ড. বদিউল আলম মজুমদার, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য। তিনি সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। নির্বাচনে মাঠের পরিবেশ, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, নির্বাচন কমিশনের সাফল্য-ব্যর্থতা, গণতন্ত্রে উত্তরণসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
প্রশ্ন: ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে। সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনের মাঠের পরিবেশ কেমন দেখছেন?
বদিউল আলম মজুমদার: এখন পর্যন্ত যা দেখছি, পরিবেশ মোটামুটি শান্তই বলা চলে। মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছে। কিছুটা উত্তাপ-উত্তেজনা থাকলেও তা বড় ধরনের কোনো সহিংসতায় রূপ নেয়নি। মানুষ ভোট দিতে গ্রামে গিয়েছে, ফলে ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে গেছে। মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করছি; বহু বছর পর তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পেয়েছে। তাই আমি আশাবাদী যে, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রশ্ন: অতীতে বাংলাদেশে যত নির্বাচন হয়েছে—বিশেষ করে শেখ হাসিনা আমলের ১৫ বছর এবং তার আগের সময়গুলো বিবেচনায় নিলে—এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও পরিবেশ কতটা ভিন্ন?
বদিউল আলম মজুমদার: অনেকটাই ভিন্ন; এখানে বিরাট পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। শেখ হাসিনা অবশ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসেছিলেন। ২০০৮ সালের সেই নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও তা গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, সেগুলোকে জালিয়াতির নির্বাচন বলা চলে। এর কোনোটি ছিল জালিয়াতিপূর্ণ, আবার কোনোটি একতরফা। এগুলো মোটেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল না। এর মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে এবং কার্যত আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থাকেই নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, প্রতিষ্ঠানগুলোতে চরম দলীয়করণ এবং ব্যাপক নিপীড়ন-নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতো, এখন হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে। যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কারও প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার কথা নয়, তাই আমরা আশা করছি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। পরিবেশটা সম্পূর্ণ আলাদা। আগে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দলীয়করণ ছিল, নির্বাচন কমিশনও চরম পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। বর্তমান পরিবেশ হয়তো সবচেয়ে আদর্শ নয়, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং অযোগ্য প্রার্থীদের অংশগ্রহণ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কতটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে আপনি মনে করেন?
বদিউল আলম মজুমদার: বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিছুটা ইতিবাচক, আবার কিছুটা নেতিবাচক। ইতিবাচক দিক হলো, মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় আশা করা যায় ভোট শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ হবে। সরকারের পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার কারণ নেই এবং নির্বাচন কমিশনেরও নিরপেক্ষ আচরণ করার কথা। মানুষ তাদের ভোটাধিকার ছাড়াও কথা বলার স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে।
তবে কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে আমরা যেসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক হতে পারত, তার অনেকগুলোই তারা গ্রহণ করেনি। এ ছাড়া ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের মনোনয়ন বৈধ করার মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে, যা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। আমরা হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, অনেকে আইন অনুযায়ী সর্বশেষ আয়কর বিবরণী জমা দেননি। পর্যবেক্ষক নিয়োগ নিয়েও চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এসব বিষয় কমিশনের সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। যারা ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিক বা যারা আয়কর বিবরণী জমা দেননি—অর্থাৎ যাদের মনোনয়নপত্র অসম্পূর্ণ—তাদের মনোনয়ন বাতিল হওয়ার কথা। যখন এমন সম্ভাব্য অবৈধ প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেন, তখন নির্বাচনের হিসাব-নিকাশই বদলে যায়। যারা হয়তো জিতত না, তারা জিতে যেতে পারে। নির্বাচন শুধু ভোট দিলেই হয় না, তা হতে হয় নিরপেক্ষ এবং ন্যায়সংগত। অযোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিলে নির্বাচন সুষ্ঠু হলো কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও গ্রহণযোগ্যতার সংকট তৈরি হবে। সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে এই বিষয়গুলোর সুরাহা করতে হবে।
প্রশ্ন: ৪২ জন ঋণখেলাপি রয়েছেন, দ্বৈত নাগরিকদের বিষয়টিও যাচাই করা হয়নি। এমনকি তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ঋণখেলাপির তালিকাও চায়নি, যা সাধারণত অন্য কমিশন করে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত এই নির্বাচন কমিশন কেন এমনটা করল বলে আপনার মনে হয়?
বদিউল আলম মজুমদার: হয়তো এটি একটি দুর্বল নির্বাচন কমিশন এবং তাদের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, তারা কাউকে অসন্তুষ্ট করতে চাননি। কিন্তু এর মাধ্যমে যে নির্বাচনের মৌলিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, তা তারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন কি না, সেটাই চিন্তার বিষয়।
আরেকটি বিষয় হলো, তারা গণভোটের বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করেছে যে, সরকারি কর্মকর্তারা 'হ্যাঁ' বা 'না'-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে তারা আরপিও-এর ৮৬ অনুচ্ছেদ এবং আচরণবিধির উদ্ধৃতি দিয়েছে। অথচ এগুলো সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারা অনুযায়ী এগুলো এখানে খাটে না। তারা নিজেদের আইন সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা একটি বড় ভুল। এই নির্দেশনা গণভোটকে প্রভাবিত করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার অভাব এবং অন্যান্য অভিযোগের দায় তাদেরই নিতে হবে। এর ফলে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত হলো, সে প্রশ্ন তো উঠবেই।
প্রশ্ন: এমন পরিস্থিতি কি আওয়ামী লীগের হাতেই অস্ত্র তুলে দেওয়া হলো না? তারা তো এখন বলার সুযোগ পাবে যে, দেখো, ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিকরা মিলে এই নির্বাচন করছে?
বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, অবশ্যই। শুধু তাই নয়, আমরাও এ নিয়ে অসন্তুষ্ট। এটি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এরা না থাকলে নির্বাচনি ফলাফল যা হতে পারত বা হতো, এখন হয়তো তা ভিন্ন হবে; যদিও আমরা নিশ্চিত নই। তবে এখানে ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন জড়িত। আদালতের অনেক রায় আছে, যেখানে বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সামনে এখনো সুযোগ আছে। তারা যেভাবে সুস্পষ্টভাবে কাউকে কাউকে ছাড় দিয়েছে—একজন কমিশনার তো বলেই ফেলেছেন, 'বৈধ করে দিলাম, টাকাটা কিন্তু ফেরত দিয়েন'—এটা কোনোভাবেই একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আশা করা যায় না। এটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।
এখন তারা যেটা করতে পারে তা হলো—যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের ফলাফল গেজেটে প্রকাশ না করে, তদন্তসাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর ফলাফল প্রকাশ করা। এ ব্যাপারে আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বিচারপতি দেবনাথের একটি রায় আছে—'নূর হোসেন বনাম নজরুল ইসলাম' মামলায়। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের প্রধান আসামি, গডফাদার বা খলনায়ক নূর হোসেনের সেই মামলায় বলা হয়েছে, নির্বাচনকালীন সময়ে যদি কারচুপি বা অনিয়মের প্রশ্ন ওঠে, তবে নির্বাচন কমিশন ফলাফল বাতিল করতে পারবে এবং একই সঙ্গে নতুন নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারবে। তাদের সেই ক্ষমতা আছে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের অগাধ ক্ষমতা রয়েছে। তাদের 'ইনহেরেন্ট পাওয়ার' বা অন্তর্নিহিত ক্ষমতা আছে। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে তারা আইন ও বিধি-বিধানের সঙ্গে সংযোজনও করতে পারে। সাধারণত আইন প্রণয়ন করে সংসদ, কিন্তু আইনে যদি কোনো ফাঁকফোকর বা অস্পষ্টতা থাকে, তবে কমিশন তা দূর করতে পারে।
আরেকজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন যে, নির্বাচনের পরেও এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। তবে আমাদের মনে রাখা দরকার, একবার গেজেট প্রকাশ হয়ে গেলে বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারে চলে যাবে, যাকে 'ইলেকশন পিটিশন' বা নির্বাচনি বিরোধ বলা হয়। তাই গেজেট প্রকাশ না করে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়াই সমীচীন হবে
প্রশ্ন: এই নির্বাচনকে কি আপনি অন্তর্ভুক্তিমূলক বলবেন? অনেকে বলছেন, আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ না করায় নির্বাচনটি পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি?
বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, এক অর্থে এটা সত্য। কিন্তু কেন এমনটা হয়েছে, তা আমাদের বুঝতে হবে। আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ সব নেতাকর্মী পালিয়ে গেছে। তাদের কোনো বিকল্প কমিটিও গঠিত হয়নি। শুধু তাই নয়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে যে হত্যা ও অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার কোনো দায় তারা নেয়নি। উল্টো তারা প্রতিশোধ নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। তারা যে নির্বাচনে অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে না, এই দায় তারা এড়াতে পারে না।
অবশ্য তারা অংশগ্রহণ করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু যারা খুনখারাবি, অন্যায় ও লুটপাট করেছে, তাদের বাদ দিয়ে যদি... আসলে সে ধরনের কোনো উদ্যোগ তারা নেয়নি। তবে যেসব কর্মী-সমর্থক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল না, তাদের তো নির্বাচনে অংশ নিতে বা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে কোনো বাধা নেই।
প্রশ্ন: আপনি তো সারাজীবন সৎ ও ভালো নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করে এসেছেন। আমরা যেন ভালো এমপি নির্বাচন করতে পারি, সে চেষ্টাই আপনি আজীবন করেছেন। এবারের নির্বাচনে আপনার কি মনে হচ্ছে—আমরা যেমনটা চাচ্ছি, তেমন ভালো প্রার্থীরা কি দাঁড়িয়েছেন?
বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, কিছু ভালো এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির (ক্লিন) প্রার্থী অবশ্যই আছেন। তবে অনেক ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিক—যারা নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্য নন—তারাও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বিষয়টি আসলেই উদ্বেগজনক।
বিষয় হলো, আমগাছ রোপণ করে তো আর কাঁঠাল পাওয়া যাবে না। আপনি যদি বিতর্কিত ব্যক্তিদেরই মনোনয়ন দেন এবং বিতর্কিত ব্যক্তিরাই যদি নির্বাচিত হয়ে আসেন, তাহলে আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটবে না। গণতান্ত্রিক উত্তরণ মানে হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা এবং একে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো। এটি আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কিন্তু এর পূর্বশর্ত হলো একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এটিই প্রথম পদক্ষেপ। এই প্রথম পদক্ষেপটি যদি আমরা সঠিকভাবে নিতে না পারি, তাহলে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ প্রশস্ত হবে না। নির্বাচন কমিশন এমন কিছু গুরুতর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করবে।
প্রশ্ন: আপনি তো নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন এবং কাজ করেছেন। সবকিছু মিলিয়ে আপনার কী মনে হয়, আপনাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে?
বদিউল আলম মজুমদার: আমরা অনেকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব করেছিলাম। যেমন—আমরা বলেছি, ঋণখেলাপিদের নির্বাচনের ছয় মাস আগেই ঋণ নিয়মিত করতে হবে, যাতে অভ্যাসগত ঋণখেলাপিরা কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে। আমরা বলেছি, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রায়ন হতে হবে; কারণ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্র ও দলের গণতন্ত্রায়ন জরুরি। আমরা নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ করার কথা বলেছি। নির্বাচনি ব্যয় প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করার এবং নির্বাচনের পর জমা দেওয়া ব্যয়ের হিসাব খতিয়ে দেখার সুপারিশ করেছি।
আরেকটি বিষয় আমরা লক্ষ করেছি—অনেকেই আয়কর রিটার্ন বা ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেননি। আইনে বা আরপিওতে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। যদিও আমরা একাধিক বছরের রিটার্ন চাওয়ার প্রস্তাব করেছিলাম, কিন্তু আইনে সর্বশেষটির কথাই আছে। আমরা দেখেছি, অনেকেই হলফনামার সাথে রিটার্নের বদলে কেবল প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছেন, যা ট্যাক্স রিটার্ন নয়। এর মানে তাদের মনোনয়নপত্র অসম্পূর্ণ। মনোনয়নপত্র অসম্পূর্ণ হওয়া কোনো ছোটখাটো করণিক ভুল নয়, এটি গুরুতর অপরাধ। এ ছাড়া কেউ কেউ পুরনো ছকে হলফনামা জমা দিয়েছেন। বিশেষ করে যারা ট্যাক্স রিটার্ন দেননি, তাদের মনোনয়নপত্র কোনোভাবেই বৈধ হওয়া উচিত ছিল না।
প্রশ্ন: মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা এখন কেমন দেখছেন?
বদিউল আলম মজুমদার: মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে কিছু কিছু জায়গায় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। তবে ঢালাওভাবে কোনো গুরুতর অভিযোগ এখনও আমরা পাইনি, বা অভিযোগ থাকলেও তার স্বপক্ষে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। যেহেতু এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বে আছে, তাই আমি আশা করি মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে।
প্রশ্ন: গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো পরিবর্তন কি দেখেছেন?
বদিউল আলম মজুমদার: ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে একটি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে। শুরুতে কিছু দলের সংকোচ থাকলেও পরে প্রায় সবাই এতে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই ঐক্য এখন আর দেখা যাচ্ছে না; একতার পরিবর্তে অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়েছে। সুজনের পক্ষ থেকে আমরা ২০০৮ সাল থেকে 'প্রার্থী-ভোটার মুখোমুখি' অনুষ্ঠানের আয়োজন করি, যা একটি অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগ। কিন্তু এবার দেখছি, কিছু প্রার্থী বলছেন—'অমুক দলের সাথে বা অমুক প্রার্থীর সঙ্গে আমরা একই মঞ্চে উঠব না'। অথচ আমরা এত মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। যদি গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত হয়, তবেই হয়তো এই রক্তের ঋণ শোধ করার সুযোগ তৈরি হবে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, যারা রক্তপাতের অন্যতম কারণ, তাদের তোষামোদ করা হচ্ছে এবং তাদের সাথে নানা অঙ্গীকার করা হচ্ছে। এটি আমাদের সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি। যেমন—৯০-এর গণআন্দোলনের সময় সব দল একমত হয়েছিল যে, স্বৈরাচার এরশাদের সঙ্গে কেউ হাত মেলাবে না। কিন্তু আমরা জানি বাস্তবে কী হয়েছিল। এবারও পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা জাগছে। যারা কোনো অন্যায়, লুটপাট বা খুনখারাবির সঙ্গে জড়িত ছিল না, তাদের হয়রানি করার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নিতেই হবে। মনে হচ্ছে, আমরা আবার সেই পুরোনো সংস্কৃতিতেই ফিরে যাচ্ছি।
প্রশ্ন: এবার একটু ভিন্নভাবে প্রশ্ন করি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা আসলে কী পরিবর্তন পেলাম? বা আপনি কী পরিবর্তন দেখছেন?
বদিউল আলম মজুমদার: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের পক্ষে। কথা ছিল—আমরা স্বৈরাচারের দোসর হব না, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকব এবং সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নেব। কিন্তু বর্তমানে এসবের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতি এখনো ব্যবসা এবং টাকার খেলাতেই আটকে আছে, যা নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক নয়।
প্রশ্ন: সবশেষে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আপনার কি মনে হচ্ছে যে আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে যাচ্ছি?
বদিউল আলম মজুমদার: এটি বহুলাংশে নির্ভর করবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। অবশ্যই নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কারা জড়িত হয়? মূলত রাজনৈতিক দল, তাদের প্রার্থী এবং কর্মী-সমর্থকরাই এতে জড়ায়। তারা যদি সদাচরণ করে, সহিংসতা, কারচুপি বা ভয়ভীতি প্রদর্শন না করে, তবেই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হতে পারে এবং মানুষ নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। তাই বলটি এখন মূলত রাজনৈতিক দল এবং তাদের প্রার্থীদের কোর্টে। আমি আশা করি, তারা দায়িত্বশীল আচরণ করবে এবং সকলের স্বার্থে আমরা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারব।
মন্তব্য করুন





