হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, নীতিবিশ্লেষক ও গবেষক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং উন্নয়ননীতি নিয়ে কাজ করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ও গণভোট নিয়ে তিনি কথা বলেছেন এশিয়া পোস্টের সঙ্গে
প্রশ্ন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ও গণভোটের ভোটগ্রহণ চলছে। সার্কিকভাবে নির্বাচনের পরিবেশ কেমন দেখছেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: পরিবেশ নিয়ে অনেক ধরনের আশঙ্কা ছিল। নির্বাচন আদৌ হবে কি না, শান্তিপূর্ণ হবে কি না, বা ফেয়ার হবে কি না—সব আশঙ্কা ও সন্দেহ কাটিয়ে অবশেষে নির্বাচনটা হয়ে যাচ্ছে। ভোটাররা স্বতস্ফূর্তভাবে তাদের ভোট দিচ্ছেন। আমরা যে নির্বাচনটা করতে পারছি, সেই অর্থে আমি বলব, সব পক্ষই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দলগুলো, অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশন—সবাই মিলে। শেষ বিচারে আমরা এর গুরুত্বটা বুঝতে পেরেছি যে, এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, এই নির্বাচনের মাধ্যমে কী ধরনের সরকার আসবে, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো—গত ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ তাদের অন্যতম অধিকার, অর্থাৎ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। সেই অধিকারটি ফিরে এসেছে এবং তা প্রয়োগ করার একটা সুযোগ তারা পাচ্ছে।
প্রশ্ন: নির্বাচনকে ঘিরে অনেক আলোচনা ও আশঙ্কা ছিল। এখন নির্বাচনটি হয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে এসে আপনার প্রত্যাশা কী? কোন বিষয়গুলোকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: ফলাফল পরের বিষয়; এই প্রক্রিয়াটাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমনটা বললাম, নির্বাচন নিয়ে যত আশঙ্কা ছিল, সেগুলো আমরা অতিক্রম করে এসেছি এবং আশা করি একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে। অবশ্য নির্বাচনি প্রক্রিয়া আরও সুচারুভাবে সাজানো যেত কি না, তা নিয়ে নিশ্চয়ই প্রশ্ন থাকতে পারে। ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব ইত্যাদি নিয়মগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন আরও গ্রহণযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারত কি না—এসব নিয়ে আলোচনা হতেই পারে।
আমরা চাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। এটি কেবল দেড় বছরের অপেক্ষা নয়, এক অর্থে প্রায় ১৭ বছরের অপেক্ষা। আমরা চাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার পরিবেশ। এখানে আমি আশা করব—বিশেষ করে যাদের মধ্যে ভীতিটা একটু বেশি কাজ করে, যেমন—সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, দরিদ্র জনগোষ্ঠী কিংবা নারীরা—তারা যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন। আগামীকালের নির্বাচন সুষ্ঠু হলো কি না, তার অন্যতম সূচক হবে এটাই। যাদের মধ্যে ভয় কাজ করার কথা, তারা যদি নির্ভয়ে গিয়ে ভোট দিয়ে আসতে পারেন, তাহলেই আমরা বুঝতে পারব ভোট কেমন হচ্ছে।
প্রশ্ন: একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য ভোটার ও রাজনৈতিক দলসহ সকল পক্ষের করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহনশীলতা। আসলে তিন ধরনের সহনশীলতা দরকার। প্রথমত, ভোটারদের সহনশীলতা। তারা ভোট দিতে যাবেন, সেখানে আরও অনেক ভোটার থাকবেন; তাই ভোটারদের নিজেদের মধ্যে সহনশীল মনোভাব থাকা জরুরি। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কর্মী ও দলের সহনশীলতা অত্যন্ত জরুরি। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও উত্তেজনার মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহনশীলতা প্রদর্শন প্রয়োজন। আর তৃতীয়ত, নির্বাচনের ঠিক পরপরই যে সহনশীলতা দরকার, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ—ফলাফল যা-ই হোক, তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা। নির্বাচন নিয়ে সাধারণত তিন ধাপে শঙ্কা থাকে: প্রাক-নির্বাচনী পরিবেশ, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়। আমরা প্রথম ধাপটি, অর্থাৎ প্রাক-নির্বাচনি পরিবেশের শঙ্কা ও আলোচনা অতিক্রম করে এসেছি। আজ দ্বিতীয় পরীক্ষা এবং নির্বাচনের পরে হবে তৃতীয় পরীক্ষা।
প্রশ্ন: গত দেড় বছরে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা সংস্কারের কথা আমরা বলেছিলাম, সেগুলো কতটা অর্জিত হলো?
হোসেন জিল্লুর রহমান: তবে আপনি যেহেতু সংস্কারের প্রশ্ন তুলেছেন, মোটা দাগে বলা যায়—সংস্কার নিয়ে যতটা আলোচনা হয়েছে, তার কার্যকরী পদক্ষেপ, ফলাফল বা দিকনির্দেশনা—তিনটি ক্ষেত্রেই আমরা বড় ধরনের ঘাটতি দেখেছি। আলোচনা ব্যাপক হয়েছে, অনেক 'কেতাবি' পরামর্শও তৈরি হয়েছে; কিন্তু ফলাফলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে ঘাটতি রয়ে গেছে। তা অর্থনীতি পরিচালনা, পরিসংখ্যানের উন্নতি বা প্রশাসনিক সংস্কার—যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার কার্যক্রমে অনেকটা একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে। তারা অনেকগুলো দরজা খুললেও নিজেদের মূলত 'সাংবিধানিক সংস্কার'-এর একটি কক্ষেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বা স্থানীয় সরকারের মতো বিষয়গুলো তারা সেভাবে আলোচনায় আনেননি। শিক্ষা খাতের মতো জায়গায় সমস্যা ব্যাপক, সেখানে খণ্ডিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জনগণের চাহিদা তো পদক্ষেপ নয়, জনগণের চাহিদা হলো ফলাফল। সরকার বা আমলাতন্ত্র পদক্ষেপ নিতে পছন্দ করে, আর আমরা জনগণ চাই ফলাফল। পদক্ষেপের তালিকা করলে হয়তো অনেক কিছু দেখা যাবে, কিন্তু ফলাফলের জায়গায় অনেক ঘাটতি রয়েছে।
তবে একটা ইতিবাচক দিক হলো, ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে অর্থনীতি যখন পতনের মুখে ছিল, তখন সেই পতনটা ঠেকানো গেছে। কিন্তু অর্থনীতির চাকায় যে গতি বা বেগ আনার দরকার ছিল, তা আসলে আনা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল, যা সামাল দেওয়া গেছে। তবে এর পরবর্তীতে আবার অনেক ধরনের ভূরাজনৈতিক দুয়ার বা ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে।
প্রশ্ন: নির্বাচনের দিনে এসে আমরা যদি অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালের দিকে ফিরে তাকাই, তবে তাদের প্রধান সাফল্য এবং সীমাবদ্ধতাগুলো কী ছিল বলে আপনি মনে করেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: সংস্কারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বা ট্রান্সপারেন্সির জায়গাতেও বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। কোনো চুক্তি হোক, কোনো সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য হোক, কিংবা কাকে কোন নিয়মে কোথায় পদায়ন করা হচ্ছে—এসব বিষয় খোলাসা করার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা গেছে। যেমন—বিমান বোর্ডে হঠাৎ করে তিনজনের পদায়ন। পদক্ষেপ নিতে সমস্যা নেই, কিন্তু এগুলোর ব্যাখ্যা বা স্বচ্ছতার অভাব ছিল। আরেকটি বিষয় হলো, শাসনপদ্ধতি বা 'গভর্ন্যান্স স্টাইল'-এর মধ্যেও বড় ঘাটতি ছিল। এক অর্থে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক ধরনের বিচ্ছিন্ন 'এভিজাত্য' বা 'এলিটিজম'-এর চর্চা করেছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, ব্যবসায়ী মহল বা তৃণমূলের কথা শোনার ক্ষেত্রে আন্তরিকতার অভাব ছিল। আলোচনাগুলো যেন একমুখী না হয়, কেবল আনুষ্ঠানিক সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—এমন খোলা মনের আদান-প্রদানের জায়গায় ঘাটতি ছিল। তবে আজকের দিনে, বিশেষ করে এই ১১ই ফেব্রুয়ারিতে দাঁড়িয়ে আমি বলব—অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশটাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে এবং কথা অনুযায়ী আগামীকাল ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হতে যাচ্ছে—এটাকে আমরা এখন অত্যন্ত ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই দেখব।
প্রশ্ন: জুলাই আন্দোলন যেসব কারণে ঘটেছিল—যেমন বৈষম্যের অবসান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন—তার উদ্দেশ্য ছিল যেন ঋণখেলাপি বা অসাধু ব্যক্তিরা ক্ষমতায় আসতে না পারে এবং সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসেন। এসব ক্ষেত্রে কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে?
হোসেন জিল্লুর রহমান: দেখুন, 'ভালো লোক' বা 'খারাপ লোক'—এগুলো এক ধরনের ব্যাখ্যা বা ন্যারেটিভ। এগুলো আদৌ কতটা কার্যকর, তা বোঝার বিষয় আছে। কারণ, আমি মনে করি দক্ষতা এবং ফলাফল আনার মানসিকতা সবচেয়ে জরুরি। স্বচ্ছতাও একটি বড় বিষয়। আমাদের এই প্রক্রিয়াগত গুণগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। 'সৎ মানুষ' অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু এটি অনেক সময় শুধুই কেতাবি বুলিতে পরিণত হয়। কে সৎ আর কে অসৎ—তা নির্ধারণ করা জটিল। অনেক সময় দেখা যায়, একজন তথাকথিত 'সৎ মানুষ' হয়তো জনবান্ধব বা কার্যকর নন। তাই সার্বিকভাবে আমাদের ফলাফলের দিকে নজর দেওয়াটা খুব জরুরি—আমরা কী ধরনের ফলাফল পাচ্ছি।
আপনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের কথা বললেন। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জাতীয় ঐক্য সংহত করা একটা এজেন্ডা ছিল, কিন্তু তাতে খুব বেশি অর্জন হয়নি। আগামীকাল নির্বাচনের মাধ্যমে যারা বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবেন বা যারা বিরোধী দলে থাকবেন—রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণের দায়িত্ব মূলত তাদের ওপরই বর্তাবে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন—অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের অনেক জায়গায় হাত না দিলেও কিছু জায়গায় অনেক বেশি পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন—জাপান, যুক্তরাষ্ট্র বা তুরস্কের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির বিষয়গুলো। হয়তো তারা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে এগুলো করেছেন, কিন্তু এখানে স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি ছিল। প্রশ্ন জাগে, এর মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের নীতি গ্রহণের স্বাধীনতা কি কমিয়ে ফেলা হলো? কারণ, কিছু পদক্ষেপ একবার নিয়ে ফেললে তা সহজে বাতিল করা যায় না। নির্বাচিত সরকারের কাজের পরিধি বা সীমানা এর ফলে সংকুচিত হলো কি না, তা দেখার বিষয় এবং ভবিষ্যতে এর বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
প্রশ্ন: আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেখলাম, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিরাট ঘটনা। জুলাইয়ের পর তরুণ সমাজ বা বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে পরিবর্তনের আশা করেছিল, তেমন কোনো পরিবর্তন কি আপনি দলগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করেছেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: এই পরিবর্তনগুলো রাতারাতি বা এককালীন হবে না। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাটা রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর থেকেই আসতে হবে। পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের চাপের জায়গাগুলোও সক্রিয় থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা বা চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা কতটা সফল হয়েছেন, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বা নির্বাচন কমিশন প্রার্থীর বৈধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে—যেমন ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব বা হলফনামার স্বচ্ছতা—সঠিক ভূমিকা পালন করেছে কি না, সেটাও দেখার বিষয়। এই স্বচ্ছতার প্রক্রিয়াটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের বিষয়টি এক দিনের নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়—নির্বাচন হবে না বা হলেও অত্যন্ত সংঘাতপূর্ণ হবে, এমন অনেক শঙ্কা ছিল। কিন্তু আমরা নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি। মনে হচ্ছে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে এবং দলগুলো সংযত হওয়ার চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে, এই উত্তরণ তাদের জন্যও জরুরি। কারণ নির্বাচনী উত্তরণ ছাড়া অনিশ্চয়তা আরও বাড়ত। তাই তারাও এক ধরনের সহনশীলতা দেখানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। এখন দেখার বিষয় হলো, ফলাফল ঘোষণার পরেও যেন এই সহনশীলতা অব্যাহত থাকে। সেটি অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবসময় আস্থার সংকট দেখা যায়। এখনও কি সেই সংকট বিদ্যমান? আমরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখছি। এক পক্ষ বলছে নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে অন্য পক্ষ ক্ষমতায় আসবে; জামায়াত বা বিএনপির মতো দলগুলো আগে থেকেই প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিচ্ছে। এই যে আগে থেকেই ফলাফলের বিষয়ে মন্তব্য করার প্রবণতা বা এমন পরিস্থিতি তৈরি করা—এ বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: এই ধরনের বক্তব্য নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। তবে আমি মনে করি, এই সংস্কৃতির পরিবর্তন হতে অনেক সময় লাগবে। প্রতিযোগিতার ভাষা অনেক সময় আক্রমণাত্মক হয়। কিন্তু আমাদের কাম্য হলো, এই আক্রমণাত্মক মনোভাব যেন কেবল ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, মাঠ পর্যায়ে সহিংসতায় রূপ না নেয়। আপনি আস্থার কথা বললেন। আসলে একে অপরের প্রতি আস্থার চেয়েও 'নিয়মের প্রতি আস্থা' থাকাটা বেশি জরুরি। সবাই যেন মেনে নেয় যে, নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। 'আমার জন্য শিথিল হোক, অন্যের জন্য নয়'—এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। বাংলাদেশে শুরু থেকেই আমরা 'খেলার নিয়ম' বা 'রুলস অব দ্য গেম'-এর বিষয়ে ঐকমত্য তৈরিতে হোঁচট খেয়েছি। এর জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা এসেছিল। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে এই আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়েছে যে, বেশকিছু মৌলিক বিষয়ে আমাদের ঐকমত্য প্রয়োজন।
প্রতিযোগিতা থাকবেই এবং তা কাম্য, কারণ এতে মানুষের বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকে। যোগ্য প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার জন্য ভালো বিকল্প থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আমাদের এখনও বহুদূর যেতে হবে। তবে যে জায়গায় আমাদের সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া দরকার, তা হলো নিয়মগুলোর ব্যাপারে ঐকমত্য শিথিল না করা। সব দলকে এই অবস্থানে শক্ত থাকতে হবে। নিয়ম যদি আমার বিপরীতে যায়, আর আমি তা নিয়ে আন্দোলন শুরু করি—এটা মোটেও কাম্য নয়।
প্রশ্ন: এবার নির্বাচন কমিশনের প্রসঙ্গে আসি। সব মিলিয়ে আপনার কি মনে হয় নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছে, নাকি তাদের কাজের মধ্যে আপনি কোনো ঘাটতি দেখছেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: দেখুন, নির্বাচন কমিশনের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে আমি লক্ষ্য করেছি যে, তারা ডিজিটাল বিষয়গুলো মোটামুটি গুছিয়ে এনেছে। 'স্মার্ট ইলেকশন' নামে একটি অ্যাপ তারা চালু করেছে, যা বেশ কার্যকর বলে শোনা যাচ্ছে। সুতরাং এদিক থেকে প্রস্তুতি ভালোই। পোস্টাল ব্যালটের বিষয়ে কিছু বিচ্যুতির কথা শুনলেও, সামগ্রিকভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। এখন কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠানোসহ অন্যান্য কাজ চলছে। তবে আমাদের নির্বাচন কমিশনের একটি দুর্বলতা বা ঘাটতি হয়তো যোগাযোগের ক্ষেত্রে রয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা জানানোর বিষয়ে তারা যেন কিছুটা নড়বড়ে—হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার তা পাল্টে ফেলছেন, কিংবা চাপের মুখে পরিবর্তন করছেন। এসব জায়গায় তাদের আরও দৃঢ় হওয়া দরকার ছিল।
আমাদের মতো দেশে নির্বাচন কমিশনকে অনেক শক্তি বা ক্ষমতা দেওয়া আছে। কিন্তু আমরা দেখি, সেখানে দুটি সমস্যা হতে পারে—হয় ক্ষমতার অপব্যবহার, নয়তো আমি যেটাকে বলি 'স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রিয়তা'। অর্থাৎ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং কিছু না করা। নির্বাচন কমিশনের উচিত এই স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রিয়তা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার—উভয় থেকেই মুক্ত হয়ে কাজ করা। নির্বাচন প্রক্রিয়াটি তো এই পর্যন্ত চলে এসেছে এবং আমরা তুলনামূলকভাবে সংঘাতহীনভাবেই এতদূর এসেছি। আশা করি, আগামীকালও নির্বাচন কমিশন তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তারা যদি এ পর্যন্ত আসার সুনামটুকু অর্জন করে থাকেন, তবে আগামীকালের সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সেই সুনাম যেন অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন—সেটাই আশা করছি।
প্রশ্ন: আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই—নতুন যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের আসলে কোন দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: সরকার গঠনের পরেই অনেক কিছু নির্ধারিত হবে, তবে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, জাতীয় ঐক্যকে আরও ছিন্নভিন্ন করা একদমই উচিত হবে না। বরং জাতীয় ঐক্যকে কীভাবে আরও সংহত করা যায়, সেদিকে সচেষ্ট থাকতে হবে। কারণ আমরা যদি 'সাংস্কৃতিক সংঘাত' শুরু করি কিংবা যেটুকু সহনশীলতা অর্জন করেছি তা বিসর্জন দিই, তবে আমরা বড় বিপদে পড়তে পারি। তাই জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। অবশ্য জাতীয় ঐক্য বলতে আমি 'জাতীয় সরকার' বোঝাচ্ছি না; আমি বোঝাচ্ছি মানুষের মধ্যে যেন নতুন করে বিভাজন তৈরি না করা হয়, বরং তাদের একত্রিত করা হয়।
দ্বিতীয় জরুরি বিষয়টি হলো অর্থনীতি, যা বর্তমানে বেশ দুরবস্থায় আছে। রিজার্ভ বাড়া বা রেমিট্যান্স আসা দিয়ে অর্থনীতির মূল চিত্রটা পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। আপনারা দেখেছেন কর্মসংস্থানের অবস্থা কী। মূল্যস্ফীতিও কমছে না, বরং স্থির হয়ে আছে; বিনিয়োগও স্থবির। অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কিন্তু স্থির হয়ে থাকে না; আমরা গ্রহণ না করলে অন্য কেউ নিয়ে নেবে। এটি বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার বিষয়। প্রতিযোগী হিসেবে আমরা দক্ষ ও সক্ষমভাবে এগোতে পারছি কি না, সেটাই দেখার বিষয়। অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে হবে। অনেক ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে—এত চাকরি বা কর্মসংস্থান হবে—কিন্তু বাস্তবে সেগুলো কীভাবে অর্জিত হবে, সেই অনুধাবনটা খুব জরুরি।
সেজন্য আমি মনে করি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, বিশেষ করে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে যে অর্থনৈতিক শাসন বা প্রবৃদ্ধির মডেল দাঁড় করিয়েছিল, তা অনেকাংশে এখনও অক্ষুণ্ণ আছে। আমরা ঋণনির্ভরতা কমাতে পারিনি। বর্তমান সরকারও বিভিন্ন বাজেট সহায়তা নিচ্ছে, যা ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ব্যয় দক্ষতা বা এডিপি (ADP) বাস্তবায়নের হারও বাড়ানো যায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে আমরা যেন উল্টো পথেই হেঁটেছি। দুর্নীতিও জোরালোভাবে কমানো সম্ভব হয়নি। হয়তো দৃশ্যমান কিছু দুর্নীতি কমেছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কালো ছায়া সর্বত্র রয়ে গেছে। দুর্নীতি কীভাবে মূলোৎপাটন করা যাবে, সে বিষয়ে একটি মহাপরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা সংস্কার কমিশনগুলোর দায়িত্ব ছিল। এই জায়গাটিতে নজর দেওয়া খুবই জরুরি।
আরেকটি বিষয় হলো 'হিউম্যান ক্যাপিটাল' বা মানবসম্পদ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত সঙ্গিন অবস্থায় আছে। অবকাঠামো ও প্রকল্প বাড়লেও শিক্ষার মান এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না—শিক্ষার বিস্তার ঘটছে ঠিকই, কিন্তু মানবসম্পদ গড়ে উঠছে না। এই নেতিবাচক সমীকরণটি ভাঙা খুব জরুরি। আগামী সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা থাকবে এ বিষয়ে কাজ করার। পাশাপাশি, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বিশ্ব পরিবেশ অনুধাবন করা এবং সজাগ দৃষ্টি রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে 'স্থায়ী বন্ধু' বলে কিছু নেই; আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বন্ধু নির্বাচন করতে হবে এবং সময়ের সঙ্গে তা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
সবশেষে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, যা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখন কথা বলছে এবং আমিও দীর্ঘদিন ধরে বলার চেষ্টা করছি। তা হলো আমাদের 'স্টাইল অফ গভার্নেন্স' বা আমলাতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতির বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার। এটি সহজ কাজ নয় এবং কোনো একটি প্রজেক্ট দিয়ে এটি হবে না। আপনারা যেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করেন, তেমনি প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিবর্তনকেও নির্বাচিত সরকারের সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।