আজকাল মোবাইল ফোনে ছবি তুললেই তা সঙ্গে সঙ্গে আরও সুন্দর, উজ্জ্বল আর নিখুঁত হয়ে ওঠে। অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না, ছবিটা আসলে কতটা বাস্তব আর কতটা কৃত্রিম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আমাদের ফোনের ক্যামেরায় এমনভাবে ঢুকে পড়েছে যে, স্মৃতিতে ধরে রাখার ছবিগুলোও আর আগের মতো থাকছে না। এতে যেমন কিছু সুবিধা আছে, আবার কিছু প্রশ্নও থেকে যায়।
সাধারণ রঙ ঠিক করা থেকে শুরু করে এমন সব মুখের বৈশিষ্ট্য যোগ করা, যা আসলে ছবিতে ছিলই না। আজকের সময়ে এসে স্মার্টফোনই ঠিক করে দিচ্ছে আমাদের ছবি কেমন হবে। ফলাফল অনেক সময় চোখে পড়ার মতো সুন্দর হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে এতে আমাদের বাস্তবতা দেখার অভ্যাসও বদলে যেতে পারে। খবর বিবিসি
আপনি কি কখনো মোবাইলে চাঁদের ছবি তুলেছেন? বেশিরভাগ সময়ই সেই ছবি ঝাপসা আসে। কিন্তু স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোন ব্যবহার করলে আপনার অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে। এসব ফোনের 100x স্পেস জুম ফিচারে চাঁদের ছবি এত পরিষ্কার আসে যে মনে হয় বড় ক্যামেরা দিয়ে তোলা। তবে এখানেই প্রশ্ন উঠে, এই ছবি কি পুরোপুরি বাস্তব?
রেডিটে (সামাজিক সংবাদ সংকলন) এক ব্যবহারকারী বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তিনি একটি ঝাপসা চাঁদের ছবি এডিট করতে দেন তার স্যামসাং ফোনে। ফোনটি সেই অস্পষ্ট ছবিকেই বদলে দিল পরিষ্কার, গর্ত আর ছায়া দেখা যায় এমন একটি চাঁদের ছবিতে। অথচ মূল ছবিতে এসব কিছুই ছিল না। স্যামসাং একে ‘টেইল এনহ্যান্সমেন্ট’ বলে। বাস্তবে ফোনটি এমন এক এআই ব্যবহার করছে, যা চাঁদ চিনে নিয়ে নিজের মতো করে চাঁদের বিস্তারিত যোগ করছে ছবিতে।
সব ফোনে এত ভালো এআই না থাকলেও, আজকের প্রায় সব স্মার্টফোনেই ছবি তোলার সময় পেছনে কাজ করে জটিল সফটওয়্যার ও এআই। ছবি সেভ হওয়ার আগেই ফোন একসঙ্গে অনেক হিসাব করে ফেলে।
এই প্রযুক্তির লক্ষ্য সাধারণত ছবি সুন্দর করা এবং ছবিকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে আসা। কিন্তু অনেক সময় এআই এত বেশি কাজ করে যে, ছবিটি আমাদের নিজের চোখে দেখা দৃশ্যের চেয়ে আলাদা হয়ে যায়। তখন প্রশ্ন আসে, আমরা কি বাস্তবতা দেখছি, নাকি ফোনের বানানো একটি সংস্করণ মাত্র।
এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফি। ফোন শুধু আলো ধরে রাখে না, বরং ধরে নেয় উন্নত ক্যামেরা হলে ছবিটা কেমন হতো, তারপর সেই ধারণা অনুযায়ী ছবি তৈরি করে।
অনেকে ভাবেন এআই বন্ধ করলে এই প্রক্রিয়া থেমে যায়। আসলে তা নয়। সাধারণ আলোতে ফোন একসঙ্গে একাধিক ছবি তোলে এবং সেগুলো মিলিয়ে একটি ছবি বানায়। এতে নয়েজ কমানো, রঙ ঠিক করা, আলো ও ছায়ার ভারসাম্য রাখা এবং ছবির ঝাপসা ভাব কমানোর কাজ করা হয়।
আইফোনে ডিপ ফিউশন নামে একটি প্রযুক্তি আছে। এটি বিপুল সংখ্যক ছবি দেখে প্রশিক্ষিত এআই ব্যবহার করে ছবির ভেতরের জিনিস আলাদাভাবে প্রসেস করে। এতে ছবি খুব পরিষ্কার আসে। তবে অনেক ব্যবহারকারী বলেন, এতে কখনো কখনো ত্বক বা জিনিসপত্র কৃত্রিম ও প্লাস্টিকের মতো দেখায়।
এই অতিরিক্ত প্রসেসিং পছন্দ না হওয়ায় কেউ কেউ পুরোনো ফোন ব্যবহার করছেন, আবার কেউ আলাদা ক্যামেরা নিচ্ছেন শুধু ছবি তোলার জন্য।
তবে এই প্রযুক্তির ভালো দিকও আছে। আগে যে এডিটিং করতে পেশাদার দক্ষতা দরকার হতো, এখন ফোন নিজেই তা করে দিচ্ছে। সাধারণ ব্যবহারকারীরা সহজেই সুন্দর ছবি পাচ্ছেন।
সমস্যা হলো, ফোন অনেক সময় ব্যবহারকারীর অজান্তেই সিদ্ধান্ত নেয়। কোন মুখ ভালো দেখাবে, কোন আলো ঠিক হবে, কোন মুহূর্তটি সেরা, এসব ঠিক করছে অ্যালগরিদম। ফলে প্রতিটি ব্র্যান্ডের ছবির আলাদা ধাঁচ তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে বাজারে তৈরি অনেক ফোনে ডিফল্টভাবে বিউটি ফিল্টার চালু থাকে। এতে ছবিতে ত্বক মসৃণ করা, রঙ বদলানো এমনকি মুখের গঠনও বদলে যায়। কোথাও ভ্রু বা চোখ ঠিকমতো না থাকলে এআই নিজেই তা বানিয়ে দেয়। এসব মূল দৃশ্যে ছিল না, সম্পূর্ণ কৃত্রিম সংযোজন।
এটি শুধু ছবির সৌন্দর্যের বিষয় নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত এআই সম্পাদিত ছবি ও ভিডিও মানুষের স্মৃতি ও নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণা বদলে দিতে পারে। কিছু ফিচার অবশ্য মানুষকে খুশি করতেই বানানো। যেমন গ্রুপ ছবিতে কারও চোখ বন্ধ থাকলে বা হাসি ঠিক না হলে, একাধিক ছবি থেকে ভালো অংশ নিয়ে একটি ছবি বানানো। এতে ছবিটি সুন্দর হয়, যদিও সে মুহূর্তটি বাস্তবে কখনো ঘটেইনি।
যারা একেবারে বাস্তব মুহূর্তের ছবি দেখতে চান, তারা প্রো মোড বা আলাদা অ্যাপ ব্যবহার করে এআই প্রসেসিং কমাতে পারেন চাইলে। এসব ছবি হয়তো কম আকর্ষণীয় হবে, কিন্তু এতে বোঝা যায় ফোন সাধারণত ছবির সঙ্গে এআই দিয়ে কী করে।
স্মার্টফোন ক্যামেরা এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ। এআই ছবি আরও সুন্দর ও পরিষ্কার করছে, এতে সন্দেহ নেই। তবে একই সঙ্গে এটি আমাদের স্মৃতি আর বাস্তবতার মাঝখানে একটি অদৃশ্য পর্দা বসিয়ে দিচ্ছে। কোনটা সত্য আর কোনটা কৃত্রিম, সেই সচেতনতা এখন ব্যবহারকারীরই দরকার। মাঝে মাঝে কাঁচা ছবির দিকে তাকালে হয়তো আমরা বাস্তবতাকে একটু কাছ থেকে দেখতে পারি।
মন্তব্য করুন





