ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ‘কুয়াশার গান’ শিরোনামে একটি চ্যারিটি কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক প্রত্যয়ে স্পিরিটস অব জুলাই ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) যৌথ আয়োজনে শনিবার এই কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। তবে কনসার্টে সিগারেট বিতরণ নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে।
মূলত, কনসার্ট চলাকালে স্পন্সরে থাকা এক তামাক কোম্পানির ছায়া প্রতিষ্ঠান ‘এক্স ফোর্স’-এর করা স্মোক জোন ও বিনামূল্যে সিগারেট বিতরণকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এবার মুখ খুলেছেন নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের’ (এনপিএ) কাউন্সিল সদস্য ও সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মেঘমল্লার বসু।
রোবাবর (১৮ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ডাকসুর কনসার্টে আবুল খায়ের গ্রুপের স্টল বসানোর বিষয়টিকে স্রেফ স্ববিরোধিতা বা হিপোক্রেসি হিসেবে দেখলে সেটা খুবই নাইভ কাজ হবে।
মনে রাখা দরকার যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সিগারেট বিক্রি করে তাদের থেকে প্রক্টরিয়াল টিম অন্যায্য চাঁদা উত্তোলন করেই ক্ষান্ত হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে ডাকসুর নেতাহাতা ও সহকারী প্রক্টররা তাদের মাল-সামান পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছেন, নষ্ট করেছেন। কাল যদি সকল স্মল ভেন্ডরকে তাড়ানো সম্ভব হয়, তখন ‘সমাধান’ হিসেবে আবুল খায়ের বা স্বয়ং ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর উদ্যোগে ছোট ছোট স্মোকিং জোন বানিয়ে তাদের প্রোডাক্ট পুশ করার একটা ব্যবস্থা করে দিলেও অবাক হব না। শ্রেণি সচেতনতাহীন লিবারেলদের একটা অংশ সেটাকে সাধুবাদও জানাতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ হাজার ভোক্তাকে বড় পুঁজির হাতে তুলে দেওয়াটা জামায়াতিদের আসল এজেন্ডা। কিন্তু যতদিন চারুকলার সামনে ১০ থেকে ২০ টাকায় চিকেন ফ্রাই পাওয়া যাবে ততদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেএফসি ব্যবসা করতে পারবে না। সাকিবের দোকানে ২০ থেকে ৩০ টাকায় বাহারি চা পাওয়া গেলে কোনোদিনই এখানে গ্লোরিয়া জিনসের শাখা খুলবে না। বিভিন্ন ছোট ভেন্ডরকে এ জন্যই তাড়ানো এত জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলাপান লেবুর শরবতও কিনবে, চিকেন ফ্রাইও খাবে, ধূমপানও করবে। প্রশ্ন হচ্ছে এগুলা কারা বিক্রি করবে?
ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা পৃথিবীর সব দেশেই বৃহৎ পুঁজির পক্ষে থাকার একটা কভার। বামপন্থিদের সব কিছুতেই পুঁজি ও শ্রেণি বিষয়ক ‘কুমিরের রচনা’ আপনাদের কাছে নিশ্চয়ই ক্লিশে লাগবে। কিন্তু তাতে এই আখেরি পুঁজিবাদের জমানায় তার প্রাসঙ্গিকতা এক ফোটাও কমবে না।

এর আগে, কনসার্টে সিগারেট বিতরণকে কেন্দ্র করে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ তার ফেসবুকে জানান, প্রথমেই সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা ও সিগারেট বিতরণকেন্দ্রিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। যদিও ডাকসু ও স্পিরিট অব জুলাইয়ের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘কুয়াশার গান’ কনসার্টে স্পন্সরের সঙ্গে যোগাযোগ, চুক্তি বা শর্ত নির্ধারণসংক্রান্ত কোনো আলোচনায় আমি ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম না এবং কনসার্টটি আয়োজনে ডাকসুর শুধু আমিই যুক্ত ছিলাম।
আমি যখন কনসার্টটিতে সম্পৃক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই তখন ডাকসুর যে কয়জনের সঙ্গে আলাপ করি তাদের প্রত্যেকেই এতে অপোজ (বিরোধিতা) করে। কিন্তু তারপরও ‘যেসব শিক্ষার্থী কনসার্ট পছন্দ করে তাদের জন্য কনসার্ট আয়োজন করা উচিত’ এই চিন্তা থেকে আমি দৃঢ়তার সাথে কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করি।
এর আগে নভেম্বরের লাস্ট সপ্তাহে আমি ৩ দিনব্যাপী একটি কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম (মাসখানেক দৌড়ে পুরো কনসার্টের ব্যয়ভারও ম্যানেজ হয়ে যায়)। তখন শেষ মুহূর্তে ডাকসুর ভিপি এবং জিএস দুজনই আমাকে জানান এটি না করতে। তখন আমি তাদের কথা অনুযায়ী কনসার্টটি না করে শিল্পী এবং স্পন্সরদের না করে দেই। কিন্তু শিক্ষার্থীদের একটা অংশের ক্রমাগত প্রত্যাশা যে, ঢাবিতে একটি কনসার্ট হোক। সে প্রত্যাশা পূরণ করতেই ‘দ্য স্পিরিট অব জুলাই’-এর সঙ্গে যৌথ আয়োজনে রাজি হই।
এবারও ডাকসু ভিপি এবং বেশ কয়েকজন নেতা এই সিদ্ধান্তের আপত্তি জানালে আমি এক প্রকার জোর করেই এই কনসার্টটি আয়োজন করি। সুতরাং সম্পূর্ণ ডাকসু এতে যুক্ত ছিল না— পুরো ডাকসুকে এর জন্য দোষারোপ করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এ ছাড়া আজকের কনসার্টে আমি ছাড়া ডাকসুর আর কেউ মঞ্চে উপস্থিতও ছিলেন না। ডাকসুর ভিপিকে বারবার অনুরোধ করলেও তিনি অসুস্থতাবোধ করছেন বলে আসতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অন্য নেতাদের আহ্বান জানালেও তারা কেউ মঞ্চে আসেননি।
আমি ব্যক্তিগতভাবে কনসার্টের স্পনসর প্রতিষ্ঠান ‘এক্স ফোর্স’ সম্পর্কে খোঁজ নেই এবং ঘাঁটাঘাঁটি করে অনলাইন অফলাইনে কিছুই খুঁজে পাইনি (আমার খোঁজার উদ্দেশ্য ছিল পেপসি কিংবা কোকাকোলা এই টাইপের কোনো বিতর্কিত কিংবা ফ্যাসিবাদের বা গণহত্যার সহযোগী প্রতিষ্ঠান কিনা এটা যাচাই করা)। ‘এক্স ফোর্স’ বেশ কিছুদিন আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও একটি কনসার্ট আয়োজন করে। সেখানে কোনো নেতিবাচক বিষয় ঘটে থাকলে অবশ্যই ঘাঁটাঘাঁটিতে নজরে আসার কথা ছিল। কিন্তু আমি সে রকম কিছুই খুঁজে পাইনি।
স্পিরিটস অব জুলাই ২০২৪ সালে আর্মি স্টেডিয়ামে রাহাত ফাতেহ আলী খানকে নিয়ে ‘ইকোস অব রেভল্যুশন’ কনসার্ট আয়োজন করে। সেই কনসার্ট থেকে আয়কৃত ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সহায়তার জন্য প্রদান করে। এ জন্য তাদের প্রতি আমার সফটনেস ও আস্থা ছিল।
আমি তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে ‘এক্স ফোর্স’ কী ধরনের প্রতিষ্ঠান? তাদের উত্তর ছিল এটা লাইফ স্টাইল প্রতিষ্ঠান, সম্পূর্ণ নতুন তৈরি হয়েছে। তারা ব্র্যান্ড প্রমোশন করার জন্য দেশব্যাপী বিভিন্ন স্থানে কনসার্ট আয়োজন করছে। তো স্বাভাবিকভাবেই আমি এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে ‘স্পিরিট অব জুলাই’-এর সঙ্গে একত্রে কাজ করতে সম্মত হই।
এরপর আমরা কনসার্টটি পাবলিকলি অ্যানাউন্স করি প্রোগ্রামের দুই দিন আগে। তখন আমাদের যারা সমালোচনা করেন, ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে শুধরে দিতে চান আমার সেসব বন্ধ এই প্রোগ্রাম নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। কোন ব্যান্ড ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত ছিল, কোন ব্যান্ড ফ্যাসিবাদের সপক্ষে পোস্ট করেছে তার প্রত্যেকটিই খুঁটিনাটি বিষয় উল্লেখ করে আমাকে ফেসবুক পোস্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অবহিত করলে আমরা অনেক পরিশ্রমের মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যান্ডগুলো রিপ্লেস করে শুধরে নেই। সে-সময়ে যদি কেউ ধরিয়ে দিতেন যে, ‘এক্স ফোর্স’ এই ধরনের কাজ করে থাকে তাহলে আমরা এটা থেকেও সরে আসতে পারতাম, শুধরে নিতে পারতাম। যে বিষয়গুলো ঘটেছে প্রত্যেকটিই ঘটেছে আমার জানার ঘাটতি থাকার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে।
‘এক্স ফোর্স’ বলেছিল সংগীতানুষ্ঠানের মাঠে তারা একটা ‘এক্সপেরিয়েন্স জোন’ করবে সেখানে বক্সিংসহ অনেকগুলো ইভেন্ট এবং ‘একটি স্মোকিং’ জোন করবে যাতে কনসার্টে আসা অন্যদের ধূমপানের কারণে কোনো সমস্যা না হয়। আমি এটা শুনে অনেক বেশি ইতিবাচক হই। আমি কনসার্টের পুরোটা সময় ধরে গেস্ট ও স্টেজ ম্যানেজমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মাঠে কী হচ্ছিল সে ব্যাপারে অবগত ছিলাম না। কনসার্টের শেষদিকে আমি ফেসবুকে দেখতে পাই যে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তখন আর কিছু করার সুযোগ ছিল না। আমি অবগত ছিলাম না যে তারা স্মোকিং জোনের ভেতরে ফ্রিতে সিগারেট দেবে শিক্ষার্থীদের।
এই মিসম্যানেজমেন্টের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে আমি আরও সতর্ক, দায়িত্বশীল ও সমন্বিত ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করব। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সম্মান ও প্রত্যাশা পূরণই আমার প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য।
আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রতিটি আয়োজন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করেই পরিচালিত হওয়া উচিত। এই নীতিতে অটল থেকেই আমি সামনে এগিয়ে যেতে চাই।
আজকের আয়োজনে হওয়া ভুলত্রুটির সমালোচনা করে আমাকে শুধরে দেওয়ায় শুভাকাঙ্ক্ষীদের ধন্যবাদ জানাই। যৌক্তিক সমালোচনাকে আমরা সবসময় সাদরে গ্রহণ করতে চাই। আমার সামনের পথচলায় ও আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত পরামর্শ আমার কাম্য। পরিশেষে সবার কাছে আবারও দুঃখ প্রকাশ করছি।
মন্তব্য করুন








