্তির বাণী নিয়ে সর্বশেষ নবী হিসেবে পৃথিবীতে আসেন সর্বকালের সেরা মানব মুহাম্মদ (সা.)। তিনি পৃথিবীর সফল রাষ্ট্রনায়ক। তার অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক কর্মসূচি, সমাজ দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি মানবসভ্যতার আকাশে এক নতুন চমক। এক নয়াদিগন্ত। একসময় তিনি গঠন করেছেন ইসলামি রাষ্ট্র। রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন আল্লাহর আইনের ওপর ভিত্তি করে।
ইসলামি রাষ্ট্র হলো যেখানে সরকারের কার্যের প্রথম ভিত্তি হবে শরিয়াহ। আল্লাহ তাআলা যেসব আকিদা ও আমল মানুষের জন্য প্রণয়ন করেছেন, তাই হলো শরিয়া।
মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর খলিফা বা প্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় সামনে আসে। মুসলমানদের আমিরের প্রয়োজন দেখা দেয়। সাহাবিরা সুন্দর ও পবিত্র পৃথিবীর জন্য তিন পদ্ধতিতে খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন করেছেন।
জনগণ কর্তৃক মনোনয়ন
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর উপস্থিত জনতার উদ্দেশে উমর (রা.) এক যুগান্তকারী ভাষণ দেন। রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে আবু বকরের (রা.)-এর সম্পর্ক, ইসলামের জন্য আবু বকরের ত্যাগ নিয়ে কথা বলেন। আবু বকর (রা.)-কে রাষ্ট্রপ্রধান বানানোর প্রস্তাব দেন। সাহাবিরা সমর্থন জানান। তাদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রথম খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন।
আবু বকর (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম পুরুষ মুসলমান। তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর মিরাজ গমনের সত্যায়নকারী। মহানবী (সা.)-এর হিজরতের সঙ্গী। ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ পুরুষ ও রাসুলের একান্ত কাছের মানুষ। রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় অসুস্থতার কালে আবু বকর জামাতের নামাজের ইমামতি করেন। ( সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৩)। মুসলমানদের জামাতের ইমামতিও খেলাফতের ইঙ্গিত বহন করে।
হাদিসে এসছে, ‘এক নারী নবী (সা.)-এর কাছে এলো। নবীজি (সা.) তাকে আবার আসার জন্য বললেন। ওই নারী বলল, আমি এসে যদি আপনাকে না পাই তাহলে কী করব? মহানবী (সা.) বললেন, যদি আমাকে না পাও, তাহলে আবু বকরের কাছে আসবে।’ (সহিহ বুখারি,হাদিস : ৩৫৫৯)। এ হাদিসটি স্পষ্টভাবে আবু বকর (রা.)-এর খলিফা হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
পূর্ববর্তী খলিফা কর্তৃক মনোনয়ন
ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর মৃত্যুর সময় বিশিষ্ট সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে উমর (রা.)-কে খলিফা নির্বাচিত করেন। পরে বিষয়টি উপস্থিত সাহাবিদের সামনে উপস্থাপন করলে সবাই সম্মতি ও ঐকমত্য পোষণ করেন। (তারিখে তাবাবি : ২/৩৫২)
উমর (রা.) ছিলেন ন্যায়ের পক্ষাবলম্বনকারী। এ কারণে তাকে ‘ফারুক’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আমিরুল মুমিনিন উপাধিটি প্রথম তার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমরা পর যদি কেউ নবী হতো, তাহলে সে হতো ওমর। হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) একবার স্বপ্নযোগে বেহেশতে যান। সেখানে ওমরের জন্য বরাদ্দকৃত প্রাসাদ দেখেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬৭৯)
মজলিসে শুরা কর্তৃক মনোনয়ন
উমর (রা.) আহত হওয়ার পর বিশিষ্ট সাহাবিদের সমন্বয়ে মজলিসে শুরা গঠন করা হয়। মজলিসে শুরায় ছিলেন আলি (রা.), উসমান (রা.), যুবায়ের (রা.), তালহা (রা.), সাদ (রা.) ও আব্দুর রহমান ইবনে উমর (রা.)। মজলিসে শুরার সবাই ছিলেন দুনিয়ায় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি। তারা মিলে ওসমান (রা.)-কে খলিফা নির্বাচিত করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৭০০)
ওসমান (রা.) নিজের সবকিছু ইসলাম ও রাসুল (সা.)-এর জন্য উৎসর্গ করেন। তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর দুই মেয়ের জামাতা—জিননুরাইন।
খলিফার নিচে যেসব পদ রয়েছে, সেসব পদে নিয়োগ দেওয়ার অধিকার খলিফার। খলিফা যোগ্য ও আমানতদার ব্যক্তিদের নির্বাচিত করে তাদের সেসব পদে নিয়োগ দেবেন। আল্লাহ তাআলা শাসকের কাছে এটা আমানত রেখেছেন। যোগ্য ও বিশ্বস্ত লোককে এসব পদের জন্য নির্বাচন করা হলে এ আমানত যথাযথভাবে আদায় হবে। আর ইসলামের চারজন খলিফাই শ্রেষ্ঠ সাহাবিদের বিভিন্ন রাষ্ট্রের গর্ভনর বানিয়েছিলেন।
রাসুল (সা.)-এর চার খলিফাই জনগণের মত ও সমর্থনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রধান নিযুক্ত হয়েছিলেন। তারা কেউ খেলাফত লাভের দাবিদার ছিলেন না। পদের জন্য চেষ্টাকারীও ছিলেন না। এমন কামনা-বাসনাও তাদের মনে জাগেনি। তারা খলিফা নিযুক্ত হওয়ার পর নিজেকে সম্পূর্ণরুপে উৎসর্গ করেছেন মানুষের খেদমতে। রাতের আঁধারে, নির্জন পল্লীতে, গ্রাম আর শহরের পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতেন অসহায় মানুষের খোঁজে। খোঁজ নিতেন, কে না খেয়ে আছে। কার উনুনে আগুন জ্বলছে না।
খলিফারা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেন অভিযোগ জানানোর সদর দরজা। তারা মানুষের ভেতরের কষ্ট আর গল্প জানতে অধীর থাকতেন। তারা বিশ্বাস করতেন, দায়িত্ব ও পদ হচ্ছে আমানত। আল্লাহ তাআলা শাসকের কাছে এটাকে আমানত রেখেছেন।
ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের অবশ্যই বিশেষ কিছু গুণ থাকতে হবে। যে গুণের কথা বলেছেন ইসলাম। এ গুণ ছাড়া কেউ মুসলমানদের সত্যিকারের রাষ্ট্র প্রধান হতে পারবে না। যেমন—
মন্তব্য করুন








