লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ছিল অসাধারণ প্রতিভা। তিনি একসঙ্গে শিল্পী, আবিষ্কারক ও অ্যানাটমি বিশেষজ্ঞ ছিলেন। রেনেসাঁ যুগের এই মানুষটির চিন্তাভাবনা ও কাজ আজও মানুষকে বিস্মিত করে। বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন তার প্রতিভার পেছনে থাকা জিনগত রহস্য খুঁজে বের করতে। তবে সমস্যা হলো, তার মৃত্যুর ৫০০ বছরেরও বেশি সময় পরে ডিএনএ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লিওনার্দো ১৫১৯ সালে মারা যান। তার কোনো সন্তান ছিল না। ফ্রান্সের অ্যাম্বোইজ শহরের সেন্ট ফ্লোরেন্টিন চ্যাপেলে তার কবর ছিল, যা ফরাসি বিপ্লবের সময় ধ্বংস হয়ে যায়। কিছু হাড় উদ্ধার করে আবার কবর দেওয়া হয়েছিল বলে শোনা যায়, কিন্তু সেগুলো সত্যিই তার কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
এই অনিশ্চয়তার কারণে বিজ্ঞানীরা সরাসরি তার দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করতে পারেননি। তাই তারা ভিন্ন একটি পথ বেছে নিয়েছেন।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি প্রজেক্টে যুক্ত বিজ্ঞানীরা তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন জিনিস থেকে ডিএনএ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। লিওনার্দো জীবনে অনেক ছবি, আঁকিবুঁকি ও চিঠি লিখে গেছেন। তিনি যেসব জিনিস স্পর্শ করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে আজও তার জিনগত উপাদানের সামান্য অংশ থেকে যেতে পারে।
গবেষকরা তার এক আত্মীয়ের লেখা চিঠি এবং একটি আঁকা ছবি পরীক্ষা করেন, যার নাম ‘হোলি চাইল্ড’। কেউ কেউ মনে করেন ছবিটি লিওনার্দোর আঁকা, আবার অনেক বিশেষজ্ঞ তা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন।
এই চিঠি ও ছবিতে বিজ্ঞানীরা ব্যাকটেরিয়া, গাছ, প্রাণী ও ছত্রাকের ডিএনএ খুঁজে পান। পাশাপাশি একটি পুরুষের ওয়াই ক্রোমোজোমের মিল থাকা অংশও পাওয়া যায়। এই গবেষণার ফলাফল জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়, যদিও এটি এখনও চূড়ান্তভাবে যাচাই করা হয়নি।
গবেষকরা দাবি করেননি যে এই ডিএনএ নিশ্চিতভাবে লিওনার্দোর। তবে তারা মনে করেন, এই পদ্ধতিটি ভবিষ্যতে আরও শিল্পকর্ম বিশ্লেষণের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। যদি একই ধরনের ওয়াই ক্রোমোজোম বারবার বিভিন্ন বস্তুতে পাওয়া যায়, তাহলে লিওনার্দোর জিনগত কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, লিওনার্দোর দৃষ্টিশক্তি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ছিল। তার শিল্পকর্মে সূক্ষ্ম বিবরণ ও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ এই ধারণাকে শক্তিশালী করে। গবেষকরা জানতে চান, এই অসাধারণ ক্ষমতার পেছনে কোনো জিনগত সুবিধা ছিল কি না।
শিল্পকর্ম থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা খুবই সংবেদনশীল কাজ। তাই গবেষকরা প্রথমে এমন পদ্ধতি খুঁজেছেন, যাতে ক্ষতি না করে ডিএনএ সংগ্রহ করা যায়। নানা পরীক্ষা শেষে তারা শুকনো তুলা দিয়ে আলতো করে মুছে ডিএনএ সংগ্রহের পদ্ধতিকে সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে করেন।
‘হোলি চাইল্ড’ ছবিটি থেকে পাওয়া ডিএনএ গত ৫০০ বছরে ছবিটি কোথায় তৈরি ও সংরক্ষিত হয়েছে, সে সম্পর্কেও ধারণা দেয়। এতে এমন গাছ ও প্রাণীর চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা ইতালির সঙ্গে মিলে যায়। এমনকি বন্য শূকরের ডিএনএও পাওয়া গেছে, যা তখনকার সময়ে তুলি তৈরিতে ব্যবহৃত হতো।
ওয়াই ক্রোমোজোম শুধু পুরুষদের মধ্যে থাকে এবং এটি পিতৃসূত্রে বংশ পরিচয় জানায়। গবেষণায় দেখা যায়, একটি চিঠি ও ছবিতে পাওয়া ওয়াই ক্রোমোজোম একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলো একটি নির্দিষ্ট হ্যাপলোগ্রুপের অন্তর্ভুক্ত, যার নাম ই১বি১।
এই হ্যাপলোগ্রুপ আজকের টাসকানি অঞ্চলের কিছু পুরুষের মধ্যে দেখা যায়। লিওনার্দো এই অঞ্চলেই জন্মেছিলেন ও কাজ করেছেন। ভবিষ্যতে যদি তার বাবার জীবিত বংশধরদের মধ্যেও একই হ্যাপলোগ্রুপ পাওয়া যায়, তাহলে এই ধারণা আরও শক্ত হবে।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এটি শুধু প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। আরও তথ্য সংগ্রহ না করা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না।
শিল্প ইতিহাসবিদরা মনে করেন, যেসব বস্তু পরীক্ষা করা হয়েছে সেগুলো লিওনার্দোর ডিএনএ খোঁজার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত নয়। বিশেষ করে ‘হোলি চাইল্ড’ ছবিটি নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। তাদের মতে, লিওনার্দোর বাবার লেখা কোনো নথি হলে তা বেশি কার্যকর হতে পারত।
তবুও অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এই গবেষণার পদ্ধতি ভবিষ্যতে বড় সাফল্য এনে দিতে পারে। যদি কখনো লিওনার্দোর দেহাবশেষ সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়, তাহলে শিল্পকর্ম থেকে পাওয়া ডিএনএর সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব হবে।
গবেষকরা ফ্রান্সে সংরক্ষিত লিওনার্দোর নোটবুক ও কম পরিচিত আঁকাগুলো পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করছেন। পাশাপাশি তার বাবার বংশধরদের কাছ থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব তথ্য একত্রে মিলিয়ে দেখাই তাদের লক্ষ্য।
গবেষকদের আশা, একদিন সব সূত্র মিলিয়ে তারা লিওনার্দোর জিনগত পরিচয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন। তবে শিল্পকর্মের সংরক্ষণ নিয়ে কঠোর নিয়ম থাকায় কাজটি সহজ নয়।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চির প্রতিভার রহস্য আজও মানুষের কৌতূহলের বিষয়। তার শিল্পকর্ম থেকে ডিএনএ খোঁজার এই প্রচেষ্টা হয়তো এখনো নিশ্চিত উত্তর দেয়নি, তবে এটি একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞান, শিল্প ও ইতিহাস একসঙ্গে কাজ করলে ভবিষ্যতে হয়তো আমরা এই মহান মানুষের জিনগত রহস্যের আরও কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব। এই অনুসন্ধানই প্রমাণ করে, প্রশ্ন আর কৌতূহলই জ্ঞানের আসল চালিকাশক্তি।
সূত্র : সিএনএন
মন্তব্য করুন







