এক সময় সকাল হলেই শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত কারখানা প্রাঙ্গণ। ভেতর থেকে ভেসে আসত উৎপাদনযন্ত্রের শব্দ। আশপাশের সড়কেও দেখা যেত কর্মস্থলে ছুটে চলা শ্রমিকদের ভিড়। এখন সেখানে নীরবতা। বিশাল কারখানাটি পড়ে আছে বন্ধ। দিন-রাত শুধু পাহারায় রয়েছেন ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মী।
এই কারখানার আয়ে একসময় চলত প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিকের সংসার। তাদের কারও স্বামী নেই, কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, কারও আবার সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চলত মাস শেষে পাওয়া সামান্য বেতনে। হঠাৎ কর্মস্থল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের অনেকের ঘরেই এখন নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। পুরুষ শ্রমিকদের কেউ কেউ বিকল্প কাজে যুক্ত হতে পারলেও সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নারী শ্রমিকরা।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাখালিয়া এলাকায় অবস্থিত বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ ২০১২ সালে উৎপাদনে যায়। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের বড় একটি উৎস হয়ে ওঠে। চলতি বছরের ১৫ মে কারখানার প্রধান ফটকে বন্ধের নোটিশ দেওয়ার পর থেকে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
কারখানা এলাকায় কথা হয় রহিমা বেগম, সুমি আক্তারসহ অন্তত আরও ১০/১২ জন শ্রমিকের সঙ্গে। তাদের প্রায় সবার গল্পই একই কাজ নেই, আয় নেই; অথচ সংসারের খরচ থেমে নেই।
শ্রমিকদের দাবি, কারখানাটি পুনরায় চালু করা গেলে তাদের দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থান ফিরে আসবে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য স্থানীয়ভাবে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় তারা কারখানাটি চালুর দিকেই তাকিয়ে আছেন।
একসময় যেখানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে দিন শুরু হতো, সেখানে এখন নীরবতা। কারখানার ফটকের ভেতরে শুধু নিরাপত্তাকর্মীদের আনাগোনা। আর ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক শ্রমিকের চোখে একটাই প্রশ্ন—আবার কবে চালু হবে তাদের সেই কর্মস্থল?
সোনাপুর এলাকার শ্রমিক সুমি আক্তার বলেন, “পুরুষ শ্রমিকদের অনেকে অন্যত্র কাজ পেয়েছেন। কিন্তু আমরা মধ্যবয়সী নারীরা কোথাও কাজ পাচ্ছি না। বিসিক শিল্পনগরীতেও যোগাযোগ করেছি, কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বিধবা বা একার আয়ে চলা নারীদের টিকে থাকাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।”
শেফালী তারা বানু বেগম মকসুদুন্নেসাসহ ৫/৭ জন নারী শ্রমিকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করায় অনেকেরই অন্য কোথাও কাজের অভিজ্ঞতা বা যোগাযোগ নেই। হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়ায় জমানো সামান্য টাকা দিয়ে কোনো রকমে দিন কাটছে। নতুন কাজ মিললেও মজুরি কম এবং কাজের নিশ্চয়তা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুম, হাবিবুর রহমান ও মানিক হোসেন বলেন, কারখানাটি চালু থাকাকালে শুধু শ্রমিকরাই নন, আশপাশের ছোট ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষও এর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব পড়েছে।
চাকরি আছে, নেই আগের মতো কাজ আক্ষেপ করে কারখানার নিরাপত্তা বিভাগের কর্মী মো. শফিক বলেন, বেতন ১২ হাজার টাকা। তিনি নিরাপত্তা সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত থাকলেও কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় আগের মতো নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।
শফিক বলেন, “এই চাকরির আয়ের ওপরই আমার সংসার চলে। কারখানা কবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, সেই চিন্তা থাকে। এখন আগের মতো ডিউটিও নেই। তারপরও আশা করি কারখানাটি আবার চালু হবে।
একই দুশ্চিন্তা সিকিউরিটি ইনচার্জ অহিদুর রহমানের। প্রায় ১৬ বছর ধরে বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজে কাজ করছেন তিনি। মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা বেতনে স্ত্রী সালেহা বেগম, তিন ছেলে ও তিন মেয়ের সংসার চলে।
অহিদুর রহমান বলেন, “এত বছর ধরে এই চাকরির ওপরই সংসার চলছে। এখন কাজ আগের মতো নেই। কখন পুরোপুরি চাকরি চলে যায়, সেই চিন্তায় আছি।”
বর্তমানে কারখানাটির ভেতরে উৎপাদন কার্যক্রম না থাকলেও দিন-রাত মিলিয়ে ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। শ্রমিকদের কোলাহলের জায়গায় এখন তাদেরই পদচারণা।
বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) বিপ্লব পাল বলেন, “এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমরা লে-অফে গিয়েছিলাম। তখন স্টাফসহ প্রায় ৯৬৫ জন কর্মী ছিল। তার আগে ছিলো ১৮০০ জন শ্রমিক। তিনি আরো বলেন, প্রথমে ৪৫ দিনের লে-অফ দেওয়া হয়। পরে ১৫ দিন করে সময় বাড়ানো হয়। প্রায় আড়াই থেকে তিন মাস পর্যন্ত কর্মীদের বেতন দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমরা স্থায়ীভাবে ছাঁটাই করিনি এবং পুরোপুরি বন্ধও করিনি। প্রতিষ্ঠানটি আবার চালুর চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে অনেক শ্রমিক অন্য কারখানায় চলে গেছেন। আমরা চালু করতে পারলে যারা ফিরে আসবেন, তাদের বিষয়টি হিসাব-নিকাশ করে দেখা হবে।”