ট্রাম্প প্রশাসন এক বছর আগে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জাতিসংঘ এবং এর সর্বজনীন মানবাধিকার সমুন্নত রাখার প্রচেষ্টাকে কঠোরভাবে অবমূল্যায়নে করে আসছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন নিজেকে আজীবন চেয়ারম্যান করে ‘বোর্ড অব পিস’ তথা ‘শান্তি পর্ষদ’ নামে নতুন একটি সংস্থা গঠন করতে চাচ্ছেন। এতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে অনেক ‘দুর্বৃত্ত’ নেতা ও সরকারের প্রতিনিধি রয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার পুনরাবৃত্তি রোধে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি জাতিসংঘের স্বায়ত্তশাসনের প্রতি হুমকির বিষয়ে সর্বদা সতর্ক থাকলেও সংস্থাটির সঙ্গে সব সময় ‘প্রেম-ঘৃণার’ সম্পর্ক রেখেছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ঘৃণার ওপর জোর দিয়ে সংস্থাটিকে ‘আমেরিকা বিরোধী’ ও ‘শত্রুতাপূর্ণ এজেন্ডা’ বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখছে।
ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের কয়েক ডজন ‘নিরাপত্তা কর্মসূচি’ উপেক্ষা ও তহবিল বঞ্চিত করেছে। এমনকি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে প্রদেয় অনুদানের বেশিরভাগ অংশও আটকে রেখেছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জলবায়ু সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের পাশাপাশি সশস্ত্র সংঘাত ও সংকটাপন্ন অঞ্চলে নারীদের সুরক্ষা দেওয়া জনসংখ্যা তহবিলকে অর্থায়ন করাও বন্ধ করে দিয়েছে।
মার্কিন সমঝোতাকারীরা জাতিসংঘের আলোচনায় এর প্রস্তাব ও বিবৃতি থেকে নির্বাচিত মানবাধিকারের পরিভাষা বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে ট্রাম্পের আদর্শিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়েছেন। জাতিসংঘের কূটনীতিকদের মতে, এই তালিকায় ‘লিঙ্গ’, ‘বৈচিত্র্য’ ও ‘জলবায়ু’র এর মতো শব্দ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এগুলোকে রাজনৈতিকভাবে সঠিক বলে মনে করে।
ভেটো ক্ষমতার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তার আদর্শিক প্রচারে কিছুটা সফল হলেও সাধারণ পরিষদে ততোটা সফল হয়নি। কারণ, সেখানে ১৯৩ ভোটার সদস্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র মাত্র একটি সদস্য রাষ্ট্র এবং কোনো ভেটো নেই।
কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদকে ট্রাম্পের ইচ্ছে মতো রূপ দিতে তার প্রশাসন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। শান্তি পর্ষদের প্রস্তাবিত সনদ অনুযায়ী, এটি একটি ‘আন্তর্জাতিক সংস্থা- যা স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি, নির্ভরযোগ্য আইনের শাসন পুনরুদ্ধার এবং সংঘাতপূর্ণ বা হুমকির সম্মুখীন এলাকায় স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে চায়’। কিন্তু সনদে মানবাধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া সনদে স্পষ্ট করা আছে- বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে ‘সমাধান বা অন্যান্য নির্দেশনা গ্রহণে’ ট্রাম্প যেগুলো উপযুক্ত মনে করেন; তার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব থাকবে।
ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদের স্থায়ী সদস্য হতে এক বিলিয়ন ডলার ফি প্রদানের বিষয়টি বিচার করলে এটাকে এক ধরনের ‘খেলার জন্য অর্থ প্রদানের’ বৈশ্বিক ক্লাব মনে হয়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাইডলাইনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন- সংস্থাটি দুর্ভোগ, ঘৃণা এবং রক্তপাত বন্ধের বিষয় অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু খুব অল্প সংখ্যক বিরোধী কণ্ঠস্বরের বিপরীতে বেশ কয়েকজন কুখ্যাত মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী এবং যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত নেতা থাকায় সংস্থাটি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দেবে বলে মনে করা কঠিন।
সংস্থাটিতে যোগদানে ট্রাম্প যাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন- তাদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রয়েছেন। এ ছাড়া ভয়াবহ মানবাধিকার ভঙ্গের রেকর্ড থাকা চীন, বেলারুশ ও কাজাখস্তানের নেতাদের পর্যন্ত ট্রাম্প আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কেবল হাঙ্গেরি ও বুলগেরিয়া এতে যোগদানে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে হাঙ্গেরির অতি-ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের সমর্থক।
অন্যদিকে ট্রাম্পের এই বোর্ডে যোগদানের প্রস্তাব যারা প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাদের মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ রয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ফরাসি মদ ও শ্যাম্পেইনের ওপর উল্লেখযোগ্য শুল্ক বৃদ্ধির হুমকি দিয়েছেন।
ট্রাম্প শান্তি পর্ষদের স্থায়ী সদস্য হতে কানাডাকেও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের দাভোসে দেওয়া কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্যের পর প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। ওই বক্তব্যে ছোট দেশগুলোর বিরুদ্ধে বৃহৎ শক্তির অর্থনৈতিক বলপ্রয়োগের তীব্র সমালোচনা করে কার্নি বলেন, জাতিসংঘ ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থা হুমকির মুখে রয়েছে। মধ্যম শক্তিগুলোকে একত্রিত হয়ে বৃহৎ শক্তির দাঙ্গা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানান কার্নি।
ট্রাম্পের এই শান্তি পর্ষদের উদ্দেশ্য ছিল মূলত গাজার অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন তত্ত্বাবধান করা। গাজায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণ ও ধ্বংসজ্ঞের ফলে অন্তত ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন; যার সঙ্গে আমেরিকাও জড়িত ছিল। অথচ, শান্তি পর্ষদের সনদে গাজার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
ট্রাম্পকে এক বিলিয়ন ডলারের চেক দেওয়ার পরিবর্তে সরকারগুলোর উচিত বিশ্বব্যাপী আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইন বজায় রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষার জন্য একসঙ্গে কাজ করা। আইসিসির বিচারক ও প্রসিকিউটর, জাতিসংঘের বিশেষ দূত ও ফিলিস্তিনি মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির ওপর ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার মতো অন্যায্য পদক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বন করা উচিত।
এ ছাড়া গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধরত সকল পক্ষের গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের জবাবদিহিতার জন্য তাদের চাপ দেওয়া উচিত।
এর চেয়ে কম কিছু ট্রাম্পকে একটি বিপজ্জনক বিজয় এনে দেবে এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে পাশে সরিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। মানবাধিকার সমুন্নত রাখাসহ জাতিসংঘের নিজস্ব সমস্যা রয়েছে। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের ক্লাব দিয়ে জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করার চেয়ে সংস্থাটিকে শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরিচালক
আলজাজিরার মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত
মন্তব্য করুন


