শতবর্ষে ভেড়ামারা সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জীর্ণতায় ন্যুব্জ
একশ বছর ধরে মানুষের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র। প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের সুখ-দুঃখের নীরব সাক্ষী এই প্রতিষ্ঠানটি শতবর্ষে এসে জীর্ণতা, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি সংস্কার করে ১০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উন্নীত করা হোক।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ধরমপুর ইউনিয়নের সাতবাড়িয়া এলাকায় হিসনা নদীর তীরে, হিসনা ব্রিজের পশ্চিম পাশে অবস্থিত উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। ১৯২৬ সালে এস. জে. যোগেন্দ্র নাথ ব্যানার্জি এটি নির্মাণ করেন। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি শতবর্ষে পদার্পণ করেছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ। ভেড়ামারা উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দৌলতপুর ও মিরপুর উপজেলার একাংশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল।
ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে ১৬ দাগ এলাকায় অবস্থিত। সেখানে যেতে হলে ভেড়ামারা দক্ষিণ ও উত্তর রেলগেট অতিক্রম করতে হয়। ট্রেন চলাচলের সময় রেলগেট বন্ধ হয়ে গেলে সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সাধারণ রোগীদের জন্য এই অপেক্ষা সহনীয় হলেও মুমূর্ষু রোগী, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি কিংবা জরুরি প্রসূতি রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের বিলম্বও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে শহরের প্রবেশমুখে অবস্থিত সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির গুরুত্ব অনেক বেশি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে রয়েছে দুটি পুরোনো ভবন। এর দক্ষিণ পাশের ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের চারপাশে গজিয়ে উঠেছে আগাছা ও ঝোপঝাড়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে সাপ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন প্রাণীর উপদ্রব রয়েছে। অপর ভবনটিতেও কোনো রকমে চলছে চিকিৎসাসেবা। শত বছরের পুরোনো স্থাপনাটিতে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধারও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির চারপাশে নেই কোনো সীমানাপ্রাচীর। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অনেকটা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত হলে সেখানে চোর ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়।
বর্তমানে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নিশান চাঁদ বিশ্বাস ও ফার্মাসিস্ট মনিরুল ইসলাম—এই দুজন কর্মী স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এত বড় একটি এলাকার মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার ভরসাস্থল হিসেবে জনবল ও অবকাঠামোর এই সীমাবদ্ধতা দ্রুত দূর করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
১০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র চান এলাকাবাসী
এলাকাবাসীর দাবি, সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এখানে ১০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হোক। নতুন ভবন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, ওষুধ সরবরাহ, জরুরি চিকিৎসাসেবা, রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা এবং সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হলে ভেড়ামারার পশ্চিমাঞ্চল, দৌলতপুর ও মিরপুরের একাংশের বিপুলসংখ্যক মানুষ উপকৃত হবেন।
ধরমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সেলিম হোসেন বলেন, ‘সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ১০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উন্নীত করা হোক। প্রতিদিন এই কেন্দ্রে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী সেবা নেন। ইতিপূর্বে এখানে একজন মেডিকেল অফিসার কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে কোনো মেডিকেল অফিসার নেই। ১০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য আমরা জোরালো সমর্থন জানাচ্ছি।’
ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে উন্নত করার দাবির প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বর্তমানে জীর্ণতা, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ভারে ন্যুব্জ। ইতিপূর্বে একাধিকবার বরাদ্দের জন্য আবেদন করা হয়েছে।’
কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার শীল বলেন, সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য নতুন বরাদ্দের বিষয়ে ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। কিছু জমি বেদখল হয়ে গেছে। বেদখল জমি উদ্ধার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এইচইডি) প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সাতবাড়িয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।