রমজান এলেই খাবারের সময়সূচি বদলে যায়, বদলে যায় দৈনন্দিন রুটিনও। শীত থাকতে থাকতে রমজান পড়লে রোজার সময় তুলনামূলক কম ও আরামদায়ক হয়, ফলে শারীরিকভাবে রোজা রাখা অনেকের জন্য সহজ হয়। তবে চিকিৎসকদের মতে, একটি বড় সমস্যা প্রায়ই আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। সেটি হলো ঘুমের অনিয়ম।
চিকিৎসকরা বলছেন, রমজানে অনেক মানুষ ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মন খারাপ থাকা ও কাজে মনোযোগের অভাবে ভোগেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর মূল কারণ রোজা নয়, বরং ঘুমের সময় ও অভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন। এ বিষয়ে থাকছে চিকিৎসকদের কিছু পরামর্শ।
ধীরে ধীরে ঘুমের সময় বদলানো জরুরি
রমজান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ ঘুমের সময় বদলে ফেলা ঠিক নয়। আমাদের শরীর একটি নির্দিষ্ট জৈব ঘড়ি অনুযায়ী চলে। হঠাৎ ঘুমের সময়ের পরিবর্তনে বা ঘুমের ঘাটতিতে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে, মনোযোগ কমে যায় এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, রমজানের কয়েক দিন আগে থেকেই প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০ মিনিট করে ঘুমানোর ও ওঠার সময় এগিয়ে নেওয়া। এতে সাহরির সময় ঘুম থেকে উঠতে শরীর ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
রাতে অন্তত টানা চার থেকে ছয় ঘণ্টা একই সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করা ভালো। দিনে পরে অল্প ঘুম হলেও এই মূল ঘুম শরীরের হরমোনের ভারসাম্য, শক্তি ও বিশ্রামের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আলো, খাবার ও স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাব
ঘুমের মান ভালো রাখতে আলো একটি বড় ভূমিকা রাখে। ঘুম থেকে ওঠার পর উজ্জ্বল আলো শরীরকে সজাগ করে, আর সন্ধ্যার দিকে কম আলো মেলাটোনিন হরমোন তৈরি হতে সাহায্য করে, যা ঘুম আনে।
রাতে ভারী খাবার, অতিরিক্ত মোবাইল বা যে কোনো স্ক্রিনের ব্যবহার এবং অতিরিক্ত উত্তেজনাকর কাজ ঘুমের সমস্যা বাড়ায়। ভাঙা ভাঙা ঘুম হলেও একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মোট ঘুমের প্রয়োজন দিনে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা।
ঘুমের অভাব কীভাবে শরীরে প্রভাব ফেলে
অনেকে রমজানে খাবারের দিকে বেশি নজর দেন, কিন্তু ঘুমকে গুরুত্ব দেন না। চিকিৎসকদের মতে, ভালো খাবার খেয়েও যদি ঘুম ঠিক না হয়, তাহলে শরীর ক্লান্তই থাকবে।
অনিয়মিত ঘুম শরীরের ভেতরের ঘড়িকে (সার্কাডিয়ান রিদম হলো শরীরের ভেতরের একটি স্বাভাবিক ঘড়ি, যা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘুম ও জাগরণের সময়সূচি এবং শরীরের বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।) বিভ্রান্ত করে। এতে শক্তি কমে যায়, মন ভালো থাকে না এবং ক্ষুধার অনুভূতিতেও পরিবর্তন আসে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মানুষ সহজেই বিরক্ত, অস্থির ও মানসিকভাবে দুর্বল অনুভব করে। শারীরিকভাবে মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, কম শক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
ঘুম পুষিয়ে নিতে ঘুমানো, তবে বুঝেশুনে
রমজানে একটি কার্যকর ঘুমের রুটিন হতে পারে। যেমন রাতে এশার পর মূল ঘুম, সাহরির জন্য ওঠা, সুযোগ থাকলে আবার কিছুক্ষণ ঘুম এবং প্রয়োজনে দিনে ছোট একটি বা দুটি ঘুম।
২০ থেকে ৩০ মিনিটের ছোট দুপুরের ঘুম মনোযোগ ও শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। তবে সন্ধ্যার দিকে বা দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতে ঘুম আসতে সমস্যা হয়। বারবার এলোমেলোভাবে ঘুমানো শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে এবং উল্টো আরও ক্লান্তি তৈরি করতে পারে।
আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার
চিকিৎসকরা মনে করেন, রমজানের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ঘুমের রুটিন ঠিক করা সবচেয়ে ভালো। ছোট ছোট পরিবর্তনই বড় উপকার এনে দেয়। ঘুমকে গুরুত্ব দিলে রোজা রাখা সহজ লাগে, শক্তি স্থির থাকে এবং মানুষ রমজানের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দিকগুলোর দিকে বেশি মন দিতে পারে।
রমজানে ঘুম নিয়ে যেসব ভুল হয়
- অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দেওয়া বা মোবাইল স্ক্রল করতে থাকা
- ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার, যা নীল আলো ছড়িয়ে ঘুমের হরমোন কমায়
- রাতে ভারী, ভাজাপোড়া, ঝাল বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া
- ঘুমের কাছাকাছি সময়ে চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক বা নিকোটিন গ্রহণ
- ইফতার ও সাহরির মাঝখানে পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া
ভালো ঘুমের জন্য করণীয়
- রাত জাগা অভ্যাস কমিয়ে ঘুমকে অগ্রাধিকার দিন
- রাতে হালকা ও পরিমিত খাবার খান, যাতে হজম সহজ হয়
- ঘুমের অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে উত্তেজক পানীয় ও অভ্যাস এড়িয়ে চলুন
- ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করুন
- ভাঙা ঘুম হলেও একটি নির্দিষ্ট মূল ঘুমের সময় ধরে রাখার চেষ্টা করুন
রমজানে সুস্থ ও সতেজ থাকতে শুধু খাবারের দিকে নজর দিলেই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত ও মানসম্মত ঘুম শরীর ও মনের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। আগেভাগে ঘুমের রুটিন ঠিক করা, ছোট অভ্যাস বদলানো এবং ঘুমকে গুরুত্ব দিলে রোজা রাখা যেমন সহজ হবে, তেমনি পুরো রমজান কাটবে আরও শান্ত ও স্বস্তিতে।
সূত্র: গালফ নিউজ
মন্তব্য করুন








