যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা দুই দেশকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সংখ্যা ও পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখন যদি যুদ্ধ লাগে তাহলে তা ইরান ও তার আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। এ ধরনের যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ও বিশ্বকে এর মূল্য চুকাতে হবে।
ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর সাম্প্রতিক দমন-পীড়নের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে অপসারণের সময় এসেছে। এরপর মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ বিভিন্ন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন থাড ও প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে।
বিপুল সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর পর ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের পরবর্তী হামলা হবে জুনে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন আক্রমণের চেয়েও ভয়াবহ।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, একটি সফল চুক্তির জন্য ইরানকে তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা কমাতে হবে। একইসঙ্গে আঞ্চলিক প্রভাবও বৃদ্ধি করা যাবে না এবং হিজবুল্লাহ-হুতিদের সহায়তা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের দাবি ইরানের অবিশ্বাসের মাত্রা বৃদ্ধি করবে এবং চুক্তির সম্পাদনের বিষয়টি অসম্ভব করে তুলবে। ইরানি সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি কমিশনের সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি স্পষ্ট করে বলেছেন, বেসামরিক পারমাণবিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি ইরান কখনো ত্যাগ করবে না।
আলজাজিরার মতে এখনও দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়নি। তবে ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত এমন সব দাবি করছে, যার মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের শঙ্কা আছে। এ ছাড়া দেশটিতে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বারবার বলছে ট্রাম্প প্রশাসন ও তেল আবিবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ কারণে যদি আরেকবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করে, তাহলে দেশটি কোনো রাখঢাক না রেখেই সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে পাল্টা হামলা চালাবে। মার্কিন হামলার ভয়াবহতা অনুসারে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে ইরান। এর ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, ইরান ও বিশ্বব্যাপী একটি গুরুতর সংকট সৃষ্টি হবে।
ট্রাম্প এবার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালাতে চান। তিনি বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা করবেন। বিশেষ করে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ঘাঁটি, বাসিজ ইউনিট, বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনী ও থানাগুলোতে হামলা চালানো হবে। কারণ, তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানকে বিপজ্জনক পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তখন ইরানে ক্ষমতা একীভূতকরণ বা সামরিক শাসন জারি হতে পারে। অথবা আইআরজিসি সম্পূর্ণ ক্ষমতা দখল করবে বা অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাড়তে পারে। এ ছাড়া গত বছরের মতো ইরানিরা হামলার পর দেশটির শাসকদের প্রতি আরও অনুগত হবে। কারণ তারা ইরানকে সিরিয়া ও লিবিয়ার মতো ধ্বংস হতে দিতে চায় না। এ দেশটিতে বিশ্বাসযোগ্য মধ্যপন্থি বিরোধী দল নেই তাই ইসলামপন্থি সরকারের বিকল্প গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া ইরানের মধ্যে শক্তিশালী আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি রয়েছে। এসব কারণে ইরানকে দুর্বল করা সহজ হবে না বা দেশটির শাসন পদ্ধতিরও পরিবর্তন হবে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বকে হত্যা করতে সক্ষম হয় তাহলে উত্তরাধিকার সংকট তৈরি হবে। এ ছাড়া শাসনব্যবস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক-নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। আইআরজিসির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে সামরিক-প্রধান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
ইরানকে ভূরাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গৃহযুদ্ধ শুরুর চেষ্টাও করতে পারে। গত মাসে টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজের মতো কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ইরানি বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এসব উত্তেজনাকর বক্তব্য এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন প্রচেষ্টার কারণে ইরান বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করেছে। একইসঙ্গে তারা সমঝোতা ও সংঘর্ষের ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাও করতে চায়, আবার হামলা হলে কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর।
এ বিষয়ে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, ইরানের ওপর যে কোনো সামরিক আক্রমণ ‘আঞ্চলিক যুদ্ধ’ সৃষ্টি করবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও সমগ্র বিশ্ব একটি সংকটের মধ্যে পড়বে। কারণ, হামলা হলে ইরান প্রতিশোধ নেবে। তখন মার্কিন মিত্র ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘর্ষে লিপ্ত হতে বাধ্য হবে। তখন এ অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মূলধন পাচার হতে পারে। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো হতে ইউরোপে শরণার্থী এবং অভিবাসীদের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।
তাছাড়া ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বা উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে আক্রমণ করে, তাহলে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাবে। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং বিভিন্ন দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়বে। এসব কারণে অভিবাসন বাড়বে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যে কোনো মার্কিন সামরিক হামলা কেবল ইরানের জন্যই নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ, একবার সংঘাত শুরু হলে, তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে। তখন অপ্রত্যাশিতভাবে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে যাবে।
লেখক : আয়ারল্যান্ডের মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি স্কলার।
মন্তব্য করুন


