রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’-এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি)। শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় অর্ধশতাব্দীর মধ্যে প্রথম বিশ্বের সবচেয়ে দুই পরাশক্তির দেশে এই অস্ত্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। ফলে বিশ্ব নতুন এক নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে এগোতে পারে। এই শঙ্কা ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করেছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে নেতিবাচকভাবে দেখছে মস্কো। ক্রেমলিন বলেছে, চুক্তি শেষ হওয়ায় পারমাণবিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাশিয়া দায়িত্বশীল অবস্থানই নেবে। সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বরাতে বলেছেন, ‘একবিংশ শতাব্দীতে সত্যিকারের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ অর্জনের জন্য চীনকে অন্তর্ভুক্ত না করে এমন কিছু করা অসম্ভব।’ কারণ হিসেবে তিনি বেইজিংয়ের বিশাল অস্ত্র ভান্ডার ও দ্রুত বর্ধনশীল মজুত নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
গত বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র রাজি হলে আরও এক বছর চুক্তির সীমা মানতে প্রস্তুত রাশিয়া। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি বাড়ানো নিয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি বরং চীনকে নতুন কোনো চুক্তির অংশ করতে চান, যা বেইজিং প্রত্যাখ্যান করেছে। ক্রেমলিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানান, পুতিন সম্প্রতি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র মেয়াদ বাড়ানোর রুশ প্রস্তাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, মস্কো চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টিকে ‘নেতিবাচক’ হিসেবে দেখছে। তিনি বলেন, ‘যাই হোক না কেন, পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাশিয়া তার দায়িত্বশীল ও পূর্ণাঙ্গ অবস্থান ধরে রাখবে। অবশ্যই, এ ক্ষেত্রে রাশিয়া তার জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।’
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে গত বুধবার রাতে জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির পক্ষগুলো আর চুক্তির মূল বিধান বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতার আওতায় নেই। ফলে তারা নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপ বেছে নিতে স্বাধীন।
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ নিউ স্টার্ট চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির আওতায় উভয় দেশকে ৭০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র, বোমারু বিমান এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৫০টি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত পারমাণবিক ওয়ারহেড রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
চুক্তিটির মূল মেয়াদ ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা পাঁচ বছরের জন্য বাড়ানো হয়। চুক্তি অনুযায়ী পারস্পরিক সম্মতি যাচাইয়ের জন্য সরেজমিনে পরিদর্শনের ব্যবস্থা ছিল। তবে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ২০২০ সালে এসব পরিদর্শন বন্ধ হয়ে যায়, আর শুরু হয়নি।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুতিন ঘোষণা দেন, রাশিয়া ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তিতে অংশগ্রহণ স্থগিত করছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্ররা যখন প্রকাশ্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার পরাজয় চাচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনকে মস্কোর পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। একই সময়ে ক্রেমলিন জানায়, রাশিয়া পুরোপুরি চুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে না এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ধারিত সীমা মানার প্রতিশ্রুতি বহাল থাকবে।
গত সেপ্টেম্বরে পুতিন প্রস্তাব দেন, ভবিষ্যৎ কোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় পাওয়ার জন্য নিউ স্টার্টের মেয়াদ আরও এক বছর মানা যেতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। একইসঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার বাড়িয়ে তুলতে পারে।
নিউ স্টার্ট ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস সংক্রান্ত দীর্ঘ চুক্তির ধারাবাহিকতার অংশ। তবে আগের বেশ কয়েকটি চুক্তি ইতোমধ্যেই বাতিল হয়ে গেছে। তবে কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো ড. টং ঝাও বলেন, ‘নিউ স্টার্ট চুক্তি ধরে রাখার ব্যাপারে ওয়াশিংটনের তেমন আগ্রহ নেই। প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ খোলা রাখতেই এখন বেশি মনোযোগ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহৎ শক্তিধর দেশগুলোর পারমাণবিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে রাশিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তুলনামূলকভাবে কম উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে, মস্কোর পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বড় আকারে বাড়ানোর মতো পর্যাপ্ত সম্পদ না থাকায় এই উদ্বেগ আরও কমেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তবে নতুন কোনো চুক্তিতে চীনকেও যুক্ত করতে চান। গত মাসে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার দৃঢ়ভাবে মনে হয়, যদি আমরা নতুন করে চুক্তি করি, তাহলে চীনকে এর অংশ হওয়া উচিত।’
চীন তাদের তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর কোনো বিধিনিষেধ মানতে রাজি নয়। অর্থাৎ এই মুহূর্তে কোনো পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় অংশ নেবে না। একইসঙ্গে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বৃহস্পতিবার বলেন, ‘চীনের পারমাণবিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সমান নয়। তাই বর্তমান পর্যায়ে চীন পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় অংশ নেবে না।’ তিনি আরও বলেন, নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় চীন দুঃখ প্রকাশ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যে, রাশিয়ার সঙ্গে দ্রুত পারমাণবিক সংলাপ পুনরায় শুরু করতে ও আপাতত চুক্তির মূল সীমাগুলো মেনে চলতে।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে বিশ্বের ৮০ শতাংশেরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড নিয়ন্ত্রণ করে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, চীনের কাছে কমপক্ষে ৬০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে অনুমান করা হয়। এটি নিউ স্টার্টের অধীনে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ৮০০টি করে ওয়ারহেডের সীমাবদ্ধতার চেয়ে অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দূরপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে থাকা আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটছে। এতে নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই ধরনের চুক্তির গুরুত্ব শুধু অস্ত্রের সংখ্যার ওপর সীমা আরোপেই নয়, বরং একটি স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ কাঠামো তৈরির মধ্যেও নিহিত, যা অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে সাহায্য করে।
থিঙ্কট্যাঙ্ক র্যান্ড করপোরেশনের বিশেষজ্ঞ কিংস্টন রিফ এক অনলাইন আলোচনায় বলেন, ‘চুক্তির মাধ্যমে যে ভবিষ্যতের পরিণতি নির্ধারণ হয়, তা না থাকলে প্রতিটি পক্ষ সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। এতে তারা নিজেদের দৃঢ়তা ও শক্তি দেখাতে মোতায়েন করা অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াতে পারে, অথবা কৌশলগত সুবিধা আদায়ের জন্য আলোচনার পথ খুঁজতে পারে।’
ওয়াশিংটনের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিমবল বিশ্বাস করেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া মানে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, ‘এই মেয়াদোত্তীর্ণ চুক্তি শুধু রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই নয়, বরং চীনকেও যুক্ত করে অবাধ ও বিপজ্জনক ত্রিমুখী অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি করবে। চীনের পারমাণবিক কর্মসূচি তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও, তারা অত্যন্ত বিধ্বংসী অস্ত্রভাণ্ডার ক্রমেই বাড়াচ্ছে।’
ড. ঝাও বলেন, চুক্তিটি পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেলে রাশিয়া পারমাণবিক শক্তিচালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার পানির নিচে চলা পারমাণবিক টর্পেডোর মতো নতুন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরিতে এগিয়ে যেতে পারে। তার মতে, এসব ব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রচলিত ও বিশেষভাবে বিপজ্জনক। এমনকি এগুলোর উন্নয়ন ও পরীক্ষার সময়ও বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নজিরবিহীন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে ওয়াশিংটন তার বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীতে অতিরিক্ত পারমাণবিক ওয়ারহেড বসানোর ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাধীনতা পাবে।
রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপ-প্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন, রাশিয়া তার নিরাপত্তার জন্য যে কোনো নতুন হুমকির জবাব দ্রুত ও দৃঢ়ভাবে দেবে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমাদের কথা যদি শোনা না হয়, তাহলে সমতা ফিরিয়ে আনতে আমরা আনুপাতিক পদক্ষেপ নেব।’
তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে (গোল্ডেন ডোম) সম্ভাব্য অস্থিতিশীল পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেন। মহাকাশভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার এই পরিকল্পনা মস্কোর জন্য উদ্বেগের কারণ। এতে পারস্পরিক দুর্বলতার নীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এই নীতিই এতদিন পারমাণবিক প্রতিরোধমূলক সংলাপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
ড্যারিল কিমবল বলেন, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা রাশিয়া ও চীনকে উদ্বিগ্ন করেছে। তিনি বলেন, ‘তারা সম্ভবত গোল্ডেন ডোমের জবাবে এমন ব্যবস্থা নেবে, যাতে তারা এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করতে পারে এবং নিশ্চিত করতে পারে যে, তাদের পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা তাদেরও আছে।’ তিনি আরও বলেন, আক্রমণাত্মক অস্ত্র ব্যবস্থা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার তুলনায় অনেক দ্রুত ও কম খরচে তৈরি করা যায়।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েট প্রেস, সিএনএ
মন্তব্য করুন








