প্রযুক্তি আজ আমাদের জীবনের সর্বত্র। তাই অনেকেরই মনে হতে পারে, জিমেইলে যুক্ত হওয়া নতুন এআই সহকারী বুঝি গোপনে ই-মেইল পড়ে ফেলছে। বিষয়টি কি সত্যি? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে প্রযুক্তি ও গোপনীয়তা বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং গুগলের প্রকাশ্য তথ্য বিশ্লেষণ করেছে রিডার্স ডাইজেস্ট।
জিমেইল বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ই-মেইল সেবা। প্রায় ১৮০ কোটি মানুষ এটি ব্যবহার করেন। একাধিক ডিভাইসে সহজ ব্যবহার, যে কোনো জায়গা থেকে ই মেইল ব্যবস্থাপনা এবং বিনামূল্যের সেবা হওয়ায় জিমেইল অনেকের প্রথম পছন্দ। তবে সাম্প্রতিক এক পরিবর্তন ব্যবহারকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি গুগল জিমেইলে বড় ধরনের একটি আপডেট চালু করেছে। এতে জেমিনি ৩ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেল যুক্ত করা হয়েছে, যা জিমেইলকে একটি সক্রিয় ব্যক্তিগত সহকারীতে রূপ দিচ্ছে। এই এআই ই-মেইল সংক্ষেপ করতে পারে, খোঁজার কাজ সহজ করে, করণীয় তালিকা বানায় এবং উত্তর লেখায় সাহায্য করে। তবে এসব সুবিধার পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জেমিনি কী
জেমিনি হলো গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী। এটি ইতোমধ্যে গুগলের বিভিন্ন সেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে। গুগল সার্চে দেখা সারাংশ, লেখা বা ছবি তৈরি, এমনকি কোড বোঝার কাজেও জেমিনি ব্যবহৃত হয়। মানুষের মতো করে কথোপকথন করাও সম্ভব।
ম্যাপস, ডকস ও জিমেইলের মতো অ্যাপেও জেমিনি যুক্ত রয়েছে। ২০২৫ সালে এটি গুগল নেস্ট ডিভাইসের ভয়েস সহকারী হিসেবেও ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জিমেইলের নতুন এআই সংস্করণ ধাপে ধাপে চালু হয়।
আপনার ইনবক্সে জেমিনি কী করছে
নতুন জিমেইলে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হলো এআই ইনবক্স। এখানে ই-মেইল শুধু সময় অনুযায়ী নয়, গুরুত্ব অনুযায়ী দেখানো হয়। জরুরি বার্তা, গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ বা করণীয় বিষয়গুলো আলাদা করে তুলে ধরা হয়।
নতুন ফিচারগুলোর মধ্যে রয়েছে-
ই-মেইল সারাংশ: দীর্ঘ ই-মেইল থ্রেডের শুরুতেই সংক্ষেপে মূল কথা তুলে ধরা
উত্তর লেখায় সহায়তা: আপনার লেখার ধরন অনুযায়ী উত্তর সাজেস্ট করা
করণীয় তালিকা: ই-মেইল থেকে কাজ, বিল পরিশোধ বা মিটিং চিহ্নিত করা
বিষয়ভিত্তিক গ্রুপ: একই প্রকল্প বা আলোচনার ই-মেইল একসঙ্গে দেখানো
বেসিক জিমেইলে এসব সুবিধা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। তবে আরও উন্নত এআই সুবিধা পেতে হলে অর্থের বিনিময়ে সাবস্ক্রিপশন নিতে হয়।
তাহলে কি গুগল আপনার ই-মেইল পড়ছে
গুগলের দাবি, কোনো মানব কর্মী আপনার ই-মেইল পড়েন না। তবে এআই সিস্টেম কাজ করতে হলে ই-মেইল দেখার অনুমতি লাগে। এটি নতুন কিছু নয়। আগেও জিমেইল টিকিট বা ভ্রমণ তথ্য থেকে ক্যালেন্ডার ইভেন্ট তৈরি করতে ই-মেইল পড়ত।
তফাৎ হলো, এখন এআই ই-মেইলের অর্থ ও প্রসঙ্গ বুঝে কাজ করছে। এটি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর লাগতে পারে। তবে গুগলের মতে, এটি নজরদারি নয়, বরং ব্যবহারকারীর সুবিধার জন্য করা হচ্ছে।
ই-মেইল কি এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার হচ্ছে
গুগল জানায়, ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ই-মেইল এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হয় না। তবে ব্যবহারকারী যদি নিজের ইচ্ছায় ই-মেইল বা অন্যান্য তথ্য সার্চ বা বিশ্লেষণের জন্য ব্যবহার করেন, তখন সে তথ্য গুগলের সেবা উন্নত করতে কাজে লাগতে পারে।
অর্থাৎ অনুমতি ছাড়া আপনার ই-মেইল দিয়ে এআই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে না।
ই-মেইল স্ক্যান করে কি বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে
না। গুগল ২০১৭ সালেই ই-মেইল স্ক্যান করে বিজ্ঞাপন দেখানো বন্ধ করেছে। জিমেইলে দেখা বিজ্ঞাপন আসে ব্যবহারকারীর সার্চ হিস্ট্রি, ইউটিউব ব্যবহার বা অন্যান্য অনলাইন কার্যকলাপের ভিত্তিতে।
আপনার তথ্য কতটা নিরাপদ
যে কোনো অনলাইন সেবার মতোই এখানে ঝুঁকি একেবারে শূন্য নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষভাবে তৈরি করা ক্ষতিকর ই-মেইল সারাংশ করতে গেলে এআই বিভ্রান্ত হতে পারে। তবে গুগল জানিয়েছে, তারা এসব ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কিছু ত্রুটি সমাধান করা হয়েছে।
জিমেইলে জেমিনি কীভাবে বন্ধ করবেন
চাইলেই আপনি জি-মেইলে এআই ফিচার বন্ধ করতে পারেন।
ডেস্কটপে
- জিমেইল খুলুন
- উপরের ডান পাশে সেটিংস আইকনে ক্লিক করুন
- সব সেটিংস দেখুন অপশনে যান
- জেনারেল ট্যাবে স্মার্ট ফিচার বন্ধ করুন
- সেভ চেঞ্জেস ক্লিক করুন
মোবাইলে
- মেনু আইকনে ট্যাপ করুন
- সেটিংসে যান
- ডাটা প্রাইভেসি নির্বাচন করুন
- স্মার্ট ফিচার বন্ধ করুন
কাজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ই-মেইল হলে প্রশাসকের অনুমতি লাগতে পারে।
আর কোথায় জেমিনি ব্যবহার হচ্ছে
জিমেইলের বাইরেও জেমিনি রয়েছে। আলাদা অ্যাপ, গুগল সার্চ, ক্রোম ব্রাউজার এবং ভয়েসভিত্তিক লাইভ সার্চে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
জেমিনি এআই জিমেইল ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সহজ ও দ্রুত করতে সাহায্য করছে। তবে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন থাকা জরুরি। ভালো দিক হলো, ব্যবহারকারীর হাতে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। চাইলে এআই সুবিধা বন্ধ করে আগের মতো জি-মেইল ব্যবহার করা সম্ভব। তাই আতঙ্কিত না হয়ে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সেটিংস ঠিক করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান।
মন্তব্য করুন





