সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মলেনে ‘গাজা বোর্ড অব পিস’ বা ‘শন্তি বোর্ড’ গঠনের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ঘোষণা বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই বোর্ডটি গাজা উপত্যকায় ‘স্থায়ী শান্তি স্থাপন ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গঠিত’ হওয়ার কথা থাকলেও, এর অন্তরালে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা দেখছেন অনেক বিশ্লেষকই।
ট্রাম্পের জামাতা ও মার্কিন বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার গাজাকে যুক্তরাষ্ট্রের আদলে ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতিতে’ গড়ে তোলার একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। পরিকল্পনায় উপকূলজুড়ে উঁচু ভবন, ব্যবসায়িক জেলা ও আধুনিক নগর অবকাঠামোর কথা বলা হয়েছে। ‘নতুন গাজা’র পরিকল্পনা অনুযায়ী, উপত্যকাটির ইউটিলিটি ও জনসেবা খাত উন্নয়নে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হয়েছে।
কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা আসলে ভয়ংকর বিষয়। ব্রিটিশ-ইসরায়েলি বিশ্লেষক ও প্রাক্তন শান্তি আলোচক ড্যানিয়েল লেভির মতে, যুদ্ধ ও গণহত্যার ধ্বংসস্তূপের ওপর বড় কর্পোরেশন ও ধনিদের টাকা কামানোর আরেকটা উদাহরণ হতে পারে এটি। গাজা যুদ্ধে ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ এটাকে গণহত্যা বলে মনে করছে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন ডাচ কার্টুনিস্ট পিটার ডি উইটের ভবিষ্যতের গাজা নিয়ে আঁকা একটি ভয়ংকর কার্টুনের কথা তুলে ধারা হয়। কার্টুনটিতে দেখা যায়, গাজার সুন্দর সৈকতে শুয়ে বাবা-মা রোদ পোহাচ্ছেন। আর তাদের শিশুটি খেলা করার সময় বালির নিচে মানুষের খুলি খুঁজে পাচ্ছে। অর্থাৎ উপরে মনোরম পর্যটন এলাকা হলেও, নিচে লুকিয়ে রয়েছে ভয়াবহ গণহত্যার ইতিহাস। তার ‘গাজা বিচ ২০৩০’ নামের ওই কার্টুনটি গত বছর নেদারল্যান্ডসে সেরা রাজনৈতিক কার্টুন হিসেবে পুরস্কার জিতেছিল।
ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখক সুসান আবুলহাওয়া এই পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো ‘গাজার নিজস্ব আদিবাসী চরিত্র মুছে ফেলা, অবশিষ্ট জনগণকে তাদের ‘শিল্পাঞ্চল’ পরিচালনার জন্য সস্তা শ্রমশক্তিতে পরিণত করা এবং পর্যটনের জন্য একটি একচেটিয়া উপকূল গড়ে তোলা।’
তিনি সোশ্যাল হ্যান্ডেল এক্সে লেখেন, ‘এই ভূমির আদিবাসী ঐতিহ্য ও সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।’ কুশনার বলেন, গাজায় ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতি’ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে হোয়াইট হাউস। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প যে ‘একই মানসিকতা, একই পদ্ধতি’ প্রয়োগ করছেন, সেটিই গাজায় প্রতিফলিত করতে চাওয়া হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবেদ আবু শাহাদেহ বলছেন, শক্তিশালী সত্তা যুদ্ধ আর বিপর্যয়কে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে, এটা নতুন কিছু না। তিনি নাওমি ক্লেইনের বিখ্যাত বই ‘দ্য শক ডকট্রিন: দ্য রাইজ অব ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম’ উদ্ধৃত করে বলেন, বইটি খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে কীভাবে বড় শক্তিগুলো বিপর্যয় থেকে মুনাফা নেয়।
তার মতে, কর্পোরেশনগুলো (বিশেষ করে আমেরিকান কোম্পানি) দুর্যোগকে মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে নয়, বরং বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখে। সাধারণ মানুষ যেখানে মৃত্যু আর ধ্বংস দেখে দুঃখ পায়, তারা সেখানে জমি দখল, অ্যাপার্টমেন্ট নেওয়া, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ দেখে। আবু শাহাদেহ আরও বলেন, এই লাভ শুধু আমেরিকান বা ইসরায়েলিরাই পাবে না। বিভিন্ন দেশের ধনী মানুষ এতে জড়িত হবে। এমনকি আরব ব্যবসায়ী ও কিছু ধনী ফিলিস্তিনিও এই ধরনের প্রকল্প থেকে লাভবান হতে পারে।
চুপ থাকবে না হামাস
বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, কুশনার যে ‘মুক্ত বাজার গাজা’ বানানোর কথা বলছেন, বাস্তবে তা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ রাজনৈতিক, সামরিক ও বাস্তব পরিস্থিতি এত জটিল যে শুধু ব্যবসা আর উন্নয়নের পরিকল্পনা দিয়ে সেটি বাস্তবায়ন করা কঠিন। ডাভোসে বক্তৃতায় ট্রাম্প-জামাতা বলেছেন, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে ধাপে ধাপে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ না করা পর্যন্ত গাজার পুনর্গঠন শুরু হবে না। অর্থাৎ, আগে হামাসকে অস্ত্র ছাড়তে হবে, তারপর উন্নয়নের কাজ।
কিন্তু গাজা যুদ্ধের কারণে পদত্যাগ করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা অ্যানেল শেলিন মনে করেন, ‘এটিই সবচেয়ে বড় বাধা’। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণে রাজি হবে আশা করা অবাস্তব। বরং তিনি চান হামাস তাদের ঘোষিত অবস্থানেই অটল থাকুক।
শেলিন আরও বলেন, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ব্যাপক বেসামরিক ক্ষতি সত্ত্বেও যুদ্ধ চালিয়েছে, কিন্তু তবুও হামাসকে আত্মসমর্পণ বা নিরস্ত্রীকরণে বাধ্য করতে পারেনি। তাই অন্য কোনো শক্তি এসে এটি করতে পারবে এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। তিনি ট্রাম্পের ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের ব্যর্থতার কথাও মনে করিয়ে দেন। সেই ব্যর্থ যুদ্ধগুলোই ট্রাম্পকে আমেরিকান জনগণের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল, কারণ অনেক আমেরিকান তখন বিদেশি যুদ্ধ ও ‘অর্থহীন মিশনে’ বিরক্ত ছিল।
মন্তব্য করুন








