ঢাকা, বাংলাদেশ ||
সোমবার
০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ||

আলজাজিরার কলাম

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা: কূটনীতিতেই বাজি কাতারের

সুলতান আল-খুলাইফি

  ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:৫৩
তেহরানের প্রসিডেন্ট প্রাসাদে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির সঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান (বাঁয়ে)। ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সাম্প্রতিক সময়ে আরও অস্থির পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি সামরিক হামলা, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং তেহরানের প্রতিক্রিয়া, সব মিলিয়ে দেশদুটির মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি এখন আর তাত্ত্বিক ধারণামাত্র নয়, বরং বাস্তব পরিস্থিতি। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সংঘাতের প্রভাব যেসব উপসাগরীয় রাষ্ট্রের ওপর পড়বে, বিষয়টি নিয়ে তাদেরও যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে।

পরিবর্তন অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

এ প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্য মধ্যস্থতাকারী পক্ষ হিসেবে কাতারের কূটনৈতিক ভূমিকা বোঝা উচিত। কেননা, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা এখানে নিছক নিরপেক্ষতা নয়, বরং উত্তেজনা বাড়লে উপসাগরীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের আশঙ্কা তা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রয়াস। আলজাজিরার এক মন্তব্য প্রতিবেদনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য সংঘাত ও তা নিয়ন্ত্রণে কাতারের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এর আগেও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যখনই কোনো সংঘাত বা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। উপসাগরীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা, জ্বালানি তেলের মজুত এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা নির্ভরতার কারণে সীমিত সংঘাতও দ্রুত আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রাখে।

সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানির পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠেছে। ওই সময়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিক্ষোভকারীদের সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমন বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ধারাবাহিকভাবে উত্তেজনা প্রশমন, মধ্যস্থতা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।

তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পের্কের ভিত্তিতে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে কাতার। দেশটি যোগাযোগের এমন একটি চ্যানেল সক্রিয় রেখেছে, যাতে করে আলোচনার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়লেও দুই পক্ষকে পরোক্ষভাবে কথা বলার সুযোগ দেয়।

তেহরান ও ওয়াশিংটনের সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কাতারের এমন ভূমিকার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যখন তারা দেশদুটির মধ্যে বন্দি বিনিময় ও জব্দ হওয়া ইরানি তহবিল মুক্ত করতে সহায়তা করে। ওই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন হয়েছিল কয়েক মাসের পরোক্ষ আলোচনা এবং উভয়পক্ষের রাজনৈতিক আশ্বাস।

যদিও সেই সমঝোতা বৃহত্তর সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়নি, তবে অন্তত এটুকু প্রমাণ হয়েছে, যে চরম বৈরিতার মধ্যেও কূটনীতি সম্ভব হতে পারে। কাতার দেখিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক ইস্যু কিংবা সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টেকসইভাবে সামাল দেওয়া যায় না। বরং সামরিক পদক্ষেপের বদলে আলোচনাই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও উত্তেজনা প্রতিরোধের কার্যকর পথ হতে পারে।

গত বছরের জুনে, যখন ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায় এবং জবাবে ইরান কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে, তখনও কাতারের মধ্যস্থতাকারী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন দেখা যায়। ওই পরিস্থিতিতে দোহা দ্রুত উভয়পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সংকট নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে কাতার, যা মোটামুটি কার্যকর ছিল।

বিশ্লেষকরা সবসময়ই বলে আসছেন, ইরানে সরকার উৎখাতের জন্য কোনো সামরিক সংঘাত হলে তার প্রভাব দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশেও ছড়িয়ে পড়বে। প্রাথমিকভাবে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এ সংঘাত তাৎক্ষণিক শরণার্থী স্রোত এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। উপসাগরীয় অঞ্চল ছাড়াও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এরই মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েল-হামাসের হামলার পর ইরান সমর্থিত শক্তিগুলোর নেটওয়ার্ক উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়ে। ফলে কিছু অঞ্চলে তেহরানের প্রভাব কমেছে। একই সঙ্গে গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলা দেশদুটির মধ্যে সংযমের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল হলেই যে স্থিতিশীলতা আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কেননা, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করাই অগ্রাধিকার পাবে। এই মূল্যায়ন শুধু কাতারের নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ও ওমানের অবস্থানের সঙ্গেও কাতারের দৃষ্টিভঙ্গির মিল পাওয়া যায়। দেশগুলোও আলোচনা মাধ্যমে তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর প্রতি জোরারোপ করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনকে সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি অবগত করার ক্ষেত্রে তাদের প্রচেষ্টা বৃহত্তর আঞ্চলিক মনোভাবেরই বহিপ্রকাশ। অতীতে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন থাকলেও বর্তমান মৈত্রী ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করার মতো, বলছেন বিশ্লেষকরা।

চলমান পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের বিবেচনা, দোহা চায়, যোগাযোগের পথ খোলা রেখে সমঝোতা সহজ করা এবং চরমপন্থি কৌশলকে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে ভুল হিসেবের ঝুঁকি কমাতে।

যদিও এ ধরনের উদ্যোগ দ্রুত ও নাটকীয় সাফল্য এনে দেয় না। তবে এমন নিরপেক্ষ উদ্যোগের অভাব সংঘাতকে উসকে দিয়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। যদিও এ ধরনের উদ্যোগে সচরাচর প্রতিরোধমূলক কৌশলের স্পষ্টতা বা সামরিক পদক্ষেপের উচ্ছ্বাস দেখা যায় না, তা সত্ত্বেও কাতারের মতো দেশগুলোর নিরপেক্ষ এ প্রচেষ্টা বৃহত্তর সংঘাত এড়িয়ে শান্তি ও আলোচনার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

লেখক : সেন্টার ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যানিটেরিয়ান স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক

আলজাজিরার মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত

মন্তব্য করুন

আলজাজিরার কলাম / ইরানের ওপর মার্কিন হামলার কী প্রভাব পড়বে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা দুই দেশকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সংখ্যা ও পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখন যদি যুদ্ধ লাগে তাহলে তা ইরান ও তার আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। এ ধরনের যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ও বিশ্বকে এর মূল্য চুকাতে হবে। ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর সাম্প্রতিক দমন-পীড়নের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে অপসারণের সময় এসেছে। এরপর মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ বিভিন্ন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন থাড ও প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে। বিপুল সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর পর ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের পরবর্তী হামলা হবে জুনে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন আক্রমণের চেয়েও ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, একটি সফল চুক্তির জন্য ইরানকে তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা কমাতে হবে। একইসঙ্গে আঞ্চলিক প্রভাবও বৃদ্ধি করা যাবে না এবং হিজবুল্লাহ-হুতিদের সহায়তা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের দাবি ইরানের অবিশ্বাসের মাত্রা বৃদ্ধি করবে এবং চুক্তির সম্পাদনের বিষয়টি অসম্ভব করে তুলবে। ইরানি সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি কমিশনের সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি স্পষ্ট করে বলেছেন, বেসামরিক পারমাণবিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি ইরান কখনো ত্যাগ করবে না।  আলজাজিরার মতে এখনও দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়নি। তবে ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত এমন সব দাবি করছে, যার মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের শঙ্কা আছে। এ ছাড়া দেশটিতে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বারবার বলছে ট্রাম্প প্রশাসন ও তেল আবিবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ কারণে যদি আরেকবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করে, তাহলে দেশটি কোনো রাখঢাক না রেখেই সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে পাল্টা হামলা চালাবে। মার্কিন হামলার ভয়াবহতা অনুসারে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে ইরান। এর ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, ইরান  ও বিশ্বব্যাপী একটি গুরুতর সংকট সৃষ্টি হবে।  ট্রাম্প এবার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালাতে চান। তিনি বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা করবেন। বিশেষ করে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ঘাঁটি, বাসিজ ইউনিট, বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনী ও থানাগুলোতে হামলা চালানো হবে। কারণ, তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানকে বিপজ্জনক পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তখন ইরানে ক্ষমতা একীভূতকরণ বা সামরিক শাসন জারি হতে পারে। অথবা আইআরজিসি সম্পূর্ণ ক্ষমতা দখল করবে বা অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাড়তে পারে। এ ছাড়া গত বছরের মতো ইরানিরা হামলার পর দেশটির শাসকদের প্রতি আরও অনুগত হবে। কারণ তারা ইরানকে সিরিয়া ও লিবিয়ার মতো ধ্বংস হতে দিতে চায় না। এ দেশটিতে বিশ্বাসযোগ্য মধ্যপন্থি বিরোধী দল নেই তাই ইসলামপন্থি সরকারের বিকল্প গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া ইরানের মধ্যে শক্তিশালী আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি রয়েছে। এসব কারণে ইরানকে দুর্বল করা সহজ হবে না বা দেশটির শাসন পদ্ধতিরও পরিবর্তন হবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বকে হত্যা করতে সক্ষম হয় তাহলে উত্তরাধিকার সংকট তৈরি হবে। এ ছাড়া শাসনব্যবস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক-নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। আইআরজিসির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে সামরিক-প্রধান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। ইরানকে ভূরাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গৃহযুদ্ধ শুরুর চেষ্টাও করতে পারে। গত মাসে টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজের মতো কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ইরানি বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।  তবে যুক্তরাষ্ট্রের এসব উত্তেজনাকর বক্তব্য এবং ইসলামী  শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন প্রচেষ্টার কারণে ইরান বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করেছে। একইসঙ্গে তারা সমঝোতা ও সংঘর্ষের ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাও করতে চায়, আবার হামলা হলে কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর। এ বিষয়ে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, ইরানের ওপর যে কোনো সামরিক আক্রমণ ‘আঞ্চলিক যুদ্ধ’ সৃষ্টি করবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও সমগ্র বিশ্ব একটি সংকটের মধ্যে পড়বে। কারণ, হামলা হলে ইরান প্রতিশোধ নেবে। তখন মার্কিন মিত্র ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘর্ষে লিপ্ত হতে বাধ্য হবে। তখন এ অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মূলধন পাচার হতে পারে। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো হতে ইউরোপে শরণার্থী এবং অভিবাসীদের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া  ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বা উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে আক্রমণ করে, তাহলে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাবে। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং বিভিন্ন দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়বে। এসব কারণে অভিবাসন বাড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যে কোনো মার্কিন সামরিক হামলা কেবল ইরানের জন্যই নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ, একবার সংঘাত শুরু হলে, তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে। তখন অপ্রত্যাশিতভাবে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে যাবে। লেখক : আয়ারল্যান্ডের মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি স্কলার।
ইরানের ওপর মার্কিন হামলার কী প্রভাব পড়বে
মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের নিয়েই শান্তি পর্ষদ গড়ছেন ট্রাম্প
ট্রাম্প প্রশাসন এক বছর আগে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জাতিসংঘ এবং এর সর্বজনীন মানবাধিকার সমুন্নত রাখার প্রচেষ্টাকে কঠোরভাবে অবমূল্যায়নে করে আসছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন নিজেকে আজীবন চেয়ারম্যান করে ‘বোর্ড অব পিস’ তথা ‘শান্তি পর্ষদ’ নামে নতুন একটি সংস্থা গঠন করতে চাচ্ছেন। এতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে অনেক ‘দুর্বৃত্ত’ নেতা ও সরকারের প্রতিনিধি রয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার পুনরাবৃত্তি রোধে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি জাতিসংঘের স্বায়ত্তশাসনের প্রতি হুমকির বিষয়ে সর্বদা সতর্ক থাকলেও সংস্থাটির সঙ্গে সব সময় ‘প্রেম-ঘৃণার’ সম্পর্ক রেখেছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ঘৃণার ওপর জোর দিয়ে সংস্থাটিকে ‘আমেরিকা বিরোধী’ ও ‘শত্রুতাপূর্ণ এজেন্ডা’ বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের কয়েক ডজন ‘নিরাপত্তা কর্মসূচি’ উপেক্ষা ও তহবিল বঞ্চিত করেছে। এমনকি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে প্রদেয় অনুদানের বেশিরভাগ অংশও আটকে রেখেছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জলবায়ু সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের পাশাপাশি সশস্ত্র সংঘাত ও সংকটাপন্ন অঞ্চলে নারীদের সুরক্ষা দেওয়া জনসংখ্যা তহবিলকে অর্থায়ন করাও বন্ধ করে দিয়েছে। মার্কিন সমঝোতাকারীরা জাতিসংঘের আলোচনায় এর প্রস্তাব ও বিবৃতি থেকে নির্বাচিত মানবাধিকারের পরিভাষা বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে ট্রাম্পের আদর্শিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়েছেন। জাতিসংঘের কূটনীতিকদের মতে, এই তালিকায় ‘লিঙ্গ’, ‘বৈচিত্র্য’ ও ‘জলবায়ু’র এর মতো শব্দ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এগুলোকে রাজনৈতিকভাবে সঠিক বলে মনে করে।  ভেটো ক্ষমতার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তার আদর্শিক প্রচারে কিছুটা সফল হলেও সাধারণ পরিষদে ততোটা সফল হয়নি। কারণ, সেখানে ১৯৩ ভোটার সদস্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র মাত্র একটি সদস্য রাষ্ট্র এবং কোনো ভেটো নেই। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদকে ট্রাম্পের ইচ্ছে মতো রূপ দিতে তার প্রশাসন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। শান্তি পর্ষদের প্রস্তাবিত সনদ অনুযায়ী, এটি একটি ‘আন্তর্জাতিক সংস্থা- যা স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি, নির্ভরযোগ্য আইনের শাসন পুনরুদ্ধার এবং সংঘাতপূর্ণ বা হুমকির সম্মুখীন এলাকায় স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে চায়’। কিন্তু সনদে মানবাধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া সনদে স্পষ্ট করা আছে- বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে ‘সমাধান বা অন্যান্য নির্দেশনা গ্রহণে’ ট্রাম্প যেগুলো উপযুক্ত মনে করেন; তার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব থাকবে। ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদের স্থায়ী সদস্য হতে এক বিলিয়ন ডলার ফি প্রদানের বিষয়টি বিচার করলে এটাকে এক ধরনের ‘খেলার জন্য অর্থ প্রদানের’ বৈশ্বিক ক্লাব মনে হয়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাইডলাইনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন- সংস্থাটি দুর্ভোগ, ঘৃণা এবং রক্তপাত বন্ধের বিষয় অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু খুব অল্প সংখ্যক বিরোধী কণ্ঠস্বরের বিপরীতে বেশ কয়েকজন কুখ্যাত মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী এবং যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত নেতা থাকায় সংস্থাটি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দেবে বলে মনে করা কঠিন। সংস্থাটিতে যোগদানে ট্রাম্প যাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন- তাদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রয়েছেন। এ ছাড়া ভয়াবহ মানবাধিকার ভঙ্গের রেকর্ড থাকা চীন, বেলারুশ ও কাজাখস্তানের নেতাদের পর্যন্ত ট্রাম্প আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কেবল হাঙ্গেরি ও বুলগেরিয়া এতে যোগদানে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে হাঙ্গেরির অতি-ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের সমর্থক।  অন্যদিকে ট্রাম্পের এই বোর্ডে যোগদানের প্রস্তাব যারা প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাদের মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ রয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ফরাসি মদ ও শ্যাম্পেইনের ওপর উল্লেখযোগ্য শুল্ক বৃদ্ধির হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প শান্তি পর্ষদের স্থায়ী সদস্য হতে কানাডাকেও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের দাভোসে দেওয়া কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্যের পর প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। ওই বক্তব্যে ছোট দেশগুলোর বিরুদ্ধে বৃহৎ শক্তির অর্থনৈতিক বলপ্রয়োগের তীব্র সমালোচনা করে কার্নি বলেন, জাতিসংঘ ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থা হুমকির মুখে রয়েছে। মধ্যম শক্তিগুলোকে একত্রিত হয়ে বৃহৎ শক্তির দাঙ্গা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানান কার্নি। ট্রাম্পের এই শান্তি পর্ষদের উদ্দেশ্য ছিল মূলত গাজার অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন তত্ত্বাবধান করা। গাজায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণ ও ধ্বংসজ্ঞের ফলে অন্তত ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন; যার সঙ্গে আমেরিকাও জড়িত ছিল। অথচ, শান্তি পর্ষদের সনদে গাজার কথা উল্লেখ করা হয়নি।  ট্রাম্পকে এক বিলিয়ন ডলারের চেক দেওয়ার পরিবর্তে সরকারগুলোর উচিত বিশ্বব্যাপী আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইন বজায় রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষার জন্য একসঙ্গে কাজ করা। আইসিসির বিচারক ও প্রসিকিউটর, জাতিসংঘের বিশেষ দূত ও ফিলিস্তিনি মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির ওপর ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার মতো অন্যায্য পদক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বন করা উচিত। এ ছাড়া গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধরত সকল পক্ষের গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের জবাবদিহিতার জন্য তাদের চাপ দেওয়া উচিত। এর চেয়ে কম কিছু ট্রাম্পকে একটি বিপজ্জনক বিজয় এনে দেবে এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে পাশে সরিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। মানবাধিকার সমুন্নত রাখাসহ জাতিসংঘের নিজস্ব সমস্যা রয়েছে। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের ক্লাব দিয়ে জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করার চেয়ে সংস্থাটিকে শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। লেখক : জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরিচালক আলজাজিরার মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত
মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের নিয়েই শান্তি পর্ষদ গড়ছেন ট্রাম্প
ইসরায়েলের যে যুদ্ধের খবর সামনে আসছে না
যুক্তরাষ্ট্র যখন তথাকথিত যুদ্ধবিরতির নাটক মঞ্চস্থ করে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই পশ্চিম তীরে খুব নীরবে আরেকটি যুদ্ধ চলছে। গত দুই বছরে পশ্চিম তীরে ‘ফিলিস্তিনি সন্ত্রাস দমন’-এর নামে ইসরায়েল তার তথাকথিত ‘কাউন্টার ইনসার্জেন্সি অপারেশন’ ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। ‘কাউন্টার ইনসার্জেন্সি’ শব্দটি ব্যবহার মোটেও কাকতালীয় নয়। সামরিক পরিভাষাকে ইসরায়েল সচেতনভাবেই নিজের আসল উদ্দেশ্য আড়াল ও বাস্তবতাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে ব্যবহার করে। অপারেশন আয়রন ওয়াল, অপারেশন সামার ক্যাম্পস, অপারেশন ফাইভ স্টোনস এবং সর্বশেষ আল-খালিলে (হেবরন) চালানো তথাকথিত ‘কাউন্টার টেররিজম’ অভিযান— সবকটিকেই অস্থায়ী, লক্ষ্যভিত্তিক ও প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এই সামরিক আগ্রাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, অবকাঠামো ধ্বংস, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া। আর ক্রমবর্ধমান সড়ক অবরোধ ও চেকপোস্ট। এসবের লক্ষ্য একটাই— পশ্চিম তীরকে ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পরিণত করা, যেখানে ফিলিস্তিনিদের জীবন অসম্ভব হয়ে উঠবে। ঠিক যেমনটি গাজায় ঘটানো হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র পশ্চিম তীর ২০২৫ সালে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আগ্রাসনের ফলে ১৯৬৭ সালের পর সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির মুখে পড়েছেন ফিলিস্তিনিরা। প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে সহিংসভাবে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি সেনারা জেনিন ও তুলকারেমের শরণার্থী শিবির ধ্বংস করে দিয়েছে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের ফিরে যাওয়ার অধিকার অস্বীকার করেছে। কার্যত এই দুই শিবিরকে তারা উত্তরাঞ্চলে নিজেদের সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করেছে। একই সঙ্গে সড়ক, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও বিদ্যুতের লাইনসহ প্রায় সব অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। শুধু জেনিন শহরেই অন্তত ৭০ শতাংশ সড়ক বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জেনিন ও তুলকারেমে পানির পাইপলাইন ও পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। যার ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এখানকার হাজার হাজার ফিলিস্তিনি পরিবার পানি ও বিদ্যুতের সুবিধা হারিয়েছে। আজও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো এমন সব দুর্গম এলাকায় বসবাস করছে, যেখানে প্রায় কোনো বেসামরিক অবকাঠামো নেই। একই সঙ্গে ইসরায়েল তার সহিংসতার ভৌগোলিক পরিসরও বাড়িয়েছে। এখন নিয়মিতভাবে পশ্চিম তীরের মধ্যাঞ্চলের শহরগুলো— রামাল্লাহ ও আরিহা (জেরিকো) এবং দক্ষিণের আল-খালিল (হেবরন) ও বেথলেহেমে অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অবরুদ্ধ ও ভয় দেখানো হয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই হত্যা করা হয়— আর এসবই ঘটে সম্পূর্ণ দায়মুক্তির সঙ্গে। এই সপ্তাহে ‘আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার’ অজুহাতে আল-খালিল শহরে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। পুরো শহর কার্যত লকডাউনের মধ্যে রাখা হয়েছে। রাস্তায় ট্যাংক টহল দিচ্ছে। পুরুষ ও কিশোরদের আটক করে মাঠ পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং নির্মম পরিস্থিতিতে আটকে রাখা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর পিছু পিছু বসতি স্থাপনকারীরা ইসরায়েলি সহিংসতা শুধু সেনা অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেনাবাহিনী যেখানে যায়, সেখানেই বসতি স্থাপনকারীরা পিছু নেয়। বসতি-ঔপনিবেশিক মানসিকতায় সেনাবাহিনী পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে। যাতে বসতি স্থাপনকারী মিলিশিয়ারা ফিলিস্তিনি মানুষ ও সম্পত্তির ওপর হামলা চালাতে পারে এবং ভূমি দখল আরও এগিয়ে যায়। গত দুই বছরে পশ্চিম তীরে অবৈধভাবে বসবাসকারী ইসরায়েলিদের হাতে মার্কিন এম-১৬ রাইফেল থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক পিস্তল ও ড্রোনসহ সামরিক মানের অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। আর তারা সেগুলো নির্বিঘ্নে ফিলিস্তিনিদের উপর ব্যবহার করছে। এখন আর সন্দেহ নেই— ইসরায়েলের এই তথাকথিত ‘কাউন্টার ইনসার্জেন্সি’ অভিযানের লক্ষ্য কোনো সামরিক বিজয় নয়। এটি বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে সমন্বিত একটি পরিকল্পনা, যার উদ্দেশ্য পশ্চিম তীরের সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে কোনো ভিন্নমত, প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের জায়গাই না থাকে। দখলদার শক্তি যখন বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর কাউন্টার ইনসার্জেন্সির যুক্তি প্রয়োগ করে, তখন ঘরবাড়ি, রাস্তা আর দৈনন্দিন জীবন— সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। ভয়কে অবকাঠামো বানানো গত জানুয়ারিতে পশ্চিম তীরের প্রধান সড়কগুলোতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বড় বড় বিলবোর্ড টানিয়ে দেয়। সেখানে মোটা অক্ষরে লেখা ছিল— ‘ফিলিস্তিনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই’। ফিলিস্তিনিরা বুঝে গিয়েছিল, এটি আসলে যুদ্ধ ঘোষণাই। এখন আমরা সেই যুদ্ধের মাঝখানে। প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন, ৮৮ জন আহত হন, ১৮০ জন গ্রেপ্তার হন, ডজনখানেক মানুষকে মাঠ পর্যায়ে নির্যাতন করা হয়। এর পাশাপাশি ঘটে গড়ে শতাধিক বসতি স্থাপনকারীর হামলা, ৩০০টি সামরিক অভিযান ও ১০টি বাড়িঘর ধ্বংস। এটুকুই এক সপ্তাহের চিত্র। এই সংখ্যাগুলো শুধু সহিংসতার মাত্রা নয়, বরং তার পুনরাবৃত্তিকেও তুলে ধরে। লক্ষ্য একটাই- ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক যে কোনো অনুভূতি ধ্বংস করে দেওয়া। বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার অভিযান, বসতি সম্প্রসারণ, বাইপাস সড়ক, শত শত নতুন চেকপোস্ট ও নজরদারির মাধ্যমে সহিংসতাকে শাসনের স্বাভাবিক পদ্ধতিতে পরিণত করা হয়েছে। এই বসতি-ঔপনিবেশিক সহিংসতাই নির্ধারণ করে দেয়, ফিলিস্তিনিরা কখন ঘুমাবে, কোথায় শিশুরা খেলবে, স্কুলে যাওয়া সম্ভব কি না, দোকান খোলা থাকবে কি না, এমনকি ভবিষ্যৎ কেমন হবে। ইসরায়েল শুধু মানচিত্র বদলাচ্ছে না; ভয়কে অবকাঠামো বানিয়ে নির্ধারণ করছে— ফিলিস্তিনিদের কোথায় বেঁচে থাকা ‘নিরাপদ’। একজন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক হিসেবে, প্রতিবার রাস্তায় বেরোলেই আমাকে গ্রাস করে পরিচিত এক আতঙ্ক— কী যে ঘটে যেতে পারে! একই পথ আমি খুব কমই দুবার ব্যবহার করি। কোনো দিন একটি গ্রাম বন্ধ, পরদিন পুরো শহর। এক ঘণ্টার পথ তিন কিংবা চার ঘণ্টায় রূপ নেয়। পাহাড়ি পথে ঘুরে যেতে হয় বারবার, কারণ প্রতিটি গ্রাম ও শহরের প্রবেশপথে ইসরায়েলি গেট আর চেকপোস্ট দাঁড়িয়ে থাকে। পশ্চিম তীরে আমাদের জীবন মাপা হয় ঘুরপথে। এগুলো শুধু ভূমি ও সম্পদ লুটের প্রমাণ নয়; এগুলো সময় কেড়ে নেয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিঃশেষ করে দেয়। ইসরায়েল শুধু ভৌগোলিক ধারাবাহিকতাই ভেঙে দেয়নি, ভেঙে দিয়েছে সামাজিক জীবন, মানসিক স্থিতি ও রাজনৈতিক সম্ভাবনাও। একটি জাতিকে ভাগ করা বিচ্ছিন্ন ভূমি মানেই বিচ্ছিন্ন মানুষ। পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি শহরগুলো ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে, আর সম্প্রসারিত ইসরায়েলি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মধ্যে গ্রাস হয়ে যাচ্ছে। গত বছর ইসরায়েল অবৈধ ই-১ বসতি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে। এ বছর জেরুজালেম, জর্ডান উপত্যকা ও রামাল্লাহ ঘিরে বসতি সম্প্রসারণ আরও জোরদার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে পূর্ব জেরুজালেম কার্যত পশ্চিম তীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, উত্তর ও দক্ষিণের সংযোগ ছিন্ন হবে। ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনি সড়ক ও বাড়িতে দখলের প্রতীক হিসেবে ইসরায়েলি পতাকা টানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিম তীর আমাদের শেখায়— যুদ্ধ সব সময় বোমা নিয়ে আসে না। কখনো তা আসে চেকপোস্ট, অনুমতিপত্র, জোনিং আইন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা আর জীবনধারণের সম্পদ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। এটি শুধু ভূমি খণ্ডিত করার প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিতভাবে টিকে থাকার সক্ষমতাকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করার কৌশল। পশ্চিম তীরই সেই জায়গা, যেখানে যুদ্ধ চলে শিরোনামের নিচে, কোনো স্পষ্ট ফ্রন্টলাইন ছাড়াই। লেখক : রামাল্লাহভিত্তিক ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখক। তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতামত ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, টিআরটি ওয়ার্ল্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। 
ইসরায়েলের যে যুদ্ধের খবর সামনে আসছে না