চলতি সপ্তাহে মার্কিন আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থা মেটা, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম টিকটক ও ইউটিউব। অভিযোগ, প্ল্যাটফর্মগুলো তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট বাড়িয়ে তুলছে। শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ে বিতর্ক যখন তীব্র হচ্ছে, তখন এই মামলায় নতুন করে সামাজিক মাধ্যমগুলোর দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির ক্যালিফোর্নিয়া সুপিরিয়র কোর্টে কেজিএম নামের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী মামলাটি দায়ের করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ছোট বয়স থেকেই এসব অ্যাপের আকর্ষণকারী ডিজাইনের কারণে তিনি আসক্ত হয়ে পড়েন। তার অভিযোগ, এসব প্ল্যাটফর্ম তার হতাশা ও আত্মহত্যার চিন্তাকে উসকে দিয়েছে। এ জন্য কোম্পানিগুলোকে দায়ী করা উচিত।
বাদীপক্ষ বলছে, শিশুদের মধ্যে ‘সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি’ নিয়ে যে কয়েকটি আলোচিত মামলা চলতি বছর শুনানিতে যাওয়ার কথা রয়েছে, তার মধ্যে এটিই প্রথম। আইনজীবী ম্যাথিউ বার্গম্যান বলেন, এই মামলায় প্রথমবার প্রযুক্তি জায়ান্টদের আদালতে তাদের পণ্যের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে। তিনি বলেন, কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় যে ধরনের তদন্ত হয়, তার চেয়েও কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মুখে পড়বে তারা।
বিচারকার্যে বিচারকরা দেখবেন যে, কোম্পানিগুলো কি মানসিক ক্ষতি করতে পারে এমন পণ্য সরবরাহে গাঁ ঢিলেমি করেছে, এবং এসব অ্যাপ কেজিএমের হতাশার প্রধান কারণ কিনা। একই সঙ্গে অন্যান্য কারণ, যেমন অ্যাপে দেখা কনটেন্ট বা তার অফলাইন জীবনের পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এই মামলাকে বিশেষজ্ঞরা ‘পরীক্ষামূলক মামলা’ বলে অভিহিত করেছেন। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের আইনজীবী ক্লে ক্যালভার্ট বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম সত্যিই ক্ষতি করেছে কিনা এই তত্ত্ব আদালতে কতটা টিকে থাকে, সেটাই দেখা হবে।
মেটার আইনজীবীরা বলছেন, তাদের প্ল্যাটফর্ম কেজিএমের মানসিক সমস্যার কারণ নয়, তারা এটাই আদালতে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন। স্ন্যাপের সিইও ইভান স্পিগেলের সাক্ষ্য দেওয়ার কথা থাকলেও, কোম্পানিটি ২০ জানুয়ারি কেজিএমের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে। যদিও সমঝোতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ইউটিউব জানিয়েছে, তারা যুক্তি দেবে যে তাদের প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো সামাজিক মাধ্যম থেকে মৌলিকভাবে আলাদা, তাই আদালতে তাদের এক কাতারে ফেলা উচিত নয়।
মামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি টিকটক।
এদিকে মামলার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রযুক্তি কোম্পানি জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তারা দাবি করছে, তাদের প্ল্যাটফর্ম কিশোরদের জন্য নিরাপদ এবং অভিভাবকদের জন্য নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন টুল চালু করেছে। এসব ফিচার প্রচারে তারা মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে।
মেটা ২০১৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্কুলে অভিভাবকদের জন্য অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মশালা স্পনসর করছে। ২০২৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে ‘স্ক্রিন স্মার্ট’ কর্মশালা আয়োজন করে, যেখানে ন্যাশনাল পিটিএ এবং মেটার নিরাপত্তা প্রধান উপস্থিত ছিলেন।
টিকটকও ‘ক্রিয়েট উইথ কাইন্ডনেস’ নামে কর্মসূচি চালু করেছে, যেখানে অভিভাবকদের জন্য টিউটোরিয়াল দেওয়া হয়। এমনকি রাতে স্ক্রিন টাইম সীমিত করার ফিচারও শেখানো হয়।
ইউটিউবের মূল কোম্পানি গুগল গার্ল স্কাউটসের সঙ্গে কাজ করছে, যেখানে মেয়েরা শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, ডিজিটাল গোপনীয়তা ও অনলাইনে সদাচরণ বিষয়ে শিক্ষা পেলে বিশেষ প্যাচ অর্জন করতে পারে। এই কোম্পানিগুলো উচ্চ-প্রোফাইল আইনজীবীও নিয়োগ করেছে, যারা আগে ওপিওয়েড ও ভিডিও গেম আসক্তি সংক্রান্ত বড় মামলায় কর্পোরেট পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
মাদার্স অ্যাগেইনস্ট মিডিয়া অ্যাডিকশনের প্রতিষ্ঠাতা জুলি স্কেলফো বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নানা ধরনের প্রভাব খাটাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে। বিশেষ করে যাদের উপর অভিভাবকদের আস্থা রাখা উচিত।
মন্তব্য করুন







