ঢাকা, বাংলাদেশ ||
সোমবার
০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ||
আলজাজিরার কলাম / ইরানের ওপর মার্কিন হামলার কী প্রভাব পড়বে
মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের নিয়েই শান্তি পর্ষদ গড়ছেন ট্রাম্প
আলজাজিরার কলাম / যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা: কূটনীতিতেই বাজি কাতারের
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা: কূটনীতিতেই বাজি কাতারের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সাম্প্রতিক সময়ে আরও অস্থির পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি সামরিক হামলা, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং তেহরানের প্রতিক্রিয়া, সব মিলিয়ে দেশদুটির মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি এখন আর তাত্ত্বিক ধারণামাত্র নয়, বরং বাস্তব পরিস্থিতি। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সংঘাতের প্রভাব যেসব উপসাগরীয় রাষ্ট্রের ওপর পড়বে, বিষয়টি নিয়ে তাদেরও যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্য মধ্যস্থতাকারী পক্ষ হিসেবে কাতারের কূটনৈতিক ভূমিকা বোঝা উচিত। কেননা, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা এখানে নিছক নিরপেক্ষতা নয়, বরং উত্তেজনা বাড়লে উপসাগরীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের আশঙ্কা তা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রয়াস। আলজাজিরার এক মন্তব্য প্রতিবেদনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য সংঘাত ও তা নিয়ন্ত্রণে কাতারের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর আগেও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যখনই কোনো সংঘাত বা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। উপসাগরীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা, জ্বালানি তেলের মজুত এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা নির্ভরতার কারণে সীমিত সংঘাতও দ্রুত আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রাখে। সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানির পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠেছে। ওই সময়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিক্ষোভকারীদের সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমন বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ধারাবাহিকভাবে উত্তেজনা প্রশমন, মধ্যস্থতা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।  তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পের্কের ভিত্তিতে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে কাতার। দেশটি যোগাযোগের এমন একটি চ্যানেল সক্রিয় রেখেছে, যাতে করে আলোচনার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়লেও দুই পক্ষকে পরোক্ষভাবে কথা বলার সুযোগ দেয়। তেহরান ও ওয়াশিংটনের সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কাতারের এমন ভূমিকার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যখন তারা দেশদুটির মধ্যে বন্দি বিনিময় ও জব্দ হওয়া ইরানি তহবিল মুক্ত করতে সহায়তা করে। ওই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন হয়েছিল কয়েক মাসের পরোক্ষ আলোচনা এবং উভয়পক্ষের রাজনৈতিক আশ্বাস। যদিও সেই সমঝোতা বৃহত্তর সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়নি, তবে অন্তত এটুকু প্রমাণ হয়েছে, যে চরম বৈরিতার মধ্যেও কূটনীতি সম্ভব হতে পারে। কাতার দেখিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক ইস্যু কিংবা সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টেকসইভাবে সামাল দেওয়া যায় না। বরং সামরিক পদক্ষেপের বদলে আলোচনাই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও উত্তেজনা প্রতিরোধের কার্যকর পথ হতে পারে। গত বছরের জুনে, যখন ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায় এবং জবাবে ইরান কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে, তখনও কাতারের মধ্যস্থতাকারী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন দেখা যায়। ওই পরিস্থিতিতে দোহা দ্রুত উভয়পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সংকট নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে কাতার, যা মোটামুটি কার্যকর ছিল। বিশ্লেষকরা সবসময়ই বলে আসছেন, ইরানে সরকার উৎখাতের জন্য কোনো সামরিক সংঘাত হলে তার প্রভাব দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশেও ছড়িয়ে পড়বে। প্রাথমিকভাবে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এ সংঘাত তাৎক্ষণিক শরণার্থী স্রোত এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। উপসাগরীয় অঞ্চল ছাড়াও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এরই মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েল-হামাসের হামলার পর ইরান সমর্থিত শক্তিগুলোর নেটওয়ার্ক উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়ে। ফলে কিছু অঞ্চলে তেহরানের প্রভাব কমেছে। একই সঙ্গে গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলা দেশদুটির মধ্যে সংযমের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে।  এ ক্ষেত্রে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল হলেই যে স্থিতিশীলতা আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কেননা, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করাই অগ্রাধিকার পাবে। এই মূল্যায়ন শুধু কাতারের নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ও ওমানের অবস্থানের সঙ্গেও কাতারের দৃষ্টিভঙ্গির মিল পাওয়া যায়। দেশগুলোও আলোচনা মাধ্যমে তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর প্রতি জোরারোপ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনকে সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি অবগত করার ক্ষেত্রে তাদের প্রচেষ্টা বৃহত্তর আঞ্চলিক মনোভাবেরই বহিপ্রকাশ। অতীতে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন থাকলেও বর্তমান মৈত্রী ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করার মতো, বলছেন বিশ্লেষকরা। চলমান পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের বিবেচনা, দোহা চায়, যোগাযোগের পথ খোলা রেখে সমঝোতা সহজ করা এবং চরমপন্থি কৌশলকে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে ভুল হিসেবের ঝুঁকি কমাতে। যদিও এ ধরনের উদ্যোগ দ্রুত ও নাটকীয় সাফল্য এনে দেয় না। তবে এমন নিরপেক্ষ উদ্যোগের অভাব সংঘাতকে উসকে দিয়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। যদিও এ ধরনের উদ্যোগে সচরাচর প্রতিরোধমূলক কৌশলের স্পষ্টতা বা সামরিক পদক্ষেপের উচ্ছ্বাস দেখা যায় না, তা সত্ত্বেও কাতারের মতো দেশগুলোর নিরপেক্ষ এ প্রচেষ্টা বৃহত্তর সংঘাত এড়িয়ে শান্তি ও আলোচনার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। লেখক : সেন্টার ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যানিটেরিয়ান স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক আলজাজিরার মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত
ইসরায়েলের যে যুদ্ধের খবর সামনে আসছে না
আরও