ঢাকা, বাংলাদেশ ||
সোমবার
০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ||

সাক্ষাৎকারে ড. মির্জা এম হাসান

সংস্কার এড়িয়ে গেলে গণতন্ত্রের জন্য সুখকর হবে না

এশিয়া পোস্ট নিউজ

  ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০১
ড. মির্জা এম হাসান। ছবি: সংগৃহীত

ড. মির্জা এম হাসান রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ও গবেষক। তিনি বর্তমানে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নেন্স অ্যান্ড পলিটিক্স ক্লাস্টারের প্রধান এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গণভোট, সংস্কার, জুলাই সনদসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

প্রশ্ন : কেমন হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন?

ড. মির্জা এম হাসান: সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, নির্বাচনটা হয়ে গেছে এবং আমরা যে সহিংসতার আশঙ্কা করছিলাম, তা হয়নি। এটি একটি বিশাল ব্যাপার। এটি প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশে চাইলে সহিংসতামুক্ত নির্বাচন করা সম্ভব। হয়তো এর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, কিন্তু এটি সম্ভব।

আরেকটা বিষয় হলো, নির্বাচনের ফলাফল খুব একটা আশ্চর্যজনক হয়নি। যদিও আমাদের আশঙ্কা ছিল জামায়াত জিতে যেতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে ফলাফল মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়েছে বলে মনে করি। ব্যক্তিগতভাবে আমি আরও খুশি হতাম যদি বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন না পেয়ে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত। কারণ, এখন বিশাল শক্তি নিয়ে সরকার গঠন করতে যাওয়ায় তারা সংস্কারের অনেক প্রস্তাব উপেক্ষা বা প্রতিরোধ করতে পারে। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তারা বিরোধী দলের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হতো। তবে সব মিলিয়ে, দীর্ঘ দিন পর শান্তিপূর্ণভাবে মানুষের অংশগ্রহণে এমন একটি নির্বাচন হওয়াকে আমি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখি।

প্রশ্ন : ভোটের ফলাফলকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করছেন?

ড. মির্জা এম হাসান: ভোটের ফলাফল নিয়ে আমি আগেই বলেছি, বিএনপি যদি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত, তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি খুশি হতাম। এতে সংসদে বিরোধী দলগুলো সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে সরকারের সাথে জোরালোভাবে দরকষাকষি করতে পারত। কিন্তু বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ায় সেটা কিছুটা কঠিন হয়ে গেল। বাংলাদেশের নির্বাচনি গণতন্ত্রের ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই কোনো দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখনই তারা স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো আইন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বদলে ফেলে। গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সরকার সবসময় একটা চাপে থাকত, যা আমাদের জন্য ভালো হতো।

প্রশ্ন : অন্তর্বর্তী সরকার অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব রেখে যাচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আপনি কতটা আশাবাদী?

ড. মির্জা এম হাসান: আমি খুব বেশি আশাবাদী নই। তবে ১৯৯১ বা ২০০৬-০৭ সালের পরিস্থিতির চেয়ে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। আগের পরিবর্তনগুলোতে রাজনৈতিক দল বা সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ছিল প্রধান, কিন্তু এবারই প্রথম বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তন এসেছে। কোনো নির্দিষ্ট দলের নেতৃত্বে এটি হয়নি। এ কারণেই আমরা সনদ তৈরি করতে পেরেছি এবং স্বৈরাচারবিরোধী মৌলিক জায়গাগুলোতে হাত দিতে পেরেছি। অতীতে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা থেকেই স্বৈরাচারের শুরু হয়। এবার সেই ‘প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরাচার’ যেন ফিরে না আসে, সেজন্য আমরা ভিন্ন ধরনের জবাবদিহিতা এবং প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছি। তবে আগামী কয়েক মাসে দেখার বিষয় হলো, আমরা সেই ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্য রক্ষা করতে পারব কি না, নাকি জনগণ আবারও হেরে যাবে।

প্রশ্ন : জুলাই সনদে বর্ণিত বিষয়গুলোর মধ্যে কিছু বিষয় উচ্চকক্ষ সম্পর্কিত। উচ্চকক্ষ গঠনের আগেই যদি দুদক কিংবা অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত কমিশনের প্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়ে যায়, তাহলে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা?

ড. মির্জা এম হাসান: হ্যাঁ, এটা একটা শঙ্কার বিষয় এবং সম্ভবত তারা আগেই নিয়োগগুলো দিয়ে ফেলবে। এটি একটি কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার যে, প্রক্রিয়াটি সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে না। আমার মনে হয়, নিম্নকক্ষে এ নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হবে। তবে আমার আশঙ্কা, উচ্চকক্ষ গঠনের আগেই অনেক ঘটনা ঘটে যাবে। তখন তর্ক-বিতর্ক শুধু পার্লামেন্টের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা রাজপথেও গড়াতে পারে।

প্রশ্ন : নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী হবে বলে মনে করেন?

ড. মির্জা এম হাসান: নতুন সরকারের (বিএনপির) জন্য আমি প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ দেখছি। প্রথমত, নিজেদের দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিশেষ করে চাঁদাবাজি বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, সরকার আমলাতন্ত্রকে কীভাবে সামলাবে। আমরা দেখেছি, প্রতিটি সংস্কারের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত রাজনীতি সামলাতে ব্যস্ত থাকে এবং শাসন প্রক্রিয়া আমলাদের ওপর ছেড়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত দলীয়করণে রূপ নেয়। তৃতীয়ত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমানে দেশে প্রকৃত আইনের শাসন নেই। পুলিশের কার্যক্রম এবং নিম্ন ও উচ্চ আদালত যেন দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হবে।

প্রশ্ন : জাতীয় ঐক্য আগামীতে বজায় থাকবে বলে মনে করেন কী?

ড. মির্জা এম হাসান: ঐক্যের ব্যাপারে আমার কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। ঐক্য বলতে আসলে কী বোঝায়? গণতন্ত্রে ঐক্যের অর্থ হলো, আমরা সবাই মিলে সংবিধান বা ‘রুলস অফ দ্য গেম’ মেনে চলব। আমাদের রাজনৈতিক আলোচনা সংসদে হবে, আমরা সমঝোতার মাধ্যমে চলব— এটিই হলো একটি বৃহত্তর সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করা। আমরা অসাংবিধানিক কিছু করব না। যদি একে ঐক্য বলা হয়, তবে সেটাই ঐক্য। কিন্তু মতামতের ঐক্য তো হতে পারে না। দেশ পরিচালনার বিষয়ে আমার একটি নির্দিষ্ট ফিলোসফি বা চিন্তাভাবনা থাকতে পারে, আবার আপনাদের ভিন্ন একটি মত থাকতে পারে। সেখানে ঐক্যের প্রশ্নই ওঠে না।

অনেকে রোমান্টিকভাবে ঐক্যের কথা বলেন, কিন্তু গণতন্ত্রে ঐক্য মানে সেটা নয়। গণতন্ত্র মানেই হলো আমি আপনার সঙ্গে একমত নই, তাই আমি আপনার সঙ্গে বিতর্ক করব, যুক্তি দেখাব এবং জনগণকে আমার দিকে আনার চেষ্টা করব। এখানে সংঘাত বা ‘কনফ্লিক্ট’ একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে এই সংঘাত বা আদর্শগত লড়াই একটি সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরেই হতে হবে। আগের কোনো সরকারই এই কাঠামোর মধ্যে থাকতে পারেনি; তারা সংবিধানের বাইরে গিয়ে দমন-পীড়ন চালিয়েছে। আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো, বর্তমান সরকার এমন একটি কাঠামো বজায় রাখতে পারছে কি না, যেখানে আমরা স্বাধীনভাবে বিরোধিতা করতে পারব এবং রাজনীতি করতে পারব। এটিই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

প্রশ্ন : আগামীতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা কি হওয়া উচিত?

ড. মির্জা এম হাসান: সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজের ভূমিকা বেশ দুর্বল ছিল, যার মূল কারণ দলীয়করণ। ১৯৯১ সাল থেকেই আমরা দেখছি যে, সুশীল সমাজ দুই দলে বিভক্ত হয়ে আছে, যার ফলে তারা কাজ করতে পারেনি। গত ১৮ মাসে বা অভ্যুত্থানের পরেও এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যাতে বলা যায় সুশীল সমাজ স্বাধীন হয়ে গেছে। হাতেগোনা তিন-চারটি সংগঠন ছাড়া বাকিরা— যেমন বার অ্যাসোসিয়েশন, চিকিৎসক বা শিক্ষকদের সংগঠন— অসম্ভব ক্ষমতাধর হলেও তারা দলীয়বৃত্তেই রয়ে গেছে। এখন হয়তো আওয়ামী লীগের অনুসারীরা কিছুটা আড়ালে চলে যাবেন এবং জামায়াতপন্থীরা প্রথমবারের মতো জোরালোভাবে সামনে আসবেন। কিন্তু ‘আমি এই দলের’ বা ‘ওই দলের’— এই মানসিকতা একই থাকছে। তাই স্বাধীন ভূমিকার সম্ভাবনা আমি খুব কম দেখছি, যা খুবই দুঃখজনক। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কিছু সিভিল সোসাইটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হচ্ছে। তারা সাহস করলে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানের ভীতিহীন পরিস্থিতিতে, অর্থাৎ যতদিন বিএনপি বা বর্তমান সরকার আমাদের কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে, ততোদিন আমাদের দ্রুত কিছু কাজ করে নিতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নতুন সুশীল সমাজের উত্থান ও ক্ষমতায়ন এবং সংস্কার বা রিফর্মগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

প্রশ্ন : নির্বাচনের ফলাফলের কোনো প্যাটার্ন কি লক্ষ্য করা যাচ্ছে? উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও পূর্ব এবং পশ্চিমবঙ্গে বিএনপির ভালো ফলাফল কোনো বার্তা প্রদান করে কী?

ড. মির্জা এম হাসান: বার্তা বলতে আসলে কী? অতীতের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে সবসময়ই জামায়াতের একটি প্রভাব থাকে। এর পেছনে ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে বলে শোনা যায়। দেশভাগের সময় যারা ভারত থেকে এসেছিলেন, তারা পাকিস্তান সৃষ্টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। অনেকে বলেন, তারা একাত্তরের স্বাধীনতাকে সহজভাবে নেননি। সীমান্ত এলাকায় ভারত থেকে আসা একটি বড় মুসলিম জনগোষ্ঠী বা তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ভোটার হিসেবে আছেন। সাতক্ষীরার মতো হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাতেও মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে বংশপরম্পরায় একটি রাজনৈতিক ঝোঁক কাজ করে।

তবে সামগ্রিকভাবে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রাধান্য থাকার পেছনে খুব গভীর কোনো রাজনৈতিক বা সমাজতাত্ত্বিক কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না; এটি অনেকটা কাকতালীয়ভাবে হয়ে গেছে এবং সেই ধারাবাহিকতা চলছে। বাংলাদেশে মানুষ এখনো নিজস্ব বিচার-বিবেচনায় ভোট দেয় না। পরিবার, প্রতিবেশী বা মহল্লার মতামতের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেয়। অর্থাৎ, বাংলাদেশে ভোটের ক্ষেত্রে এখনো এক ধরনের ‘গ্রুপ মোরালিটি’ বা সামষ্টিক প্রথা কাজ করে।

প্রশ্ন : জামায়াতে ইসলামীর ভোট বৃদ্ধির পেছনে কী কারণ বিদ্যমান বলে মনে করেন?

ড. মির্জা এম হাসান: এটি শুধুমাত্র একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছিল না, তাই আমাদের পুরনো বিশ্লেষণগুলো এখানে কাজে লাগছে না। আওয়ামী লীগের প্রায় ৩০% এর মতো যে সলিড ভোটব্যাংক ছিল, তার একটি অংশ বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে ভাগ হয়েছে। জামায়াতের এই উত্থান তাই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ দুটি দলকে (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) দেখার পর এবার তৃতীয় একটি দলকে সুযোগ দিতে চেয়েছে। অনেক উচ্চশিক্ষিত ও উদারমনা পেশাজীবীও এই যুক্তিতে জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে, জামায়াতকে নিয়ে নারীদের মধ্যে ভীতির কথা বলা হলেও, গ্রামীণ নারীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। বিএনপি যখন প্রচারণা চালায়, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের হইচই পূর্ণ ভাব থাকে, যা গ্রামীণ নারীরা সবসময় পছন্দ করেন না। বিপরীতে, জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এবং ভদ্রতা বজায় রেখে ঘরে ঘরে গিয়ে কাজ করেছে (যেমন: তালিম গ্রুপ)। তাদের এই ভদ্রতা ও ব্যক্তিত্ব গ্রামীণ নারীদের আকৃষ্ট করেছে, যা ঢাকা বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গাতেও কাজ করেছে। সুতরাং, জামায়াতের উত্থান ব্যাখ্যা করতে হলে এই সব বিষয়কে একত্রে বিবেচনা করতে হবে।

প্রশ্ন : এবার বেশ কয়েকজন তরুণ সংসদে যাচ্ছেন? সংসদে তাদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

ড. মির্জা এম হাসান: তরুণদের প্রধান ভূমিকা হওয়া উচিত রাজনীতির পুরোনো লিখিত ও অলিখিত নিয়মকানুন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা। তবে আমরা কেবল আশাই করতে পারি, কারণ মানসিকতা পরিবর্তন করা এত সহজ নয়। বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি—সব দলেই তরুণরা আছে, তবে তারা যে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারবে, তা নিশ্চিত নয়। তরুণদের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের যুক্তি ও নির্দেশ মেনে চলতে হবে। প্রবীণরা হয়তো তাদের বোঝাবেন যে, চাইলেই সবকিছু দ্রুত পরিবর্তন করা যায় না, ধীরে ধীরে এগোতে হয়। তাই তরুণ রাজনীতিবিদদের নিয়ে আমরা যতটা আশাবাদী, অতিরিক্ত প্রত্যাশা করলে ততটাই হতাশ হতে পারি। ফলাফলটি সম্ভবত মিশ্র হবে—কিছুটা পরিবর্তন এবং কিছুটা পুরোনো ধারা। রাজনীতিতে টিকে থাকার স্বার্থেই অনেকে পুরোনো নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এনসিপি ছাড়া অন্য দলগুলোতে নেতৃত্ব এখনো প্রবীণদের হাতেই রয়েছে। তাই বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমাদের প্রত্যাশা নির্ধারণ করা উচিত।

প্রশ্ন : নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকসহ বেশকিছু অভিযোগ উঠেছিল। নির্বাচন কমিশন কি সেগুলো যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছে কী? না দিয়ে থাকলে তার কারণ কী?

ড. মির্জা এম হাসান: নির্বাচন কমিশন তার সীমাবদ্ধতা বোঝে। যদিও তাদের কঠোর হতে বলা হয়েছিল এবং তাদের যথেষ্ট ক্ষমতাও ছিল, তবুও তারা খুব বেশি র‍্যাডিক্যাল হতে পারেনি। মনে রাখতে হবে, যারা কমিশন নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাদের নিজস্ব রাজনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি আছে। তারা মনে করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশি কঠোর হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তাই ঋণখেলাপি বা দ্বৈত নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলো তারা অনেক ক্ষেত্রে এড়িয়ে গেছেন, কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। কমিশন একটি ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। তবে এখন জামায়াত ও এনসিপির মতো দলগুলো এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দেখার বিষয়, আগামীতে বিরোধী দলগুলো এই চ্যালেঞ্জ কতটা এগিয়ে নেয় নাকি কোনো পর্যায়ে গিয়ে সমঝোতা করে।

প্রশ্ন : রাজনৈতিক দলগুলো কী যথাযথ ও পরিচ্ছন্ন প্রার্থী দিয়েছে? আপানার পর্যবেক্ষণ কী বলে?

ড. মির্জা এম হাসান: দলগুলো অনেক কিছুই করতে পারত। তবে আগেই বলেছি, নির্বাচন কমিশনের লোকজন আমাদের সমাজেরই অংশ এবং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই তাদের চিন্তাভাবনা। তারা মনে করে বেশি দূর এগোনোর প্রয়োজন নেই। যেমন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও খুব বেশি সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারেনি; তারাও ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। হয়তো তাদের প্রতি বার্তা ছিল যে, একটু ভারসাম্য রেখে দ্রুত নির্বাচন শেষ করতে হবে। তবে আমি আশা করি এ নিয়ে সমস্যা তৈরি হবে এবং বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জ করা হবে। এটা চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত।

প্রশ্ন : বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার পরিচালনা করবে। এতে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন কী?

ড. মির্জা এম হাসান: আমার ধারণা, আগামী দুই-তিন মাসের রাজনীতি হবে এই সংস্কার নিয়েই। জামায়াত, এনসিপি এবং প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ সংস্কার চাইবে এবং প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে। সাধারণ মানুষের ক্ষমতা বিশাল। আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় আমার এখতিয়ার কী, আমি বলব আমি ওই পাঁচ কোটি ভোটারের একজন। এর আইনি বৈধতা নিয়ে হয়তো তর্ক হতে পারে, কিন্তু আসল শক্তি হলো রাজনীতি ও নৈতিকতা। বিএনপি এবং তারেক রহমান প্রকাশ্যে সংস্কারের পক্ষে বা জনগণের ম্যান্ডেটের পক্ষে কথা বলেছেন। এই প্রতিশ্রুতি তারা এখন ফিরিয়ে নিতে পারবেন না। এখানে বৈধতা, নৈতিকতা এবং রাজনীতির প্রশ্ন জড়িত। কেবল আইনের মারপ্যাঁচ দেখিয়ে এগুলো এড়ানো যাবে না। যদি জনগণ, জামায়াত এবং এনসিপি— নিজেদের স্বার্থেই হোক বা গণতন্ত্রের জন্য— এই লড়াইটা চালিয়ে যায়, তবে বিএনপি সরকার সব না হলেও অন্তত বড় অংশের সংস্কার মেনে নিতে বাধ্য হবে। যদি আমরা সংস্কারগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে না পারি, তবে এই অভ্যুত্থান ও সনদ সবকিছুই ব্যর্থ হবে। এখানে হেরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই; আমাদের লড়াই করতেই হবে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরো এগিয়ে নিতে আপনার পরামর্শগুলো কী হবে?

ড. মির্জা এম হাসান: বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শুধু টিকিয়ে রাখা নয়, বরং আরও উজ্জীবিত ও সুদৃঢ় করতে হলে আমাদের বর্তমানের পরোক্ষ বা নির্বাচনি গণতন্ত্রের বাইরে চিন্তা করতে হবে। বর্তমানে আমরা জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে শাসিত হই। কিন্তু আমি চাই প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র, যেখানে নাগরিক হিসেবে আমি সরাসরি নিজেকে উপস্থাপন করতে পারব। বিশ্বের বহু দেশে এর চর্চা আছে। এর জন্য সাংবিধানিক স্বীকৃতি বা ম্যান্ডেট প্রয়োজন, যাতে আমি রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে থেকে সরাসরি সরকার ও আমলাতন্ত্রের জবাবদিহি চাইতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়ার্ড সভা বা উন্মুক্ত বাজেট ব্যবস্থা আছে, কিন্তু সেখানে আমরা শুধু কথা বলতে পারি।

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের জন্য আমাদের শাসনব্যবস্থার ভেতরে ঢুকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার এবং প্রয়োজনে ভুল সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। পুলিশ কমিশন বা দুদকের সংস্কার প্রস্তাবে নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথা কিছুটা বলা হয়েছিল, কিন্তু আমলাতন্ত্রের চাপে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। নির্বাচনি গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে আমাদের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের উপাদানগুলো যুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত এটা পছন্দ করে না, তাই গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে প্রচার চালাতে হবে যেন জনগণ এ সম্পর্কে সচেতন হয়।

মন্তব্য করুন

সাক্ষাৎকারে ড. আলী রীয়াজ / জুলাই সনদ বাস্তবায়ন রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব
অন্তর্বর্তী সরকারের আলোচিত মুখ ড. আলী রীয়াজ। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ছিলেন তিনি। পেশাগত জীবনে আলী রীয়াজ ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট। এশিয়া পোস্টের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গণভোট, জুলাই সনদ এবং সংস্কারসহ নানা বিষয়ে।  সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও অনুষ্ঠিত হলো। আমরা দেখেছি, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও ‘না’ ভোটও উল্লেখযোগ্য হারে পড়েছে। বিএনপি কি পুরো ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করবে, নাকি তাদের ভিন্নমত বজায় রেখে বাস্তবায়ন করবে? ড. আলী রীয়াজ: সব দলের ক্ষেত্রেই আমরা বারবার বলেছি, যেহেতু তারা এই সনদে স্বাক্ষর করেছেন তাই নীতিগতভাবে তারা এটি মেনে নিয়েছেন। এখন যেহেতু ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ জনগণের ভোটে অনুমোদিত হয়েছে তাই যে-ই সরকার গঠন করুক এটি বাস্তবায়ন করা তাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। বিএনপির ইশতেহারেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা আছে। দল হিসেবে তাদের কিছু ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং ইশতেহারে তার প্রতিফলনও ঘটেছে। তবে যেহেতু জনগণের সম্মতি পাওয়া গেছে, তাই আশা করি বিএনপি নিঃসন্দেহে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কারণ এই ভোটাররাই তাদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী করে দেশ শাসনের ম্যান্ডেট দিয়েছে। অতীতেও বিএনপি বড় সংস্কারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯১ সালে তারা রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার ম্যান্ডেট পেলেও জনগণের দাবির মুখে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিএনপি যথেষ্ট অভিযোজনক্ষম একটি দল। অর্থনৈতিক সংস্কারসহ বিভিন্ন সময়ে তাদের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা আমরা দেখেছি। আমি আশা করি, আলোচনার মাধ্যমে মতভিন্নতাগুলো তারা বিবেচনায় নেবে। সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দল এবং সিভিল সোসাইটিরও ভূমিকা থাকবে, কারণ অধিকাংশ মানুষ সংস্কার চায়। আপনি বলেছিলেন যে আগামী সংসদ গঠিত হওয়ার পর ১৮০ দিনের মধ্যে তা ‘    সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করে সংবিধানের সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে। বিষয়টি আসলে কীভাবে কাজ করবে, যদি বিস্তারিত বলতেন? ড. আলী রীয়াজ: ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশ ২০২৫’ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে একটি প্রস্তাব ছিল যে, এই সংসদই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করবে। আমি স্পষ্ট করতে চাই—এটি ‘গণপরিষদ’ (কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) নয়, এটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’। গণপরিষদের যে গাঠনিক ক্ষমতা থাকে, সাধারণ সংসদের তা থাকে না; সংসদের থাকে কেবল সংশোধনী ক্ষমতা। আমাদের সুপ্রিম কোর্ট ‘বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন’ বা মৌলিক কাঠামো মতবাদ একধিকবার ব্যবহার করে সংবিধানের সংশোধন বাতিল করেছে। তাই সংসদকে গাঠনিক ক্ষমতা দেওয়ার জন্যই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়া হয়েছে এবং জাতীয় সংসদকে একই সঙ্গে নির্ধারিরত সময়ের জন্যে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বলা হচ্ছে । জনগণ তা অনুমোদন করেছে। ফলে, নির্বাচিত ৩০০ সংসদ সদস্যই সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে বসবেন এবং আগামী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদে উল্লেখিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবেন। এতে বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিনের কারণে সংস্কারগুলো আদালতে বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না। এই কাজটি সমান্তরালভাবে চলবে। অর্থাৎ, জাতীয় সংসদ প্রথম দিন থেকেই তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাবে—যেমন সরকার গঠন, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, মন্ত্রিসভা গঠন, বাজেট পাস বা প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সংসদের নিজস্ব ক্ষমতায় তারা এসব করবে। পাশাপাশি, তারাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বড় ধরনের সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবেন। এর মানে এই নয় যে, এখানেই সব শেষ; বিদ্যমান সংবিধান এবং জুলাই সনদের বিধান অনুসরণ করে ভবিষ্যতেও সংসদ আরও সংশোধনী আনতে পারবে। মূলত, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব এই সংস্কার পরিষদের ওপরই অর্পিত হবে। গণভোটে আমরা দেখলাম ‘হ্যাঁ’ ভোটের পাশাপাশি প্রায় ৩০ শতাংশের মতো ‘না’ ভোটও পড়েছে। এটি আমাদের কী বার্তা দেয়? এ বিষয়ে আপনার মতামত কী? ড. আলী রীয়াজ: এটি দুটি বার্তা দেয়। প্রথমত, স্বল্প সময়ের মধ্যে গণভোটের আয়োজন করায় বিষয়টি হয়তো সবার কাছে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি; সময় পেলে আরও মানুষকে সম্মত করা যেত। দ্বিতীয়ত, যারা বিরোধিতা করেছেন, তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু গণভোটে ভিন্নমত থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে ৩০ শতাংশ ‘না’ বললেও প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সম্মতি দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে হবে, পাশাপাশি যারা ‘না’ বলেছেন তাদের মতকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। সরকার তো অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। এই সংস্কারগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনে কতটা সক্ষম হবে বলে মনে করেন? ড. আলী রীয়াজ: অনেকটাই সক্ষম হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য তিনটি বিষয় জরুরি: ১. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, ২. রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ৩. রাজনৈতিক অর্থনীতি। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছভাবে কাজ না করে, তবে গণতন্ত্র সংহত হয় না। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ। তবে কেবল প্রতিষ্ঠান দিয়ে হবে না, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখছি; যেমন—৩০টিরও বেশি দল দীর্ঘ সময় আলোচনায় থেকে একটি দলিলের অনেক বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছে, যা আগে অকল্পনীয় ছিল। তারা আলোচনায় ভিন্নমত সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচনের পর পরাজিত প্রার্থীরা বিজয়ীদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন, যা একটি বড় পরিবর্তন। সবশেষে, রাজনৈতিক অর্থনীতি, অর্থাৎ সমাজের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে বৈষম্য তৈরি করে এবং যার ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতায় বৈষম্য তৈরি হয় তা কমিয়ে আনতে হবে। যদি এই তিনটি বিষয় একত্রে অগ্রসর হয়, তবে গণতন্ত্র সংহত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। নির্বাচনে বিজয়ী দল কী সব সংস্কার বাস্তবায়ন করবে নাকি আগের রূপেই ফিরে যাবে?  ড. আলী রীয়াজ: এখানে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। গত ১৬ বছর দেশ একটি স্বৈরতন্ত্রের মধ্য দিয়ে গেছে। রাজনৈতিক কর্মীরা সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছেন। কারণ বিচার বিভাগ স্বাধীন ছিল না। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আমরা দেখেছি কীভাবে আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধীদের সাজা দেওয়া হয়েছে। গুম-খুন নিয়ে প্রশ্ন করা যায়নি। এই অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নিশ্চয়ই উপলব্ধি হয়েছে যে, স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত পুলিশ বাহিনী কতটা জরুরি। ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের বিষয়েও সবাই একমত হয়েছেন। যদিও দক্ষিণ এশিয়ায় বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সঠিক আচরণ না করার নজির বেশি, তবুও ১৬ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানে এত মানুষের আত্মত্যাগের কারণে আমি আস্থা রাখতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দায়বদ্ধতা অনুভব করবে এবং সঠিক পথেই হাঁটবে। নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার চ্যালেঞ্জগুলো কী হবে বলে আপনি মনে করেন?  ড. আলী রীয়াজ: প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে—প্রথমত, শাসনের বা সুশাসনের চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট অন্যতম। বিগত সরকার অর্থনীতির খাতকে শুধু নিঃস্বই করেনি, বরং বানোয়াট পরিসংখ্যান দিয়ে তা আড়াল করার চেষ্টা করেছে। এর আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এমন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি হাতে পেয়ে প্রথমেই রক্তপাত বন্ধ করার দিকে নজর দিয়েছিল এবং তা তারা করেছে। কিন্তু কেবল রক্তপাত বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। কারণ, দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয়নি। দেশি বা বিদেশি—কোনো বিনিয়োগই তেমন আসেনি। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব নয়, বরং বেকারত্ব বেড়েছে। বিনিয়োগ না হওয়ার কারণ হলো অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের অনিশ্চয়তা। বিনিয়োগকারীরা বুঝতে চান ভবিষ্যৎ নীতি কী হবে। নির্বাচিত সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ক্ষমতায় থাকলে আগামী দিনের নীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হয়। তাই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো সংস্কার। আমি প্রচুর অধ্যাদেশের কথা উল্লেখ করেছি—সেগুলো নির্বাচিত সরকারকে অনুমোদন করতে হবে। পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভিত্তিতে ১৮০ দিনের মধ্যে যে সাংবিধানিক সংস্কার করার কথা, সেটি সম্পন্ন করা। এটি একটি সময় নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট কাজ। তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো রাজনৈতিক। একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। এখানে বিরোধী দলের ভূমিকা থাকবে, কিন্তু মূল উদ্যোগটি ক্ষমতাসীনদেরই নিতে হবে। তাদেরই নিশ্চিত করতে হবে যেন সংসদ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। বিরোধীদের মতামত গুরুত্ব পায়।  চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অস্থিতিশীলতা তৈরিতে বিভিন্ন উপাদান কাজ করেছে। পুলিশের ব্যবস্থাটি এই সরকার এক অর্থে জোড়াতালি দিয়ে চালিয়েছে। এখানে বড় ধরনের সংস্কার এবং একটি সংগঠিত শক্তির প্রয়োজন। এর অভাবেই ‘মব জাস্টিস’, মাজারে হামলা বা নারীদের অবমাননাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে। আর পাশাপাশি, পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি বিদেশ থেকে হুমকি-ধামকি বা উত্তেজনা সৃষ্টি করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করবে। যদিও আমি নির্বাচনে দেখেছি তাদের আবেদন কমে আসছে, তবুও এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে তা মোকাবিলা করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী দিনে বিরোধী দলের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন? ড. আলী রীয়াজ: যে কোনো সংসদীয় ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হচ্ছে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। এই জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো যাতে গড়ে ওঠে, সেদিকে তাদের চেষ্টা থাকতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে সত্য অবহিত করা এবং নিজেদের স্বচ্ছ থাকা জরুরি। বিরোধী দলকে স্বচ্ছতার সঙ্গে স্বীকার করতে হবে সরকার কোথায় সঠিক কাজ করছে এবং কোথায় ভুল করছে। সরকারের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিয়ে ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে হবে। বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা তখনই পালন করতে পারবে, যদি ক্ষমতাসীন দল সমালোচনা সহ্য করে এবং বলপ্রয়োগের পথে না হাঁটে—যা অতীতে আমরা দেখেছি। তাই বিরোধী দলের ভূমিকা হওয়া উচিত গঠনমূলক এবং জবাবদিহিতা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ওপর তাদের জোর দিতে হবে। আপনি তো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার কি মনে হয় রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা কতটা সম্ভব হয়েছে?  ড. আলী রীয়াজ: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি হয়েছে, এটাই বড় অর্জন। এখানে ভিন্নমত অবশ্যই আছে। সব বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল প্রতিটি শব্দে একমত হবে—এটা সম্ভব নয়। যারা সমালোচনা করেন যে সবাই একমত হয়নি, তাদের বুঝতে হবে মৌলিক জায়গাগুলোতে ঐকমত্য হয়েছে কিনা। অনেক বিষয়েই কিন্তু ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর নির্দিষ্ট করা কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা যায়। তবে তার চেয়েও বড় অর্জন হলো এই সংস্কৃতিটি তৈরি করা—যেখানে সব দলকে একত্র করে সাংবিধানিক ও নীতিগত বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করা সম্ভব হয়েছে। এটি ধরে রাখা জরুরি। এর মানে এই নয় যে, কমিশন ৫ বছর ধরে কাজ করবে, কারণ তখন সংসদ থাকবে। সংসদেই আলোচনা হবে। তবে সংসদের বাইরেও জবাবদিহিতার জায়গা থাকতে হবে। কারণ ১৮ কোটি মানুষ তো সংসদে যায় না। তাই নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে—তারা বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখছে এবং মোকাবিলা করছে। আমি এ ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। বাংলাদেশের জনসাধারণের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী থাকবে?  ড. আলী রীয়াজ: সরকারের অংশ হিসেবে নয়, বরং আমার অভিজ্ঞতা ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমি কয়েকটি বিষয় বলতে চাই। প্রথমত, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং দায়িত্ব জনগণের। জনগণকে সবসময় সরকারের ওপর নজরদারি বা ‘ভিজিল্যান্স’ বজায় রাখতে হবে এবং জবাবদিহিতা চাইতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা, স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা। এটি ভবিষ্যতে সব দলের জন্যই সুফল বয়ে আনবে। সর্বশেষ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে আমাদের সবাইকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং অংশগ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অর্থ শুধু দলের সদস্য হওয়া বা রাজপথে মিছিল করা নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রতিটি কাজই রাজনীতির অংশ। আমাদের সবাইকে ‘সচেতন নাগরিক’ হিসেবে জেনে-বুঝে রাজনীতির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং সরকার বা বিরোধী দল—সবাইকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এই জায়গায় আমাদের ঘাটতি আছে, যা পূরণ করা জরুরি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব
সাক্ষাৎকারে হোসেন জিল্লুর রহমান / জাতীয় ঐক্যকে কোনোভাবেই আর বিভক্ত করা উচিত হবে না
হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, নীতিবিশ্লেষক ও গবেষক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং উন্নয়ননীতি নিয়ে কাজ করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ও গণভোট নিয়ে তিনি কথা বলেছেন এশিয়া পোস্টের সঙ্গে প্রশ্ন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ও গণভোটের ভোটগ্রহণ চলছে। সার্কিকভাবে নির্বাচনের পরিবেশ কেমন দেখছেন? হোসেন জিল্লুর রহমান: পরিবেশ নিয়ে অনেক ধরনের আশঙ্কা ছিল। নির্বাচন আদৌ হবে কি না, শান্তিপূর্ণ হবে কি না, বা ফেয়ার হবে কি না—সব আশঙ্কা ও সন্দেহ কাটিয়ে অবশেষে নির্বাচনটা হয়ে যাচ্ছে। ভোটাররা স্বতস্ফূর্তভাবে তাদের ভোট দিচ্ছেন। আমরা যে নির্বাচনটা করতে পারছি, সেই অর্থে আমি বলব, সব পক্ষই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দলগুলো, অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশন—সবাই মিলে। শেষ বিচারে আমরা এর গুরুত্বটা বুঝতে পেরেছি যে, এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, এই নির্বাচনের মাধ্যমে কী ধরনের সরকার আসবে, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো—গত ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ তাদের অন্যতম অধিকার, অর্থাৎ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। সেই অধিকারটি ফিরে এসেছে এবং তা প্রয়োগ করার একটা সুযোগ তারা পাচ্ছে। প্রশ্ন: নির্বাচনকে ঘিরে অনেক আলোচনা ও আশঙ্কা ছিল। এখন নির্বাচনটি হয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে এসে আপনার প্রত্যাশা কী? কোন বিষয়গুলোকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন? হোসেন জিল্লুর রহমান: ফলাফল পরের বিষয়; এই প্রক্রিয়াটাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমনটা বললাম, নির্বাচন নিয়ে যত আশঙ্কা ছিল, সেগুলো আমরা অতিক্রম করে এসেছি এবং আশা করি একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে। অবশ্য নির্বাচনি প্রক্রিয়া আরও সুচারুভাবে সাজানো যেত কি না, তা নিয়ে নিশ্চয়ই প্রশ্ন থাকতে পারে। ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব ইত্যাদি নিয়মগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন আরও গ্রহণযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারত কি না—এসব নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। আমরা চাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। এটি কেবল দেড় বছরের অপেক্ষা নয়, এক অর্থে প্রায় ১৭ বছরের অপেক্ষা। আমরা চাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার পরিবেশ। এখানে আমি আশা করব—বিশেষ করে যাদের মধ্যে ভীতিটা একটু বেশি কাজ করে, যেমন—সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, দরিদ্র জনগোষ্ঠী কিংবা নারীরা—তারা যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন। আগামীকালের নির্বাচন সুষ্ঠু হলো কি না, তার অন্যতম সূচক হবে এটাই। যাদের মধ্যে ভয় কাজ করার কথা, তারা যদি নির্ভয়ে গিয়ে ভোট দিয়ে আসতে পারেন, তাহলেই আমরা বুঝতে পারব ভোট কেমন হচ্ছে। প্রশ্ন: একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য ভোটার ও রাজনৈতিক দলসহ সকল পক্ষের করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন? হোসেন জিল্লুর রহমান: একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহনশীলতা। আসলে তিন ধরনের সহনশীলতা দরকার। প্রথমত, ভোটারদের সহনশীলতা। তারা ভোট দিতে যাবেন, সেখানে আরও অনেক ভোটার থাকবেন; তাই ভোটারদের নিজেদের মধ্যে সহনশীল মনোভাব থাকা জরুরি। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কর্মী ও দলের সহনশীলতা অত্যন্ত জরুরি। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও উত্তেজনার মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহনশীলতা প্রদর্শন প্রয়োজন। আর তৃতীয়ত, নির্বাচনের ঠিক পরপরই যে সহনশীলতা দরকার, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ—ফলাফল যা-ই হোক, তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা। নির্বাচন নিয়ে সাধারণত তিন ধাপে শঙ্কা থাকে: প্রাক-নির্বাচনী পরিবেশ, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়। আমরা প্রথম ধাপটি, অর্থাৎ প্রাক-নির্বাচনি পরিবেশের শঙ্কা ও আলোচনা অতিক্রম করে এসেছি। আজ দ্বিতীয় পরীক্ষা এবং নির্বাচনের পরে হবে তৃতীয় পরীক্ষা। প্রশ্ন: গত দেড় বছরে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা সংস্কারের কথা আমরা বলেছিলাম, সেগুলো কতটা অর্জিত হলো? হোসেন জিল্লুর রহমান: তবে আপনি যেহেতু সংস্কারের প্রশ্ন তুলেছেন, মোটা দাগে বলা যায়—সংস্কার নিয়ে যতটা আলোচনা হয়েছে, তার কার্যকরী পদক্ষেপ, ফলাফল বা দিকনির্দেশনা—তিনটি ক্ষেত্রেই আমরা বড় ধরনের ঘাটতি দেখেছি। আলোচনা ব্যাপক হয়েছে, অনেক 'কেতাবি' পরামর্শও তৈরি হয়েছে; কিন্তু ফলাফলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে ঘাটতি রয়ে গেছে। তা অর্থনীতি পরিচালনা, পরিসংখ্যানের উন্নতি বা প্রশাসনিক সংস্কার—যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার কার্যক্রমে অনেকটা একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে। তারা অনেকগুলো দরজা খুললেও নিজেদের মূলত 'সাংবিধানিক সংস্কার'-এর একটি কক্ষেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বা স্থানীয় সরকারের মতো বিষয়গুলো তারা সেভাবে আলোচনায় আনেননি। শিক্ষা খাতের মতো জায়গায় সমস্যা ব্যাপক, সেখানে খণ্ডিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জনগণের চাহিদা তো পদক্ষেপ নয়, জনগণের চাহিদা হলো ফলাফল। সরকার বা আমলাতন্ত্র পদক্ষেপ নিতে পছন্দ করে, আর আমরা জনগণ চাই ফলাফল। পদক্ষেপের তালিকা করলে হয়তো অনেক কিছু দেখা যাবে, কিন্তু ফলাফলের জায়গায় অনেক ঘাটতি রয়েছে। তবে একটা ইতিবাচক দিক হলো, ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে অর্থনীতি যখন পতনের মুখে ছিল, তখন সেই পতনটা ঠেকানো গেছে। কিন্তু অর্থনীতির চাকায় যে গতি বা বেগ আনার দরকার ছিল, তা আসলে আনা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল, যা সামাল দেওয়া গেছে। তবে এর পরবর্তীতে আবার অনেক ধরনের ভূরাজনৈতিক দুয়ার বা ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে। প্রশ্ন: নির্বাচনের দিনে এসে আমরা যদি অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালের দিকে ফিরে তাকাই, তবে তাদের প্রধান সাফল্য এবং সীমাবদ্ধতাগুলো কী ছিল বলে আপনি মনে করেন? হোসেন জিল্লুর রহমান: সংস্কারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বা ট্রান্সপারেন্সির জায়গাতেও বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। কোনো চুক্তি হোক, কোনো সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য হোক, কিংবা কাকে কোন নিয়মে কোথায় পদায়ন করা হচ্ছে—এসব বিষয় খোলাসা করার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা গেছে। যেমন—বিমান বোর্ডে হঠাৎ করে তিনজনের পদায়ন। পদক্ষেপ নিতে সমস্যা নেই, কিন্তু এগুলোর ব্যাখ্যা বা স্বচ্ছতার অভাব ছিল। আরেকটি বিষয় হলো, শাসনপদ্ধতি বা 'গভর্ন্যান্স স্টাইল'-এর মধ্যেও বড় ঘাটতি ছিল। এক অর্থে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক ধরনের বিচ্ছিন্ন 'এভিজাত্য' বা 'এলিটিজম'-এর চর্চা করেছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, ব্যবসায়ী মহল বা তৃণমূলের কথা শোনার ক্ষেত্রে আন্তরিকতার অভাব ছিল। আলোচনাগুলো যেন একমুখী না হয়, কেবল আনুষ্ঠানিক সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—এমন খোলা মনের আদান-প্রদানের জায়গায় ঘাটতি ছিল। তবে আজকের দিনে, বিশেষ করে এই ১১ই ফেব্রুয়ারিতে দাঁড়িয়ে আমি বলব—অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশটাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে এবং কথা অনুযায়ী আগামীকাল ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হতে যাচ্ছে—এটাকে আমরা এখন অত্যন্ত ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই দেখব। প্রশ্ন: জুলাই আন্দোলন যেসব কারণে ঘটেছিল—যেমন বৈষম্যের অবসান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন—তার উদ্দেশ্য ছিল যেন ঋণখেলাপি বা অসাধু ব্যক্তিরা ক্ষমতায় আসতে না পারে এবং সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসেন। এসব ক্ষেত্রে কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে? হোসেন জিল্লুর রহমান: দেখুন, 'ভালো লোক' বা 'খারাপ লোক'—এগুলো এক ধরনের ব্যাখ্যা বা ন্যারেটিভ। এগুলো আদৌ কতটা কার্যকর, তা বোঝার বিষয় আছে। কারণ, আমি মনে করি দক্ষতা এবং ফলাফল আনার মানসিকতা সবচেয়ে জরুরি। স্বচ্ছতাও একটি বড় বিষয়। আমাদের এই প্রক্রিয়াগত গুণগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। 'সৎ মানুষ' অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু এটি অনেক সময় শুধুই কেতাবি বুলিতে পরিণত হয়। কে সৎ আর কে অসৎ—তা নির্ধারণ করা জটিল। অনেক সময় দেখা যায়, একজন তথাকথিত 'সৎ মানুষ' হয়তো জনবান্ধব বা কার্যকর নন। তাই সার্বিকভাবে আমাদের ফলাফলের দিকে নজর দেওয়াটা খুব জরুরি—আমরা কী ধরনের ফলাফল পাচ্ছি। আপনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের কথা বললেন। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জাতীয় ঐক্য সংহত করা একটা এজেন্ডা ছিল, কিন্তু তাতে খুব বেশি অর্জন হয়নি। আগামীকাল নির্বাচনের মাধ্যমে যারা বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবেন বা যারা বিরোধী দলে থাকবেন—রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণের দায়িত্ব মূলত তাদের ওপরই বর্তাবে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন—অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের অনেক জায়গায় হাত না দিলেও কিছু জায়গায় অনেক বেশি পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন—জাপান, যুক্তরাষ্ট্র বা তুরস্কের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির বিষয়গুলো। হয়তো তারা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে এগুলো করেছেন, কিন্তু এখানে স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি ছিল। প্রশ্ন জাগে, এর মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের নীতি গ্রহণের স্বাধীনতা কি কমিয়ে ফেলা হলো? কারণ, কিছু পদক্ষেপ একবার নিয়ে ফেললে তা সহজে বাতিল করা যায় না। নির্বাচিত সরকারের কাজের পরিধি বা সীমানা এর ফলে সংকুচিত হলো কি না, তা দেখার বিষয় এবং ভবিষ্যতে এর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। প্রশ্ন: আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেখলাম, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিরাট ঘটনা। জুলাইয়ের পর তরুণ সমাজ বা বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে পরিবর্তনের আশা করেছিল, তেমন কোনো পরিবর্তন কি আপনি দলগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করেছেন? হোসেন জিল্লুর রহমান: এই পরিবর্তনগুলো রাতারাতি বা এককালীন হবে না। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাটা রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর থেকেই আসতে হবে। পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের চাপের জায়গাগুলোও সক্রিয় থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা বা চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা কতটা সফল হয়েছেন, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বা নির্বাচন কমিশন প্রার্থীর বৈধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে—যেমন ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব বা হলফনামার স্বচ্ছতা—সঠিক ভূমিকা পালন করেছে কি না, সেটাও দেখার বিষয়। এই স্বচ্ছতার প্রক্রিয়াটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের বিষয়টি এক দিনের নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়—নির্বাচন হবে না বা হলেও অত্যন্ত সংঘাতপূর্ণ হবে, এমন অনেক শঙ্কা ছিল। কিন্তু আমরা নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি। মনে হচ্ছে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে এবং দলগুলো সংযত হওয়ার চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে, এই উত্তরণ তাদের জন্যও জরুরি। কারণ নির্বাচনী উত্তরণ ছাড়া অনিশ্চয়তা আরও বাড়ত। তাই তারাও এক ধরনের সহনশীলতা দেখানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। এখন দেখার বিষয় হলো, ফলাফল ঘোষণার পরেও যেন এই সহনশীলতা অব্যাহত থাকে। সেটি অত্যন্ত জরুরি। প্রশ্ন: বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবসময় আস্থার সংকট দেখা যায়। এখনও কি সেই সংকট বিদ্যমান? আমরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখছি। এক পক্ষ বলছে নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে অন্য পক্ষ ক্ষমতায় আসবে; জামায়াত বা বিএনপির মতো দলগুলো আগে থেকেই প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিচ্ছে। এই যে আগে থেকেই ফলাফলের বিষয়ে মন্তব্য করার প্রবণতা বা এমন পরিস্থিতি তৈরি করা—এ বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? হোসেন জিল্লুর রহমান: এই ধরনের বক্তব্য নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। তবে আমি মনে করি, এই সংস্কৃতির পরিবর্তন হতে অনেক সময় লাগবে। প্রতিযোগিতার ভাষা অনেক সময় আক্রমণাত্মক হয়। কিন্তু আমাদের কাম্য হলো, এই আক্রমণাত্মক মনোভাব যেন কেবল ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, মাঠ পর্যায়ে সহিংসতায় রূপ না নেয়। আপনি আস্থার কথা বললেন। আসলে একে অপরের প্রতি আস্থার চেয়েও 'নিয়মের প্রতি আস্থা' থাকাটা বেশি জরুরি। সবাই যেন মেনে নেয় যে, নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। 'আমার জন্য শিথিল হোক, অন্যের জন্য নয়'—এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। বাংলাদেশে শুরু থেকেই আমরা 'খেলার নিয়ম' বা 'রুলস অব দ্য গেম'-এর বিষয়ে ঐকমত্য তৈরিতে হোঁচট খেয়েছি। এর জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা এসেছিল। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে এই আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়েছে যে, বেশকিছু মৌলিক বিষয়ে আমাদের ঐকমত্য প্রয়োজন। প্রতিযোগিতা থাকবেই এবং তা কাম্য, কারণ এতে মানুষের বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকে। যোগ্য প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার জন্য ভালো বিকল্প থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আমাদের এখনও বহুদূর যেতে হবে। তবে যে জায়গায় আমাদের সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া দরকার, তা হলো নিয়মগুলোর ব্যাপারে ঐকমত্য শিথিল না করা। সব দলকে এই অবস্থানে শক্ত থাকতে হবে। নিয়ম যদি আমার বিপরীতে যায়, আর আমি তা নিয়ে আন্দোলন শুরু করি—এটা মোটেও কাম্য নয়। প্রশ্ন: এবার নির্বাচন কমিশনের প্রসঙ্গে আসি। সব মিলিয়ে আপনার কি মনে হয় নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছে, নাকি তাদের কাজের মধ্যে আপনি কোনো ঘাটতি দেখছেন? হোসেন জিল্লুর রহমান: দেখুন, নির্বাচন কমিশনের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে আমি লক্ষ্য করেছি যে, তারা ডিজিটাল বিষয়গুলো মোটামুটি গুছিয়ে এনেছে। 'স্মার্ট ইলেকশন' নামে একটি অ্যাপ তারা চালু করেছে, যা বেশ কার্যকর বলে শোনা যাচ্ছে। সুতরাং এদিক থেকে প্রস্তুতি ভালোই। পোস্টাল ব্যালটের বিষয়ে কিছু বিচ্যুতির কথা শুনলেও, সামগ্রিকভাবে  এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। এখন কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠানোসহ অন্যান্য কাজ চলছে। তবে আমাদের নির্বাচন কমিশনের একটি দুর্বলতা বা ঘাটতি হয়তো যোগাযোগের ক্ষেত্রে রয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা জানানোর বিষয়ে তারা যেন কিছুটা নড়বড়ে—হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার তা পাল্টে ফেলছেন, কিংবা চাপের মুখে পরিবর্তন করছেন। এসব জায়গায় তাদের আরও দৃঢ় হওয়া দরকার ছিল। আমাদের মতো দেশে নির্বাচন কমিশনকে অনেক শক্তি বা ক্ষমতা দেওয়া আছে। কিন্তু আমরা দেখি, সেখানে দুটি সমস্যা হতে পারে—হয় ক্ষমতার অপব্যবহার, নয়তো আমি যেটাকে বলি 'স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রিয়তা'। অর্থাৎ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং কিছু না করা। নির্বাচন কমিশনের উচিত এই স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রিয়তা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার—উভয় থেকেই মুক্ত হয়ে কাজ করা। নির্বাচন প্রক্রিয়াটি তো এই পর্যন্ত চলে এসেছে এবং আমরা তুলনামূলকভাবে সংঘাতহীনভাবেই এতদূর এসেছি। আশা করি, আগামীকালও নির্বাচন কমিশন তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তারা যদি এ পর্যন্ত আসার সুনামটুকু অর্জন করে থাকেন, তবে আগামীকালের সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সেই সুনাম যেন অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন—সেটাই আশা করছি। প্রশ্ন: আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই—নতুন যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের আসলে কোন দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন? হোসেন জিল্লুর রহমান: সরকার গঠনের পরেই অনেক কিছু নির্ধারিত হবে, তবে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, জাতীয় ঐক্যকে আরও ছিন্নভিন্ন করা একদমই উচিত হবে না। বরং জাতীয় ঐক্যকে কীভাবে আরও সংহত করা যায়, সেদিকে সচেষ্ট থাকতে হবে। কারণ আমরা যদি 'সাংস্কৃতিক সংঘাত' শুরু করি কিংবা যেটুকু সহনশীলতা অর্জন করেছি তা বিসর্জন দিই, তবে আমরা বড় বিপদে পড়তে পারি। তাই জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। অবশ্য জাতীয় ঐক্য বলতে আমি 'জাতীয় সরকার' বোঝাচ্ছি না; আমি বোঝাচ্ছি মানুষের মধ্যে যেন নতুন করে বিভাজন তৈরি না করা হয়, বরং তাদের একত্রিত করা হয়। দ্বিতীয় জরুরি বিষয়টি হলো অর্থনীতি, যা বর্তমানে বেশ দুরবস্থায় আছে। রিজার্ভ বাড়া বা রেমিট্যান্স আসা দিয়ে অর্থনীতির মূল চিত্রটা পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। আপনারা দেখেছেন কর্মসংস্থানের অবস্থা কী। মূল্যস্ফীতিও কমছে না, বরং স্থির হয়ে আছে; বিনিয়োগও স্থবির। অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কিন্তু স্থির হয়ে থাকে না; আমরা গ্রহণ না করলে অন্য কেউ নিয়ে নেবে। এটি বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার বিষয়। প্রতিযোগী হিসেবে আমরা দক্ষ ও সক্ষমভাবে এগোতে পারছি কি না, সেটাই দেখার বিষয়। অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে হবে। অনেক ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে—এত চাকরি বা কর্মসংস্থান হবে—কিন্তু বাস্তবে সেগুলো কীভাবে অর্জিত হবে, সেই অনুধাবনটা খুব জরুরি। সেজন্য আমি মনে করি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, বিশেষ করে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে যে অর্থনৈতিক শাসন বা প্রবৃদ্ধির মডেল দাঁড় করিয়েছিল, তা অনেকাংশে এখনও অক্ষুণ্ণ আছে। আমরা ঋণনির্ভরতা কমাতে পারিনি। বর্তমান সরকারও বিভিন্ন বাজেট সহায়তা নিচ্ছে, যা ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ব্যয় দক্ষতা বা এডিপি (ADP) বাস্তবায়নের হারও বাড়ানো যায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে আমরা যেন উল্টো পথেই হেঁটেছি। দুর্নীতিও জোরালোভাবে কমানো সম্ভব হয়নি। হয়তো দৃশ্যমান কিছু দুর্নীতি কমেছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কালো ছায়া সর্বত্র রয়ে গেছে। দুর্নীতি কীভাবে মূলোৎপাটন করা যাবে, সে বিষয়ে একটি মহাপরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা সংস্কার কমিশনগুলোর দায়িত্ব ছিল। এই জায়গাটিতে নজর দেওয়া খুবই জরুরি। আরেকটি বিষয় হলো 'হিউম্যান ক্যাপিটাল' বা মানবসম্পদ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত সঙ্গিন অবস্থায় আছে। অবকাঠামো ও প্রকল্প বাড়লেও শিক্ষার মান এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না—শিক্ষার বিস্তার ঘটছে ঠিকই, কিন্তু মানবসম্পদ গড়ে উঠছে না। এই নেতিবাচক সমীকরণটি ভাঙা খুব জরুরি। আগামী সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা থাকবে এ বিষয়ে কাজ করার। পাশাপাশি, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বিশ্ব পরিবেশ অনুধাবন করা এবং সজাগ দৃষ্টি রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে 'স্থায়ী বন্ধু' বলে কিছু নেই; আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বন্ধু নির্বাচন করতে হবে এবং সময়ের সঙ্গে তা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। সবশেষে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, যা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখন কথা বলছে এবং আমিও দীর্ঘদিন ধরে বলার চেষ্টা করছি। তা হলো আমাদের 'স্টাইল অফ গভার্নেন্স' বা আমলাতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতির বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার। এটি সহজ কাজ নয় এবং কোনো একটি প্রজেক্ট দিয়ে এটি হবে না। আপনারা যেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করেন, তেমনি প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিবর্তনকেও নির্বাচিত সরকারের সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
জাতীয় ঐক্যকে কোনোভাবেই আর বিভক্ত করা উচিত হবে না
সাক্ষাৎকারে এম. হুমায়ুন কবির / তরুণরাই হবে রাজনীতির নির্ধারক শক্তি
আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির। তিনি ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। পরে ১৯৮২ সালে কূটনৈতিক সার্ভিসে যোগ দেন। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার, ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ২০০৯ সাল পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রদূত কবির বর্তমানে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেন। প্রশ্ন: কেমন দেখছেন নির্বাচনের পরিবেশ? মানুষ কী চায় এম. হুমায়ুন কবির: আমরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি যে, তারা কী ভাবে। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক সংস্কার চায়। দুটো জায়গায় তারা নির্দিষ্টভাবে বলেছেও। একটা হচ্ছে, তারা চায় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের বদল। নিয়মিত বিরতিতে তারা দলের নেতৃত্বের বদল চায়। দ্বিতীয় হচ্ছে, দলগুলো টাকাপয়সা কোথা থেকে পায়, কোথায় খরচ করে, তার একটা সুনির্দিষ্ট হিসাব তারা দেখতে চায়। কাজেই জনগণ বলেই দিয়েছে তারা কী চায়। রাজনীতিবিদরা যদি শুধু জনগণের কণ্ঠটাই শুধু শোনে, তারা বুঝে যাবে যে তাদের কী করতে হবে, সেটা আমাদের বলে দিতে হবে না। নারী আসন নিয়ে যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, আমরা মাঠপর্যায়ে দেখেছি যে, সেখানে ৯১ ভাগ মানুষই বলেছে নারীদের সরাসরি নির্বাচন তারা সমর্থন করে। আর কিছু বলার আছে? এখন আপনি সিদ্ধান্ত নিন, মানুষ তো তাদের কথাটা বলে দিয়েছে। মানুষ এগিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশ যদি একটা সুষম অর্থনীতির দেশ হয়, বাংলাদেশ যদি একটা সম্মানজনক জায়গায় থাকতে পারে, দেশের ভেতরে যেমন আমরা ভালো থাকব। বাইরের পৃথিবীতেও একটা সম্মানজনক জাতি হিসেবে আমরা মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারব। প্রশ্ন: অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণদের সংগঠিত হওয়ার একটা অত্যাবশ্যকীয় প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠছে ফেসবুক, ইউটিউবসহ সোশ্যাল মিডিয়া। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এর ফল সম্পর্কে আপনার অনুধাবন কী? এম. হুমায়ুন কবির: আরব বসন্তের কথা বলা হয়। এখন এশীয় বসন্তের কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু আরব বসন্তের অভিজ্ঞতা মিশ্র। কিছু দেশে এটা সফল হয়েছে, যেমন তিউনিশিয়ায়। কিছু দেশে এটা সফল হয়নি। শুধু সফল হয়নি তা নয়, সিরিয়ায় বহুদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। মিশরে সামরিক শাসন আবার ফেরত এসেছে। যে নাগরিক অধিকারের জন্য মানুষ সংগ্রাম করেছে, মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে, সেগুলো অনেক দূরে সরে গেছে। আরব বসন্ত শুধু ওই অঞ্চলের ছিল না, তার মধ্যে সক্রিয়ভাবে ভূরাজনীতিও কাজ করেছে। আপনি যদি সিরিয়া ও মিশরের দিকে দৃষ্টি দেন, তাহলে দেখবেন, সেখানে বিশ্বের ভূরাজনীতিতে সক্রিয় সব শক্তিই এখানে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছে। সেটা আপনি রাশিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বলেন, তুরস্ক বলেন, ইসরায়েল বলেন—সবাই সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক ঘূর্ণনটা সেভাবে দেখছি না এখনো। যদিও নেপালের এ পরিবর্তনে ভারত খুশি হয়েছে। খুশি হওয়ার কারণ হচ্ছে যে, অলি সরকার ২০১৬ সাল থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছে। ভারতের বাইরেও চীনের মধ্য দিয়ে তারা ট্রানজিট সুবিধা নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে, উত্তর আফ্রিকায় যেভাবে আরব বসন্তের সময় তীব্রভাবে আমরা ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা দেখেছি—দক্ষিণ এশিয়ায় চীন এবং ভারতের মধ্যে কিন্তু এই মুহূর্তে সেই সম্ভাবনা আমি দেখছি না এবং সেটা একটা ইতিবাচক জায়গা। নেপাল যদি অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাটা ব্যবহার করতে পারে, তাহলে সেই সক্ষমতার ভিত্তিতে তার একটা ট্রানজিশনের দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে যদি অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিবাদ করতে থাকে, তাহলে ভিন্ন ব্যাপার। যদি অভ্যন্তরীণভাবে মোটামুটি একটা সহমতের জায়গায় থাকতে পারে, তাহলে তুলনামূলকভাবে তারা তাদের এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমার তাই মনে হয়। ভারতের সঙ্গে আমরা সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে আছি। কিন্তু এখানে চীন-ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা খুব বেশি প্রভাবিত করছে বলে অন্তত এখনো আমরা দেখছি না। সে ক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা দিয়ে আমাদের এ ব্যবস্থাটা উত্তরণের দিকে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে ভালো ফল মিলবে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। প্রশ্ন: দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে আপনি ভূরাজনীতির কোনো প্রভাব দেখছেন কি? এম. হুমায়ুন কবির: দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যাটা মূলত দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকেই উৎসারিত। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশই জনগণের সরকার বলতে যেটা বুঝি—অর্থাৎ শুধু ভোট দেওয়া নয়, শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নয়, নাগরিক অধিকার থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক অধিকার, সামাজিক অধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকার বা মানবাধিকারের যে বিস্তৃত প্রেক্ষাপট আছে, সে জায়গায় কোনো রাষ্ট্রই সেভাবে আধুনিক রাষ্ট্র নয়। পাকিস্তানের কথা বলেন, সেটারও একই অবস্থা। এসব দেশ রাষ্ট্র হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আছে, কিন্তু তার মানুষের জন্য সে কতটা কার্যকর, কতটা দরদি, সে প্রশ্ন করাই যায়। ভারতে এখনো কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের যে অবস্থা, তা অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশে আমরা বলছি গণতন্ত্রের কথা, কিন্তু শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া গণতন্ত্রের চর্চা বা মূল্যবোধ কি আমাদের আছে? কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের কি সম্মান আছে? কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মক্ষম থাকুক এটা কি আমরা চাই? এবং সাধারণ মানুষের অধিকার কি সে অর্থে কার্যকর হয়েছে বলে মনে করতে পারি? একই কথা নেপালের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো রাষ্ট্রই নাগরিকদের রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারেনি এখনো। আর নাগরিকদের রাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত না হবে, ততক্ষণ যতই কাঠামো তৈরি করুন না কেন, নাগরিকরা যদি কখনো নারাজ বা বিক্ষুব্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেটাকে টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। বিশেষ করে এখন কয়েকটা নতুন উপাদান আমরা দেখছি। দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, এখানে তরুণ প্রজন্ম জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ সংখ্যায় তারা বেশি। দ্বিতীয় হলো, সব দেশেই কর্মসংস্থানের ঘাটতি। সব দেশেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু সেটি কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে তরুণ প্রজন্ম বিক্ষুব্ধ হচ্ছে, হতাশ হচ্ছে। আর নিওলিবারেল ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের ফলে বৈষম্য বাড়ছে। কাজেই যারা তরুণ না, তারা প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আরেকটি বিষয় হলো যে, আগে সরকারের কাছ থেকে মানুষ তথ্য-উপাত্ত পেত বা পেতে চাইত। কন্ট্রোল অব ইনফরমেশন একটা ক্ষমতা হিসেবে ছিল। এখন আর সেই ক্ষমতা সরকারের নেই। প্রত্যেকটা নাগরিকই এখন তথ্যপ্রযুক্তিতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। ফলে নাগরিকদের নিজেদের মধ্যেই এখন এক ধরনের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল ক্ষমতা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা। দুপক্ষের মধ্যে দূতিয়ালি করার দায়িত্বটা ছিল তাদের। এখন তরুণ প্রজন্ম তাদের এ দূতিয়ালির দায়িত্বটা গ্রহণ করছে না। তারা নিজেরাই নিজেদের এজেন্সি নিয়ে নিচ্ছে। অর্থাৎ তরুণ প্রজন্ম নিজেরাই সে দায়িত্ব পালন করছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে তা বাংলাদেশে আমরা দেখলাম। তরুণ প্রজন্ম সেই দায়িত্বটা পালন করল। রাজনৈতিক দলগুলো পেছনে পেছনে হেঁটে এটা প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা করেছে যে, তারা তাদের সঙ্গে আছে। নেপালে তরুণ প্রজন্ম সব রাজনৈতিক দলকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে তারা একটা নতুন সরকার গঠন করল। শ্রীলঙ্কায়ও আমরা তাই দেখলাম। কাজেই অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আমরা আগে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায়, যে রাজনৈতিক মূল্যবোধ, যে রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করেছি—আগামী দিনে সে রাজনৈতিক কাঠামো টিকিয়ে রাখাটা খুব চ্যালেঞ্জিং হবে। কারণ, তরুণ প্রজন্ম নিজেরাই ক্ষমতার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। আমার ধারণা, প্রযুক্তির কারণে আগামী দিনে সেটা আরও বেশি ত্বরান্বিত হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন: ৫ আগস্টের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েন তৈরি হলো, যা এখনো বিদ্যমান। এর কারণ কী? এম. হুমায়ুন কবির: আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের স্বার্থটা কী? এর প্রধানতম উপাদান হচ্ছে, বাইরের মানুষ আমাদের কীভাবে চেনে? আমাদের ভাবমূর্তি বা ইমেজটা কী? বাংলাদেশকে বিশ্বের মানুষ গণতান্ত্রিক, উদার এবং পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত একটা দেশ হিসেবে দেখতে চায়। এটাই আমাদের ভাবমূর্তি। কাজেই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন আমাদের কোনো অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া এ ভাবমূর্তির কাঠামোটা ক্ষতিগ্রস্ত না করে। এটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিন্তু বাংলাদেশের মৌলিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি তিনটা স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কৃষি, আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্স। কৃষিতে বাইরের পৃথিবীর একটা বড় অংশগ্রহণ আছে। আমদানি-রপ্তানিতে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—এ চার শক্তি আমার অত্যাবশ্যকীয়। আর রেমিট্যান্স প্রবাহও বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজেই এ মৌলিক বিষয়গুলো যদি কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে আমরা বিপদে পড়ে যাব। অর্থনীতির এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বজায় রাখতেই হবে। কাজেই যে সরকারই বাংলাদেশে থাকুক, এ বিষয়টা মাথায় রেখেই তাকে এগোতে হবে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, আমরা বাইরে থেকে বিনিয়োগ চাচ্ছি, দেশীয় বিনিয়োগ চাচ্ছি, যে সরকারই আসুক তাকে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে আইনের শাসন থাকতে হবে। সেখানে কোনো ধরনের উগ্র চিন্তা যদি ঢুকে পড়ে, তাহলে আপনি দেশীয় বিনিয়োগও পাবেন না, বাইরের বিনিয়োগকারীরাও আসবে না, কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না। কাজেই মধ্যপন্থা থেকে আপনি যে কোনো দিকেই যান না কেন, তাতে বিপদের আশঙ্কা বাড়বে। আর ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের অবনতির বিষয়ে বলব যে, এটা অবশ্যই বিপজ্জনক, তবে আমরা যেন তাদের নতুন করে কোনো সুযোগ তৈরি করে না দিই। গত পনেরো বছরে তারা বাংলাদেশের কাছ থেকে যে কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে—সেটা এখন পাবে কি না, সেই নিশ্চয়তা তাদের নেই। এর কারণে হয়তো তারা এক ধরনের হতাশায় ভুগছে। আরেকটি বিষয় হলো, ভারতকে শক্তি হিসেবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়ার জন্য যে আঞ্চলিক সহযোগিতা দেখানোর দরকার ছিল, সেটা তারা বাংলাদেশ থেকে পেয়েছে। সার্ক এখানে অকার্যকর হয়ে গেছে—ভারত যেদিন ঘোষণা করেছে আমরা যাব না, তার পরদিনই বাংলাদেশও ঘোষণা করেছে যে, আমিও যাব না। তাতে কী দাঁড়াল? সার্ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নষ্ট হয়ে গেল, ক্ষতিগ্রস্ত হলো। আমি বলব যে, আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্র, কাজেই আমি যদি সম্মানজনক ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখি, তাহলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা খুব কঠিন কাজ নয়। সে ক্ষেত্রে ভারতই যেহেতু ৫ আগস্টের পর নিজে উদ্যোগ নিয়ে আমাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে, ফলে তাকেই সে জায়গায় এগিয়ে আসতে হবে। আমার ধারণা, বাংলাদেশের দিক থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের কথাবার্তায় যা বুঝি তা হলো, ভারত এগিয়ে এলে এ সরকার সাড়া দেবে। তা ছাড়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ রেখে আমাদের কোনো লাভ নেই। আমরা ভারতের সঙ্গে যেসব পারস্পরিক ক্ষেত্র আছে, সেগুলোকে সম্মানজনক জায়গায় রাখতে চাই, সমতার ভিত্তিতে রাখতে চাই। যে কথাটা আমাদের প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন। আমাদের মতভিন্নতাও থাকবে, সহমতও থাকবে—এটাকে মাথায় রেখেই আমাদের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। প্রশ্ন: বিগত দিনগুলোতে আমরা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবস্থা দেখেছি। এখন আমরা নতুন করে চিন্তা করছি যে, একটা পরিবর্তন আসবে। আপনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন? এম. হুমায়ুন কবির: আমি আশাবাদী হতে চাই। আশাবাদী হতে চাই দু-তিনটা কারণে। তরুণ প্রজন্ম যখন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা যখন একটা দিকে যাত্রা করেছে—আমি জানি এখানে ঘাটতি আছে; কিন্তু আমি যদি প্রজন্ম হিসেবে দেখি, তাহলে আমি তো তরুণ প্রজন্মের উত্থান দেখতে পাচ্ছি। যে প্রজন্ম নতুন চিন্তা নিয়ে এসেছে। নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসেছে। নতুন প্রত্যাশা নিয়ে এসেছে। এটা আমার কাছে আশার সঞ্চার করে। দ্বিতীয় আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ৫৪ বছর ধরে যা দেখছি—মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের শক্তির জায়গাটা এ দেশের সাধারণ মানুষ। এ দেশের সাধারণ মানুষ যতদিন সচেতন আছে, ততদিন পর্যন্ত আপনি হয়তো সাময়িকভাবে সুবিধা নিতে পারবেন, কিন্তু চূড়ান্ত বিবেচনায় আপনাকে দায়বদ্ধতায় আসতেই হবে। এ দেশের সাধারণ মানুষরা কিন্তু পরিশ্রম করে সৎভাবে তাদের জীবন নির্বাহ করতে আগ্রহী। একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তারা যেতে চায়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে তার সম্মান করে। তারা আশা করে, যারা ক্ষমতায় থাকবেন তারাও যাতে গণতান্ত্রিকভাবে তাদের সঙ্গে সে আচরণটাই করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা সেটা দেখি না। আবার নেপালের কথায় যদি আসি, সেখান থেকেও দেখা যায় যে, একসময় যারা হিরো ছিলেন, তারাও কিন্তু আজকে ভালো জায়গায় নেই। এটা শুধু নেপালের রাজনীতিবিদদের জন্য শিক্ষার বিষয় নয়, সবার জন্যই এ শিক্ষা। রাজনীতিবিদরা যদি জনগণের প্রত্যাশা ও তাদের স্বপ্নকে ধারণ না করেন—তাহলে জনগণও তাদের প্রতি কোনো দায়বোধ অনুভব করবে না। এখানেই একটা নতুন চিন্তার সুযোগ আছে। আমি বলব যে, ৯১ থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত আমরা যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি গণতন্ত্রের জন্য, সে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভালো-খারাপ দিকগুলোর একটা বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। তা যদি না হয়, তাহলে আজকে যারা হিরো হিসেবে আছেন, আগামী ১০-১৫ বছর পর তারা কোথায় থাকবেন তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। কারণ, তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি অগ্রসর, অনেক বেশি চিন্তাশীল। তারা এ দায়বদ্ধতা দাবি করে। কাজেই তাদের এ চিন্তাটাকে মাথায় রেখে আগামী দিনের রাজনীতির বিবর্তনটা যদি সংগঠিত হয়, তাহলেই আমরা আশাবাদী হতে পারি।
তরুণরাই হবে রাজনীতির নির্ধারক শক্তি
সাক্ষাৎকারে বদিউল আলম মজুমদার / রাজনীতি সেই ব্যবসা আর টাকার খেলাতেই রয়ে গেছে
ড. বদিউল আলম মজুমদার, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য। তিনি সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। নির্বাচনে মাঠের পরিবেশ, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, নির্বাচন কমিশনের সাফল্য-ব্যর্থতা, গণতন্ত্রে উত্তরণসহ নানা বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। প্রশ্ন: ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে। সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনের মাঠের পরিবেশ কেমন দেখছেন? বদিউল আলম মজুমদার: এখন পর্যন্ত যা দেখছি, পরিবেশ মোটামুটি শান্তই বলা চলে। মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছে। কিছুটা উত্তাপ-উত্তেজনা থাকলেও তা বড় ধরনের কোনো সহিংসতায় রূপ নেয়নি। মানুষ ভোট দিতে গ্রামে গিয়েছে, ফলে ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে গেছে। মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করছি; বহু বছর পর তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পেয়েছে। তাই আমি আশাবাদী যে, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রশ্ন: অতীতে বাংলাদেশে যত নির্বাচন হয়েছে—বিশেষ করে শেখ হাসিনা আমলের ১৫ বছর এবং তার আগের সময়গুলো বিবেচনায় নিলে—এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও পরিবেশ কতটা ভিন্ন? বদিউল আলম মজুমদার: অনেকটাই ভিন্ন; এখানে বিরাট পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। শেখ হাসিনা অবশ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসেছিলেন। ২০০৮ সালের সেই নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও তা গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, সেগুলোকে জালিয়াতির নির্বাচন বলা চলে। এর কোনোটি ছিল জালিয়াতিপূর্ণ, আবার কোনোটি একতরফা। এগুলো মোটেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল না। এর মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে এবং কার্যত আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থাকেই নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, প্রতিষ্ঠানগুলোতে চরম দলীয়করণ এবং ব্যাপক নিপীড়ন-নির্যাতন চালানো হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতো, এখন হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে। যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কারও প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার কথা নয়, তাই আমরা আশা করছি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। পরিবেশটা সম্পূর্ণ আলাদা। আগে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দলীয়করণ ছিল, নির্বাচন কমিশনও চরম পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। বর্তমান পরিবেশ হয়তো সবচেয়ে আদর্শ নয়, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে। প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং অযোগ্য প্রার্থীদের অংশগ্রহণ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কতটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে আপনি মনে করেন? বদিউল আলম মজুমদার: বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিছুটা ইতিবাচক, আবার কিছুটা নেতিবাচক। ইতিবাচক দিক হলো, মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় আশা করা যায় ভোট শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ হবে। সরকারের পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার কারণ নেই এবং নির্বাচন কমিশনেরও নিরপেক্ষ আচরণ করার কথা। মানুষ তাদের ভোটাধিকার ছাড়াও কথা বলার স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। তবে কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে আমরা যেসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক হতে পারত, তার অনেকগুলোই তারা গ্রহণ করেনি। এ ছাড়া ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের মনোনয়ন বৈধ করার মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছে, যা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। আমরা হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, অনেকে আইন অনুযায়ী সর্বশেষ আয়কর বিবরণী জমা দেননি। পর্যবেক্ষক নিয়োগ নিয়েও চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এসব বিষয় কমিশনের সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। যারা ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিক বা যারা আয়কর বিবরণী জমা দেননি—অর্থাৎ যাদের মনোনয়নপত্র অসম্পূর্ণ—তাদের মনোনয়ন বাতিল হওয়ার কথা। যখন এমন সম্ভাব্য অবৈধ প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেন, তখন নির্বাচনের হিসাব-নিকাশই বদলে যায়। যারা হয়তো জিতত না, তারা জিতে যেতে পারে। নির্বাচন শুধু ভোট দিলেই হয় না, তা হতে হয় নিরপেক্ষ এবং ন্যায়সংগত। অযোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিলে নির্বাচন সুষ্ঠু হলো কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও গ্রহণযোগ্যতার সংকট তৈরি হবে। সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে এই বিষয়গুলোর সুরাহা করতে হবে। প্রশ্ন: ৪২ জন ঋণখেলাপি রয়েছেন, দ্বৈত নাগরিকদের বিষয়টিও যাচাই করা হয়নি। এমনকি তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ঋণখেলাপির তালিকাও চায়নি, যা সাধারণত অন্য কমিশন করে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত এই নির্বাচন কমিশন কেন এমনটা করল বলে আপনার মনে হয়? বদিউল আলম মজুমদার: হয়তো এটি একটি দুর্বল নির্বাচন কমিশন এবং তাদের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, তারা কাউকে অসন্তুষ্ট করতে চাননি। কিন্তু এর মাধ্যমে যে নির্বাচনের মৌলিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, তা তারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন কি না, সেটাই চিন্তার বিষয়। আরেকটি বিষয় হলো, তারা গণভোটের বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করেছে যে, সরকারি কর্মকর্তারা 'হ্যাঁ' বা 'না'-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে তারা আরপিও-এর ৮৬ অনুচ্ছেদ এবং আচরণবিধির উদ্ধৃতি দিয়েছে। অথচ এগুলো সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারা অনুযায়ী এগুলো এখানে খাটে না। তারা নিজেদের আইন সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা একটি বড় ভুল। এই নির্দেশনা গণভোটকে প্রভাবিত করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার অভাব এবং অন্যান্য অভিযোগের দায় তাদেরই নিতে হবে। এর ফলে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত হলো, সে প্রশ্ন তো উঠবেই। প্রশ্ন: এমন পরিস্থিতি কি আওয়ামী লীগের হাতেই অস্ত্র তুলে দেওয়া হলো না? তারা তো এখন বলার সুযোগ পাবে যে, দেখো, ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিকরা মিলে এই নির্বাচন করছে? বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, অবশ্যই। শুধু তাই নয়, আমরাও এ নিয়ে অসন্তুষ্ট। এটি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এরা না থাকলে নির্বাচনি ফলাফল যা হতে পারত বা হতো, এখন হয়তো তা ভিন্ন হবে; যদিও আমরা নিশ্চিত নই। তবে এখানে ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন জড়িত। আদালতের অনেক রায় আছে, যেখানে বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সামনে এখনো সুযোগ আছে। তারা যেভাবে সুস্পষ্টভাবে কাউকে কাউকে ছাড় দিয়েছে—একজন কমিশনার তো বলেই ফেলেছেন, 'বৈধ করে দিলাম, টাকাটা কিন্তু ফেরত দিয়েন'—এটা কোনোভাবেই একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আশা করা যায় না। এটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। এখন তারা যেটা করতে পারে তা হলো—যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের ফলাফল গেজেটে প্রকাশ না করে, তদন্তসাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর ফলাফল প্রকাশ করা। এ ব্যাপারে আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বিচারপতি দেবনাথের একটি রায় আছে—'নূর হোসেন বনাম নজরুল ইসলাম' মামলায়। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের প্রধান আসামি, গডফাদার বা খলনায়ক নূর হোসেনের সেই মামলায় বলা হয়েছে, নির্বাচনকালীন সময়ে যদি কারচুপি বা অনিয়মের প্রশ্ন ওঠে, তবে নির্বাচন কমিশন ফলাফল বাতিল করতে পারবে এবং একই সঙ্গে নতুন নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারবে। তাদের সেই ক্ষমতা আছে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের অগাধ ক্ষমতা রয়েছে। তাদের 'ইনহেরেন্ট পাওয়ার' বা অন্তর্নিহিত ক্ষমতা আছে। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে তারা আইন ও বিধি-বিধানের সঙ্গে সংযোজনও করতে পারে। সাধারণত আইন প্রণয়ন করে সংসদ, কিন্তু আইনে যদি কোনো ফাঁকফোকর বা অস্পষ্টতা থাকে, তবে কমিশন তা দূর করতে পারে। আরেকজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন যে, নির্বাচনের পরেও এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। তবে আমাদের মনে রাখা দরকার, একবার গেজেট প্রকাশ হয়ে গেলে বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারে চলে যাবে, যাকে 'ইলেকশন পিটিশন' বা নির্বাচনি বিরোধ বলা হয়। তাই গেজেট প্রকাশ না করে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়াই সমীচীন হবে প্রশ্ন: এই নির্বাচনকে কি আপনি অন্তর্ভুক্তিমূলক বলবেন? অনেকে বলছেন, আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ না করায় নির্বাচনটি পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি? বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, এক অর্থে এটা সত্য। কিন্তু কেন এমনটা হয়েছে, তা আমাদের বুঝতে হবে। আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ সব নেতাকর্মী পালিয়ে গেছে। তাদের কোনো বিকল্প কমিটিও গঠিত হয়নি। শুধু তাই নয়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে যে হত্যা ও অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার কোনো দায় তারা নেয়নি। উল্টো তারা প্রতিশোধ নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। তারা যে নির্বাচনে অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে না, এই দায় তারা এড়াতে পারে না। অবশ্য তারা অংশগ্রহণ করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু যারা খুনখারাবি, অন্যায় ও লুটপাট করেছে, তাদের বাদ দিয়ে যদি... আসলে সে ধরনের কোনো উদ্যোগ তারা নেয়নি। তবে যেসব কর্মী-সমর্থক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল না, তাদের তো নির্বাচনে অংশ নিতে বা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে কোনো বাধা নেই। প্রশ্ন: আপনি তো সারাজীবন সৎ ও ভালো নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করে এসেছেন। আমরা যেন ভালো এমপি নির্বাচন করতে পারি, সে চেষ্টাই আপনি আজীবন করেছেন। এবারের নির্বাচনে আপনার কি মনে হচ্ছে—আমরা যেমনটা চাচ্ছি, তেমন ভালো প্রার্থীরা কি দাঁড়িয়েছেন? বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, কিছু ভালো এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির (ক্লিন) প্রার্থী অবশ্যই আছেন। তবে অনেক ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিক—যারা নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্য নন—তারাও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বিষয়টি আসলেই উদ্বেগজনক। বিষয় হলো, আমগাছ রোপণ করে তো আর কাঁঠাল পাওয়া যাবে না। আপনি যদি বিতর্কিত ব্যক্তিদেরই মনোনয়ন দেন এবং বিতর্কিত ব্যক্তিরাই যদি নির্বাচিত হয়ে আসেন, তাহলে আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটবে না। গণতান্ত্রিক উত্তরণ মানে হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা এবং একে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো। এটি আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কিন্তু এর পূর্বশর্ত হলো একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এটিই প্রথম পদক্ষেপ। এই প্রথম পদক্ষেপটি যদি আমরা সঠিকভাবে নিতে না পারি, তাহলে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ প্রশস্ত হবে না। নির্বাচন কমিশন এমন কিছু গুরুতর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করবে। প্রশ্ন: আপনি তো নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন এবং কাজ করেছেন। সবকিছু মিলিয়ে আপনার কী মনে হয়, আপনাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে? বদিউল আলম মজুমদার: আমরা অনেকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব করেছিলাম। যেমন—আমরা বলেছি, ঋণখেলাপিদের নির্বাচনের ছয় মাস আগেই ঋণ নিয়মিত করতে হবে, যাতে অভ্যাসগত ঋণখেলাপিরা কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে। আমরা বলেছি, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রায়ন হতে হবে; কারণ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্র ও দলের গণতন্ত্রায়ন জরুরি। আমরা নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ করার কথা বলেছি। নির্বাচনি ব্যয় প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করার এবং নির্বাচনের পর জমা দেওয়া ব্যয়ের হিসাব খতিয়ে দেখার সুপারিশ করেছি। আরেকটি বিষয় আমরা লক্ষ করেছি—অনেকেই আয়কর রিটার্ন বা ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেননি। আইনে বা আরপিওতে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। যদিও আমরা একাধিক বছরের রিটার্ন চাওয়ার প্রস্তাব করেছিলাম, কিন্তু আইনে সর্বশেষটির কথাই আছে। আমরা দেখেছি, অনেকেই হলফনামার সাথে রিটার্নের বদলে কেবল প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছেন, যা ট্যাক্স রিটার্ন নয়। এর মানে তাদের মনোনয়নপত্র অসম্পূর্ণ। মনোনয়নপত্র অসম্পূর্ণ হওয়া কোনো ছোটখাটো করণিক ভুল নয়, এটি গুরুতর অপরাধ। এ ছাড়া কেউ কেউ পুরনো ছকে হলফনামা জমা দিয়েছেন। বিশেষ করে যারা ট্যাক্স রিটার্ন দেননি, তাদের মনোনয়নপত্র কোনোভাবেই বৈধ হওয়া উচিত ছিল না। প্রশ্ন: মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা এখন কেমন দেখছেন? বদিউল আলম মজুমদার: মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে কিছু কিছু জায়গায় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। তবে ঢালাওভাবে কোনো গুরুতর অভিযোগ এখনও আমরা পাইনি, বা অভিযোগ থাকলেও তার স্বপক্ষে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। যেহেতু এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বে আছে, তাই আমি আশা করি মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে। প্রশ্ন: গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো পরিবর্তন কি দেখেছেন? বদিউল আলম মজুমদার: ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে একটি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে। শুরুতে কিছু দলের সংকোচ থাকলেও পরে প্রায় সবাই এতে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই ঐক্য এখন আর দেখা যাচ্ছে না; একতার পরিবর্তে অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়েছে। সুজনের পক্ষ থেকে আমরা ২০০৮ সাল থেকে 'প্রার্থী-ভোটার মুখোমুখি' অনুষ্ঠানের আয়োজন করি, যা একটি অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগ। কিন্তু এবার দেখছি, কিছু প্রার্থী বলছেন—'অমুক দলের সাথে বা অমুক প্রার্থীর সঙ্গে আমরা একই মঞ্চে উঠব না'। অথচ আমরা এত মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। যদি গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত হয়, তবেই হয়তো এই রক্তের ঋণ শোধ করার সুযোগ তৈরি হবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, যারা রক্তপাতের অন্যতম কারণ, তাদের তোষামোদ করা হচ্ছে এবং তাদের সাথে নানা অঙ্গীকার করা হচ্ছে। এটি আমাদের সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি। যেমন—৯০-এর গণআন্দোলনের সময় সব দল একমত হয়েছিল যে, স্বৈরাচার এরশাদের সঙ্গে কেউ হাত মেলাবে না। কিন্তু আমরা জানি বাস্তবে কী হয়েছিল। এবারও পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা জাগছে। যারা কোনো অন্যায়, লুটপাট বা খুনখারাবির সঙ্গে জড়িত ছিল না, তাদের হয়রানি করার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নিতেই হবে। মনে হচ্ছে, আমরা আবার সেই পুরোনো সংস্কৃতিতেই ফিরে যাচ্ছি। প্রশ্ন: এবার একটু ভিন্নভাবে প্রশ্ন করি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা আসলে কী পরিবর্তন পেলাম? বা আপনি কী পরিবর্তন দেখছেন? বদিউল আলম মজুমদার: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের পক্ষে। কথা ছিল—আমরা স্বৈরাচারের দোসর হব না, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকব এবং সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নেব। কিন্তু বর্তমানে এসবের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতি এখনো ব্যবসা এবং টাকার খেলাতেই আটকে আছে, যা নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক নয়। প্রশ্ন: সবশেষে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আপনার কি মনে হচ্ছে যে আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে যাচ্ছি? বদিউল আলম মজুমদার: এটি বহুলাংশে নির্ভর করবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। অবশ্যই নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কারা জড়িত হয়? মূলত রাজনৈতিক দল, তাদের প্রার্থী এবং কর্মী-সমর্থকরাই এতে জড়ায়। তারা যদি সদাচরণ করে, সহিংসতা, কারচুপি বা ভয়ভীতি প্রদর্শন না করে, তবেই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হতে পারে এবং মানুষ নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। তাই বলটি এখন মূলত রাজনৈতিক দল এবং তাদের প্রার্থীদের কোর্টে। আমি আশা করি, তারা দায়িত্বশীল আচরণ করবে এবং সকলের স্বার্থে আমরা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারব।
রাজনীতি সেই ব্যবসা আর টাকার খেলাতেই রয়ে গেছে
ফরিদা আখতারের সাক্ষাৎকার / নতুন সরকার যেন আমাদের ভালো কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে
অধিকারকর্মী হিসেবে সুপরিচিত ফরিদা আখতার। ১৯৮০-এর দশক থেকেই, বিশেষ করে নারী অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত উন্নয়ন বিতর্কের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালকও ছিলেন। জৈব কৃষি, প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে একাধিক গবেষণামূলক গবেষণা ও কাজের সঙ্গে যুক্ত তিনি। গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত হওয়া অন্তর্বর্তী সরকারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান ফরিদা আখতার। গত দেড় বছর নিজ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন শেষে দেশের কৃষি খাত, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত এবং এ খাতের উন্নয়ন ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন এশিয়া পোস্টের সঙ্গে। এশিয়া পোস্ট : কৃষিকে আমরা সচরাচর যেভাবে দেখি, প্রাণিসম্পদ খাত কি তার চেয়ে ভিন্ন কিছু? বিশেষ করে পোলট্রি ও দেশীয় জাত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? ফরিদা আখতার: আমরা অনেক সময় কৃষিকে খুব সংকীর্ণভাবে বুঝি। কৃষি বা খাদ্য বলতেই যেন শুধু চাল, ডাল—এগুলোকেই বোঝায়; মাছ ও মাংস এর বাইরে থেকে যায়। মন্ত্রণালয়ে এসে দেখলাম, এখানে শুধু বলা হচ্ছে—আমরা প্রোটিন বা প্রাণিজ আমিষের জোগান দিচ্ছি। কিন্তু এটাও যথেষ্ট নয়। বিষয়টির গভীরে গিয়ে বুঝলাম, খাদ্যের জোগান দেওয়া একটা দিক, কিন্তু এর সঙ্গে আমাদের দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা জড়িত। যেমন ধরুন, হাঁস-মুরগি বা গরু-ছাগল—এগুলোর পালনকারী মূলত গ্রামের নারী ও দরিদ্র মানুষ। তারা এগুলো পালন করতে গিয়ে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, সেটা বোঝা জরুরি। আমাদের দেশে ডেইরি বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল লাইভস্টক সেক্টর সেভাবে গড়ে ওঠেনি, যেভাবে পোলট্রি সেক্টর গড়ে উঠেছে। পোলট্রিতে আমরা হয়তো কিছুটা এগিয়েছি এবং এর ইতিবাচক দিক হলো মানুষ সস্তায় ডিম ও মাংস পাচ্ছে। কিন্তু ক্ষতির দিক হলো, আমাদের স্থানীয় জাতের মুরগির প্রতি কোনো মনোযোগ নেই, সরকারি কোনো পরিকল্পনাও নেই। ওটা যেন কেবল বিএলআরআই (বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট)-এর গবেষণার বিষয় হয়ে আছে। অথচ এটিই আমাদের মূল সম্পদ ছিল। এশিয়া পোস্ট: দায়িত্ব নেওয়ার পর উৎপাদন বৃদ্ধিতে আপনি কোন বিষয়গুলোর ওপর জোর দিচ্ছেন? খামারিরা, বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ে যারা গবাদিপশু পালন করেন, তাদের সহায়তায় ভ্যাকসিনের সমস্যা সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে? ফরিদা আখতার: দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি চেষ্টা করেছি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি মানে এই নয় যে, কেবল কৃত্রিম প্রজনন আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন করে গরুর দুধ বাড়াতে হবে। প্রাণিসম্পদের সঙ্গে যে ব্যাপক জনগোষ্ঠী জড়িত, আমরা যদি তাদের সহায়তা করতে পারি—সেটাই বড় কাজ। আর এই সহায়তা করা খুব কঠিন কিছু নয়। যেমন, ভ্যাকসিনের নিশ্চয়তা দেওয়া। আমি এখন সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছি। আমরা যদি রোগ নিরাময়মূলক বা প্রতিরোধমূলক কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারি, তাহলে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই পশুপালন করতে পারবে। এতদিন মনোযোগ না দেওয়ার কারণে এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভ্যাকসিনের দাম। সরকারিভাবে যা দেওয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় কম, ফলে মানুষ প্রাইভেট সেক্টর থেকে ভ্যাকসিন নিচ্ছে। সরকার যেখানে হয়তো ৫০ টাকায় দিত, প্রাইভেট কোম্পানি নিচ্ছে ৩০০ টাকা। এই পার্থক্য গরিব মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই আমি আমাদের দেশীয় গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এই বিষয়গুলোতে নজর দেওয়ার চেষ্টা করছি। এশিয়া পোস্ট: আমাদের দেশে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন ও সংরক্ষণে কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে? উৎপাদন বাড়াতে বিদেশি জাত বা কৃত্রিম প্রজননের ওপর নির্ভরতা এবং দেশীয় জাতের উপযোগিতা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? ফরিদা আখতার: বৈচিত্র্যের দিক থেকে আমি জেনে খুব খুশি হয়েছি যে, আমাদের দেশে গবাদিপশুর প্রচুর বৈচিত্র্য রয়েছে। বাংলাদেশ ছোট একটি ভূখণ্ড হলেও পার্বত্য এলাকায় বিশেষ জাতের গরু পাওয়া যায়, উত্তরবঙ্গে ‘নর্থ বেঙ্গল গ্রে’ আছে, মুন্সীগঞ্জে ‘মীরকাদিম’ এবং পাবনাতেও নিজস্ব ভ্যারাইটি বা জাত রয়েছে। এতদিন উৎপাদন বৃদ্ধির নামে ক্রস বা শংকর জাত করতে গিয়ে আমরা ক্ষতি করে ফেলেছি। আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন বা কৃত্রিম প্রজনন বারবার করার ফলে পশুদের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং অন্যান্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বলা হয়েছিল বিদেশি জাত আনলে গরু মোটাতাজা হবে, বেশি মাংস ও দুধ পাওয়া যাবে। এটা ঠিক যে দেশীয় গরু ১০ লিটার দুধ দিলে বিদেশি জাত ৩০-৪০ লিটার দেবে। কিন্তু এর পেছনের বাস্তবতা গ্রামের নারীরা খুব সুন্দর করে তুলে ধরেন। তারা বলেন, ‘বিদেশি গরুর জন্য ফ্যান চালাতে হয়, মশারি টাঙাতে হয়, বিশেষ খাবার দিতে হয়, আবার অ্যান্টিবায়োটিক তো আছেই।’ অর্থাৎ এর পেছনে যে যত্ন ও খরচ লাগে, তা দিয়ে আমি দেশীয় তিনটা গরু পালতে পারি এবং সেখান থেকেই ৩০ লিটার দুধ পেতে পারি, যা পালন করাও সহজ। এশিয়া পোস্ট: খামারিদের অন্যতম বড় সংকট গো-খাদ্য ও মৎস্য খাদ্যের উচ্চমূল্য। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে এবং জিএমও মুক্ত খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় কী ভাবছে? ফরিদা আখতার: আরেকটি গভীর সমস্যা হলো খাদ্য—গোখাদ্য বা মৎস্য খাদ্য। মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৭০ শতাংশই চলে যায় খাদ্য কেনা বাবদ। এই খাদ্যগুলো কী? এগুলো মূলত আমদানি করা উপকরণ দিয়ে দেশীয় কোম্পানিগুলো তৈরি করে। আমদানিকৃত উপাদানের মধ্যে সয়াবিন ও ভুট্টা অন্যতম, এবং খোঁজ নিলে দেখা যাবে এগুলোর জিএমও (GMO) হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অর্থাৎ, আমরা আমদানি করা জিএমও খাদ্য গরুকে খাওয়াচ্ছি এবং এতে উৎপাদন খরচও বাড়ছে। অন্যদিকে বিএলআরআই এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এখন ঘাস উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে, যা খুব ভালো উদ্যোগ। কারণ গরু তৃণভোজী, তাকে দানাদার খাবার খাওয়ানো খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়। কিন্তু আমাদের ঘাস ও খড়ের সংকট থাকায় দানাদার খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াতে হয়। আমরা যদি দানাদার খাদ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারি—যেমন স্থানীয়ভাবে ভুট্টা ও সয়াবিন উৎপাদনের ব্যবস্থা করা—তাহলে ফিড উৎপাদনকারীদের সুবিধা হবে। কারণ যারা ফিড আমদানি করে, তাদের উৎসে কর ও শুল্কের চাপে পড়তে হয়। এই জায়গাগুলোতে নীতিগত সহায়তা দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এশিয়া পোস্ট: ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া এবং এর পেছনের কারণ অনুসন্ধানে আপনাদের পর্যবেক্ষণ কী? ফরিদা আখতার: মৎস্য ক্ষেত্রে ইলিশের প্রাপ্যতা কমছে, এটা কিন্তু এক বছরের ঘটনা নয়। গত চার-পাঁচ বছর ধরে এটি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। হ্রাসের কারণগুলোও অনেক বছর ধরে ঘটে আসছে, কিন্তু কেউ তা দেখার চেষ্টা করেনি। যেন মনে করা হয় ইলিশ একটি ‘রেডিমেড প্রোডাক্ট’, নদী বা সমুদ্র থেকে লাফ দিয়ে বাজারে চলে আসবে। দাম কমলো কি কমলো না—শুধু সেটুকুই দেখার বিষয়। এই যে না দেখা বা কারণ না খোঁজা, এটা বড় সমস্যা। কাউকে এটা নিয়ে লেগে থাকতে হয়। এশিয়া পোস্ট: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে কৃষির ‘উপখাত’ হিসেবে দেখার বিষয়ে আপনার তীব্র আপত্তি রয়েছে। বিদ্যুৎ বিল বা প্রণোদনার ক্ষেত্রে এই খাত কী ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এবং এর সমাধানে আপনারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন? ফরিদা আখতার: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিদ্যুৎ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে কৃষির ‘উপখাত’ বলা হয়। আমি এতে ভয়ানক আপত্তি জানাচ্ছি। যদি কৃষির উপখাতই হবে, তবে কৃষির মতো প্রণোদনা বা ভর্তুকি কেন দেওয়া হয় না? আমাকে বিদ্যুতের বিল দিতে হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা কমার্শিয়াল রেটে। বন্যায় আক্রান্ত হলে কৃষকরা প্রণোদনা পায়, কিন্তু মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ খামারিরা পায় না। আমাকে যখন ইন্ডাস্ট্রির মতো বিবেচনা করা হচ্ছে, তখন আমি উপখাত হব কেন? জিডিপিতে কৃষির অবদান ক্রমাগত কমে এখন প্রায় ১১ শতাংশে ঠেকেছে। অন্যদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ—এই দুই খাত মিলে জিডিপিতে অবদান প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা কৃষির অর্ধেকের মতো। অন্যান্য অনেক খাতের অবদান ৫ শতাংশের চেয়েও কম। সেদিক থেকে আমরা কেন একটি স্বতন্ত্র খাত হব না? বাজেটে আমাদের বরাদ্দ দেওয়া হয় কৃষির অংশ হিসেবে এবং সেটাও কমতে থাকে। সাংবাদিকরাও যখন লেখেন, কৃষি, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য নিয়ে লেখেন, কিন্তু মৎস্য খাত নিয়ে আলাদাভাবে কেউ লেখেন না। এর ফলে এটি যে একটি পূর্ণাঙ্গ সেক্টর, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এর যে বিশাল অবদান—তা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। এটাকে উপখাত বানিয়ে রাখাটা আমার কাছে অন্যায় মনে হয় এবং এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এফএও (FAO)-কেও আমি বলেছি, তোমরা ফিশারিজ ও লাইভস্টক নিয়ে কাজ কর, তাহলে নাম কেন শুধু ‘অ্যাগ্রিকালচার’ (Agriculture)? আমি তাদের বলেছি আমাদের যেন শুধু সাব-সেক্টর হিসেবে না দেখা হয়। তারা আমার কথা শুনেছে। এই খাতের অবদান বাড়াতে হলে এর মর্যাদা ও সম্মান বাড়াতে হবে, অন্যের অধীন রাখা যাবে না। আর যদি রাখাই হয়, তবে সমান সুযোগ দিতে হবে। বিদ্যুতের সমস্যাটি নিয়ে আমরা চেষ্টা করছি। গত এক বছর ধরে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে বলার পর তারা ভর্তুকির কথা বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠায়। সেখান থেকে আবার এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে গেছে। তারা হয়তো কৃষির মতো একটি রেট ঠিক করবে। আমরা বলেছি, বাজেটে যেখানে কৃষি থাকে, তার পাশে ‘ওবলিক’ (/) দিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ লিখে দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এশিয়া পোস্ট: চিংড়ি রপ্তানি কমে যাওয়া এবং একে ‘অকৃষিজ পণ্য’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করার বিষয়ে আপনার মতামত কী? ফরিদা আখতার: চিংড়ির ব্যাপারে শুনলাম, রপ্তানি পণ্যের তালিকায় একে ‘অকৃষিজ শিল্প পণ্য’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটা কেন অকৃষি হবে? চিংড়ির সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকা ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্পর্ক আছে। এটি তো আমি কারখানায় তৈরি করছি না, প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরণ করে প্রসেস করছি। চিংড়ি রপ্তানি কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি। নব্বইয়ের দশকে গার্মেন্টসের পাশাপাশি চিংড়ি রপ্তানিকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, এমনকি ম্যানগ্রোভ বন কেটে পরিবেশের ক্ষতি করে হলেও একে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। আর এখন এর প্রতি চরম অবহেলা। এশিয়া পোস্ট: চরাঞ্চলে গবাদিপশুর চারণভূমি বা বাথান এবং জলমহাল ইজারা নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের কোনো অভাব কি পরিলক্ষিত হচ্ছে? এ ক্ষেত্রে নীতিগত কী পরিবর্তন আপনারা চাচ্ছেন? ফরিদা আখতার: আরেকটি বড় সমস্যা হলো চরাঞ্চল ও ভূমি মন্ত্রণালয় নিয়ে। যখন কোনো চর জাগে, সেটি মহিষ বা গরুর বাথান হতে পারে—সিরাজগঞ্জ বা মনপুরার মতো জায়গায় আমি দেখেছি। কিন্তু চর জাগলেই ভূমি মন্ত্রণালয় সেটি নিয়ে নেয় এবং ইজারা দিয়ে দেয়। যেখানে মহিষ বা গরু পালন হয়, সেখানে কেন বাথান করতে দেওয়া হবে না? এটা তো সরকারি জায়গাই। ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রেও দেখা হয় কত বেশি রাজস্ব আসবে। এমন চড়া মূল্য নির্ধারণ করা হয় যা মৎস্যজীবীদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে অমৎস্যজীবীরা ইজারা পায়। আমরা যদি রাজস্বের বদলে দেখতাম কে প্রাণবৈচিত্র্য ও জলজ সম্পদ রক্ষা করতে পারবে, তাহলে সেটাই হতো প্রকৃত লাভ। এখন ইজারা নীতির সংশোধন চাচ্ছি। ভালো খবর হলো, ভূমি মন্ত্রণালয় বাঁওড়ের ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা করেছে। এশিয়া পোস্ট: মৎস্যজীবীদের সংজ্ঞা এবং জলজ প্রাণী আহরণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বা বন বিভাগের সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান বা আইনি জটিলতা আছে কি? ফরিদা আখতার: হাওর এবং নদীর ইজারা নিয়েও সমস্যা আছে। গতকাল সিরাজগঞ্জে দেখলাম, একটি মসজিদ কমিটি প্রবহমান নদী ইজারা দিচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মালিকানা স্থাপনের বিষয়টি এখন খুব খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। আবার সংজ্ঞাগত সমস্যাও আছে। মৎস্য নীতিমালায় মৎস্যজীবীর সংজ্ঞা স্পষ্ট নয়। যখন সংজ্ঞায় মৎস্য, কাঁকড়া ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করতে চাওয়া হলো, তখন বন মন্ত্রণালয় আপত্তি জানাল। তারা বলল, ‘কাঁকড়া বন্য প্রাণী (Wild Animal), এটি ধরা যাবে না।’ অথচ কাঁকড়া অনেকের জীবিকা এবং খাদ্য। বন মন্ত্রণালয় যদি এসে বলে এটি ধরা যাবে না এবং ধরলে তাকে মৎস্যজীবী বলা যাবে না—তাহলে সংকট তৈরি হয়। কাজ করতে গেলেই বোঝা যায় আন্তঃমন্ত্রণালয় নির্ভরতা এবং সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা কোথায় কোথায় সমস্যা তৈরি করে রেখেছে। এশিয়া পোস্ট: ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে নদীর নাব্যসংকট কতটা বড় বাধা? এ ছাড়া হাওর ও জলাশয়ে ‘অল ওয়েদার রোড’-এর মতো অপরিকল্পিত অবকাঠামো মৎস্যসম্পদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন? ফরিদা আখতার: ইলিশের ক্ষেত্রে এখন যে সমস্যাটি হচ্ছে, তা হলো নদীর নাব্যসংকটের কারণে সমুদ্র থেকে ইলিশ আসতে পারছে না। তখন আমাদের কার কাছে যেতে হয়? হয় নৌপরিবহন, নয়তো পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে। আমাদের মন্ত্রণালয়ের ড্রেজিংয়ের কোনো ক্ষমতা নেই, অথচ আমরাই এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। এরপর আরেকটি বড় সমস্যা হলো অপরিকল্পিত বাঁধ। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে গিয়ে দেখবেন বাঁধ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে হাওরগুলো নষ্ট হচ্ছে। কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম যে রাস্তাটি করা হয়েছে, তাকে ‘অল ওয়েদার রোড’ বলা হচ্ছে। সড়ক উপদেষ্টা বলেছেন, এর মতো ভুল নাম আর হয় না। কারণ এর আগে-পিছে যেসব রাস্তা আছে, সেগুলো সাবমারসিবল এবং বর্ষাকালে পানির নিচেই থাকে। এই রাস্তাটি শুধু তিনটি উপজেলাকে সংযুক্ত করেছে। কিন্তু সেখানে যেতে হলে অন্য জায়গা থেকে প্রথমে স্পিডবোটে যেতে হয়। আমি নিজে সেখানে গিয়ে ঘুরে এসেছি। এর ফলে পানির প্রবাহ এবং মাছের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা সড়ক উপদেষ্টাকে বিষয়টি জানানোর পর তিনি নিজে গিয়েছিলেন এবং একটি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্টের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বর মাসে সেই অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে যে, প্রবাহ ঠিক রাখতে হলে কিছু কালভার্ট এবং মাঝখানে ব্রিজের মতো কিছু অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। রাস্তাটি যে কতটা শখের বশে করা হয়েছিল, তার প্রমাণ বার্জার পেইন্টিংয়ের আলপনা। আলপনা আঁকতে হলো, অথচ সেই রং পানিতে গিয়ে মাছের ক্ষতি করল। এগুলোকে কী বলবেন? এগুলো কত বড় অন্যায়! যেহেতু ৪০০ কোটি টাকা খরচ করে ফেলা হয়েছে, তাই এখন বলা হচ্ছে রাস্তাটি ভাঙা যাবে না। তাই এর মাঝখানেই কিছু পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এশিয়া পোস্ট: অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের যে ক্ষতি করছে, তা রোধে ভবিষ্যতে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে আপনারা কোনো নীতিগত বাধ্যবাধকতা বা ছাড়পত্রের নিয়ম চালু করার কথা ভাবছেন কি? ফরিদা আখতার: আমি এখন একটি দাবি তুলছি—যেকোনো কিছু করার ক্ষেত্রে যেমন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র লাগে, তেমনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়েরও ছাড়পত্র নিতে হবে। কারণ পরিবেশ মন্ত্রণালয় সবসময় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতির বিষয়টি খেয়াল নাও করতে পারে; ওটা তাদের আওতার বাইরে থাকতে পারে। যেমন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় করার সময় পরিবেশ মন্ত্রণালয় হাওর এলাকাটি দেয়নি, এটা ভালো ভাগ্য। কিন্তু চলন বিলে পুরো মৎস্য সম্পদ নষ্ট হয়ে যেত। সিরাজগঞ্জের মিল্ক ভিটা এলাকায় বন্যার সময় আমি দেখেছি বাথানগুলোতে শুধু গরু আর গরু। এসবের পেছনে কত মানুষের জীবন জড়িত, তা কেউ খেয়াল করে না। তাই আমি বলছি, আগামীতে অনেক পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু এক জায়গা থেকে সনদ নিলে চলবে না। এশিয়া পোস্ট: পোলট্রি খাতে গুটিকয়েক করপোরেট কোম্পানির বাজার নিয়ন্ত্রণ বা ‘অলিগোপলি’র অভিযোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র খামারিদের স্বার্থ রক্ষা এবং ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’-এর মতো বিষয়গুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন? ফরিদা আখতার: করপোরেট কোম্পানিগুলো আসবে, এটা ঠেকানো যাবে না এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে তাদের অবদান আমি অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু পোলট্রি খাতে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। মাত্র কয়েকটা কোম্পানির হাতে ‘ডে ওল্ড চিকেন’ বা এক দিনের বাচ্চার পুরো নিয়ন্ত্রণ। এটি একটি অলিগোপলির মতো হয়ে আছে এবং তারাই দাম নির্ধারণ করে। অথচ তারা মোট সাপ্লাইয়ের মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ জোগান দেয়, বাকিটা দেয় ক্ষুদ্র খামারিরা। কিন্তু এই ক্ষুদ্র খামারিরা বাচ্চার জন্য এবং ফিডের জন্য তাদের ওপর নির্ভরশীল। ডিলারদের মাধ্যমে একটি চেইন গড়ে উঠেছে, যারা করপোরেট স্বার্থই রক্ষা করে। করপোরেটাইজেশনের মধ্যে আমি যে বিষয়টি পছন্দ করছি না, তা হলো ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’। এতে খামারিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না, তারা কোম্পানির অধীনস্থ হয়ে যাবে। তারা হয়তো সুযোগ-সুবিধা পাবে, কিন্তু এটি অনেকটা তামাক চাষের মতো হয়ে যাবে। ক্ষুদ্র খামারিরা যদি স্বাধীন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে না পারে, তবে পুরো সেক্টরের জন্য তা ভালো হবে না। এশিয়া পোস্ট: ডিম ও দুধের বাজারের অস্থিরতা এবং খামারি ও ভোক্তার দামের মধ্যে বিশাল ব্যবধান—এই সংকট নিরসনে সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা ‘চিলিং সেন্টার’ গড়ে তোলার বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী? ফরিদা আখতার: আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডিমের দাম বাড়ার একটি কারণ হলো, এ সময় সবজি উৎপাদন কম থাকে। মধ্যবিত্ত পরিবারও বাজারে গিয়ে সবজি কিনতে না পেরে ডিমের ওপর নির্ভর করে। ডিম আর আলু মিলে একটি তরকারি হয়ে যায়। এ সময় চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। আবার ডিমের চাহিদার সিজনাল ব্যাপারও আছে। খুব গরম পড়লে ডিম দ্রুত নষ্ট হয় বলে দাম কমে যায়। খামারিরা অভিযোগ করেন, দাম বাড়লে পত্রিকায় লেখা হয়, কিন্তু কমলে লেখা হয় না। তবে এই চাহিদার তারতম্যের সুযোগ ক্ষুদ্র খামারিরা পায় না, নেয় বড় করপোরেট সেক্টর। এটি সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়। এখানে সরকারের অনেক কিছু করার আছে। উপজেলা পর্যায়ে যদি চিলিং সেন্টার করা যায় এবং প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগ আনা যায়, তবে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। দুধের চাহিদাও একেক সময় একেক রকম থাকে। মিষ্টির চাহিদা বাড়ে বিয়ের বা পরীক্ষার মৌসুমে। আবার আমের মৌসুমে মানুষ মিষ্টির বদলে আম নিয়ে বেড়াতে যায়, তাই দুধের চাহিদা কমে। যদি দুধের কালেকশন পয়েন্ট বা সংগ্রহ কেন্দ্র থাকত, তবে এই সমস্যা হতো না। মিল্ক ভিটার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কালেকশন বাড়ানো উচিত। আমি ঝিনাইদহ গিয়ে কেঁদে ফেলেছি যখন শুনলাম বাজারে দুধ ৫০ টাকা, অথচ খামারিদের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে ২০ টাকায়। এই ২০ টাকায় তারা কী করবে? কিছু বড় ব্র্যান্ড এই সুযোগ নিয়ে নিজেরা বেশি দামে বিক্রি করছে, কিন্তু খামারিদের ন্যায্য দাম দিচ্ছে না। এই অন্যায় রোধে আমাদের রেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। এশিয়া পোস্ট: প্রাকৃতিক উৎসের মাছ কমে যাওয়ায় আমরা এখন চাষের মাছ বা অ্যাকুয়াকালচারের ওপর নির্ভরশীল। এতে মাছের বৈচিত্র্য কমে যাওয়া এবং মাছ ও পোলট্রি ফিডে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য যে হুমকি তৈরি করছে, তা মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন? ফরিদা আখতার: আমাদের মাছ দুইভাবে আসে। একটি হলো নদী, খাল, বিল, হাওর-বাঁওড়ের মতো জলাশয় থেকে আহরণ করা। এখানে আমাদের মূল কাজ হলো মাছের বসবাসের পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রজনন ঋতুতে নিষিদ্ধ সময় ঘোষণা করা। এককালে মোট মাছের ৬০ শতাংশেরও বেশি আসত প্রাকৃতিক উৎস থেকে, আর ৩০-৪০ শতাংশ আসত চাষ বা অ্যাকুয়াকালচার থেকে। এখন পরিস্থিতি উল্টে গেছে; প্রায় ৬০ শতাংশই আসে চাষকৃত মাছ থেকে। এর ভালোমন্দ দুই দিকই আছে। তবে ‘নয়াকৃষি’র দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমি দেখি যে, চাষ করতে গিয়ে আমরা মাছের প্রজাতি সীমিত করে ফেলছি। রুই, কাতলা, পাঙাশ, পাবদা, সিলভার কার্প, তেলাপিয়া—এর বাইরে খুব বেশি মাছ পাওয়া যায় না। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এর বাইরে মাছের নামও বলতে পারে না। সামুদ্রিক মাছও আমরা খুব বেশি পরিচিত করতে পারিনি। তবে অ্যাকুয়াকালচারে আমরা বিশ্বে পঞ্চম স্থানে আছি এবং এটি প্রোটিনের জোগান দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিককে জিজ্ঞেস করলে সে পাঙাশ মাছ খাওয়ার কথা বলে, যা শুনে আমার ভালো লাগে। অন্যদিকে মাছের ফিড বা খাবার নিয়েও সমস্যা আছে। কিছু কোম্পানি এটি নিয়ন্ত্রণ করে এবং ফিডে চামড়ার বর্জ্যসহ ক্ষতিকর অনেক কিছু মেশায়। দ্রুত লাভের আশায় তারা অ্যান্টিবায়োটিক দেয়, এমনকি খরচ বাঁচাতে বিষ দিয়ে মাছ ধরে। অ্যাকুয়াকালচারে এসব ঘটার ফলে নিরাপদ মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। আমি এই জায়গায় নজর দিতে চাই এবং রেগুলেটরি মেকানিজম শক্ত করতে চাই। আমরা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি। পোলট্রিও যেন অ্যান্টিবায়োটিক মুক্ত থাকে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের অনেকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ১৭-১৮টি অ্যান্টিবায়োটিকও কাজ করছে না। শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তাদের বাঁচানো গেছে। তাই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য—এই তিনটি মিলে যে ‘ওয়ান হেলথ’ কনসেপ্ট, তা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। আমরা যদি প্রাণীর স্বাস্থ্য রক্ষা করি এবং সুস্থ প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি, তবে মানুষের অসুস্থতাও কমবে। এশিয়া পোস্ট: খামারিদের সুরক্ষা দিতে বিমা ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে ভোক্তার কাছে ন্যায্যমূল্যে পণ্য পৌঁছাতে সরকারের উদ্যোগগুলো কী? ফরিদা আখতার: ট্যাক্স-ভ্যাটের কথা বলতে গেলে এনবিআরের কথা আসে। তারা মনে করে ভ্যাট থেকেই রাজস্ব আসবে। কিন্তু আমার মনে হয় এর মাধ্যমে সম্পদ রক্ষা বা মানুষকে নিশ্চয়তা দেওয়াটা বেশি জরুরি। ইনস্যুরেন্স বা বীমা নিয়ে আমরা কাজ করছি। কৃষির মতো আমাদের খাতেও বাম্পার ফলন হলে খামারিরা দাম পায় না, পণ্য ফেলে দিতে হয়। দামের বিষয়টি আমরা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। দেখা গেছে, খামারি কম দাম পাচ্ছে কিন্তু ভোক্তা বেশি দামে কিনছে। ডিম ভোক্তার হাতে আসার আগে প্রায় ছয়বার হাত বদলায়। প্রতিবার এক টাকা করে বাড়লেও দাম অনেক বেড়ে যায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার এবং আমরা সবাই মিলে এই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর চেষ্টা করছি। আরেকটি বড় সমস্যা হলো চাঁদাবাজি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ছাড়া এটি কমানো সম্ভব নয়। আড়তদাররাও এতে অতিষ্ঠ। আমাদের বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থা কৃষি বা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বান্ধব নয়। সরকারি উদ্যোগে বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা করা গেলে খরচ কমত। কোরবানির ঈদের সময় যেমন দেওয়া হয়, তেমনি সারা বছর যদি ট্রেনের বিশেষ বগি কৃষি ও মৎস্য পণ্যের জন্য বরাদ্দ দেওয়া যেত, তবে খুব ভালো হতো। এশিয়া পোস্ট: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত থেকে রপ্তানি আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা কতটুকু? আর আপনার শুরু করা সংস্কার ও উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকার বিষয়ে আপনি কতটা আশাবাদী? ফরিদা আখতার: আমরা রপ্তানিতে যাবই। কারণ বিশ্বের অনেক দেশে বাঙালিরা আছেন, তারাই আমাদের ক্রেতা হবেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায়। আমাদের গরুর উৎপাদন ও সিস্টেমের দক্ষতা বাড়াতে পারলে রপ্তানি সম্ভব। মাছের ক্ষেত্রে আমাদের ‘ডিপ সি ফিশিং’ বা গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে যেতে হবে। অভ্যন্তরীণ মৎস্য আহরণে সীমাবদ্ধতা থাকলেও গভীর সমুদ্রে আমরা অবশ্যই পারব। চিংড়ি রপ্তানির সমস্যাগুলো দূর করে আবার রপ্তানি বাড়াতে হবে। অর্থনীতিতে এখানে বড় সুযোগ রয়ে গেছে। আমরা যদি কিছু ভালো কাজ করে থাকি, তবে আশা করব পরবর্তী সময়ে যারা আসবেন, তারা যেন এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। গত সরকারের কাজ বলেই সব বাদ দিতে হবে—এমনটা আমরা করিনি; কাজের ভালোমন্দ বিবেচনা করেছি। ঠিক তেমনি, এই এক-দেড় বছরে আমরা যেসব ভালো কাজ করেছি, সেগুলো যেন অব্যাহত থাকে। জনগণের জীবন-জীবিকা, প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা এবং অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নে এই মন্ত্রণালয়ের অবদানকে আরও সামনে নিয়ে আসাটাই আমার লক্ষ্য। এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ফরিদা আখতার: আপনাকেও ধন্যবাদ।
নতুন সরকার যেন আমাদের ভালো কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সাক্ষাৎকার / নতুন সরকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
সালেহউদ্দিন আহমেদ ১৯৭০ সালে অর্থনীতি বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। অতঃপর তৎকালীন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি) যোগদান করেন। ১৯৭৮-৭৯ সালে ঢাকা জেলার সহকারী কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭৯-৮০ সালে পিরোজপুর মহকুমার মহকুমা প্রশাসক ছিলেন। তিনি ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর রিসার্চ অন হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টে কাজ করেন, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সঙ্গে একীভূত হয়। তিনি ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। তিনি ১৯৯৫-৯৬ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিরডাপ) গবেষণা প্রধান হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ছিলেন। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। ২০১৪ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তিনি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ট্রাস্টি। অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং তার কর্মময় জীবনের ‍ওপর তার ১০০টির বেশি নিবন্ধ ও বই প্রকাশিত হয়, যেগুলো দেশ ও বিদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। একই সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বেও ছিলেন সাবেক এই গভর্নর। সরকারের শেষ সময়ে এসে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন খ্যাতিমান এই অর্থনীতিবিদ। এ সময় তিনি দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ, দুর্নীতি, দেশের অর্থপাচার, ব্যাংকিং খাত ও বিভিন্ন খাতের সংস্কারসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। এশিয়া পোস্ট: দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভঙ্গুর অবস্থায় আপনি দায়িত্ব নিয়েছেন। আর্থিক খাতকে কী অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: আমরা অর্থনৈতিক বা আর্থিক খাতকে মোটামুটি একটি সন্তোষজনক অবস্থায় রেখে যাচ্ছি। আমরা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন ব্যাংকিং খাতের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। বেশিরভাগ ব্যাংকে তারল্য সংকট ছিল। ব্যাপক হারে অর্থ পাচার হয়েছিল। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা ছিল প্রবল। ব্যাংকিং খাতের ঋণ সুবিধা গুটিকতক মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। দুর্নীতি এবং এনবিআরের বিশৃঙ্খলার কারণে কর আদায়ে লিকেজ বা অপচয় হচ্ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যে একচেটিয়া আধিপত্য এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের অভাব ছিল, যদিও তৈরি পোশাক খাত ভালো অবস্থানে ছিল এবং এখনও আছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং বাজার অস্থিতিশীলতা। জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে প্রচুর লোডশেডিং হতো। সামষ্টিক দিক বিবেচনা করলে বর্তমানে আমরা সন্তোষজনক অবস্থায় আছি। লোডশেডিং আগের তুলনায় কমেছে। গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় কিছুটা ঘাটতি থাকলেও আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। তা আমরা ৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে। প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের দায় পরিশোধের পরেও বর্তমানে গ্রস রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। বাজারের অবস্থা অনেকটা ভালো হয়েছে। রপ্তানি আয় কমেনি এবং রেমিট্যান্সে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে, যা আগে হুন্ডির মাধ্যমে আসত। এশিয়া পোস্ট: অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে মনে করেন? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ:  ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোপুরি চাঙা হয়নি। দেশে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকায় বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ কিছুটা কমেছে। দেশীয় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ না করলে বিদেশি বিনিয়োগ আসাও কঠিন। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সার্বিকভাবে আমি মনে করি পরিস্থিতি অনেকটা সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। এশিয়া পোস্ট: বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আপনারা কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: প্রথমত, সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হলো মানুষের মানসিকতা। অনেকেই পরিবর্তন চান না এবং চিরাচরিত পদ্ধতিতে কাজ করতেই অভ্যস্ত। সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই যারা পুরনো ব্যবস্থায় সুবিধাভোগী ছিলেন, তারা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার মেনে নিতে চান না। কারণ, জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে অর্থের অপচয়, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধ হবে, যা তাদের স্বার্থের পরিপন্থি। তাই সংস্কারের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষ থেকে একটি প্রতিরোধ ছিল। দ্বিতীয়ত, পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও এক ধরনের ধীরগতি লক্ষ করা যায়। নতুন প্রযুক্তি বা আইটি ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হতে মানুষের সময় লাগে। তৃতীয়ত, সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ, সৎ ও নিষ্ঠাবান লোকের অভাব রয়েছে। আইটি খাতে কিছুটা উন্নতি হলেও প্রকৌশল বা চিকিৎসা খাতের মতো বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি আছে। স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতের সংস্কারে এই বিষয়গুলো সীমাবদ্ধতা হিসেবে কাজ করেছে। এশিয়া পোস্ট: সরকারের ব্যয় সংকোচন বা অপচয় রোধে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: অতীতে বিদেশ ভ্রমণ, বিভিন্ন উৎসব ও দিবস পালনের নামে সরকারি অর্থের ব্যাপক অপচয় হতো, যার কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেশের প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়নে ছিল না। মুষ্টিমেয় কিছু লোক এসব সুবিধা ভোগ করত। আমরা এসব অপ্রয়োজনীয় খরচ বন্ধ করে দিয়েছি। এতে সুবিধাভোগী একটি ছোট অংশ অসন্তুষ্ট বা ক্ষুব্ধ হলেও সাধারণ মানুষের কোনো ক্ষতি হয়নি, কারণ তারা এর কোনো সুফল পেত না। বরং জনগণ দেখছে যে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হচ্ছে এবং তা ভালো কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। কিছুটা বিরূপ মনোভাব থাকলেও কোনো বড় ঝামেলা ছাড়াই আমরা এই সাশ্রয়ী পদক্ষেপগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। এশিয়া পোস্ট: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের সংস্কার নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী এবং এটি বাস্তবায়নে কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দীর্ঘকাল ধরে একটি চিরাচরিত বা গতানুগতিক ধারায় পরিচালিত হয়ে আসছে। তাদের নীতি বা রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতিতে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ের দক্ষতা বৃদ্ধি বা করের আওতা (ট্যাক্স নেট) বাড়ানোর ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হয়নি। এ কারণেই আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম, যা বর্তমানে মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমরা রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায়—এই দুটি কার্যক্রমকে আলাদা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে এনবিআর কর্মকর্তারা ভেবেছিলেন এতে তাদের ক্ষমতা কমে যাবে বা জনবল ছাঁটাই করা হবে, যা সম্পূর্ণ অমূলক। আমাদের পরিকল্পনায় জনবল কমানোর কোনো বিষয় নেই। আমরা প্রযুক্তির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের ওপর জোর দিচ্ছি। আমরা চেয়েছি, নীতি বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে আধুনিক শুল্ক, আয়কর ও ট্যারিফ নীতি প্রণয়ন করবে। অন্যদিকে, আদায় বিভাগ দ্রুততম সময়ে ভ্যাট, আয়কর আদায় এবং বন্দরে পণ্য খালাসের বিষয়টি নিশ্চিত করবে। নিজেদের স্বার্থ ও ক্ষমতা কমে যাওয়ার ভয়ে এনবিআর-এর ভেতর থেকে কিছুটা প্রতিরোধ ও আন্দোলন হয়েছিল। তবে সরকারের দৃঢ় অবস্থান এবং আলোচনার মাধ্যমে আমরা তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। ব্যবসায়ী সমাজ এবং সাংবাদিকরাও এই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন। তারা মত দিয়েছেন যে এটা করা দরকার। ফলে শেষ পর্যন্ত বাধার যুক্তিগুলো টেকেনি। এশিয়া পোস্ট: অর্থপাচার রোধ এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে আপনারা কী পদক্ষেপ নিয়েছেন? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: প্রথমত, অর্থ পাচার রোধ ও পুনরুদ্ধারে আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছি। সেখানে মূল দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমাদের প্রধান উপদেষ্টাও এই বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক। আমাদের প্রধান লক্ষ্য দুটি। প্রথমত, দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ যতটা সম্ভব ফেরত আনা। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে যেন কেউ অর্থ পাচারের সাহস না পায় তার জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। আমরা ইতিমধ্যে বড় বড় ১২টি সংস্থাকে শনাক্ত করেছি যাদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে এবং ২০০ কোটি টাকার ওপরে অর্থ পাচারকারীদের অনেককেও আমরা চিহ্নিত করেছি। প্রথম ধাপে, দেশে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আদালতের আদেশের মাধ্যমে ফ্রিজ বা জব্দ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে, বিদেশ থেকে টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি একটি আইনি প্রক্রিয়া এবং এর জন্য ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স’বা পারস্পরিক আইনি সহায়তার প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন দেশের আইন ও নিয়মকানুন ভিন্ন হওয়ায় আমরা বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানকেও (লিগ্যাল ফার্ম) নিয়োগ করছি। যুক্তরাজ্যে কিছু সম্পদ জব্দ করা হলেও তা ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ। হুট করে একদিনেই এই টাকা ফেরত আনা সম্ভব নয়। তবে আমরা প্রক্রিয়াটি শুরু করে দিয়েছি এবং আশা করছি আমাদের সময়েই কিছু অর্থ ফেরত আসবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমরা একটি সঠিক পথ তৈরি করে দিচ্ছি যা পরবর্তী সরকারগুলোকেও অনুসরণ করতে হবে। এশিয়া পোস্ট: গত সরকারের সময় দুর্নীতির ক্ষেত্রে আমলা, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের একটি চক্র কাজ করেছে। এটাকে ভাঙতে আপনাদের কী পদক্ষেপ ছিল? এর ফলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা কতটুকু উপকৃত হচ্ছেন? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অলিগার্কি বা মুষ্টিমেয় লোকের আধিপত্য ভাঙা হয়েছে। আগে দেখা যেত ব্যাংকের মালিক, শিল্পপতি, সংসদ সদস্য এবং গণমাধ্যমের মালিক—সবাই মূলত একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। এই সিন্ডিকেটের অনেকেই এখন পলাতক। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করেছে, যেখানে প্রত্যক্ষভাবে ব্যাংকের মালিকদের আধিপত্য নেই। গণমাধ্যমের মালিকানার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। অনেকে দুর্নীতিসহ অন্যান্য ক্রিমিনাল মামলায় অভিযুক্ত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে মালিকানা একই থাকলেও তাদের নীতিতে পরিবর্তন এসেছে। আগে বিভিন্ন এজেন্সির চাপে তারা নির্দেশিত পথে চলত। এখন সেই চাপ বা নিয়ন্ত্রণ কমে গেছে। আমাদের নেওয়া পদক্ষেপ এবং পরিস্থিতির স্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে এতদিন বঞ্চিত ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এখন সামনে আসছেন। ব্যাংকগুলোও এখন বড় ব্যবসায়ীদের পরিবর্তে ছোটদের ঋণ দেওয়ায় আগ্রহী হচ্ছে। কারণ, ব্যাংকগুলো বুঝতে পেরেছে যে বড় ব্যবসায়ীরাই মূলত বড় ঋণখেলাপি। যদিও তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো পুরোপুরি সহায়তা করতে পারছে না, তবুও তাদের ফোকাস এখন পরিবর্তিত হয়েছে। এর ফলে বড় বড় সিন্ডিকেট বা অলিগার্ক প্রথা ভেঙে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে আরও বিকেন্দ্রীকরণ ও সমতা আসবে বলে আমি মনে করি। এশিয়া পোস্ট: ব্যবসায়িক খাতে দীর্ঘদিনের বৈষম্য কমাতে আপনারা কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন? গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব কি লক্ষ করা যাচ্ছে? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: অতীতে ব্যবসায়িক খাতে বৈষম্য ছিল অত্যন্ত প্রকট। সেই অসম কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে সামান্য বৈষম্য বাড়লেও তা বিশাল আকার ধারণ করে। আমরা হয়তো রাতারাতি এই বৈষম্য পুরোপুরি কমিয়ে আনতে পারব না। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এটি যেন আর না বাড়ে। এ কারণেই নতুন ঋণ ও ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা বেশ কড়াকড়ি আরোপ করেছি। এখন নতুন উদ্যোক্তরাই প্রধান ভূমিকা পালন করছেন এবং আবেদনের সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে পুরোনো প্রভাবশালী বা সিন্ডিকেটকারীরা আর আগের মতো বাজার নিয়ন্ত্রণ বা কারসাজি করতে পারছে না। যদিও পুরনোদের কেউ কেউ ছদ্মবেশে আসার চেষ্টা করতে পারে। তবু নতুনদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। আমরা আত্মকর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি। নারীদের ব্যবসার ক্ষেত্রে কর রেয়াতসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যাতে বৈষম্য কমে আসে। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আগে কৃষি খাতে জমি লিজ নেওয়া বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তিদের হাতে ছিল। তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো জমি দখল বা নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা নেই। কৃষি, মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ খাতে এখন যারা প্রকৃত উৎপাদনকারী, তারাই মালিকানা ও বাজারজাতকরণের সুযোগ পাচ্ছেন। আগে উৎপাদনকারীরা কেবল শ্রমিক হিসেবে খাটত এবং মালিকানা থাকত অন্যের হাতে। এখন উৎপাদনকারী ও মালিকের মধ্যে দূরত্ব কমেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা মিলেমিশে কাজ করছেন। ফলে ক্ষেত-খামারে কাজ করা শ্রমিকরা আগের মতো বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন না। পরিস্থিতি পুরোপুরি ঠিক না হলেও উন্নতির দিকে যাচ্ছে। এশিয়া পোস্ট: কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে আপনাদের কৌশল কী ছিল? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: কর্মসংস্থান তৈরির মূল উৎস হলো বেসরকারি খাত, সরকারি খাত নয়। তাই আমরা বেসরকারি খাতকে উজ্জীবিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। বড় শিল্পের অবশ্যই প্রয়োজন আছে, তবে সেগুলো শ্রমঘন (লেবার ইনটেনসিভ) হতে হবে। পাশাপাশি আমরা রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিচ্ছি। তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া, প্লাস্টিক পণ্য, ইলেকট্রিক সামগ্রী এবং সিরামিক শিল্পের বিকাশে কাজ করছি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কুটির শিল্প। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে আমরা এই খাতগুলোকে উৎসাহিত করছি। ব্যাংকারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন এই খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো হয়। চাকরির পেছনে না ছুটে আত্মকর্মসংস্থানের জন্য স্টার্টআপ বা নিজের উদ্যোগে কিছু করাকে আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। এক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন বা পুঁজি। ব্যাংকঋণ বা এসএমই ফান্ডের প্রক্রিয়াটি কিছুটা ধীরগতির হলেও কাজ হচ্ছে। বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে আমরা এখন দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্য বা সৌদি আরবে আমাদের শ্রমিকরা যে বেতনে কাজ করেন, একটু দক্ষ হলে বা কারিগরি জ্ঞান থাকলে তারা তার দ্বিগুণ বা তিনগুণ আয় করতে পারতেন। এ ছাড়া জাপান, ইতালি বা কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে কাজের জন্য ভাষার দক্ষতা জরুরি। তাই আমরা ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে বিদেশে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছি। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতা—সব মিলিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করলে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি পাবে। এশিয়া পোস্ট: কাঙ্ক্ষিত হারে বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলো কী বলে আপনি মনে করেন? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, অর্থের যোগান বা ঋণের অভাব। অনেক বিনিয়োগকারী ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছেন—কেউ পরিস্থিতির শিকার হয়ে, আবার কেউ অন্য কোনো কারণে। ফলে তারা নতুন করে ঋণ বা অর্থায়ন পাচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সংকট। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে অনেকে কারখানা স্থাপন করেও উৎপাদনে যেতে পারছেন না। তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। চতুর্থত, দেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা থাকায় বিদেশি বিনিয়োগও আসছে না। বিদেশিরা সাধারণত স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে অথবা তাদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে চায়। দেশি বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় না হলে বিদেশিরাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এ ছাড়া আমাদের ফিসকাল পলিসি বা রাজস্ব নীতিতে কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে। বিশেষ করে কর, ভ্যাট এবং অগ্রিম আয়কর সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশ কি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত? এ ক্ষেত্রে আপনারা কী ধরনের ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ দেখছেন? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের বিষয়ে আমরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কারণ বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে এর জন্য প্রস্তুত। তবে কিছু নির্দিষ্ট খাত যেমন—বন্দর সুবিধা, আইটি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এখনো ঘাটতি রয়েছে। নিজেদের শিল্পকারখানা এবং এই খাতগুলোর উন্নয়ন না ঘটিয়ে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করলে আমাদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে। গ্র্যাজুয়েশনের পর আমরা মেধাস্বত্ব বা ট্রিপস সুবিধা হারাতে পারি এবং আমাদের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধাগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ইউরোপ হয়তো আর বাড়তি সময় (গ্রেস পিরিয়ড) দেবে না, আবার আমেরিকার ট্যারিফ নীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। সব মিলিয়ে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও আমরা মনে করি, এখনই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করা উচিত। আমরা যদি বারবার সময় পিছিয়ে দিই, তবে ব্যবসায়ীরা চিরাচরিত অভ্যাসেই থেকে যাবে, নতুন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেবে না। আমরা প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছি। যদি ভবিষ্যতে দেখা যায় যে আমরা কুলিয়ে উঠতে পারছি না, তখন সময় নেওয়া যাবে। এমনকি পরবর্তী সরকারও এসে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে বাড়তি সময় চাইতে পারবে। প্রশ্ন: গত সরকার যে ব্যাপক পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নিয়েছিল সেই ঋণের দায় পরিশোধে বর্তমান পরিস্থিতি কেমন এবং ঋণের চাপ সামলাতে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: আমরা ঋণের কিস্তি মোটামুটি নিয়মিত পরিশোধ করছি। সম্প্রতি আমরা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ঋণ পরিশোধ করেছি। তবে প্রতিদিনই নতুন নতুন দায় বা ঋণের বোঝা যুক্ত হচ্ছে এবং এ বিষয়ে আমরা সজাগ আছি। ভবিষ্যতে ঋণের বিষয়ে আমরা দুটি পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রথমত, ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করার চেষ্টা করছি। দ্বিতীয়ত, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা অর্জনের জন্য দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতের উন্নয়ন জরুরি। কারণ শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার না ঘটলে ঋণ শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এশিয়া পোস্ট: পরবর্তী সরকারের জন্য আপনার পরামর্শ কী থাকবে? বিশেষ করে আপনাদের শুরু করা সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে তাদের প্রতি আপনার কোনো বার্তা আছে কি? ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: পরবর্তী সরকারের প্রতি আমার প্রথম পরামর্শ হলো—কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, অর্থাৎ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব না থাকে। সবকিছু চলতে হবে পেশাদারত্ব, আইন এবং ব্যবসায়িক নীতিমালার ভিত্তিতে। দ্বিতীয়ত, আমাদের অর্থনীতি বা ব্যবসা-বাণিজ্যকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে বিশ্ব ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হবে। কারণ সামনে আমাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা ট্রেড পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্টের (টিপিএ) মতো বিষয়গুলো নিয়ে দরকষাকষি করতে হবে। তাই নীতিগুলো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখেই প্রণয়ন করা জরুরি। সর্বশেষ পরামর্শ হলো, আমরা যেসব সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছি, সেগুলো যেন অব্যাহত রাখা হয়। কারণ এই সংস্কারগুলো কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং জনগণের মঙ্গলের জন্যই করা হয়েছে। যে কোনো সরকার ক্ষমতায় এলেই পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের এই কাজগুলো করতে হতো। তাই আমার অনুরোধ থাকবে, তারা যেন এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করে। প্রয়োজনে কাজের ধরনে বা ভঙ্গিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা যেতে পারে, কিন্তু সংস্কারগুলো যেন একেবারে বাদ দেওয়া না হয়। এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
নতুন সরকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে