চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার জহুরপুর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গবাদিপশু চোরাচালান কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন ভারত থেকে পাচার হয়ে আসছে শত শত গরু-মহিষ। বিজিবির অভিযানে মাঝেমধ্যে কিছু চালান ধরা পড়লেও বিশাল একটি অংশ জনচক্ষুর অন্তরালে দেশের বিভিন্ন হাটে পৌঁছে যাচ্ছে।
এই সীমান্ত এলাকাটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন। এই ব্যাটালিয়নের জহুরপুর সীমান্ত এলাকাসহ অন্তত ৩৭ কিলোমিটারজুড়ে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। এসব অরক্ষিত এলাকা ও নদীপথকে পুঁজি করে দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে চোরাচালান সিন্ডিকেট।
খামারিরা জানান, ভারত থেকে এভাবে অবৈধ পথে গবাদিপশু আসায় দেশের প্রাণিসম্পদ খাত মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দেশীয় খামারিরা দীর্ঘ প্রচেষ্টায় পশুপালনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও চোরাচালানের সস্তা গরুর কারণে তারা বাজারে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে অনেক খামারি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। এর বাইরেও সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে মারাত্মক সব সংক্রামক ব্যাধি। কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা না থাকায় এসব চোরাচালানের গরুর মাধ্যমে দেশীয় গবাদিপশুর মধ্যে খুরা রোগসহ লাম্পি স্কিন ডিজিজের মতো ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার খামারি রহমত আলী বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে ধার-দেনা করে গরু লালনপালন করি। আশা থাকে গরু বিক্রি করে দুই পয়সা লাভ করব। কিন্তু সীমান্ত দিয়ে যখন ইন্ডিয়ান গরু ঢোকে, তখন বাজারে গরুর দাম একদম কমে যায়।
আরেক খামারি মতিউর রহমান বলেন, এভাবে ভারতীয় গরু আসতে থাকলে ছোট খামারিদের পথে বসতে হবে। এ ছাড়া অন্যদেশ থেকে আসা গরুর অসুখ-বিসুখ থাকলে আমাদের গরুর জন্য বড় বিপদ।
বিজিবির অভিযানের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের শুরু থেকে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৫৩ বিজিবি বিভিন্ন সীমান্তে অভিযান চালিয়ে মোট ৭৯টি গরু ও ২৫টি মহিষ জব্দ করেছে। এরমধ্যে গত বছরের ২৩ জানুয়ারি জহুরপুর সীমান্তে ৬টি মহিষ জব্দের মধ্য দিয়ে বছর শুরু হয়। ধারাবাহিকভাবে ২০ ফেব্রুয়ারি ১০টি মহিষ, ১০ এপ্রিল ১০টি গরু এবং ৪ অক্টোবর পদ্মা নদী থেকে ৭টি মহিষ আটক করা হয়। এ ছাড়াও বছরের শেষ দিকে মাসুদপুর ও হাকিমপুর সীমান্তে অভিযানে ৪ জন বাংলাদেশি ও ২ জন ভারতীয় চোরাকারবারিকে আটক করা হয়। চলতি বছরের ১৯ দিনের মধ্যে বিজিবি আরও ৩৩টি গরু উদ্ধার করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জহুরপুর সীমান্ত এলাকায় এ অবৈধ কারবার নিয়ন্ত্রণের নেপথ্যে কাজ করছে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। জহুরপুর বিওপি এলাকার সাদেক, আবু, ইকবাল ও মামুন এবং জহুরপুরটেক সীমান্তের ডলার, মুকুল, কুতুবুল ও তৌহিদ এই সিন্ডিকেটের হোতা হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ উঠেছে, চোরাচালানের মূলে থাকা এই ৮ হোতা বিভিন্ন দপ্তরকে ম্যানেজ করার নামে গরুপ্রতি ১৫-২০ হাজার টাকা উঠাচ্ছে। চোরাচালানে যুক্ত থাকার বিষয়ে কয়েকজনের স্বীকারোক্তিও পেয়েছে এপি নিউজ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন চোরাকারবারি জানান, তারা মূলত গভীর রাত বা ভোরের ঘন কুয়াশাকে কাজে লাগিয়ে গরু পাচার করে। নদীপথে অনেক সময় কলাগাছের ভেলা তৈরি করে গরু পারাপার করা হয়। ভারত থেকে গরু আনার পর সেগুলো সরাসরি হাটে না নিয়ে প্রথমে সীমান্ত-সংলগ্ন আম বাগান বা ফসলি জমিতে লুকিয়ে রাখা হয়। এরপর সিন্ডিকেটের নিয়োগ করা লাইনম্যানদের সংকেত অনুযায়ী রাতের অন্ধকারে ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পাচার করা এই গরুগুলোর একটি বড় অংশ জেলার স্থানীয় পশুর হাটগুলোতেই কৌশলে দেশি গরু হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে রক্ষা করতে এই চিহ্নিত সিন্ডিকেট সদস্যদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে, দেশীয় পশু সম্পদ ভয়াবহ হুমকির মধ্যে পড়বে।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সীমান্তে চোরাচালান দমনে বিজিবি সবসময় সজাগ রয়েছে। গত ১ মাস ধরে জহোরপুর সীমান্ত এলাকায় লোকবল বাড়িয়ে শীতের রাতে কুয়াশায় নাইট ভিশন, গগলস ব্যবহারের মাধ্যমে টহল জোরদার করা হয়েছে। এরই ফলশ্রুতিতে গত এক বছরে আমরা বিপুল পরিমাণ গবাদিপশু ও মাদকসহ বেশ কয়েকজন চোরাকারবারিকে আটক করতে সক্ষম হয়েছি। এরপরেও নদীপথ ও দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় প্রতিকূল পরিবেশের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা চোরাচালান করে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবির এই কঠোর নজরদারি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
মন্তব্য করুন








