অধিকারকর্মী হিসেবে সুপরিচিত ফরিদা আখতার। ১৯৮০-এর দশক থেকেই, বিশেষ করে নারী অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত উন্নয়ন বিতর্কের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালকও ছিলেন। জৈব কৃষি, প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে একাধিক গবেষণামূলক গবেষণা ও কাজের সঙ্গে যুক্ত তিনি।
গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত হওয়া অন্তর্বর্তী সরকারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান ফরিদা আখতার। গত দেড় বছর নিজ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন শেষে দেশের কৃষি খাত, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত এবং এ খাতের উন্নয়ন ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন এশিয়া পোস্টের সঙ্গে।
এশিয়া পোস্ট : কৃষিকে আমরা সচরাচর যেভাবে দেখি, প্রাণিসম্পদ খাত কি তার চেয়ে ভিন্ন কিছু? বিশেষ করে পোলট্রি ও দেশীয় জাত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ফরিদা আখতার: আমরা অনেক সময় কৃষিকে খুব সংকীর্ণভাবে বুঝি। কৃষি বা খাদ্য বলতেই যেন শুধু চাল, ডাল—এগুলোকেই বোঝায়; মাছ ও মাংস এর বাইরে থেকে যায়। মন্ত্রণালয়ে এসে দেখলাম, এখানে শুধু বলা হচ্ছে—আমরা প্রোটিন বা প্রাণিজ আমিষের জোগান দিচ্ছি। কিন্তু এটাও যথেষ্ট নয়। বিষয়টির গভীরে গিয়ে বুঝলাম, খাদ্যের জোগান দেওয়া একটা দিক, কিন্তু এর সঙ্গে আমাদের দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা জড়িত। যেমন ধরুন, হাঁস-মুরগি বা গরু-ছাগল—এগুলোর পালনকারী মূলত গ্রামের নারী ও দরিদ্র মানুষ। তারা এগুলো পালন করতে গিয়ে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, সেটা বোঝা জরুরি। আমাদের দেশে ডেইরি বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল লাইভস্টক সেক্টর সেভাবে গড়ে ওঠেনি, যেভাবে পোলট্রি সেক্টর গড়ে উঠেছে। পোলট্রিতে আমরা হয়তো কিছুটা এগিয়েছি এবং এর ইতিবাচক দিক হলো মানুষ সস্তায় ডিম ও মাংস পাচ্ছে। কিন্তু ক্ষতির দিক হলো, আমাদের স্থানীয় জাতের মুরগির প্রতি কোনো মনোযোগ নেই, সরকারি কোনো পরিকল্পনাও নেই। ওটা যেন কেবল বিএলআরআই (বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট)-এর গবেষণার বিষয় হয়ে আছে। অথচ এটিই আমাদের মূল সম্পদ ছিল।
এশিয়া পোস্ট: দায়িত্ব নেওয়ার পর উৎপাদন বৃদ্ধিতে আপনি কোন বিষয়গুলোর ওপর জোর দিচ্ছেন? খামারিরা, বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ে যারা গবাদিপশু পালন করেন, তাদের সহায়তায় ভ্যাকসিনের সমস্যা সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
ফরিদা আখতার: দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি চেষ্টা করেছি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি মানে এই নয় যে, কেবল কৃত্রিম প্রজনন আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন করে গরুর দুধ বাড়াতে হবে। প্রাণিসম্পদের সঙ্গে যে ব্যাপক জনগোষ্ঠী জড়িত, আমরা যদি তাদের সহায়তা করতে পারি—সেটাই বড় কাজ। আর এই সহায়তা করা খুব কঠিন কিছু নয়। যেমন, ভ্যাকসিনের নিশ্চয়তা দেওয়া। আমি এখন সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছি। আমরা যদি রোগ নিরাময়মূলক বা প্রতিরোধমূলক কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারি, তাহলে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই পশুপালন করতে পারবে। এতদিন মনোযোগ না দেওয়ার কারণে এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভ্যাকসিনের দাম। সরকারিভাবে যা দেওয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় কম, ফলে মানুষ প্রাইভেট সেক্টর থেকে ভ্যাকসিন নিচ্ছে। সরকার যেখানে হয়তো ৫০ টাকায় দিত, প্রাইভেট কোম্পানি নিচ্ছে ৩০০ টাকা। এই পার্থক্য গরিব মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই আমি আমাদের দেশীয় গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এই বিষয়গুলোতে নজর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
এশিয়া পোস্ট: আমাদের দেশে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন ও সংরক্ষণে কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে? উৎপাদন বাড়াতে বিদেশি জাত বা কৃত্রিম প্রজননের ওপর নির্ভরতা এবং দেশীয় জাতের উপযোগিতা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ফরিদা আখতার: বৈচিত্র্যের দিক থেকে আমি জেনে খুব খুশি হয়েছি যে, আমাদের দেশে গবাদিপশুর প্রচুর বৈচিত্র্য রয়েছে। বাংলাদেশ ছোট একটি ভূখণ্ড হলেও পার্বত্য এলাকায় বিশেষ জাতের গরু পাওয়া যায়, উত্তরবঙ্গে ‘নর্থ বেঙ্গল গ্রে’ আছে, মুন্সীগঞ্জে ‘মীরকাদিম’ এবং পাবনাতেও নিজস্ব ভ্যারাইটি বা জাত রয়েছে। এতদিন উৎপাদন বৃদ্ধির নামে ক্রস বা শংকর জাত করতে গিয়ে আমরা ক্ষতি করে ফেলেছি। আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন বা কৃত্রিম প্রজনন বারবার করার ফলে পশুদের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং অন্যান্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বলা হয়েছিল বিদেশি জাত আনলে গরু মোটাতাজা হবে, বেশি মাংস ও দুধ পাওয়া যাবে। এটা ঠিক যে দেশীয় গরু ১০ লিটার দুধ দিলে বিদেশি জাত ৩০-৪০ লিটার দেবে। কিন্তু এর পেছনের বাস্তবতা গ্রামের নারীরা খুব সুন্দর করে তুলে ধরেন। তারা বলেন, ‘বিদেশি গরুর জন্য ফ্যান চালাতে হয়, মশারি টাঙাতে হয়, বিশেষ খাবার দিতে হয়, আবার অ্যান্টিবায়োটিক তো আছেই।’ অর্থাৎ এর পেছনে যে যত্ন ও খরচ লাগে, তা দিয়ে আমি দেশীয় তিনটা গরু পালতে পারি এবং সেখান থেকেই ৩০ লিটার দুধ পেতে পারি, যা পালন করাও সহজ।
এশিয়া পোস্ট: খামারিদের অন্যতম বড় সংকট গো-খাদ্য ও মৎস্য খাদ্যের উচ্চমূল্য। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে এবং জিএমও মুক্ত খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় কী ভাবছে?
ফরিদা আখতার: আরেকটি গভীর সমস্যা হলো খাদ্য—গোখাদ্য বা মৎস্য খাদ্য। মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৭০ শতাংশই চলে যায় খাদ্য কেনা বাবদ। এই খাদ্যগুলো কী? এগুলো মূলত আমদানি করা উপকরণ দিয়ে দেশীয় কোম্পানিগুলো তৈরি করে। আমদানিকৃত উপাদানের মধ্যে সয়াবিন ও ভুট্টা অন্যতম, এবং খোঁজ নিলে দেখা যাবে এগুলোর জিএমও (GMO) হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অর্থাৎ, আমরা আমদানি করা জিএমও খাদ্য গরুকে খাওয়াচ্ছি এবং এতে উৎপাদন খরচও বাড়ছে। অন্যদিকে বিএলআরআই এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এখন ঘাস উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে, যা খুব ভালো উদ্যোগ। কারণ গরু তৃণভোজী, তাকে দানাদার খাবার খাওয়ানো খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়। কিন্তু আমাদের ঘাস ও খড়ের সংকট থাকায় দানাদার খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াতে হয়। আমরা যদি দানাদার খাদ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারি—যেমন স্থানীয়ভাবে ভুট্টা ও সয়াবিন উৎপাদনের ব্যবস্থা করা—তাহলে ফিড উৎপাদনকারীদের সুবিধা হবে। কারণ যারা ফিড আমদানি করে, তাদের উৎসে কর ও শুল্কের চাপে পড়তে হয়। এই জায়গাগুলোতে নীতিগত সহায়তা দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
এশিয়া পোস্ট: ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া এবং এর পেছনের কারণ অনুসন্ধানে আপনাদের পর্যবেক্ষণ কী?
ফরিদা আখতার: মৎস্য ক্ষেত্রে ইলিশের প্রাপ্যতা কমছে, এটা কিন্তু এক বছরের ঘটনা নয়। গত চার-পাঁচ বছর ধরে এটি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। হ্রাসের কারণগুলোও অনেক বছর ধরে ঘটে আসছে, কিন্তু কেউ তা দেখার চেষ্টা করেনি। যেন মনে করা হয় ইলিশ একটি ‘রেডিমেড প্রোডাক্ট’, নদী বা সমুদ্র থেকে লাফ দিয়ে বাজারে চলে আসবে। দাম কমলো কি কমলো না—শুধু সেটুকুই দেখার বিষয়। এই যে না দেখা বা কারণ না খোঁজা, এটা বড় সমস্যা। কাউকে এটা নিয়ে লেগে থাকতে হয়।
এশিয়া পোস্ট: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে কৃষির ‘উপখাত’ হিসেবে দেখার বিষয়ে আপনার তীব্র আপত্তি রয়েছে। বিদ্যুৎ বিল বা প্রণোদনার ক্ষেত্রে এই খাত কী ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এবং এর সমাধানে আপনারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
ফরিদা আখতার: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিদ্যুৎ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে কৃষির ‘উপখাত’ বলা হয়। আমি এতে ভয়ানক আপত্তি জানাচ্ছি। যদি কৃষির উপখাতই হবে, তবে কৃষির মতো প্রণোদনা বা ভর্তুকি কেন দেওয়া হয় না? আমাকে বিদ্যুতের বিল দিতে হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা কমার্শিয়াল রেটে। বন্যায় আক্রান্ত হলে কৃষকরা প্রণোদনা পায়, কিন্তু মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ খামারিরা পায় না। আমাকে যখন ইন্ডাস্ট্রির মতো বিবেচনা করা হচ্ছে, তখন আমি উপখাত হব কেন? জিডিপিতে কৃষির অবদান ক্রমাগত কমে এখন প্রায় ১১ শতাংশে ঠেকেছে। অন্যদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ—এই দুই খাত মিলে জিডিপিতে অবদান প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা কৃষির অর্ধেকের মতো। অন্যান্য অনেক খাতের অবদান ৫ শতাংশের চেয়েও কম। সেদিক থেকে আমরা কেন একটি স্বতন্ত্র খাত হব না? বাজেটে আমাদের বরাদ্দ দেওয়া হয় কৃষির অংশ হিসেবে এবং সেটাও কমতে থাকে। সাংবাদিকরাও যখন লেখেন, কৃষি, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য নিয়ে লেখেন, কিন্তু মৎস্য খাত নিয়ে আলাদাভাবে কেউ লেখেন না। এর ফলে এটি যে একটি পূর্ণাঙ্গ সেক্টর, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এর যে বিশাল অবদান—তা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। এটাকে উপখাত বানিয়ে রাখাটা আমার কাছে অন্যায় মনে হয় এবং এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এফএও (FAO)-কেও আমি বলেছি, তোমরা ফিশারিজ ও লাইভস্টক নিয়ে কাজ কর, তাহলে নাম কেন শুধু ‘অ্যাগ্রিকালচার’ (Agriculture)? আমি তাদের বলেছি আমাদের যেন শুধু সাব-সেক্টর হিসেবে না দেখা হয়। তারা আমার কথা শুনেছে। এই খাতের অবদান বাড়াতে হলে এর মর্যাদা ও সম্মান বাড়াতে হবে, অন্যের অধীন রাখা যাবে না। আর যদি রাখাই হয়, তবে সমান সুযোগ দিতে হবে।
বিদ্যুতের সমস্যাটি নিয়ে আমরা চেষ্টা করছি। গত এক বছর ধরে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে বলার পর তারা ভর্তুকির কথা বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠায়। সেখান থেকে আবার এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে গেছে। তারা হয়তো কৃষির মতো একটি রেট ঠিক করবে। আমরা বলেছি, বাজেটে যেখানে কৃষি থাকে, তার পাশে ‘ওবলিক’ (/) দিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ লিখে দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
এশিয়া পোস্ট: চিংড়ি রপ্তানি কমে যাওয়া এবং একে ‘অকৃষিজ পণ্য’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করার বিষয়ে আপনার মতামত কী?
ফরিদা আখতার: চিংড়ির ব্যাপারে শুনলাম, রপ্তানি পণ্যের তালিকায় একে ‘অকৃষিজ শিল্প পণ্য’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটা কেন অকৃষি হবে? চিংড়ির সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকা ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্পর্ক আছে। এটি তো আমি কারখানায় তৈরি করছি না, প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরণ করে প্রসেস করছি। চিংড়ি রপ্তানি কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি। নব্বইয়ের দশকে গার্মেন্টসের পাশাপাশি চিংড়ি রপ্তানিকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, এমনকি ম্যানগ্রোভ বন কেটে পরিবেশের ক্ষতি করে হলেও একে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। আর এখন এর প্রতি চরম অবহেলা।
এশিয়া পোস্ট: চরাঞ্চলে গবাদিপশুর চারণভূমি বা বাথান এবং জলমহাল ইজারা নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের কোনো অভাব কি পরিলক্ষিত হচ্ছে? এ ক্ষেত্রে নীতিগত কী পরিবর্তন আপনারা চাচ্ছেন?
ফরিদা আখতার: আরেকটি বড় সমস্যা হলো চরাঞ্চল ও ভূমি মন্ত্রণালয় নিয়ে। যখন কোনো চর জাগে, সেটি মহিষ বা গরুর বাথান হতে পারে—সিরাজগঞ্জ বা মনপুরার মতো জায়গায় আমি দেখেছি। কিন্তু চর জাগলেই ভূমি মন্ত্রণালয় সেটি নিয়ে নেয় এবং ইজারা দিয়ে দেয়। যেখানে মহিষ বা গরু পালন হয়, সেখানে কেন বাথান করতে দেওয়া হবে না? এটা তো সরকারি জায়গাই। ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রেও দেখা হয় কত বেশি রাজস্ব আসবে। এমন চড়া মূল্য নির্ধারণ করা হয় যা মৎস্যজীবীদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে অমৎস্যজীবীরা ইজারা পায়। আমরা যদি রাজস্বের বদলে দেখতাম কে প্রাণবৈচিত্র্য ও জলজ সম্পদ রক্ষা করতে পারবে, তাহলে সেটাই হতো প্রকৃত লাভ। এখন ইজারা নীতির সংশোধন চাচ্ছি। ভালো খবর হলো, ভূমি মন্ত্রণালয় বাঁওড়ের ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা করেছে।
এশিয়া পোস্ট: মৎস্যজীবীদের সংজ্ঞা এবং জলজ প্রাণী আহরণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বা বন বিভাগের সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান বা আইনি জটিলতা আছে কি?
ফরিদা আখতার: হাওর এবং নদীর ইজারা নিয়েও সমস্যা আছে। গতকাল সিরাজগঞ্জে দেখলাম, একটি মসজিদ কমিটি প্রবহমান নদী ইজারা দিচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মালিকানা স্থাপনের বিষয়টি এখন খুব খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। আবার সংজ্ঞাগত সমস্যাও আছে। মৎস্য নীতিমালায় মৎস্যজীবীর সংজ্ঞা স্পষ্ট নয়। যখন সংজ্ঞায় মৎস্য, কাঁকড়া ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করতে চাওয়া হলো, তখন বন মন্ত্রণালয় আপত্তি জানাল। তারা বলল, ‘কাঁকড়া বন্য প্রাণী (Wild Animal), এটি ধরা যাবে না।’ অথচ কাঁকড়া অনেকের জীবিকা এবং খাদ্য। বন মন্ত্রণালয় যদি এসে বলে এটি ধরা যাবে না এবং ধরলে তাকে মৎস্যজীবী বলা যাবে না—তাহলে সংকট তৈরি হয়। কাজ করতে গেলেই বোঝা যায় আন্তঃমন্ত্রণালয় নির্ভরতা এবং সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা কোথায় কোথায় সমস্যা তৈরি করে রেখেছে।
এশিয়া পোস্ট: ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে নদীর নাব্যসংকট কতটা বড় বাধা? এ ছাড়া হাওর ও জলাশয়ে ‘অল ওয়েদার রোড’-এর মতো অপরিকল্পিত অবকাঠামো মৎস্যসম্পদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন?
ফরিদা আখতার: ইলিশের ক্ষেত্রে এখন যে সমস্যাটি হচ্ছে, তা হলো নদীর নাব্যসংকটের কারণে সমুদ্র থেকে ইলিশ আসতে পারছে না। তখন আমাদের কার কাছে যেতে হয়? হয় নৌপরিবহন, নয়তো পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে। আমাদের মন্ত্রণালয়ের ড্রেজিংয়ের কোনো ক্ষমতা নেই, অথচ আমরাই এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। এরপর আরেকটি বড় সমস্যা হলো অপরিকল্পিত বাঁধ। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে গিয়ে দেখবেন বাঁধ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে হাওরগুলো নষ্ট হচ্ছে। কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম যে রাস্তাটি করা হয়েছে, তাকে ‘অল ওয়েদার রোড’ বলা হচ্ছে। সড়ক উপদেষ্টা বলেছেন, এর মতো ভুল নাম আর হয় না। কারণ এর আগে-পিছে যেসব রাস্তা আছে, সেগুলো সাবমারসিবল এবং বর্ষাকালে পানির নিচেই থাকে। এই রাস্তাটি শুধু তিনটি উপজেলাকে সংযুক্ত করেছে। কিন্তু সেখানে যেতে হলে অন্য জায়গা থেকে প্রথমে স্পিডবোটে যেতে হয়। আমি নিজে সেখানে গিয়ে ঘুরে এসেছি।
এর ফলে পানির প্রবাহ এবং মাছের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা সড়ক উপদেষ্টাকে বিষয়টি জানানোর পর তিনি নিজে গিয়েছিলেন এবং একটি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্টের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বর মাসে সেই অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে যে, প্রবাহ ঠিক রাখতে হলে কিছু কালভার্ট এবং মাঝখানে ব্রিজের মতো কিছু অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। রাস্তাটি যে কতটা শখের বশে করা হয়েছিল, তার প্রমাণ বার্জার পেইন্টিংয়ের আলপনা। আলপনা আঁকতে হলো, অথচ সেই রং পানিতে গিয়ে মাছের ক্ষতি করল। এগুলোকে কী বলবেন? এগুলো কত বড় অন্যায়! যেহেতু ৪০০ কোটি টাকা খরচ করে ফেলা হয়েছে, তাই এখন বলা হচ্ছে রাস্তাটি ভাঙা যাবে না। তাই এর মাঝখানেই কিছু পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
এশিয়া পোস্ট: অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের যে ক্ষতি করছে, তা রোধে ভবিষ্যতে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে আপনারা কোনো নীতিগত বাধ্যবাধকতা বা ছাড়পত্রের নিয়ম চালু করার কথা ভাবছেন কি?
ফরিদা আখতার: আমি এখন একটি দাবি তুলছি—যেকোনো কিছু করার ক্ষেত্রে যেমন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র লাগে, তেমনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়েরও ছাড়পত্র নিতে হবে। কারণ পরিবেশ মন্ত্রণালয় সবসময় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতির বিষয়টি খেয়াল নাও করতে পারে; ওটা তাদের আওতার বাইরে থাকতে পারে। যেমন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় করার সময় পরিবেশ মন্ত্রণালয় হাওর এলাকাটি দেয়নি, এটা ভালো ভাগ্য। কিন্তু চলন বিলে পুরো মৎস্য সম্পদ নষ্ট হয়ে যেত। সিরাজগঞ্জের মিল্ক ভিটা এলাকায় বন্যার সময় আমি দেখেছি বাথানগুলোতে শুধু গরু আর গরু। এসবের পেছনে কত মানুষের জীবন জড়িত, তা কেউ খেয়াল করে না। তাই আমি বলছি, আগামীতে অনেক পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু এক জায়গা থেকে সনদ নিলে চলবে না।
এশিয়া পোস্ট: পোলট্রি খাতে গুটিকয়েক করপোরেট কোম্পানির বাজার নিয়ন্ত্রণ বা ‘অলিগোপলি’র অভিযোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র খামারিদের স্বার্থ রক্ষা এবং ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’-এর মতো বিষয়গুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ফরিদা আখতার: করপোরেট কোম্পানিগুলো আসবে, এটা ঠেকানো যাবে না এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে তাদের অবদান আমি অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু পোলট্রি খাতে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। মাত্র কয়েকটা কোম্পানির হাতে ‘ডে ওল্ড চিকেন’ বা এক দিনের বাচ্চার পুরো নিয়ন্ত্রণ। এটি একটি অলিগোপলির মতো হয়ে আছে এবং তারাই দাম নির্ধারণ করে। অথচ তারা মোট সাপ্লাইয়ের মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ জোগান দেয়, বাকিটা দেয় ক্ষুদ্র খামারিরা। কিন্তু এই ক্ষুদ্র খামারিরা বাচ্চার জন্য এবং ফিডের জন্য তাদের ওপর নির্ভরশীল। ডিলারদের মাধ্যমে একটি চেইন গড়ে উঠেছে, যারা করপোরেট স্বার্থই রক্ষা করে। করপোরেটাইজেশনের মধ্যে আমি যে বিষয়টি পছন্দ করছি না, তা হলো ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’। এতে খামারিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না, তারা কোম্পানির অধীনস্থ হয়ে যাবে। তারা হয়তো সুযোগ-সুবিধা পাবে, কিন্তু এটি অনেকটা তামাক চাষের মতো হয়ে যাবে। ক্ষুদ্র খামারিরা যদি স্বাধীন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে না পারে, তবে পুরো সেক্টরের জন্য তা ভালো হবে না।
এশিয়া পোস্ট: ডিম ও দুধের বাজারের অস্থিরতা এবং খামারি ও ভোক্তার দামের মধ্যে বিশাল ব্যবধান—এই সংকট নিরসনে সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা ‘চিলিং সেন্টার’ গড়ে তোলার বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
ফরিদা আখতার: আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডিমের দাম বাড়ার একটি কারণ হলো, এ সময় সবজি উৎপাদন কম থাকে। মধ্যবিত্ত পরিবারও বাজারে গিয়ে সবজি কিনতে না পেরে ডিমের ওপর নির্ভর করে। ডিম আর আলু মিলে একটি তরকারি হয়ে যায়। এ সময় চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। আবার ডিমের চাহিদার সিজনাল ব্যাপারও আছে। খুব গরম পড়লে ডিম দ্রুত নষ্ট হয় বলে দাম কমে যায়। খামারিরা অভিযোগ করেন, দাম বাড়লে পত্রিকায় লেখা হয়, কিন্তু কমলে লেখা হয় না। তবে এই চাহিদার তারতম্যের সুযোগ ক্ষুদ্র খামারিরা পায় না, নেয় বড় করপোরেট সেক্টর। এটি সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়। এখানে সরকারের অনেক কিছু করার আছে।
উপজেলা পর্যায়ে যদি চিলিং সেন্টার করা যায় এবং প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগ আনা যায়, তবে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। দুধের চাহিদাও একেক সময় একেক রকম থাকে। মিষ্টির চাহিদা বাড়ে বিয়ের বা পরীক্ষার মৌসুমে। আবার আমের মৌসুমে মানুষ মিষ্টির বদলে আম নিয়ে বেড়াতে যায়, তাই দুধের চাহিদা কমে। যদি দুধের কালেকশন পয়েন্ট বা সংগ্রহ কেন্দ্র থাকত, তবে এই সমস্যা হতো না। মিল্ক ভিটার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কালেকশন বাড়ানো উচিত। আমি ঝিনাইদহ গিয়ে কেঁদে ফেলেছি যখন শুনলাম বাজারে দুধ ৫০ টাকা, অথচ খামারিদের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে ২০ টাকায়। এই ২০ টাকায় তারা কী করবে? কিছু বড় ব্র্যান্ড এই সুযোগ নিয়ে নিজেরা বেশি দামে বিক্রি করছে, কিন্তু খামারিদের ন্যায্য দাম দিচ্ছে না। এই অন্যায় রোধে আমাদের রেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: প্রাকৃতিক উৎসের মাছ কমে যাওয়ায় আমরা এখন চাষের মাছ বা অ্যাকুয়াকালচারের ওপর নির্ভরশীল। এতে মাছের বৈচিত্র্য কমে যাওয়া এবং মাছ ও পোলট্রি ফিডে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য যে হুমকি তৈরি করছে, তা মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
ফরিদা আখতার: আমাদের মাছ দুইভাবে আসে। একটি হলো নদী, খাল, বিল, হাওর-বাঁওড়ের মতো জলাশয় থেকে আহরণ করা। এখানে আমাদের মূল কাজ হলো মাছের বসবাসের পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রজনন ঋতুতে নিষিদ্ধ সময় ঘোষণা করা। এককালে মোট মাছের ৬০ শতাংশেরও বেশি আসত প্রাকৃতিক উৎস থেকে, আর ৩০-৪০ শতাংশ আসত চাষ বা অ্যাকুয়াকালচার থেকে। এখন পরিস্থিতি উল্টে গেছে; প্রায় ৬০ শতাংশই আসে চাষকৃত মাছ থেকে। এর ভালোমন্দ দুই দিকই আছে। তবে ‘নয়াকৃষি’র দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমি দেখি যে, চাষ করতে গিয়ে আমরা মাছের প্রজাতি সীমিত করে ফেলছি। রুই, কাতলা, পাঙাশ, পাবদা, সিলভার কার্প, তেলাপিয়া—এর বাইরে খুব বেশি মাছ পাওয়া যায় না। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এর বাইরে মাছের নামও বলতে পারে না। সামুদ্রিক মাছও আমরা খুব বেশি পরিচিত করতে পারিনি। তবে অ্যাকুয়াকালচারে আমরা বিশ্বে পঞ্চম স্থানে আছি এবং এটি প্রোটিনের জোগান দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিককে জিজ্ঞেস করলে সে পাঙাশ মাছ খাওয়ার কথা বলে, যা শুনে আমার ভালো লাগে।
অন্যদিকে মাছের ফিড বা খাবার নিয়েও সমস্যা আছে। কিছু কোম্পানি এটি নিয়ন্ত্রণ করে এবং ফিডে চামড়ার বর্জ্যসহ ক্ষতিকর অনেক কিছু মেশায়। দ্রুত লাভের আশায় তারা অ্যান্টিবায়োটিক দেয়, এমনকি খরচ বাঁচাতে বিষ দিয়ে মাছ ধরে। অ্যাকুয়াকালচারে এসব ঘটার ফলে নিরাপদ মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। আমি এই জায়গায় নজর দিতে চাই এবং রেগুলেটরি মেকানিজম শক্ত করতে চাই। আমরা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি। পোলট্রিও যেন অ্যান্টিবায়োটিক মুক্ত থাকে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের অনেকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ১৭-১৮টি অ্যান্টিবায়োটিকও কাজ করছে না। শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তাদের বাঁচানো গেছে। তাই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য—এই তিনটি মিলে যে ‘ওয়ান হেলথ’ কনসেপ্ট, তা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। আমরা যদি প্রাণীর স্বাস্থ্য রক্ষা করি এবং সুস্থ প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি, তবে মানুষের অসুস্থতাও কমবে।
এশিয়া পোস্ট: খামারিদের সুরক্ষা দিতে বিমা ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে ভোক্তার কাছে ন্যায্যমূল্যে পণ্য পৌঁছাতে সরকারের উদ্যোগগুলো কী?
ফরিদা আখতার: ট্যাক্স-ভ্যাটের কথা বলতে গেলে এনবিআরের কথা আসে। তারা মনে করে ভ্যাট থেকেই রাজস্ব আসবে। কিন্তু আমার মনে হয় এর মাধ্যমে সম্পদ রক্ষা বা মানুষকে নিশ্চয়তা দেওয়াটা বেশি জরুরি। ইনস্যুরেন্স বা বীমা নিয়ে আমরা কাজ করছি। কৃষির মতো আমাদের খাতেও বাম্পার ফলন হলে খামারিরা দাম পায় না, পণ্য ফেলে দিতে হয়। দামের বিষয়টি আমরা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। দেখা গেছে, খামারি কম দাম পাচ্ছে কিন্তু ভোক্তা বেশি দামে কিনছে। ডিম ভোক্তার হাতে আসার আগে প্রায় ছয়বার হাত বদলায়। প্রতিবার এক টাকা করে বাড়লেও দাম অনেক বেড়ে যায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার এবং আমরা সবাই মিলে এই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর চেষ্টা করছি।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো চাঁদাবাজি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ছাড়া এটি কমানো সম্ভব নয়। আড়তদাররাও এতে অতিষ্ঠ। আমাদের বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থা কৃষি বা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বান্ধব নয়। সরকারি উদ্যোগে বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা করা গেলে খরচ কমত। কোরবানির ঈদের সময় যেমন দেওয়া হয়, তেমনি সারা বছর যদি ট্রেনের বিশেষ বগি কৃষি ও মৎস্য পণ্যের জন্য বরাদ্দ দেওয়া যেত, তবে খুব ভালো হতো।
এশিয়া পোস্ট: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত থেকে রপ্তানি আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা কতটুকু? আর আপনার শুরু করা সংস্কার ও উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকার বিষয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
ফরিদা আখতার: আমরা রপ্তানিতে যাবই। কারণ বিশ্বের অনেক দেশে বাঙালিরা আছেন, তারাই আমাদের ক্রেতা হবেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায়। আমাদের গরুর উৎপাদন ও সিস্টেমের দক্ষতা বাড়াতে পারলে রপ্তানি সম্ভব। মাছের ক্ষেত্রে আমাদের ‘ডিপ সি ফিশিং’ বা গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে যেতে হবে। অভ্যন্তরীণ মৎস্য আহরণে সীমাবদ্ধতা থাকলেও গভীর সমুদ্রে আমরা অবশ্যই পারব। চিংড়ি রপ্তানির সমস্যাগুলো দূর করে আবার রপ্তানি বাড়াতে হবে। অর্থনীতিতে এখানে বড় সুযোগ রয়ে গেছে।
আমরা যদি কিছু ভালো কাজ করে থাকি, তবে আশা করব পরবর্তী সময়ে যারা আসবেন, তারা যেন এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। গত সরকারের কাজ বলেই সব বাদ দিতে হবে—এমনটা আমরা করিনি; কাজের ভালোমন্দ বিবেচনা করেছি। ঠিক তেমনি, এই এক-দেড় বছরে আমরা যেসব ভালো কাজ করেছি, সেগুলো যেন অব্যাহত থাকে। জনগণের জীবন-জীবিকা, প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা এবং অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নে এই মন্ত্রণালয়ের অবদানকে আরও সামনে নিয়ে আসাটাই আমার লক্ষ্য।
এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ফরিদা আখতার: আপনাকেও ধন্যবাদ।
মন্তব্য করুন





