এক দশকেরও বেশি বিরতির পর আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু করতে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এই রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ায় যাত্রীদের যাত্রাসময় যেমন কমবে, তেমনি ভাড়ায় সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
বিমান সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-করাচি রুটে একমুখী টিকিটের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ৮৯৯ টাকা। আর রাউন্ড ট্রিপ টিকিটের দাম শুরু হবে ৫৬ হাজার ৯০৩ টাকা থেকে। বর্তমানে ট্রানজিট হয়ে যাতায়াতের তুলনায় এই ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন হাব হয়ে ইকোনমি ক্লাসে ঢাকা-করাচি ফিরতি টিকিটের দাম পড়ছে ৮৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আসন সংকট ও বিদেশি এয়ারলাইনসের ওপর নির্ভরতার কারণেই ভাড়া এতটা বেড়ে গেছে।
ইনোগ্লোব ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলের সিইও এবং ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) পরিচালক মো. তসলিম আমিন বাসসকে জানান, সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের দুবাই, দোহা কিংবা শারজার মতো শহর হয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে। এতে যাত্রার সময় ও ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইটে সাধারণত সময় লাগে চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা। কিন্তু ট্রানজিটের কারণে বর্তমানে যাত্রীদের সাড়ে ৮ ঘণ্টা থেকে ১৩ ঘণ্টা, কখনো কখনো ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।
ট্রাভেল এজেন্টদের মতে, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। ভবিষ্যতে অন্যান্য এয়ারলাইনস এই রুটে ফ্লাইট চালু করলে ভাড়া আরও নিয়ন্ত্রণে আসবে।
বিমান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা-করাচি রুটটি প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলক বা ‘কৌশলগত পর্যবেক্ষণ’ ভিত্তিতে চালু করা হচ্ছে। আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত দুই মাস ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে ট্রায়াল হিসেবে।
বিমানের বিপণন ও বিক্রয় পরিচালক আশরাফুল আলম বলেন, ইতোমধ্যে যাত্রীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম ফ্লাইটের ৮০ শতাংশের বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।
এই পরীক্ষামূলক সময়ে যাত্রী চাহিদা, লোড ফ্যাক্টর এবং সামগ্রিক বাণিজ্যিক কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা হবে। এসব পর্যালোচনার ভিত্তিতেই রুটটি স্থায়ী করা হবে কি না এবং ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে, সর্বশেষ ২০১২ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-করাচি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল। তবে যাত্রী সংকট ও লোকসানের কারণে সে সময় সেবা বন্ধ হয়ে যায়। কর্মকর্তারা বলছেন, আগের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আরও সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে দুই দিন (বৃহস্পতিবার ও শনিবার) এই রুটে ফ্লাইট চলবে। ঢাকা থেকে রাত ৮টায় ফ্লাইট ছেড়ে রাত ১১টায় করাচিতে পৌঁছাবে। করাচি থেকে রাত ১২টায় ছেড়ে পরদিন ভোর ৪টা ২০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিমানের জনসংযোগ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার বুশরা ইসলাম জানান, যাত্রীদের সুবিধা বিবেচনায় এমন সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কম সময়ে এবং ট্রানজিট ঝামেলা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছানো যায়।
তিনি বলেন, এই সরাসরি ফ্লাইট যাত্রীদের ভ্রমণ সহজ করার পাশাপাশি পর্যটন ও ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিমানের বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ফ্লাইট পুনরায় চালুর আগে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের মধ্যে কয়েক মাস ধরে কূটনৈতিক ও কারিগরি আলোচনা চলে। এরপরই আকাশপথ ব্যবহারের অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
ঢাকা-করাচি রুট পুনরায় চালু হওয়াকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এই রুট চামড়া রপ্তানি, কৃষিপণ্য বাণিজ্য এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পারিবারিক ভ্রমণ, ধর্মীয় পর্যটন ও চিকিৎসা ভ্রমণও সহজ হবে, যা এতদিন উচ্চ ভাড়া ও দীর্ঘ যাত্রার কারণে সীমিত ছিল।
মন্তব্য করুন








