ড. মির্জা এম হাসান রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ও গবেষক। তিনি বর্তমানে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নেন্স অ্যান্ড পলিটিক্স ক্লাস্টারের প্রধান এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গণভোট, সংস্কার, জুলাই সনদসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি।
প্রশ্ন : কেমন হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন?
ড. মির্জা এম হাসান: সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, নির্বাচনটা হয়ে গেছে এবং আমরা যে সহিংসতার আশঙ্কা করছিলাম, তা হয়নি। এটি একটি বিশাল ব্যাপার। এটি প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশে চাইলে সহিংসতামুক্ত নির্বাচন করা সম্ভব। হয়তো এর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, কিন্তু এটি সম্ভব।
আরেকটা বিষয় হলো, নির্বাচনের ফলাফল খুব একটা আশ্চর্যজনক হয়নি। যদিও আমাদের আশঙ্কা ছিল জামায়াত জিতে যেতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে ফলাফল মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়েছে বলে মনে করি। ব্যক্তিগতভাবে আমি আরও খুশি হতাম যদি বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন না পেয়ে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত। কারণ, এখন বিশাল শক্তি নিয়ে সরকার গঠন করতে যাওয়ায় তারা সংস্কারের অনেক প্রস্তাব উপেক্ষা বা প্রতিরোধ করতে পারে। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তারা বিরোধী দলের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হতো। তবে সব মিলিয়ে, দীর্ঘ দিন পর শান্তিপূর্ণভাবে মানুষের অংশগ্রহণে এমন একটি নির্বাচন হওয়াকে আমি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখি।
প্রশ্ন : ভোটের ফলাফলকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করছেন?
ড. মির্জা এম হাসান: ভোটের ফলাফল নিয়ে আমি আগেই বলেছি, বিএনপি যদি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত, তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি খুশি হতাম। এতে সংসদে বিরোধী দলগুলো সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে সরকারের সাথে জোরালোভাবে দরকষাকষি করতে পারত। কিন্তু বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ায় সেটা কিছুটা কঠিন হয়ে গেল। বাংলাদেশের নির্বাচনি গণতন্ত্রের ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই কোনো দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখনই তারা স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো আইন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বদলে ফেলে। গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সরকার সবসময় একটা চাপে থাকত, যা আমাদের জন্য ভালো হতো।
প্রশ্ন : অন্তর্বর্তী সরকার অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব রেখে যাচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আপনি কতটা আশাবাদী?
ড. মির্জা এম হাসান: আমি খুব বেশি আশাবাদী নই। তবে ১৯৯১ বা ২০০৬-০৭ সালের পরিস্থিতির চেয়ে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। আগের পরিবর্তনগুলোতে রাজনৈতিক দল বা সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ছিল প্রধান, কিন্তু এবারই প্রথম বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তন এসেছে। কোনো নির্দিষ্ট দলের নেতৃত্বে এটি হয়নি। এ কারণেই আমরা সনদ তৈরি করতে পেরেছি এবং স্বৈরাচারবিরোধী মৌলিক জায়গাগুলোতে হাত দিতে পেরেছি। অতীতে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা থেকেই স্বৈরাচারের শুরু হয়। এবার সেই ‘প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরাচার’ যেন ফিরে না আসে, সেজন্য আমরা ভিন্ন ধরনের জবাবদিহিতা এবং প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছি। তবে আগামী কয়েক মাসে দেখার বিষয় হলো, আমরা সেই ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্য রক্ষা করতে পারব কি না, নাকি জনগণ আবারও হেরে যাবে।
প্রশ্ন : জুলাই সনদে বর্ণিত বিষয়গুলোর মধ্যে কিছু বিষয় উচ্চকক্ষ সম্পর্কিত। উচ্চকক্ষ গঠনের আগেই যদি দুদক কিংবা অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত কমিশনের প্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়ে যায়, তাহলে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা?
ড. মির্জা এম হাসান: হ্যাঁ, এটা একটা শঙ্কার বিষয় এবং সম্ভবত তারা আগেই নিয়োগগুলো দিয়ে ফেলবে। এটি একটি কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার যে, প্রক্রিয়াটি সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে না। আমার মনে হয়, নিম্নকক্ষে এ নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হবে। তবে আমার আশঙ্কা, উচ্চকক্ষ গঠনের আগেই অনেক ঘটনা ঘটে যাবে। তখন তর্ক-বিতর্ক শুধু পার্লামেন্টের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা রাজপথেও গড়াতে পারে।
প্রশ্ন : নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী হবে বলে মনে করেন?
ড. মির্জা এম হাসান: নতুন সরকারের (বিএনপির) জন্য আমি প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ দেখছি। প্রথমত, নিজেদের দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিশেষ করে চাঁদাবাজি বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, সরকার আমলাতন্ত্রকে কীভাবে সামলাবে। আমরা দেখেছি, প্রতিটি সংস্কারের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত রাজনীতি সামলাতে ব্যস্ত থাকে এবং শাসন প্রক্রিয়া আমলাদের ওপর ছেড়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত দলীয়করণে রূপ নেয়। তৃতীয়ত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমানে দেশে প্রকৃত আইনের শাসন নেই। পুলিশের কার্যক্রম এবং নিম্ন ও উচ্চ আদালত যেন দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হবে।
প্রশ্ন : জাতীয় ঐক্য আগামীতে বজায় থাকবে বলে মনে করেন কী?
ড. মির্জা এম হাসান: ঐক্যের ব্যাপারে আমার কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। ঐক্য বলতে আসলে কী বোঝায়? গণতন্ত্রে ঐক্যের অর্থ হলো, আমরা সবাই মিলে সংবিধান বা ‘রুলস অফ দ্য গেম’ মেনে চলব। আমাদের রাজনৈতিক আলোচনা সংসদে হবে, আমরা সমঝোতার মাধ্যমে চলব— এটিই হলো একটি বৃহত্তর সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করা। আমরা অসাংবিধানিক কিছু করব না। যদি একে ঐক্য বলা হয়, তবে সেটাই ঐক্য। কিন্তু মতামতের ঐক্য তো হতে পারে না। দেশ পরিচালনার বিষয়ে আমার একটি নির্দিষ্ট ফিলোসফি বা চিন্তাভাবনা থাকতে পারে, আবার আপনাদের ভিন্ন একটি মত থাকতে পারে। সেখানে ঐক্যের প্রশ্নই ওঠে না।
অনেকে রোমান্টিকভাবে ঐক্যের কথা বলেন, কিন্তু গণতন্ত্রে ঐক্য মানে সেটা নয়। গণতন্ত্র মানেই হলো আমি আপনার সঙ্গে একমত নই, তাই আমি আপনার সঙ্গে বিতর্ক করব, যুক্তি দেখাব এবং জনগণকে আমার দিকে আনার চেষ্টা করব। এখানে সংঘাত বা ‘কনফ্লিক্ট’ একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে এই সংঘাত বা আদর্শগত লড়াই একটি সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরেই হতে হবে। আগের কোনো সরকারই এই কাঠামোর মধ্যে থাকতে পারেনি; তারা সংবিধানের বাইরে গিয়ে দমন-পীড়ন চালিয়েছে। আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো, বর্তমান সরকার এমন একটি কাঠামো বজায় রাখতে পারছে কি না, যেখানে আমরা স্বাধীনভাবে বিরোধিতা করতে পারব এবং রাজনীতি করতে পারব। এটিই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
প্রশ্ন : আগামীতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা কি হওয়া উচিত?
ড. মির্জা এম হাসান: সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজের ভূমিকা বেশ দুর্বল ছিল, যার মূল কারণ দলীয়করণ। ১৯৯১ সাল থেকেই আমরা দেখছি যে, সুশীল সমাজ দুই দলে বিভক্ত হয়ে আছে, যার ফলে তারা কাজ করতে পারেনি। গত ১৮ মাসে বা অভ্যুত্থানের পরেও এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যাতে বলা যায় সুশীল সমাজ স্বাধীন হয়ে গেছে। হাতেগোনা তিন-চারটি সংগঠন ছাড়া বাকিরা— যেমন বার অ্যাসোসিয়েশন, চিকিৎসক বা শিক্ষকদের সংগঠন— অসম্ভব ক্ষমতাধর হলেও তারা দলীয়বৃত্তেই রয়ে গেছে। এখন হয়তো আওয়ামী লীগের অনুসারীরা কিছুটা আড়ালে চলে যাবেন এবং জামায়াতপন্থীরা প্রথমবারের মতো জোরালোভাবে সামনে আসবেন। কিন্তু ‘আমি এই দলের’ বা ‘ওই দলের’— এই মানসিকতা একই থাকছে। তাই স্বাধীন ভূমিকার সম্ভাবনা আমি খুব কম দেখছি, যা খুবই দুঃখজনক। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কিছু সিভিল সোসাইটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হচ্ছে। তারা সাহস করলে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানের ভীতিহীন পরিস্থিতিতে, অর্থাৎ যতদিন বিএনপি বা বর্তমান সরকার আমাদের কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে, ততোদিন আমাদের দ্রুত কিছু কাজ করে নিতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নতুন সুশীল সমাজের উত্থান ও ক্ষমতায়ন এবং সংস্কার বা রিফর্মগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন : নির্বাচনের ফলাফলের কোনো প্যাটার্ন কি লক্ষ্য করা যাচ্ছে? উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও পূর্ব এবং পশ্চিমবঙ্গে বিএনপির ভালো ফলাফল কোনো বার্তা প্রদান করে কী?
ড. মির্জা এম হাসান: বার্তা বলতে আসলে কী? অতীতের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে সবসময়ই জামায়াতের একটি প্রভাব থাকে। এর পেছনে ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে বলে শোনা যায়। দেশভাগের সময় যারা ভারত থেকে এসেছিলেন, তারা পাকিস্তান সৃষ্টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। অনেকে বলেন, তারা একাত্তরের স্বাধীনতাকে সহজভাবে নেননি। সীমান্ত এলাকায় ভারত থেকে আসা একটি বড় মুসলিম জনগোষ্ঠী বা তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ভোটার হিসেবে আছেন। সাতক্ষীরার মতো হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাতেও মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে বংশপরম্পরায় একটি রাজনৈতিক ঝোঁক কাজ করে।
তবে সামগ্রিকভাবে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রাধান্য থাকার পেছনে খুব গভীর কোনো রাজনৈতিক বা সমাজতাত্ত্বিক কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না; এটি অনেকটা কাকতালীয়ভাবে হয়ে গেছে এবং সেই ধারাবাহিকতা চলছে। বাংলাদেশে মানুষ এখনো নিজস্ব বিচার-বিবেচনায় ভোট দেয় না। পরিবার, প্রতিবেশী বা মহল্লার মতামতের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেয়। অর্থাৎ, বাংলাদেশে ভোটের ক্ষেত্রে এখনো এক ধরনের ‘গ্রুপ মোরালিটি’ বা সামষ্টিক প্রথা কাজ করে।
প্রশ্ন : জামায়াতে ইসলামীর ভোট বৃদ্ধির পেছনে কী কারণ বিদ্যমান বলে মনে করেন?
ড. মির্জা এম হাসান: এটি শুধুমাত্র একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছিল না, তাই আমাদের পুরনো বিশ্লেষণগুলো এখানে কাজে লাগছে না। আওয়ামী লীগের প্রায় ৩০% এর মতো যে সলিড ভোটব্যাংক ছিল, তার একটি অংশ বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে ভাগ হয়েছে। জামায়াতের এই উত্থান তাই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ দুটি দলকে (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) দেখার পর এবার তৃতীয় একটি দলকে সুযোগ দিতে চেয়েছে। অনেক উচ্চশিক্ষিত ও উদারমনা পেশাজীবীও এই যুক্তিতে জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে, জামায়াতকে নিয়ে নারীদের মধ্যে ভীতির কথা বলা হলেও, গ্রামীণ নারীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। বিএনপি যখন প্রচারণা চালায়, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের হইচই পূর্ণ ভাব থাকে, যা গ্রামীণ নারীরা সবসময় পছন্দ করেন না। বিপরীতে, জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এবং ভদ্রতা বজায় রেখে ঘরে ঘরে গিয়ে কাজ করেছে (যেমন: তালিম গ্রুপ)। তাদের এই ভদ্রতা ও ব্যক্তিত্ব গ্রামীণ নারীদের আকৃষ্ট করেছে, যা ঢাকা বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গাতেও কাজ করেছে। সুতরাং, জামায়াতের উত্থান ব্যাখ্যা করতে হলে এই সব বিষয়কে একত্রে বিবেচনা করতে হবে।
প্রশ্ন : এবার বেশ কয়েকজন তরুণ সংসদে যাচ্ছেন? সংসদে তাদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
ড. মির্জা এম হাসান: তরুণদের প্রধান ভূমিকা হওয়া উচিত রাজনীতির পুরোনো লিখিত ও অলিখিত নিয়মকানুন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা। তবে আমরা কেবল আশাই করতে পারি, কারণ মানসিকতা পরিবর্তন করা এত সহজ নয়। বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি—সব দলেই তরুণরা আছে, তবে তারা যে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারবে, তা নিশ্চিত নয়। তরুণদের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের যুক্তি ও নির্দেশ মেনে চলতে হবে। প্রবীণরা হয়তো তাদের বোঝাবেন যে, চাইলেই সবকিছু দ্রুত পরিবর্তন করা যায় না, ধীরে ধীরে এগোতে হয়। তাই তরুণ রাজনীতিবিদদের নিয়ে আমরা যতটা আশাবাদী, অতিরিক্ত প্রত্যাশা করলে ততটাই হতাশ হতে পারি। ফলাফলটি সম্ভবত মিশ্র হবে—কিছুটা পরিবর্তন এবং কিছুটা পুরোনো ধারা। রাজনীতিতে টিকে থাকার স্বার্থেই অনেকে পুরোনো নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এনসিপি ছাড়া অন্য দলগুলোতে নেতৃত্ব এখনো প্রবীণদের হাতেই রয়েছে। তাই বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমাদের প্রত্যাশা নির্ধারণ করা উচিত।
প্রশ্ন : নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকসহ বেশকিছু অভিযোগ উঠেছিল। নির্বাচন কমিশন কি সেগুলো যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছে কী? না দিয়ে থাকলে তার কারণ কী?
ড. মির্জা এম হাসান: নির্বাচন কমিশন তার সীমাবদ্ধতা বোঝে। যদিও তাদের কঠোর হতে বলা হয়েছিল এবং তাদের যথেষ্ট ক্ষমতাও ছিল, তবুও তারা খুব বেশি র্যাডিক্যাল হতে পারেনি। মনে রাখতে হবে, যারা কমিশন নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাদের নিজস্ব রাজনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি আছে। তারা মনে করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশি কঠোর হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তাই ঋণখেলাপি বা দ্বৈত নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলো তারা অনেক ক্ষেত্রে এড়িয়ে গেছেন, কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। কমিশন একটি ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। তবে এখন জামায়াত ও এনসিপির মতো দলগুলো এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দেখার বিষয়, আগামীতে বিরোধী দলগুলো এই চ্যালেঞ্জ কতটা এগিয়ে নেয় নাকি কোনো পর্যায়ে গিয়ে সমঝোতা করে।
প্রশ্ন : রাজনৈতিক দলগুলো কী যথাযথ ও পরিচ্ছন্ন প্রার্থী দিয়েছে? আপানার পর্যবেক্ষণ কী বলে?
ড. মির্জা এম হাসান: দলগুলো অনেক কিছুই করতে পারত। তবে আগেই বলেছি, নির্বাচন কমিশনের লোকজন আমাদের সমাজেরই অংশ এবং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই তাদের চিন্তাভাবনা। তারা মনে করে বেশি দূর এগোনোর প্রয়োজন নেই। যেমন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও খুব বেশি সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারেনি; তারাও ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। হয়তো তাদের প্রতি বার্তা ছিল যে, একটু ভারসাম্য রেখে দ্রুত নির্বাচন শেষ করতে হবে। তবে আমি আশা করি এ নিয়ে সমস্যা তৈরি হবে এবং বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জ করা হবে। এটা চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত।
প্রশ্ন : বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার পরিচালনা করবে। এতে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন কী?
ড. মির্জা এম হাসান: আমার ধারণা, আগামী দুই-তিন মাসের রাজনীতি হবে এই সংস্কার নিয়েই। জামায়াত, এনসিপি এবং প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ সংস্কার চাইবে এবং প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে। সাধারণ মানুষের ক্ষমতা বিশাল। আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় আমার এখতিয়ার কী, আমি বলব আমি ওই পাঁচ কোটি ভোটারের একজন। এর আইনি বৈধতা নিয়ে হয়তো তর্ক হতে পারে, কিন্তু আসল শক্তি হলো রাজনীতি ও নৈতিকতা। বিএনপি এবং তারেক রহমান প্রকাশ্যে সংস্কারের পক্ষে বা জনগণের ম্যান্ডেটের পক্ষে কথা বলেছেন। এই প্রতিশ্রুতি তারা এখন ফিরিয়ে নিতে পারবেন না। এখানে বৈধতা, নৈতিকতা এবং রাজনীতির প্রশ্ন জড়িত। কেবল আইনের মারপ্যাঁচ দেখিয়ে এগুলো এড়ানো যাবে না। যদি জনগণ, জামায়াত এবং এনসিপি— নিজেদের স্বার্থেই হোক বা গণতন্ত্রের জন্য— এই লড়াইটা চালিয়ে যায়, তবে বিএনপি সরকার সব না হলেও অন্তত বড় অংশের সংস্কার মেনে নিতে বাধ্য হবে। যদি আমরা সংস্কারগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে না পারি, তবে এই অভ্যুত্থান ও সনদ সবকিছুই ব্যর্থ হবে। এখানে হেরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই; আমাদের লড়াই করতেই হবে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরো এগিয়ে নিতে আপনার পরামর্শগুলো কী হবে?
ড. মির্জা এম হাসান: বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শুধু টিকিয়ে রাখা নয়, বরং আরও উজ্জীবিত ও সুদৃঢ় করতে হলে আমাদের বর্তমানের পরোক্ষ বা নির্বাচনি গণতন্ত্রের বাইরে চিন্তা করতে হবে। বর্তমানে আমরা জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে শাসিত হই। কিন্তু আমি চাই প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র, যেখানে নাগরিক হিসেবে আমি সরাসরি নিজেকে উপস্থাপন করতে পারব। বিশ্বের বহু দেশে এর চর্চা আছে। এর জন্য সাংবিধানিক স্বীকৃতি বা ম্যান্ডেট প্রয়োজন, যাতে আমি রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে থেকে সরাসরি সরকার ও আমলাতন্ত্রের জবাবদিহি চাইতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়ার্ড সভা বা উন্মুক্ত বাজেট ব্যবস্থা আছে, কিন্তু সেখানে আমরা শুধু কথা বলতে পারি।
প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের জন্য আমাদের শাসনব্যবস্থার ভেতরে ঢুকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার এবং প্রয়োজনে ভুল সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। পুলিশ কমিশন বা দুদকের সংস্কার প্রস্তাবে নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথা কিছুটা বলা হয়েছিল, কিন্তু আমলাতন্ত্রের চাপে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। নির্বাচনি গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে আমাদের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের উপাদানগুলো যুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত এটা পছন্দ করে না, তাই গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে প্রচার চালাতে হবে যেন জনগণ এ সম্পর্কে সচেতন হয়।
মন্তব্য করুন





