নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় তিন সন্তানের জননীকে (৩২) নিজ ঘরে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় সন্ত্রাসীরা একাধিক বাড়িতে হামলা চালায় বলে জানা গেছে।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নোয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে এ তথ্য জানান ভুক্তভোগী নারী। পরে তাকে ইমার্জেন্সি বিভাগে চিকিৎসা শেষে হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি করা হয়।
এর আগে গতকাল শুক্রবার রাত ১১টার দিকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানান ভুক্তভোগী নারী।
স্থানীয়রা জানায়, ঘটনার পর আজ শনিবার সকালে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন লাঠিসোঁটা নিয়ে পুনরায় ভুক্তভোগী ওই নারীর বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা তার ঘরের মূল দরজা এবং ভেতরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। ভুক্তভোগীকে তারা ঘর থেকে টেনে বের করে আনে এবং কটাক্ষ করে শারীরিক নির্যাতন করে। এ সময় তারা আশপাশের বাড়িঘরেও হামলা চালায়।
এ বিষয়ে নোয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. মোস্তাফিজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমার কাছে হাতিয়া থেকে ৩২ বছর বয়সি এক নারী রোগী এসেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, গতকাল রাত ১১টার দিকে তাকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন (যৌন হয়রানি) করা হয়েছে। আমরা তৎক্ষণাৎ রোগীকে ভর্তি করেছি এবং শারীরিক পরীক্ষার জন্য আমাদের গাইনি বিভাগে পাঠিয়েছি। বাকিটা গাইনি বিভাগের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত ফলাফল জানাবেন।
ভুক্তভোগী নারী জানান, গতকাল শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তিন ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করেন। এদের মধ্যে কালা এমরান নামের একজন এবং অজ্ঞাতনামা আরেকজন দরজায় পাহারায় ছিলেন। তখন রহমান নামের এক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করেন। তাকে লাথি মেরে গুরুতর আহত করা হয়েছে, যার ফলে তিনি বর্তমানে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছেন না। এ সময় তার স্বামীকে বেঁধে রাখা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও জানান, প্রথমে লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের বিষয়টি গোপন রাখলেও পরবর্তীতে চিকিৎসা নিতে এসে সাংবাদিকদের কাছে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বর্তমানে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন।
ওই নারী অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে এ হামলা চালানো হয়েছে। অভিযুক্তরা আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও সরকার পরিবর্তনের পর এখন বিএনপির পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে। এলাকায় এ সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানেও তাদের চাঁদা দিতে হয়।
এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য তুহিন ইমরান এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ যুগে এসে ভোট দেওয়া নিয়ে ধর্ষণের ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। একই সঙ্গে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে হাতিয়া থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিষয়টি শুনে একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে, হাসপাতালেও আমার প্রতিনিধি রয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জানানো যাবে।
এ বিষয়ে হাতিয়া থেকে ধানের শীষ প্রতীকের বিএনপির প্রার্থী ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি এ ঘটনাটি সঠিক নয়। এটি একটি সাজানো ঘটনা।
এ ঘটনায় নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে ১১ দলীয় জোটের শাপলা কলি প্রতীকে সদ্য বিজয়ী প্রার্থী ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ ভুক্তভোগী ওই নারীকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। এ সময় তিনি ভুক্তভোগীর সুচিকিৎসা না পাওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
হান্নান মাসউদ অভিযোগ করে বলেন, পুরো হাতিয়াতে বিএনপি নেতাকর্মী এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা তাণ্ডব চালাচ্ছে। গত চার দিনে প্রায় পাঁচ শতাধিক বাড়িঘরে হামলা করেছে, লুটপাট করেছে। অনেক মহিলাদের নির্যাতন করেছে। তার মধ্যে আজ আমি ধর্ষণের খবর পেলাম। ২নং চানন্দী ইউনিয়নে দুই দুইটা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে শুধু শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ার অপরাধে।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে হান্নান মাসুদ বলেন, এ ব্যাপারে প্রশাসনকে বারবার বলার পরেও প্রশাসন কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না। হাতিয়াতে অতি দ্রুত সেনাবাহিনী মোতায়েন করে অস্ত্র উদ্ধার করা দরকার। আমাদের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হামলা করছে। অস্ত্রশস্ত্র, বগি দা (দেশীয় অস্ত্র), গুলি নিয়ে একেবারে ভয়াবহ অবস্থা শুরু হয়েছে হাতিয়াতে। এই তান্ডব থেকে হাতিয়ার মানুষকে রক্ষা করতে হবে।
ঘটনা জানার পর হাসপাতালে ছুটে যান নোয়াখালী জামায়াতে ইসলামীর আমির ইসহাক খন্দকার। তিনি বলেন, সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা মাঠে থাকব। এর বিচার দেখে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।
এদিকে নোয়াখালীর হাতিয়ায় ধর্ষণ অভিযোগের এ ঘটনায় আবদুল হান্নান মাসউদকে ভিডিও কল দিয়ে ধর্ষণে ভুক্তভোগীর খোঁজখবর নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি এ ঘটনায় নিজে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের নেবেন বলে আগামী সোমবার হাতিয়ায় যাওয়ার কথা জানান। ভিডিও কলে কথা বলার সময় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের এ ঘটনা তুলে ধরার অনুরোধ জানিয়ে ভিডিও কলে জামায়াত আমির বলেন, সহ্য হয় না এসব, ফ্যাসিবাদ বিদায় করলাম এগুলো দেখার জন্য। একটা মানুষ নির্বাচনে ভোট দেবে সে যাকে পছন্দ করে তাকে। তাকে অত্যাচার নির্যাতন করা মানুষের কার্যকলাপ হয় না, অন্য প্রাণীরও হয় না এ রকম। এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে পুলিশ তাকে এখনই ধরে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানাই। এটা ক্ষমার কোনো সুযোগ নেই। আমরা এ পরিবারের পাশে আছি।
এর আগে শনিবার রাতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘নোয়াখালীর হাতিয়ায় ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিকে (এনসিপি) ভোট দেওয়ায়, তিন সন্তানের এক জননীকে ধর্ষণের যে অভিযোগ উঠেছে, তা শুনে আমি হতবাক, স্তম্ভিত।’
তিনি লেখেন, ‘অভিযোগ অনুযায়ী, শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি ভুক্তভোগীর ঘরে ঢুকে তার স্বামীকে বেঁধে ফেলে এবং এনসিপিকে ভোট দেওয়ার অভিযোগে তাকে পাশবিক নির্যাতন চালায়। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তাকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার চিকিৎসা চলছে।’
ফেসবুক পোস্টে জামায়াত আমির জানান, ‘কিছুক্ষণ আগে ফোনে আমি ভুক্তভোগী নারী এবং তার পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কথা বললাম। তাদের এই অসহনীয় যন্ত্রণা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। কোনো ভাষা দিয়ে তাদেরকে সান্ত্বনা দিতে পারিনি। আমার পুরো নির্বাচনি প্রচার জুড়ে আমি কথা দিয়েছিলাম যে— প্রতিহিংসার রাজনীতি আর থাকবে না এবং আইনের শাসনের কোনো বিকল্প নেই, এটিই আমাদের ভিত্তি। যা ঘটেছে তা রাজনীতি নয়, এটি চরম ঔদ্ধত্য এবং এখনই এর অবসান হতে হবে। বিশেষভাবে নারীদের নিরাপত্তা সবার আগে।’